kalerkantho


২৫ দুর্ধর্ষ কারবারির নিয়ন্ত্রণে চলছে সোনাপাচার

সরোয়ার আলম   

১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



২৫ দুর্ধর্ষ কারবারির নিয়ন্ত্রণে চলছে সোনাপাচার

২৫ দুর্ধর্ষ চোরাকারবারির নিয়ন্ত্রণে চলছে সোনাপাচার। দীর্ঘদিন ধরে তারা শাহজালাল, শাহ আমানত ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে সোনার চালান পাচার করছে। ওই সব বিমানবন্দরে আছে তাদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। আবার তাদের সঙ্গে দহরম-মহরম সম্পর্ক আছে জুয়েলার্স দোকানের কিছু মালিকেরও। এ ছাড়া আছে রাজনৈতিক কানেকশন। অন্যদিকে বিমান ও সিভিল এভিয়েশনের কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারীও চোরাকারবারিদের সহায়তা করে আসছে। এরই মধ্যে পুলিশ, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর কারবারিদের পাশাপাশি বিমানবন্দরে কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের শনাক্ত করেছে বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। সিগন্যাল পেলেই তাঁদের আইনের আওতায় নিয়ে আসবে। তবে আসল চোরাকারবারিদের ধারে-কাছেও যেতে পারছে না আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। বড় চালানগুলো থেকে যাচ্ছে ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরেই শাহজালাল, শাহ আমানত ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নানা রকমের অপরাধ কর্মকাণ্ড ঘটছে। কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন ধরনের কৌশল অবলম্বন করেও কারো বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না। ওই সব বিমানবন্দরে অপরাধ কর্মকাণ্ডের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সোনাপাচার। বেপরোয়াভাবে বেড়ে গেছে সোনাপাচার। বিশেষ করে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর যেন সোনার খনি হিসেবে গড়ে উঠেছে। প্রায় প্রতিদিনই সোনার চালান ধরা পড়ছে। কেন এত পাচারের ঘটনা বেড়ে গেছে, তা নিয়ে চলছে নানা গবেষণা। তা ছাড়া গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও এই নিয়ে বিশেষ তদন্ত করেছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিশ্চিত হয়েছে, বিদেশি এজেন্টদের পাশাপাশি দেশি এজেন্টরা বেশি লাভের আশায় বেপরোয়া হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক মাফিয়ারা বাংলাদেশিদের সঙ্গে আঁতাত করে পাচার করছে। এরই মধ্যে পাচারকারীদের তালিকাও তৈরি করা হয়েছে। কোনো কোনো দেশের মাফিয়া বাংলাদেশে সক্রিয় আছে, তাদের একটি তালিকা করা হয়েছে। তালিকায় ২৫ দুর্ধর্ষ চোরাকারবারির নাম উঠে এসেছে। তাদের মধ্যে ১১ জনই অবস্থান করছে দুবাইয়ে।

এ বিষয়ে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ড. মইনুল খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সোনা চোরাকারবারিদের ধরতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হচ্ছে। এরই মধ্যে দুর্ধর্ষ চোরাকারবারিদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। অর্থের বিনিময়ে তাদের ভাড়ায় খাটাচ্ছে তালিকাভুক্ত কারবারিরা।’ এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেছেন, ‘দেশিদের পাশাপাশি বিদেশি মাফিয়ারা সোনাপাচারে সক্রিয় আছে। তাদের নাম ও পরিচয় পাওয়া গেছে। বেশ কয়েকজনকে ধরাও হয়েছে।’

