kalerkantho


এসএসসি প্রস্তুতি

বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়

শামীমা ইয়াসমিন, প্রভাষক, রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, উত্তরা, ঢাকা   

৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়

গুরুত্বপূর্ণ সৃজনশীল প্রশ্ন

১। উদ্দীপকটি পড়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :

‘ক’ দেশটি প্রায় দুই শ বছর অন্য একটি সাম্রাজ্যবাদী দেশের অধীনে পরিচালিত হয়েছিল। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট এ দেশটি সাম্রাজ্যবাদী দেশের অধীন থেকে মুক্তি পেয়ে নতুন একটি দেশের পূর্বাঞ্চল তথা একটি প্রদেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু পশ্চিম অংশের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব প্রদেশের ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনীতিকে সব সময় নিজেদের করায়ত্ত করে রাখে। ফলে পূর্ব প্রদেশের জনগণ প্রথমে নিজেদের ভাষা রক্ষার আন্দোলন শুরু করে এবং কালক্রমে এ আন্দোলন তাদের জাতীয়তাবাদের ভাবাদর্শ ছড়িয়ে দেয়।

ক) কে দ্বিজাতিতত্ত্ব প্রবর্তন করেন?

খ) ছয় দফা কর্মসূচির পটভূমি ব্যাখ্যা করো।

গ) ‘ক’ দেশটির সঙ্গে পূর্ব বাংলার আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদের উত্থানের মিলগুলো ব্যাখ্যা করো।

ঘ) তুমি কি মনে করো এ ধরনের আন্দোলন সর্বপ্রথম ছাত্ররাই সূচনা করেছিল? পাঠ্যপুস্তকের আলোকে মতামত দাও।

 

উত্তর : ক) মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ দ্বিজাতিতত্ত্ব প্রবর্তন করেন।

খ) পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের প্রতি পাকিস্তান রাষ্ট্রের চরম বৈষম্যমূলক আচরণ ও অবহেলার বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম সুস্পষ্ট রূপ লাভ করে ছয় দফার স্বায়ত্তশাসনের দাবিনামায়। ১৯৬৬ সালের ৫-৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত বিরোধী দলগুলোর এক সম্মেলনে যোগদান করেন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সেখানে তিনি সংবাদ সম্মেলন করে পূর্ব বাংলার জনগণের অধিকার রক্ষার জন্য ছয় দফা তুলে ধরেন।

গ) ‘ক’দেশটির সঙ্গে পূর্ব বাংলার আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদের উত্থানের বেশ কিছু মিল আছে। ‘ক’ দেশটি অন্য একটি সাম্রাজ্যবাদী দেশের অধীনে প্রায় দুই শ বছর পরিচালিত হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে ১৪ আগস্ট দেশটি সাম্রাজ্যবাদী দেশের অধীন থেকে মুক্তি পেয়ে নতুন একটি দেশের পূর্বাঞ্চল তথা একটি প্রদেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। অনুরূপভাবে, পাঠ্যপুস্তকে দেখতে পাই, ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট রাতে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয়। জন্ম নেয় দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের। একটি ভারত, অন্যটি পাকিস্তান। জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়। পূর্ববাংলা পাকিস্তানের একটি প্রদেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। এ ক্ষেত্রে আমরা ‘ক’ দেশটির সঙ্গে পূর্ববাংলার আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদের উত্থানের মিল লক্ষ করতে পারি। উদ্দীপক থেকে আরো দেখতে পাই, ‘ক’ দেশটির পশ্চিমাংশের শাসকগোষ্ঠী পূর্ব প্রদেশের ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও রাজনীতিকে সব সময় নিজেদের করায়ত্ত করে রাখে। ফলে পূর্ব প্রদেশের জনগণ প্রথমে নিজেদের ভাষা রক্ষার আন্দোলন শুরু করে এবং কালক্রমে এ আন্দোলন তাদের জাতীয়তাবাদের ভাবাদর্শ ছড়িয়ে দেয়। এ বৈশিষ্ট্যগুলোও পাঠ্যপুস্তকের সঙ্গে মিল রয়েছে। পাকিস্তানের শাসনভার পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। পূর্ববাংলার ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থাকে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী নিজেদের করায়ত্ত করতে শুরু করে। এর বিরুদ্ধে পূর্ববাংলার জনগণ প্রতিবাদ ও আন্দোলন গড়ে তোলে। মাতৃভাষা বাংলাকে রক্ষার জন্য ভাষা আন্দোলন শুরু করে। ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভাবাদর্শ ছড়িয়ে দেয়। পরিশেষে বলা যায়, ‘ক’ দেশটির সঙ্গে পূর্ববাংলার আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদের উত্থানে উল্লিখিত মিলগুলো লক্ষ করা যায়।

 

ঘ) হ্যাঁ, আমি মনে করি এ ধরনের আন্দোলন সর্বপ্রথম ছাত্ররাই সূচনা করেছিল। রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার দাবিতে ছাত্ররা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ‘বাংলা ভাষা দাবি দিবস’ পালনে বিশেষ ভূমিকা রাখে। ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় আসেন। ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনেও তিনি অনুরূপ ঘোষণা দিলে ছাত্রসমাজ প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে এবং ‘না না’ বলে তার উক্তির প্রতিবাদ জানায়। মাতৃভাষা বাংলাকে রক্ষার মাধ্যমে পূর্ববাংলার জনগণ জাতীয়ভাবে নিজদের বিকাশের গুরুত্ব বুঝতে পারে। এ ভূখণ্ডে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো রাষ্ট্রভাষা উর্দু নয় বরং বাংলাকে সমর্থন করে। ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন ঢাকার পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় জিন্নাহকে অনুকরণ করে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার নতুন ঘোষণা দেয়। এর প্রতিবাদে ছাত্রসমাজ ৩০ জানুয়ারি ধর্মঘট পালন করে এবং ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। সুতরাং এটা প্রমাণিত যে ভাষা আন্দোলনে ছাত্ররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ আন্দোলন এই দেশের মানুষকে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলে, যা পরবর্তী সময় বাঙালিদের মধ্যে ঐক্য ও স্বাধীনতার চেতনা জাগায়।

