kalerkantho


১২ কোটি টাকা ব্যয়, তবু ফুটল না ফুল!

রাতিব রিয়ান   

১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



১২ কোটি টাকা ব্যয়, তবু ফুটল না ফুল!

রাজধানীর ব্যস্ততম সড়কের আট কিলোমিটার ডিভাইডার অংশে সৌন্দর্য বাড়ানো, সবুজায়ন ও ফুল ফোটানোর জন্য ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ১২ কোটি টাকা ব্যয় করলেও তা কাজে আসেনি। যেসব সড়কে ফুলের চারা লাগানো হয়েছে তাতে ফুল ফোটেনি। নগরবাসী ও পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, সৌন্দর্য বর্ধন প্রকল্পে গাফিলতি থাকায় এই প্রকল্পের টাকা পুরোটায় গচ্চা গেছে। অন্যদিকে সিটি করপোরেশন দাবি করছে, বিরূপ পরিবেশের কারণে নগরে ফুল ফোটেনি।

২০১৬ সালের জুনে ডিএসসিসির সড়কগুলো সবুজায়নের পাশাপাশি সৌন্দর্যমণ্ডিত করে তুলতে এক বছরমেয়াদি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৭ সালের জুনে। কিন্তু তা শেষ হতে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যায়। এ ছাড়া গাছ লাগানো হলেও তাতে ফুল আসেনি, কোথাও কোথাও গাছ মারাও গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন প্রজাতির ফুলগাছ রোপণ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে গোলাপশাহ মাজার থেকে কাকরাইল নাইটিঙ্গেল মোড়, বঙ্গবাজার থেকে শেরাটন হোটেল, মৎস্য ভবন থেকে শাহবাগ মোড়, রমনা থানার সামনে থেকে মতিঝিলের বলাকা চত্বর এলাকা। প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল—মেয়াদ শেষে সড়কগুলোতে ফুলের সৌন্দর্য শোভা পাবে, ছড়াবে সৌরভ। কিন্তু ফুল ফোটা তো দূরের কথা, বেশির ভাগ জায়গায় ফুলগাছগুলো মরে যেতে শুরু করেছে। আবার কিছু কিছু গাছ লতা-পাতায় বেড়ে উঠলেও তাতে ফুটছে না ফুলের কুঁড়ি।

সড়ক ডিভাইডারে রোপণ করা গাছে ফুল না ফোটায় ডিএসসিসির কর্মকর্তারা ঢাকার পরিবেশের ওপর দোষ চাপাচ্ছেন। তাঁদের দাবি, সিটি করপোরেশন বেশ যত্ন নিয়েই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে চেয়েছে। কিন্তু প্রচুর ধুলাবালি ও কালো ধোঁয়ার কারণে গাছগুলোয় ফুল ফুটছে না। কিন্তু পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, ঢাকার মাটি অনেক নমনীয়। সহজেই এখানে গাছগাছালি বেড়ে ওঠার মতো পরিবেশ রয়েছে। একটু যত্ন নিলেই এ প্রকল্প ফলপ্রসূ হতো। এ অবস্থায় প্রকল্পটি নিয়ে আর সামনের দিকে এগোচ্ছে না ডিএসসিসি। এ জন্য আগের মতো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে সড়ক ডিভাইডারের সৌন্দর্য বর্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ বিষয়ে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মো. বিলাল বলেন, ‘আগে রাস্তার ডিভাইডারের সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ করত বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা। এর মধ্যে ব্যাংক, বীমা ও মোবাইল অপারেটর কম্পানি ছিল। আমরা আবার তাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছি। এরই মধ্যে এ বিষয়ে আমাদের বৈঠকও হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ঢাকার ব্যস্ততম সড়কগুলোর সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য যা করা দরকার তা-ই করা হবে। আমরা এখনই হাল ছেড়ে দিচ্ছি না। যারা ডিভাইডারে ফুলের চারা লাগিয়েছে আমরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছি। তারাও ফুল ফোটানোর চেষ্টা করছে।’

এরই মধ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, ডিএসসিসি নাগরিক সুবিধাদি নিশ্চিত করাসহ বিশেষত সড়ক মিডিয়ানের (বিভাজক) সৌন্দর্য বর্ধনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে করে থাকে। তা ছাড়া রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় ও বিদেশ থেকে আগত মেহমানদের পক্ষ থেকেও দৃষ্টিনন্দন ও মননশীলভাবে সড়ক মিডিয়ান সজ্জিতকরণের বিষয়টি লক্ষ করা হয়ে থাকে। এসব কাজে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে করপোরেশনকে সহায়তা করে থাকে। চিঠিতে আরো বলা হয়, করপোরেশন এলাকায় অধিকতর সৌন্দর্যমণ্ডিত করার লক্ষ্যে সৃজনশীল ধ্যান-ধারণায় সড়ক মিডিয়ানগুলোর সৌন্দর্য বর্ধন কাজ আপনার প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ব্যাংক, বীমা, টেলিকম অপারেটর, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, প্রিন্ট মিডিয়া প্রভৃতির মাধ্যমে করানোর বিষয়ে মেয়র অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন।

প্রকল্প সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পটি শুরুর আগে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রায় আট কিলোমিটার সড়কের বিভাজন অংশ বেছে নেওয়া হয়। এ প্রকল্পের নাম দেওয়া হয় ‘বাগান বিলাস প্রকল্প’। সিটি করপোরেশন সূত্র জানিয়েছে, ডিএসসিসির রাজস্ব বিভাগের বিউটিফিকেশন সেল থেকে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সৌন্দর্য বর্ধন করা হতো। তখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে নগর ভবনে আবেদনের মাধ্যমে একেকটি এলাকার সৌন্দর্য বর্ধনের দায়িত্ব নিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। কিন্তু মেয়র সাঈদ খোকন দায়িত্ব নেওয়ার পর সৌন্দর্য বর্ধন প্রকল্পে নিয়োজিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো আর সুযোগ পায়নি।

এ বিষয়ে প্রধান নগর পরিকল্পনা কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘নগরের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। আমাদের ভালো উদ্দেশ্য ছিল। গাছে ফুল ফোটানোর জন্য আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা ছিল; কিন্তু বিরূপ পরিবেশের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। সিটি করপোরেশনের আরো রুটিন অনেক কাজ রয়েছে। আগের মতো সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ছেড়ে দেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে।’

ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছি। আশা করি এরপর থেকে আর কোনো সমস্যা থাকবে না।’ এদিকে সিটি করপোরেশনের এমন উদ্যোগের সমালোচনা করে পরিবেশ বাঁচাও (পবা) আন্দোলনের চেয়ারম্যান আবু নাসের খান বলেন, ‘যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প করা মানেই এটি জনগণের টাকা ব্যয় করে করা হয়। তাই কোনো পরিকল্পনা হাতে নেওয়ার সময় পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই করা দরকার। আমার মনে হয়, ডিভাইডারগুলোর সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য পরিবেশ-প্রতিবেশগত দিকগুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।’

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) নির্বাহী সদস্য ও নগর বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘ঢাকার মাটি ও পরিবেশ এখনো অত খারাপ হয়নি যে তাতে গাছ মারা যাবে, ফুল ফুটবে না।’ তিনি আরো বলেন, ‘এই প্রকল্প কেন ফলপ্রসূ হলো না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কারো গাফিলতি থাকলে সেটাও গণমাধ্যমে আসা উচিত। জনগণের টাকা গচ্চা যাবে এটা মেনে নেওয়া যায় না।’

 


মন্তব্য