kalerkantho


ঈদ যাত্রায় অশনি সংকেত মহাসড়কে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৮ মে, ২০১৮ ০০:০০



ঈদ যাত্রায় অশনি সংকেত মহাসড়কে

পিচ-খোয়া উঠে গেছে বহু আগেই। সেখানে বড় বড় গর্তে পানি-কাদা একাকার। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কালিয়াকৈরের পল্লী বিদ্যুৎ এলাকা থেকে শনিবার তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

নির্মাণে যথাযথ মানের উপকরণ ব্যবহার না করা, সময়মতো সংস্কার না হওয়া, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মহাসড়কই চলাচলের অনুপযোগী অবস্থায় রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ২০ বছরের স্থায়িত্ব নিয়ে নির্মাণ করা হলেও এক বছর যেতে না যেতেই মহাসড়ক চলাচলের উপযোগিতা হারাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যথাযথ মানের উপকরণের অভাব ছাড়াও অতিরিক্ত ওজনবাহী যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ না হওয়ায় নতুন মহাসড়কও দেবে যাচ্ছে। বড় বড় প্রকল্পে কমিশন বেশি বলে প্রকৌশলী ও ঠিকাদাররা রক্ষণাবেক্ষণের ছোট কাজে গুরুত্ব দেয় না। মন্ত্রী নির্দেশ দিলে তবেই প্রকৌশলীদের দৌড় শুরু হয়।

আসন্ন ঈদুল ফিতরে যাত্রী পরিবহনে বিঘ্ন দূর করতে আগামী ৮ জুনের মধ্যে সব মহাসড়ক যান চলাচলের উপযোগী রাখার নির্দেশ দিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী। এখন সওজ অধিদপ্তরের ৬১টি সড়ক বিভাগে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোথাও ইটের সুরকি ফেলা হচ্ছে, কোথাও পিচ ঢালা হচ্ছে। কিন্তু পরক্ষণেই বৃষ্টিতে ধুয়ে যাচ্ছে সংস্কারকাজ।

ভাঙা মহাসড়ক ছাড়াও মহাসড়কের পাশে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বাজার, অবৈধ গাড়ি স্ট্যান্ড, তিন চাকার বাহনের অবাধ চলাচলে এবার ঈদ যাত্রার আগেই শুরু হয়েছে যাত্রা ভোগান্তি। মহাসড়কে পুলিশসহ ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন সংগঠনের চাঁদাবাজি, অনুপযোগী গাড়ির বিকল হয়ে পড়া, উল্টোপথে গাড়ি চলাচলও এবার ঈদ যাত্রায় ভোগান্তি সৃষ্টি করবে। ২০১৬ সালের ২ জুলাই উদ্বোধনের পর ঢাকা-চট্টগ্রাম ও জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ চার লেন স্থানে স্থানে ভাঙতে শুরু করেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যাতায়াতে ১৬ ঘণ্টাও লাগছে। চার লেনে উন্নীত করার কাজ শেষ না হওয়ায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কেও দ্বিগুণ সময় লাগছে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে বাড়তি দেড়-দুই ঘণ্টা যাচ্ছে যানজটে।

গত মঙ্গলবার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গজারিয়ায় সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের আগামী ৮ জুনের মধ্যে সব মহাসড়ক ঠিক করার নির্দেশ দিলেও খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, রাস্তায় সংস্কারকাজ চলার কারণেও যানজট প্রকট হচ্ছে। যেমন—টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে যানজটে নাকাল হতে হচ্ছে এখনই। আগামী ১৬ জুন ঈদুল ফিতর হতে পারে ধরে নিয়ে সম্ভাব্য সরকারি ছুটি ঠিক করা হয়েছে ১৫ থেকে ১৭ জুন। ঢাকা থেকে ঈদে বাড়ি যেতে বেশি ব্যবহার হয় ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-মাওয়া, ঢাকা-আরিচা জাতীয় মহাসড়ক। এর মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে উন্নয়নকাজ চলছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজটের বড় কারণ হবে কয়েকটি নির্মাণাধীন সেতু ও টোল প্লাজায় ধীরগতি। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে চার লেনের ধীরগতি, ভাঙাচোরা অংশ ও জলাবদ্ধতা যানজটের কারণ। গত বছরের বন্যার ধকল সামাল না দিতেই এবার ঘন ঘন বর্ষণে নতুন নির্মিত মহাসড়ক চলাচলের উপযোগিতাই শুধু হারায়নি, হয়ে উঠেছে দুর্ঘটনাপ্রবণও। বেপরোয়া গাড়ি চলাচলে প্রতিদিন গড়ে কমপক্ষে ১৩ জনের প্রাণহানি ঘটছে।

