kalerkantho


যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা

দখলদূষণে নাকাল যাত্রী ও পথচারী

জাহিদ সাদেক   

১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



দখলদূষণে নাকাল যাত্রী ও পথচারী

মৃধাবাড়ি থেকে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা আসার পথে এই স্থানে বছরজুড়েই লেগে থাকে জলাবদ্ধতা

যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা থেকে বিভিন্ন এলাকায় সড়কের মুখে গড়ে তোলা হয়েছে লেগুনার অবৈধ স্ট্যান্ড। সায়েদাবাদ থেকে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা পর্যন্ত উড়াল সেতুর নিচের অংশ পরিণত হয়েছে আবর্জনার ভাগাড়ে। উড়াল সেতুর পিলার ঘেঁষে বসেছে চা-সিগারেটের দোকান। সড়কের দুই পাশের ফুটপাতে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী দোকান। বাদ যায়নি মূল সড়কও। এ ছাড়া যাত্রাবাড়ী থানার কাছের রাস্তায়ই আছে জলাবদ্ধতা। ফলে ক্রমেই এই মহাসড়কটি এখন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তার সড়কের ঠিক মুখেই রয়েছে খোলা একটি ডাস্টবিন। অন্যদিকে মহাসড়কে উড়াল সেতুর পাশ ঘেঁষেই বসানো হয়েছে আরেকটি ডাস্টবিন। ডাস্টবিনের কারণে শুধু উড়াল সেতুর সৌন্দর্যই নষ্ট হচ্ছে না, তীব্র দুর্গন্ধে প্রতিনিয়ত চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে যাত্রী ও পথচারীদের। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের চলাচলের জায়গায় থাকা এ ডাস্টবিনের ময়লা-আবর্জনা ও নোংরা পানি চারপাশের সড়কে প্রবাহিত হয়ে পরিবেশ ও জনজীবনকে করছে দুর্বিষহ। যাত্রাবাড়ী থেকে নিয়মিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে চলাচলকারী শিক্ষার্থী রায়হান উদ্দিন বলেন, ‘আমরা প্রতিনিয়ত এই চৌরাস্তায় ভোগান্তির শিকার হচ্ছি। জ্যামের সঙ্গে এই ডাস্টবিনের গন্ধের কারণে জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে। যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় মানুষের দুর্ভোগের যেন শেষ নেই।’

অন্যদিকে কী শীত, কী গ্রীষ্ম বছরজুড়েই ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার কিংবা মৃধাবাড়ি থেকে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা আসার পথেই রয়েছে বড় একটি জলাবদ্ধ জায়গা, যা যাত্রাবাড়ী থানার ১০০ গজ সামনেই। দীর্ঘদিন ধরে এ জায়গাটিতে জলাবদ্ধতা থাকলেও তা সমাধানের সুষ্ঠু ব্যবস্থা করা হচ্ছে না। এরই মধ্যে যাত্রাবাড়ী রুটটির চার লেনের কাজ শুরু হওয়ায় তা যেন অনেকটা সমাধানের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।