২। উদ্দীপকটি পড়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও :

আফ্রিকার একটি দেশ উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে গঠিত। উত্তরাঞ্চলের লোকজন চায় দেশটি দক্ষিণাঞ্চলীয় অত্যাচারী শাসকদের হাত থেকে মুক্ত হোক। তাই দেশটিতে কয়েকটি দল জনগণের চেতনা বৃদ্ধিতে কাজ করে। এসব দলের অনেক নেতা বিশ্ব জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করে এবং অনেকে যুদ্ধের প্রেক্ষাপট, উপযোগিতা এবং এর ভবিষ্যৎ রূপরেখা প্রণয়ন করে।

ক) মুজিবনগর সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান কোথায় হয়েছিল?

খ) বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে চীনের ভূমিকা ব্যাখ্যা করো।

গ) উদ্দীপকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যাদের অবদানের মিল রয়েছে পাঠ্যপুস্তকের আলোকে তাদের অবদান ব্যাখ্যা করো।

ঘ) তুমি কি মনে করো রাজনৈতিক ব্যক্তিরাই মূলত মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছিল? উত্তরের সপক্ষে যুক্তি দাও।

 

উত্তর : ক) মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলায় আম্রকাননে মুজিবনগর সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

খ) বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে চীনের ভূমিকা ছিল নেতিবাচক। বাংলাদেশের সঙ্গে তখন চীনের সুসম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। চীন ভারত-রাশিয়ার বিরোধী অবস্থানে ছিল। তখন পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের সুসম্পর্ক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। এ কারণে গণচীন আমাদের মুক্তিসংগ্রামে পাকিস্তানকে সর্বাত্মক সাহায্য করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ২১ আগস্ট জাতিসংঘের সদস্য পদ প্রদানের প্রস্তাবে চীন ভেটো দেয়। সুতরাং দেখা যায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে চীন বাংলাদেশের শত্রুপক্ষকে সাহায্য করে নেতিবাচক ভূমিকা পালন করে।

 

গ) উদ্দীপকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে রাজনৈতিক দলের অবদানের মিল রয়েছে। স্বাধীনতাযুদ্ধে বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী দলটি হলো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ প্রথমে পূর্ববাংলার জনগণকে স্বাধিকার আন্দোলনে সংগঠিত করে। ২৫ মার্চের পর রাজনৈতিক নেতৃত্ব সংগঠিত হয়ে সরকার গঠন, মুক্তি বাহিনী গঠন, বিদেশে জনমত সৃষ্টি ও সমর্থন আদায়, যুদ্ধের অস্ত্র সংগ্রহ এবং জনগণের মনোবল অটুট রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব মুক্তিযুদ্ধকে সফল করার ক্ষেত্রে শক্তি, মেধা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে সক্ষম হয়। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদান, ভারতে এক কোটি শরণার্থীর ত্রাণ ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা, মুক্তিযোদ্ধা ও গেরিলা যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র পরিচালনা এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিশ্ব জনমত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় আওয়ামী লীগ ছাড়াও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ন্যাপ (মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী), ন্যাপ (মোজাফফর আহমদ), কমিউনিস্ট পার্টি, জাতীয় কংগ্রেস ইত্যাদি। এসব দলের নেতাকর্মীরা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।

 

ঘ) হ্যাঁ, আমি মনে করি, রাজনৈতিক ব্যক্তিরাই মূলত মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছিল। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি রাজনৈতিক যুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করে রাজনৈতিক নেতৃত্ব। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলটি হলো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ প্রথমে পূর্ববাংলার জনগণকে স্বাধিকার আন্দোলনে সংগঠিত করে। এরপর ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভের পর জনগণকে স্বাধীনতা আনয়নে উদ্বুদ্ধ করে। ফলে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতাযুদ্ধের ডাকে সাড়া দিয়ে জনগণ মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব বাংলাদেশ সরকার গঠন করে। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাকে ১০ এপ্রিল ১৯৭১ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে। এতে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট, উপযোগিতা এবং এর ভবিষ্যৎ রূপরেখা প্রণীত হয়। ২৫ মার্চের পর রাজনৈতিক নেতৃত্ব সংগঠিত হয়ে সরকার গঠন, মুক্তি বাহিনী গঠন, বিদেশে জনমত সৃষ্টি ও সমর্থন আদায়, যুদ্ধের অস্ত্র সংগ্রহ এবং জনগণের মনোবল অটুট রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব মুক্তিযুদ্ধকে সফল করার ক্ষেত্রে শক্তি, মেধা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর সমর্থনে কতিপয় দল মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে। দলগুলো শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস নামক বিশেষ বাহিনী গঠন করে। এসব বাহিনী হত্যা, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ, নারীর সম্ভ্রমহানির মতো মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিল। স্বাধীনতাবিরোধী এ বাহিনীগুলো মুক্তিযোদ্ধা ছাড়াও ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর বাঙালিদের মেধাশূন্য করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে এ দেশের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে। রাজনৈতিক দলগুলো এসব ঘৃণ্য অপরাধীকে প্রতিহত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই বলা যায়, রাজনৈতিক ব্যক্তিরাই মূলত মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছিল।


মন্তব্য