দেশে জাতীয় মহাসড়ক, আঞ্চলিক মহাসড়ক ও জেলা সড়ক আছে ২১ হাজার কিলোমিটার। গত বছরের নভেম্বর থেকে গত জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাসে ১৭ হাজার ৯৭৬ কিলোমিটার মহাসড়ক জরিপ করে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের এইচডিএম বিভাগ। তাতে ধরা পড়েছিল ২৬ দশমিক ৩২ শতাংশ মহাসড়ক নাজুক। এরপর গত প্রায় চার মাসে বিভিন্ন মহাসড়ক স্থানে স্থানে আরো খারাপ হয়েছে। গত বছর বন্যা ও অতিবর্ষণে ২২ জেলার পাঁচ হাজার ১১৫ কিলোমিটার মহাসড়ক ক্ষতির মুখে পড়েছিল। সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের জন্য আগামী পাঁচ অর্থবছরে ২১ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা দরকার বলে ওই জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। আগের অর্থবছরে ১২ হাজার কোটি টাকার চাহিদা উল্লেখ করা হয়েছিল। চলতি অর্থবছরে রক্ষণাবেক্ষণে বরাদ্দ আছে এক হাজার ৭০৪ কোটি টাকা।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মহাসড়কে ৬০ থেকে ৭০ গ্রেডের বিটুমিন ব্যবহার বাধ্যতামূলক। কিন্তু ঠিকাদার ব্যবহার করে ৮০ থেকে ১০০ গ্রেডের বিটুমিন। নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহারের কারণে গরমে তা গলে যায়। এ কারণে সড়কে গর্ত ও ফাটল দেখা দেয়।

ঢাকা থেকে বের হওয়ার পথ থেকেই শুরু হয় যাত্রীদের ভোগান্তি। আট লেন করা হলেও যাত্রাবাড়ী থেকে কাঁচপুর পার হতেই লাগছে এক ঘণ্টারও বেশি। এ পথ দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ওঠা হয়। ঢাকার মহাখালী-বনানী-আব্দুল্লাহপুর হয়ে উত্তরবঙ্গগামী ও সিলেটগামী গাড়ি চলাচল করে। কিন্তু মহাখালী থেকে আব্দুল্লাহপুর পার হতে দুই ঘণ্টাও লাগছে। যাত্রাবাড়ী থেকে মাওয়ার পথে বড় যানজটের শুরু হয় যাত্রাবাড়ীতেই।

প্রতিবছর ঈদ যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে আন্ত মন্ত্রণালয় সভা হয়। এবার তা এখনো হয়নি। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী এরই মধ্যে অবশ্য ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে মাঠে উপস্থিত হয়ে অংশীজনদের নিয়ে বৈঠক করে নির্দেশনা দিচ্ছেন। তবে বৈঠকের সিদ্ধান্ত মাঠে বাস্তবায়ন খুব কমই দেখা যাচ্ছে।

ঢাকা-চট্টগ্রাম : এই মহাসড়কের কোনো কোনো অংশ যান চলাচলের প্রায় অনুপযোগী। বিভিন্ন অংশ বিচ্ছিন্নভাবে খারাপ ও খুব খারাপ। এসব অংশে গাড়ি ধীরগতিতে চলে। সৃষ্টি হয় যানজট। ঢাকা-চট্টগ্রাম-ময়মনসিংহ রুটের কাভার্ড ভ্যানচালক জসিম উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকা থেকে বের হয়ে কাঁচপুর থেকে দাউদকান্দি পর্যন্ত যানজটে কষ্ট করতে হয়। কুমিল্লার চান্দিনা থেকে কাঁচপুর সেতু পর্যন্ত অংশে এখনই নিয়মিত যানজট হচ্ছে। মেঘনা ও গোমতী সেতুতে টোল আদায়ে বিলম্বই এর বড় কারণ।’ সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবুল কাশেম বলেন, ‘এ মহাসড়কে ঈদের আগে উন্নয়নকাজ বন্ধ করে গাড়ি চলাচলের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেব।’ 

এই মহাসড়কের মহীপালে (ফেনী) রেল ওভারব্রিজের কাজ চলছে। কুমিল্লা সড়ক বিভাগের প্রকৌশলী এ কে এম মনির হোসেন পাঠান জানান, ফেনী থেকে কুমিল্লার দাউদকান্দি পর্যন্ত কাটিং, র‌্যাপিং ও ফিলিংয়ের কাজ চলছে। চলতি মাসের মধ্যেই তা শেষ হবে।