যাত্রাবাড়ী ঢাকা মহানগরীর প্রধান প্রবেশদ্বার। তিনটি বিভাগীয় শহরের বিপুল পরিমাণ গাড়ি ঢাকা মহানগরীতে প্রবেশ ও বের হওয়ার ফলে সৃষ্টি হচ্ছে নাগরিক জীবনে এক অবর্ণনীয় ও অসহনীয় মাত্রার তীব্র যানজটের। এই যানজট বর্তমানে এতটাই প্রকট আকার ধারণ করেছে যে চিটাগাং রোড থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত মাত্র সাত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে চার-পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগে যাচ্ছে। এ ছাড়া যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা থেকে বিভিন্ন এলাকায় যাওয়ার প্রতিটি সড়কের মুখে আছে লেগুনার অবৈধ স্ট্যান্ড। সড়ক দখল করে সেখানে প্রায় সব সময়ই দাঁড়িয়ে থাকে লেগুনা। এতে চৌরাস্তার মুখে সৃষ্টি হয় যানজটের। অন্যদিকে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সংস্কারের কাজে অত্যন্ত ধীরগতির কারণেও মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। ২০১৩ সালে উদ্বোধনের পর এখন মেয়র হানিফ উড়াল সেতুর ওপর দিয়ে দ্রুতবেগে গাড়ি ছুটলেও এর নিচের রাস্তার দীর্ঘদিন ধরে বেহাল অবস্থা, যা নিয়ে নগরবাসীর ক্ষোভের অন্ত নেই। এ ছাড়া বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। মেয়র মোহাম্মদ হানিফ উড়াল সেতুর বেশির ভাগ অংশ ওয়ারী ও যাত্রাবাড়ী থানা এলাকায়। দুই থানার সড়ক দুর্ঘটনাসংক্রান্ত মামলার নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত উড়াল সেতুর নিচের সড়কের গুলিস্তান থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুতুবখালী, ডেমরা সড়কের কাজলা, মাওয়া সড়কের দোলাইরপাড় প্রান্ত এবং উড়াল সেতুর গোলাপবাগ অংশে ৬১ জন পথচারী মারা গেছে। সবচেয়ে বেশি ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তা এলাকায়। ১১ জন মারা গেছে সায়েদাবাদ এলাকায়। তবে সেখানে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত পথচারীর প্রকৃত সংখ্যা বেশি বলে জানান যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মো. আনিসুর রহমান। তিনি বলেন, ‘যে পরিমাণ দুর্ঘটনা ঘটে, থানায় মামলা হয় তার চেয়ে কম। নিহতের আত্মীয়রা থানার অনুমতি নিয়ে লাশ দাফন করে ফেলে। অনেক সময় আমরা দুর্ঘটনার কথা জানতেও পারি না। ঘটনাস্থল থেকেই মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়।’

অন্যদিকে বাড়ছে ফুটপাত দখল ও মূল সড়কে হকারের উৎপাত। যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তার উড়াল সেতুর নিচের অংশ, ফুটপাত এবং মূল রাস্তা চলে গেছে হকারদের দখলে। চৌরাস্তা থেকে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল পর্যন্ত ফুটপাত দিয়ে পথচারীদের হাঁটার উপায় নেই। ফুটপাত দখল করে বসানো হয়েছে অস্থায়ী দোকান। এমনকি দোকান বসানো হয়েছে মূল সড়কেও। এতে পথচারীদের ঝুঁকি নিয়ে মূল সড়ক দিয়ে হাঁটতে হয়। রাস্তায় বসা কয়েকজন হকারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় কাউন্সিলরের পরিচয় দিয়ে কয়েকজন এসে টাকা নিয়ে যায়। এ ছাড়া থানার সামনে হওয়ায় বিভিন্ন সময়ে পুলিশকেও উেকাচ দেওয়া লাগে। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে যাত্রাবাড়ী থানার ওসি আনিসুর রহমান বলেন, ‘হকারদের আমরা কোনোভাবেই রাস্তায় বসতে দিই না। তাদের ব্যাপারে আমরা জিরো টলারেন্স দেখাই। হকার উচ্ছেদে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে।’ চৌরাস্তার সার্বিক দিক নিয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কপোরেশনের ৪৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. আবুল কালাম অনু বলেন, ‘আমরা কয়েকবার উদ্যোগ নিয়ে উড়াল সেতুর নিচের অংশ দখলমুক্ত করার চেষ্টা করেছি। চৌরাস্তা থেকে ডেমরার উড়াল সেতুর নিচে বালু ফেলে সব ঠিকঠাক করা হয়েছে। তবে বেশ কিছু অংশ এখনো বাকি আছে, যা খুব দ্রুত করা হবে। এ ছাড়া উড়াল সেতুর নিচে শৌচাগার, যাত্রীদের বিশ্রাম ও পার্কিংয়ের জায়গা করা হবে। তখন আর সেখানে ময়লা ফেলা যাবে না।’

 


মন্তব্য