সূত্র জানায়, তালিকাভুক্তরা বেশ প্রভাবশালী। তাদের সঙ্গে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। তা ছাড়া আছে রাজনৈতিক কানেকশন। তাদের ছবিসহ জীবনবৃত্তান্ত সব কয়টি বিমানবন্দরে থাকলেও কোনো কাজ হচ্ছে না। কৌশলে তারা বাহকের মাধ্যমে সোনার চালান পার করে দিচ্ছে। তাদের মধ্যে একজন হলো ফিরোজ আলম। তার গ্রামের বাড়ি একটি বিশেষ জেলায়। ওই জেলার একাধিক প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে তার ওঠা-বসা। বর্তমানে সে দুবাই অবস্থান করছে। গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছে, ফিরোজ যে পাসপোর্ট ব্যবহার করছে তাতে দেখা যাচ্ছে, সে সিঙ্গাপুর ও দুবাইয়ে ১৭ বার আসা-যাওয়া করেছে। মাঝেমধ্যে ঢাকায় এলে মিরপুর ডিওএইচএস থাকে। আরেক সোনাপাচারকারীর নাম মোহাম্মদ আনিস। তার গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ। সে গত আট মাসে ১৯ বার দুবাই, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ভারতে ভ্রমণ করেছে। বিশেষ করে সিঙ্গাপুর বেশি যাতায়াত করেছে। আরেক কারবারি মোহাম্মদ ওয়াহেদুজ্জামান। তার বাসা সায়েদাবাদ। একাধিকবার বিদেশ ভ্রমণ করেছে। বর্তমানে সে সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছে। তবে প্রায় সময়ই থাকে দুবাই। আরেকজন আবদুল আউয়াল। তার সঙ্গে শাসকদলের একাধিক নেতার যোগাযোগ আছে। ফারুক আহম্মেদ। তার গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ। বর্তমানে অবস্থান করছে দুবাই। দীর্ঘদিন ধরে সে সোনাপাচার করছে বলে গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছে। সোহেল রানা। তার গ্রামের বাড়ি দিনাজপুর। সুমন সারোয়ার। তার গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ। খলিল রহমান। তার গ্রামের বাড়িও মুন্সীগঞ্জ। দুজনই গত তিন বছরে অন্তত ৩৬ বার বিদেশ ভ্রমণ করেছে। মনির আহম্মেদ। তার গ্রামের বাড়ি নরসিংদী। ওয়ায়েদউল্লাহ। তার গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জ। তালিকাভুক্তদের মধ্যে ফারুক আহম্মেদ মাস তিনেক আগে ২০ বার দুবাই ও সিঙ্গাপুর গেছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া মিরপুরের সাইফুল ইসলাম, নারায়ণগঞ্জের মঞ্জুর হোসেন, পল্লবীর সামসুল হুদা, মুন্সীগঞ্জের ইসলাম শেখ, রাজবাড়ীর মোহাম্মদ হানিফ, মুন্সীগঞ্জের মোহাম্মদ রুবেল একাধিকবার দুবাই সফর করেছে। তারা বাংলাদেশে যতবার এসেছে, ততবারই সোনার চালান নিয়ে এসেছে বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে।

এ ছাড়া সূত্র জানায়, বিদেশ থেকে সোনা আসার পর পরই দেশের সীমান্ত এলাকাগুলো দিয়ে ১৭ জন ভারতীয় চোরাকারবারি সক্রিয় আছে। তারা বাংলাদেশের কারবারিদের কাছ থেকে নিয়মিত চালান নিয়ে যাচ্ছে। সাতক্ষীরা, বেনাপোল ও হিলি সীমান্ত দিয়ে বেশি সোনাপাচার হচ্ছে। ভারতীয় কারবারিরা বাংলাদেশের মোবাইল সিম ব্যবহার করছে। তারা এসএমএসের মাধ্যমে চালানের তথ্য আদান-প্রদান করছে। গোয়েন্দাদের তালিকা অনুযায়ী—রূপসাহা, গোপাল বিজন, বিজন হালদার, লহ্মণ সেন, গোবিন্দ বাবু, লালু জয়দেব, গওহর প্রসাদ, সঞ্জীব, রামপ্রসাদ, মিন্টু, সুমন চ্যাটার্জি, রিয়াজ, তপন সাহা, ডালিম, মোনায়েম, ফারুক, বসাক চ্যাটার্জি ও স্বপন সাহা বাংলাদেশে সোনাপাচারের সঙ্গে জড়িত। তারা দুবাই ও সিঙ্গাপুর থেকে সোনার চালান নিয়ে আসছে। তাদের সঙ্গে সিভিল এভিয়েশনের নিরাপত্তাকর্মী শরীয়তপুরের মিজান, রহিম উদ্দিন, নুর মোহাম্মদ, ইউসুফ, নজরুল, অপারেটর প্রতুল চন্দ্র দাসসহ প্রায় ১০ জনের একটি সিন্ডিকেট সক্রিয়। তারা সোনাপাচারের পাশাপাশি মানবপাচারও করে আসছে।

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চোরাচালানের পণ্য নির্বিঘ্নে পার করতে বিমানবন্দরে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থার অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাহায্য নেওয়া হচ্ছে। আবার চোরাচালানের ভাগ যাচ্ছে বিমানের সংশ্লিষ্ট শাখার কিছু অসাধু কর্মকর্তার কাছে। চোরাচালান রুখতে একের পর এক বিমানের উড়োজাহাজ পর্যন্ত জব্দ করা হয়েছে। চোরাচালানচক্র উড়োজাহাজে পণ্য রাখার জন্য নিজেরাই বিশেষ স্থান তৈরি করে সোনাসহ বিভিন্ন চোরাইপণ্য নিয়ে আসছে। শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে সবচেয়ে বেশি সোনাপাচার হচ্ছে। আর চোরাই সোনা বহনের অভিযোগে গত দুই বছরে বিমানের ছয়টি উড়োজাহাজ পর্যন্ত জব্দ করা হয়েছে।’

 

 


মন্তব্য