ঢাকা-টাঙ্গাইল : স্বাভাবিক সময়ে এই মহাসড়ক হয়ে ২৩ জেলার প্রায় আট হাজার যানবাহন চলাচল করে। তবে ঈদ মৌসুমে যান চলাচল প্রায় চার গুণ বেড়ে যায়। গত ঈদুল আজহার আগের দিন বঙ্গবন্ধু সেতুর ওপর দিয়ে ৩১ হাজারের বেশি গাড়ি পারাপার হয়, যা এই সেতু চালুর পর থেকে সর্বোচ্চ রেকর্ড। এখন চন্দ্রা মোড় থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত ৭০ কিলোমিটার পথে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত যাচ্ছে যানজটে। চান্দুরা থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত অংশে চার লেনের কাজ চলছে। জানা গেছে, ঈদ যাত্রার আগে কয়েকটি সেতু চালু হতে পারে। পুরো কাজ শেষ হবে না।

ঢাকার গাবতলী, মহাখালী টার্মিনালসহ বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড থেকে উত্তরবঙ্গের ২০টি জেলার যানবাহন চলে বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক, গাজীপুর বাইপাস ও আবদুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়ক ধরে সব যানবাহন এসে মেশে চন্দ্রা মোড়ে। হাটিকুমরুল, তাড়াশ, শেরপুর, মোকামতলা এলাকায় মহাসড়কের একাধিক স্থানে খানাখন্দে ভরা। সিরাজগঞ্জে ইট-খোয়া-পাথর-বিটুমিন উঠে চোখে পড়ে বড় বড় গর্ত। সওজের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবুল কাশেম বলেন, ‘এলেঙ্গার দিকে সড়কে কার্পেটিংয়ের কাজ চলছে। বৃষ্টির কারণে ঠিকমতো কাজ করা যাচ্ছে না। তার পরও মন্ত্রীর নির্দেশমতো মহাসড়ক প্রস্তুত হয়ে যাবে।’

পাবনা-নগরবাড়ী মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে বিটুমিন ও পাথর উঠে গেছে। সিরাজগঞ্জের চান্দাইকোনা থেকে গাইবান্ধার রহবল পর্যন্ত ৮০ কিলোমিটারের ২৫ কিলোমিটার অংশ খানাখন্দময়।

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার কাজ ৩০ শতাংশ বাকি। মির্জাপুরের গোড়াই থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত সেতু সংযোগ সড়ক ও সড়কদ্বীপ নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। সেই সঙ্গে মহাসড়কের স্থানে স্থানে গাড়ির চাকাও আটকে যাচ্ছে ভাঙার কারণে। নগর জালফৈ থেকে ঘারিন্দা অংশে খানাখন্দ বেড়েছে। বিসিক শিল্প এলাকা, পাবনা বাইপাসের আগেও ছোট-বড় গর্তের ওপর দিয়ে গাড়ি চালাতে হয়। কয়েক দিনের বৃষ্টিতে এলেঙ্গা ওভারব্রিজের দক্ষিণে খোয়া বের হয়েছে। 

ঢাকা-আরিচা : রাজধানী ঢাকার সঙ্গে পশ্চিমাঞ্চলের ২২ জেলার সড়ক যোগাযোগের মাধ্যম এই মহাসড়ক। এর গোলড়া বাসস্ট্যান্ড ও এখানে সবজির পাইকারি বাজার, মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড, বানিয়াজুড়ি বাসস্ট্যান্ড, উথুলি বাসস্ট্যান্ড এলাকায় যানবাহন এলোপাতাড়ি রাখায় যানবাহনের জট লেগে যায়। এই মহাসড়কে সাভারের আমিনবাজার, হেমায়েতপুর, উলাইল, সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড, নবীনগর, নয়ারহাট, কালমাপুর এবং নবীনগর-চন্দ্রার দীর্ঘ ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত তীব্র যানজট সৃষ্টি হয় সাম্প্রতিক সময়ে। চার লেনের নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কে ডিইপিজেড থেকে ভলিভদ্র বাজার পর্যন্ত ৬০০ মিটার সংস্কার হলেও প্রায় ৩০০ মিটার অংশের কাজ শেষ হয়নি। নবীনগর-চন্দ্রা ও টঙ্গী-আশুলিয়া-ডিইপিজেড মহাসড়কের সংযোগস্থল বাইপাইল ত্রিমোড়ে যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক থ্রি হুইলার বেড়ে যাওয়ায় যানজট হচ্ছে।

বগুড়া-নাটোর মহাসড়কের নন্দীগ্রামের জামাদারপুকুর থেকে গাড়ীদহ সড়কের বিভিন্ন স্থানে গভীর খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে। মহাসড়কের পৌরসভা এলাকার এবং জেলার বেশির ভাগ ‘আন্ত জেলা সড়কগুলো’ খানাখন্দে ভর্তি হয়ে ওঠায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এসব মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কের দেখভাল করা অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তারা বলছেন, বরাদ্দ না পাওয়ায়, বর্ষার কারণে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না।

 

 

 


মন্তব্য