kalerkantho


রাজধানীতে বস্তি সমস্যা

উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার বস্তিজীবনের শেষ কোথায়

২১ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার বস্তিজীবনের শেষ কোথায়

সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুর ১২ নম্বরের ইলিয়াস মোল্লা বস্তিতে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় হাজারো ঘর

দেশে বিকাশমান অর্থনীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঘটেছে নগরায়ণ, বেড়েছে নগরের জনসংখ্যা ও আবাসনের চাহিদা। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে চাহিদা পূরণ না হওয়ায় ক্রমেই বাড়ছে অনিয়মতান্ত্রিক আবাসস্থল বস্তির সংখ্যা। আর এই বস্তিবাসীর জীবনমান খুবই নিম্ন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে নিরাপত্তাহীন উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার এক মানবেতর জীবনযাপন। এই নগরে বস্তিবাসী মানুষের যাপিত জীবনের নানা দিক তুলে ধরে সবিস্তারে লিখেছেন আরিফুর রহমান

 

দেশের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চল থেকে কাজের খোঁজে ঢাকাসহ অন্যান্য শহরে দলে দলে মানুষ আসছে প্রতিদিনই। এটি ঢাকার জনসংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। ঢাকায় এসে তারা নানা ধরনের অস্থায়ী কাজ করে। জীবিকার তাগিদে গ্রামাঞ্চল থেকে আসা এসব গরিব মানুষ থাকার জায়গা হিসেবে ঠাঁই করে নেয় ঢাকার অসংখ্য বস্তির কোনো একটিতে। থাকার জায়গা পেলেও এই বস্তিবাসীর অবস্থা দুর্বিষহ। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়। আবার অনেকের থাকার জায়গাও নেই। তারা ফুটপাত, রেলস্টেশন ও গাছতলায় থাকে। দেশে ক্ষমতার পালবদল ঘটে। ঘুরে যায় অনেকের ভাগ্যের চাকা। ঘোরে না শুধু সমাজের এই সব প্রান্তিক শ্রেণির মানুষের ভাগ্য। উল্টো প্রতিবছরই উচ্ছেদ কিংবা অগ্নিকাণ্ডে সর্বস্ব হারাতে হয় হাজারো বস্তিবাসীকে। বহুতল ভবন নির্মাণ করতে বস্তিতে আগুন লাগানোর অভিযোগ আছে বিস্তর। আবার বস্তির এসব মানুষকে ব্যবহার করা হয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেও। ভোটের সময় ভোট প্রার্থীদের তাদের দ্বারস্থ হতে দেখলেও সারা বছর আর কেউ খোঁজ রাখে না। গত দুই দশকে দেশে বস্তির সংখ্যা কমেনি, বরং বেড়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে সবার আগে আঘাত আসে বস্তিবাসীর ওপর। স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ মৌলিক অধিকার থেকেও তারা বঞ্চিত।

সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুর ১২ নম্বরের ইলিয়াস মোল্লা বস্তিতে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় হাজারো ঘর। সর্বস্ব হারিয়ে পথে নামতে হয় বস্তিবাসীকে। ঢাকার বস্তিগুলোতে নানা কারণে প্রায়ই আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। এসব অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্যে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট, গ্যাসের লিকেজ বা অসচেতনভাবে গ্যাসের লাইন থেকে আগুন ধরাসহ নানা কারণ দেখানো হয়; যদিও এর পেছনে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পাওয়া যায় স্বার্থান্বেষীমহলের নানা চক্রান্ত।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উল্টো দিকে কুমিল্লা বস্তি। কুমিল্লা থেকে আসা মানুষের হাত ধরে বস্তিটি গড়ে ওঠায় এটি এখনো কুমিল্লা বস্তি হিসেবে পরিচিত; যদিও ময়মনসিংহ, বাগেরহাট ও খুলনা থেকে আসা মানুষের সংখ্যাও কম নয়। বস্তির মাঝখানে ছোট একটি টং দোকান দিয়েছেন রোকেয়া বেগম। আলাপচারিতার একপর্যায়ে বস্তিতে কবে এলেন, কেন এলেন জানতে চাইলে হঠাৎই চোখে জল এসে গেল তাঁর। আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে রোকেয়া বেগম বললেন, ‘বাবারে, আমার মতো দুঃখ আর কেউ করে কি না জানা নাই। ’৮৮ সালে স্বামী মইরা যাওয়ার পর দুঃখের সাগরে ঝাঁপ দিছি। ভিটামাটি ছাইড়া দুই মাইয়া নিয়া ঢাকায় আইসা উঠছি এই কুমিল্লা বস্তিতে। প্রশাসন কতবার উচ্ছেদ করছে, তার হিসাব নাই। ছোট্ট একটা দোকান চালাই, এইখান থাইকা যা আয় হয় তাই দিয়া কোনো মতে দিন পার করি। আমাগো জীবন এইভাবেই যাইব। কেউ দেখার নাই।’ একই বস্তিতে কথা হলো ময়মনসিংহ থেকে আসা রিপার সঙ্গে। পাশের ইসলামিক ফাউন্ডেশনে রান্নার কাজ করেন তিনি। বস্তির জীবন কেমন—তাঁর অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ঘর ভাড়া লাগে আড়াই হাজার টাকা। ঘুপচি ঘরে থাকতে হয়। রান্নাবান্নার সমস্যা। গ্যাস নাই, পানি নাই। এ রকম হাজারটা সমস্যার মধ্যে বাস করতে হয় বস্তিতে।’

