kalerkantho


ঢাকায় ইউটার্ন প্রকল্প

আশার প্রদীপ নিভু নিভু!

রাতিব রিয়ান   

১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



আশার প্রদীপ নিভু নিভু!

যানজট কমাতে তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তা থেকে উত্তরা হাউস বিল্ডিং পর্যন্ত ১১টি ইউটার্ন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এ বছরের জুলাইয়ে নির্মাণ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্পে কোনো অগ্রগতি নেই। ইউটার্ন নির্মাণে যেসব জমি ব্যবহার হবে তার বিনিময় মূল্য চাইছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। ফলে কবে নাগাদ ইউটার্ন নির্মাণ হবে সে বিষয়ে কেউ-ই কোনো তথ্য দিতে পারছে না। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ইউটার্নগুলো নির্মাণ হলে ঢাকার সামগ্রিক যানজট ২৫-৩০ শতাংশ কমে যাবে।

গত ৪ নভেম্বর থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস এম কনস্ট্রাকশন এগুলো নির্মাণের কাজ শুরু করলে সড়ক ও জনপথ বিভাগের বাধায় তা আটকে যায়। বর্তমানে উত্তরার র‌্যাব-১-এর কার্যালয় ও রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্স বাদে বাকি ৯টি জায়গায় নির্মাণকাজ দুই মাস ধরে বন্ধ আছে। ইউটার্ন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) জানিয়েছে, ইউটার্নগুলো নির্মাণ করতে ৩৭.০৯ বিঘা জমির প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে সড়ক ও জনপথের ৩১.২৫ বিঘা, রেলওয়ের ১.৬১ বিঘা এবং সিভিল এভিয়েশনের ১.৮৩ বিঘা জমি রয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে অন্যান্য জমি। ওই প্রকল্পে যৌথ ব্যয় ধরা হয় ২৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১৯ কোটি ৮৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা দেবে সরকার। বাকি চার কোটি ৯৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা দেওয়ার কথা ডিএনসিসির। এসব ইউটার্ন নির্মাণ হওয়ার কথা ছিল তেজগাঁওয়ের সাতরাস্তা, তিব্বত মোড়, মহাখালী বাস টার্মিনাল, মহাখালী ফ্লাইওভার, বনানী চেয়ারম্যানবাড়ি, বনানী কবরস্থান, বনানী ওভারপাস, শেওড়া, কাওলা, উত্তরার র‌্যাব-১ অফিসের সামনের সড়ক এবং জসীমউদ্দীন এভিনিউয়ের সামনে।

প্রকল্প পরিচালক ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুব আলম বলেন, ‘কাজ শুরুর আগে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে বৈঠকও করা হয়েছিল। সমন্বয় সভায় সিদ্ধান্ত হয় ইউটার্ন প্রকল্পের জন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগ, সিভিল এভিয়েশন এবং রেলওয়ের কিছু জমি ব্যবহৃত হবে, তখন কোনো টাকা-পয়সার কথা হয়নি। কিন্তু সড়ক ও জনপথ টাকা চাইছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা এই সমস্যার কথা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি। এ ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে জমি বাবদ টাকা-পয়সার কোনো প্রসঙ্গ ছিল না। আমরা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে জমি পাচ্ছি না। জমিগুলো খালি পড়ে আছে। কবে নাগাদ জমি পাব তা-ও জানি না।’

মাহবুব আলম আরো বলেন, ‘প্রকল্পটি ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে শুরু হয়ে ২০১৭ সালের জুন মাসের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অনুমোদন পেতেই লেগে যায় দুই বছরের বেশি। এরপর প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। যদি এই জানুয়ারি মাসের মধ্যেও আমাদের কাছে জমিগুলো বুঝিয়ে দেওয়া হয় তাহলে আগামী জুনের মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব। না হলে এটা নির্ধারিত সময়ে শেষ করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।’

