kalerkantho


স্কুলব্যাগ বড্ড ভারী

মারুফা মিতু   

১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



স্কুলব্যাগ বড্ড ভারী

ছবি : লুৎফর রহমান

লাল ফিতা সাদা মোজা...গুটি গুটি পায়ে স্কুলে যাওয়া। মাথায় সাদা ফিতার বেণি। আহা, বড় স্নিগ্ধ সে দৃশ্য! ছোট হাত-পায়ের কচি কচি মুখগুলো। কিন্তু কাঁধে ব্যাগের ভারে ক্লিষ্ট থাকে প্রায়-ই। ছোট শিশু এ ব্যাগ বহন করতে পারবে না বলে অভিভাবক-ই বহন করেন ব্যাগের বোঝা। 

অভিভাবকদের মতে, প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে স্কুলগুলোর কারণেই এ বাড়তি বোঝা বহন করতে হচ্ছে। তাদের বোর্ড নির্ধারিত বই যদি হয় ১০ থেকে ১২টি, তাহলে স্কুল নির্ধারিত সহপাঠ পুস্তিকা হবে আরো পাঁচ-ছয়টি। এর সঙ্গে খাতাসহ আরো আনুষঙ্গিক অনেক কিছু থাকে। থাকে পানির পট, টিফিন বক্স। ব্যাগের নিজেরও একটা ওজন আছে। সব মিলে ব্যাগভর্তি বইয়ের ওজন হয় সাত-আট কেজি বা তারও বেশি। আর প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া-আসায় দুবার করে ব্যাগ টানতে গিয়ে এসব শিশু শারীরিকভাবে কাহিল, কখনো কখনো বেঁটে হওয়ার কারণ হতে পারে।

সন্তানদের দৈহিক গড়নের তুলনায় বইয়ের বাড়তি বোঝা বয়ে স্কুলে আসা-যাওয়ার এমন চিত্র দেখা যায় রাজধানীর প্রতিটি স্কুল ও কোচিং সেন্টারে। অতিরিক্ত বই নিয়ে শিশু শিক্ষার্থীরা বলছে, বইয়ের এত বোঝা তারা টানতে পারে না। এ জন্য মা-বাবার পিঠে তুলে দেন। অভিভাবকরা বলছেন, অতিরিক্ত বইয়ের বোঝার কারণে শারীরিক চাপের পাশাপাশি মানসিক চাপও বয়ে বেড়াতে হয় ছোট বাচ্চাদের।

মিরপুরের কাজীপাড়ার তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর বাবা জানান, ‘তৃতীয় শ্রেণির এতটুকু বাচ্চার জন্য ১২/১৪টি বই-খাতা, তার ওপর পড়ালেখা কঠিন, তার সঙ্গে এত বই বয়ে বেড়ানোও সহজ নয়।’ সকালে স্কুলে নিয়ে আসেন মা, স্কুল ছুটি হলে বাবা নিয়ে যান বাসায়, এভাবে বইয়ের বোঝা নিয়ে শিশুদের সঙ্গে অভিভাবকদের প্রতিদিনের আসা-যাওয়া। তৃতীয় শ্রেণিতে বোর্ড অনুমোদিত বই হলো বাংলা, ইংরেজি, গণিত, ইসলাম ধর্ম, বিজ্ঞান এবং বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়।

চতুর্থ শ্রেণির একটি বইয়ের লিস্ট থেকে জানা যায়, বোর্ড অনুমোদিত তিনটি বইয়ের বাইরে তাদের রয়েছে ছয়টি বই। এ ছাড়া খাতা, খাবার, পানির পট মিলে ব্যাগের ওজন হয় চার কেজির বেশি।

একাধিক স্কুলের অভিভাবকরা বলেন, অতিরিক্ত ওজনে বাচ্চারা পিঠ ও পায়ে ব্যথা অনুভব করে। শিক্ষা আধুনিক হলেও এই বোঝা কমানো উচিত বলে মন্তব্য করেন তাঁরা। রাজধানীর উদয়ন বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নরত আজওয়াদ উৎস। উেসর বাবা কামরুজ্জামান জানান, ‘আমাদের শহরের বিদ্যালয়গুলোর আগে শেখানো বা পড়ানোর প্রবণতা বেশি। কেজি শ্রেণিতে পড়ানো হয় দ্বিতীয় শ্রেণির সিলেবাস। অথচ সেটা দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ালে বাচ্চার কোনো ক্ষতি নেই। শিক্ষকদের উচিত হবে বাচ্চাদের আগে শেখানোর প্রবণতা বাদ দেওয়া! তাহলে হয়তো বইয়ের বোঝা কমানো সম্ভব।’