রাজধানীর শেরেবাংলানগরে একসময় বিএনপি বস্তি বেশ বড় ছিল। কিন্তু সরকারি অনেক অফিস হয়ে যাওয়ায় এটি এখন অনেক ছোট হয়ে গেছে। সেখানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষই বেশি। আবদুল মোতালেব নামের একজন জানালেন, তিন হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে থাকেন বস্তিতে। বিএনপি বস্তি ও কুমিল্লা বস্তিতে থাকা হতদরিদ্র মানুষগুলো ভয় আর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। কারণ প্রশাসন থেকে নোটিশ টাঙানো হয়েছে, রাজস্ব ভবন করা হবে সেখানে। অন্যদিকে রাজধানীর কড়াইল বস্তিতে বসবাসকারী আমিনুল ইসলাম ঝালমুড়ি বিক্রি করে পরিবার চালান। এত কষ্টের মধ্যেও কেন বস্তিতে থাকেন—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কই থাকমু। অন্য কোথাও থাকতে হইলে যে টাকা ভাড়া লাগব, সেইটা কই থাইকা আইব। কষ্ট হইলেও থাকতে হইব।’ রাজধানীসহ দেশের সব বস্তিতেই প্রায় একই চিত্র।

অমানবিক ও নোংরা পরিবেশের মধ্যেও কেন তাহলে বস্তিতে বসবাস? রাজধানীর বিএনপি বস্তি, কুমিল্লা বস্তি, তেজকুনিপাড়া বস্তি এবং সবচেয়ে বড় কড়াইল বস্তির মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, জীবিকার সন্ধানে প্রতিনিয়ত গ্রাম ছেড়ে শহরে ছুটছে দেশের ছিন্নমূল, ভূমিহীন ও বেকার মানুষ। নিরুপায় হয়ে গ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে শহরমুখী হচ্ছে এসব খেটে খাওয়া মানুষ। নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণেও গ্রাম ছাড়ছে অসংখ্য মানুষ। ঢাকায় এলে কাজ পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তায় অনেকে নাড়ির সম্পর্কে ইতি টেনে চলে আসে রাজধানীতে। খেটে খাওয়া হতদরিদ্র মানুষগুলো কাজের আশায় শহরে এসে মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে আশ্রয় নিচ্ছে বস্তিতে।

এসব বস্তিতে বসবাসকারীরা নানা পেশার সঙ্গে জড়িত। কেউ রিকশা চালায়, কেউ ভ্যান, কেউ বাসাবাড়িতে বুয়ার কাজ করে। কেউ রান্না করে বিভিন্ন স্থানে দিয়ে আসে। পোশাকশিল্প, নির্মাণশিল্প, সেবা খাতের বড় একটি অংশে বস্তির মানুষ কাজ করে। আবার বস্তিকে ঘিরে আছে মাদকের জমজমাট ব্যবসাও। বেশ কয়েকটি বস্তি ঘুরে জানা গেল, দিনদুপুরে বস্তিতে প্রকাশ্যে চলে মাদক ব্যবসা। এর সঙ্গে পুরুষ-নারী-শিশু সবাই জড়িত। প্রশাসনকে ম্যানেজ করে প্রকাশ্যেই চলছে এ ব্যবসা।

বাংলাদেশে বস্তি ও বস্তিতে বসবাসরত মানুষের সংখ্যা কত তা নিয়ে একটি জরিপ করেছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। সংস্থাটি দেখিয়েছে, বাংলাদেশে বস্তির সংখ্যা বাড়ছে। একই সঙ্গে সেখানে বসবাসরত মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। সংস্থাটি বলছে, স্বাধীনতার আগে ও পরে দেশের সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা সদর ও অন্যান্য শহরাঞ্চলে ছোট-বড় অসংখ্য বস্তি গড়ে উঠেছে। তবে দেশব্যাপী বস্তির বিকাশ ঘটেছে আশির দশকে। বিবিএসের হিসাবে, দেশে এখন বস্তির সংখ্যা ১৫ হাজার। তার মধ্যে রাজধানী ঢাকায়ই রয়েছে পাঁচ হাজারের বেশি বস্তি। এর আগে ১৯৯৭ সালে বিবিএসের করা জরিপ মতে, তখন বস্তির সংখ্যা ছিল দুই হাজার এক শ। সে হিসাবে গত ২০ বছরে দেশের সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা সদর ও অন্যান্য শহরাঞ্চলে বস্তি বেড়েছে প্রায় ৪০০ শতাংশ। বিবিএস বলছে, এসব বস্তিতে এখন প্রায় ২৫ লাখ মানুষ বাস করছে, যার মধ্যে পুরুষের সংখ্যাই বেশি। পুরুষের সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ, বাকিরা নারী।