প্রকল্পের ঠিকাদার এস এম কনস্ট্রাকশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসিবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের লোকজনকে হয়রানি করা হচ্ছে। নানা অসুবিধা হচ্ছে। সব পক্ষই যদি সহায়তা না দেয় তাহলে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা মুশকিল হয়ে দাঁড়াবে।’ এ বিষয়ে ঢাকা সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মেহেদী ইকবাল বলেন, ‘ডিএনসিসিকে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে শর্ত দেওয়া হয়েছিল, আমরা বলেছি আমাদের জমির দাম দিতে হবে। এ ছাড়া যেসব স্থাপনা সরানো হবে তারও ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এখনো ডিএনসিসি ক্ষতিপূরণ দেয়নি। ক্ষতিপূরণ দিলে তারা কাজ শুরু করতে পারবে।’

এদিকে ইউটার্নের সুবিধা সম্পর্কে এস এম কনস্ট্রাকশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসিবুর রহমান বলেন, ‘ইউটার্নগুলো তৈরি হলে বিমানবন্দর সড়কের যানজট প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ কমে যাবে। একটি ইউটার্ন থেকে আরেকটি ইউটার্নের সর্বনিম্ন দূরত্ব হবে ৮০০ মিটার আর সর্বোচ্চ ৩.২ কিলোমিটার। এসব ইউটার্ন দিয়ে ছোট-বড় গাড়ি স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারবে। ইউটার্নের ক্রসিং পয়েন্টে রাস্তার দুই পাশের কিছু জমি নিয়ে সেখানে ডানে টার্ন নেওয়ার জন্য একটি লেন করে দেওয়া হবে। সেই লেন ব্যবহার করে গাড়ি ডানে টার্ন নিতে পারবে। ইউটার্নের উন্মুক্ত স্থানে থাকবে ফুলের বাগান। ফলে সৌন্দর্য বাড়বে।’

ডিএনসিসি জানায়, ইউটার্ন তৈরির জায়গা নির্ধারণ করতে ডিএনসিসির তৎকালীন মেয়র আনিসুল হক ২০১৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর উত্তরার জসীমউদ্দীন মোড় থেকে টঙ্গী পর্যন্ত পরিদর্শন করেন। সেদিন মেয়র জানিয়েছিলেন, যানজট নিরসনে প্রাথমিকভাবে বনানী-কাকলী, এয়ারপোর্ট, উত্তরার জসীমউদ্দীন ও আবদুল্লাহপুরের ট্রাফিক মোড়ে চারটি ইউটার্ন নির্মাণ করার প্রকল্প নিয়েছে ডিএনসিসি। পরে ওই বছরের ২৮ নভেম্বর ইউটার্ন নির্মাণবিষয়ক এক সভায় ডিএনসিসির পক্ষ থেকে জানানো হয়, গাজীপুর থেকে হাতিরঝিল পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার সড়ক ট্রাফিক সিগন্যালমুক্ত করতে ২২টি ‘ইউ’ আকৃতির গাড়ি ঘোরানোর জায়গা তৈরি করা হবে। ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ৬৯টি ক্রসিং বন্ধ করে এসব ইউটার্ন নির্মাণ করা হবে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের শুরুর দিকে ইউটার্নগুলো নির্মাণের জন্য ৫০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছিল ডিএনসিসি। কিন্তু ডিএনসিসির সীমানা আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত। আবদুল্লাহপুর থেকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সীমানা শুরু। ২২টি ইউটার্নের ১২টি ডিএনসিসি এলাকায় এবং ১০টি গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় পড়ে। এ কারণে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী দুই সিটি করপোরেশন আলাদা দুটি প্রস্তাবনা জমা দেয়। পরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ইউটার্ন প্রকল্পের ডিপিপি গ্রহণ করে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে কিছু শর্তসাপেক্ষে ডিপিপির প্রাথমিক সম্মতি দেয় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। প্রাথমিক অবস্থায় ডিএনসিসি এলাকায় ১২টি ইউটার্ন নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও পরে তা ১১টিতে নামিয়ে আনা হয়।


মন্তব্য