রাজধানীর ইস্পাহানি উচ্চ বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীর বাবা আরিফ মাহমুদ। তাঁর মতে, বিদ্যালয়ে বাচ্চাদের একটি শেলফ রাখা দরকার। যেটা ক্লাসটিচার নিয়ন্ত্রণ করবেন। সেখানে ক্লাসের বইয়ের কিছু রাখলে বইয়ের চাপ কমবে।

ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক অভিভাবক জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘বাচ্চাদের তো বেশির ভাগ সময় ব্যাগ বহন করতে হয় না, এটা অভিভাবকরা করেন। কিন্তু যাঁদের একের অধিক বাচ্চা, তাঁদের ছেলেমেয়েরা ভারী ব্যাগ বহন করার মতো সমস্যায় পড়তে পারে।’

আজিমপুর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক আফরোজা জাহান বলেন, ‘সরকারের দেওয়া বইয়ের বাইরে অনেক বই পড়ানো হয়। অথচ এগুলো পড়ানোর দরকার নেই। কিন্তু আমাদের কথায় কেউ কোনো গুরুত্ব দেয় না।’

‘স্কুলে সব বাচ্চার জন্য যদি বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে তো বাচ্চাদের পানির বোতল আনতে হয় না। অথচ আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে বিশুদ্ধ পানির কোনো ব্যবস্থা

নেই।’ অভিভাবক আবু জাফর পুষ্টিকর বিস্কুট সরবরাহের পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

মগবাজারের একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ের একজন সহকারী অধ্যক্ষ জানান, ‘প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার নামে ছোট বাচ্চাদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হচ্ছে। শিশুদের ওপর বই চাপিয়ে দিয়ে লাভ কী?’

তিনি আরো বলেন, ‘ছোট বাচ্চারা ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে পড়বে, একাধিক বই পড়বে—এগুলো এখন স্ট্যাটাসের ব্যাপার। স্ট্যাটাস বাড়ানোর নামে শিশুদের হয়রানি বন্ধে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে।’ শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের শরীরের ওজনের ১০ শতাংশের বেশি ভার বহন করা উচিত নয়। এতে শিশুদের পিঠ ও পায়ে ব্যথাসহ বিভিন্ন রকমের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালে হাইকোর্ট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের শরীরের ওজনের ১০ শতাংশের বেশি ভারী স্কুলব্যাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে আইন প্রণয়নে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছিলেন। কিন্তু এর পর অন্য অনেক জনকল্যাণমুখী রুলের মতোই এ বিষয়ে আর কোনো অগ্রগতি জানা যায়নি।

শিশুদের বইয়ের ব্যাগ বহনের কষ্ট বুঝতে বিশেষজ্ঞ বা আইনের প্রয়োজন পড়ে না। কারণ প্রতিটি শিশুর অভিভাবকই এর ভুক্তভোগী। প্রতিদিনই অন্তত দুবার করে এর মুখোমুখি হতে হয়। আর স্কুলের পর কোচিং সেন্টার, অন্য শিক্ষকদের বাসায় যাতায়াতে শিশুদের নিত্য ব্যাগের বোঝা বহন করে চলতে হয়। মাঝেমধ্যে ব্যাগের বোঝার সঙ্গে সঙ্গে শিশুদের মনে পাঠভীতি এসে ভর করে।

রাজধানীর মগবাজারের এজি চার্চ বিদ্যালয়ের প্রিন্সিপাল শিখা বিশ্বাস জানান, ‘প্রতিটি ক্লাসে বই প্রয়োজন হয়। সেই অনুসারে খাতা। আমরা অভিভাবকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় বিভিন্ন সময়ে প্রস্তাব করেছি দুই সেট করে বই-খাতার। যেহেতু ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করে যেসব শিশু, তাদের পাঠ্যপুস্তকের দাম অনেক বেশি। সব অভিভাবকের পক্ষে তা কিনে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসি। আর আমার বিদ্যালয়ে শিশুদের পানি খাবার নিরাপদ ব্যবস্থা রয়েছে। পানির বোতলেই তো শিশুর ব্যাগটি ভার করে দেয়। এভাবে যদি স্কুল থেকে টিফিনের ব্যবস্থাও থাকত তাহলে শিশুদের ব্যাগের বোঝাও কমে যেত অনেকখানি।’


মন্তব্য