বস্তিতে কেন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে—এমন প্রশ্নে বিবিএসের কর্মকর্তারা বলেন, সুউচ্চ দালান নির্মাণ, আধুনিকায়ন ও পরিচ্ছন্নতার জন্য ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী শহরে বড় অনেক বস্তি উচ্ছেদ করা হয়েছে। উচ্ছেদকৃত বস্তির অধিবাসীরা চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। তারা ছোট ছোট দলে মিলিত হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বস্তি গড়ে তুলেছে। ফলে দেশে বস্তির সংখ্যা বেড়েছে। পাশাপাশি পরিবার ও মানুষও বেড়েছে। যদিও বেসরকারি হিসাবে বস্তিতে বসবাসকারীর সংখ্যা আরো বেশি। অনেক বেসরকারি সংস্থার মতে, দেশের বস্তিগুলোতে এখন ৪০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস করছে।

কেন মানুষ বস্তিতে আসে তার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ৫১ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, কাজের সন্ধানে এসেছে তারা। ২৯ শতাংশ বলেছে, দারিদ্র্যের কারণে। কেউ বলেছে নিরাপত্তাহীনতার কথা। সবচেয়ে উদ্বেগজনক খবর হলো—বস্তিতে বসবাসকারীদের মধ্যে সাক্ষরতার হার (সাত বছরের ঊর্ধ্বে) মাত্র ৩৩ শতাংশ। পয়োনিষ্কাশনের সুবিধা আছে মাত্র ২৬ শতাংশ পরিবারে। আর ৫০ শতাংশ পরিবারে খাবার পানির প্রধান উৎস নলকূপ। বস্তিতে প্রতিদিনই ডায়রিয়া, কলেরা, ঠাণ্ডা, কাশি, অ্যাজমাসহ নানা রোগ লেগেই থাকে। এর কারণ দূষিত পানি ও পরিবেশ। তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি কখনো আলোচনায় আসে না। বস্তিতে বসবাসকারী এসব অসহায় মানুষের দরিদ্রতার সুযোগে তাদের ব্যবহার করে প্রভাবশালীরা। বস্তির ছোট শিশুদের দিয়ে মাদক ব্যবসা করানোর অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আবার সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানা এসব বস্তি। যেকোনো রাজনৈতিক দলের সভা-সেমিনারে ডাক পড়ে বস্তিবাসীর। দিনে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা দিয়ে মাথা কেনা হয়। রাজধানীর বিভিন্ন বস্তিতে বসবাসকারী নিম্ন আয়ের মানুষ জানিয়েছে, গ্রাম কিংবা জেলা শহরে কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকলে বস্তিতে আসতে হতো না। জেলা শহরে যদি শিল্প-কারখানা গড়ে উঠত, তারা সেখানেই কাজ করে সংসার চালাতে পারত। কিন্তু তা না থাকায় শহরে ছুটে আসা। সরকার বিভিন্ন প্রণোদনা ঘোষণা করতে পারে। গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে পারে। জেলা শহরে কম দামে ফ্ল্যাট নির্মাণের ব্যবস্থা থাকতে পারে। সিঙ্গাপুর সরকার বস্তিতে বসবাসকারীদের জন্য ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। সেখানে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। রয়েছে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা। মুম্বাইয়ে বস্তিবাসীর জন্য ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশেও ছোট পরিসরে ফ্ল্যাট নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। রাজধানীর ভাসানটেকে বস্তিবাসীর জন্য বহুতলবিশিষ্ট ফ্ল্যাট নির্মাণের উদ্যোগ ছিল সরকারের। কিন্তু সে উদ্যোগ সফল হয়নি। ফ্ল্যাট নির্মাণ না করেই টাকা তুলে পালিয়েছে ঠিকাদার। ফ্ল্যাট নির্মাণ এখনো অসম্পূর্ণ। নগর এলাকায় বস্তিতে বসবাসকারী দরিদ্র জনগোষ্ঠী ক্ষুদ্র ব্যবসা ও স্বল্প বেতনের চাকরির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে দেশের সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থেই বস্তিবাসীর উন্নয়নের বিকল্প নেই।

 

বস্তিবাসীকে অর্থনীতির মূল স্রোতোধারায় আনতে হবে



মন্তব্য