বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করতে এবং সরকার উত্খাত করতে জোট বেঁধেছে দেশি-বিদেশি ২৮ সংগঠন। তাদের মধ্যে বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামী ছাড়াও ইসলামপন্থী আরো সাতটি জঙ্গি সংগঠন রয়েছে। অন্যগুলো ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমারের জঙ্গি ও সন্ত্রাসী সংগঠন। মতাদর্শ ভিন্ন হলেও পারস্পরিক স্বার্থে এক হয়ে ‘হিলফুল ফুজুল আল ইসলাম আল বাংলাদেশ’ নামে কাজ করছে তারা।
নতুন জঙ্গি জোটের ভয়ংকর পরিকল্পনা
আরিফুজ্জামান তুহিন, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার থেকে ফিরে

সরকারের প্রভাবশালী একটি গোয়েন্দা সংস্থার দেওয়া প্রতিবেদনের সূত্র ধরে কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
ষড়যন্ত্রের জাল বোনা ওই জোটে জামায়াতে ইসলামী ছাড়া বাংলাদেশের অন্য যে সংগঠনগুলো সক্রিয় রয়েছে সেগুলো হলো—জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি), হরকাতুল জিহাদ-বি, হিযবুত তাহ্রীর, হিজবুত তাওহীদ, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, শহীদ হামজা ব্রিগেড ও দাওয়াতে ইসলাম।
পাকিস্তানের সংগঠন জামাত-আল-পাকিস্তান এবং ভারতের কাশ্মীর অঞ্চলে সক্রিয় পাকিস্তানের মদদপুষ্ট সংগঠন জইশ-ই-মুহাম্মদও জোটে রয়েছে। জোটভুক্ত ভারতীয় সংগঠনগুলো হলো—জুম্ম হিজাব-উল-মুজাহিদিনি, হরকাতুল জিহাদ-আই ও উলফা। পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ভারতে সক্রিয় লস্কর-ই-তৈয়বাও এ জোটে রয়েছে।
জানা গেছে, ধরপাকড় চলার কারণে বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠনগুলো এখন তাদের নেটওয়ার্ক চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে বিস্তৃত করেছে; যদিও সম্প্রতি র্যাব ও চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের বেশ কিছু অভিযানে এসব সংগঠনের অনেক নেতাকর্মী আটক হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদও জব্দ করা হয়েছে। তবে তাতে দমে যায়নি সংগঠনগুলো। এখন চট্টগ্রামের হাটহাজারীর পাহাড়তলীকে শেল্টার হিসেবে ব্যবহার করছে তারা।
গোয়েন্দা সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর দক্ষিণ এশিয়ায় সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে আঞ্চলিক সহায়তা দানের ক্ষেত্র তৈরি করে। এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করে জঙ্গি-সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো যাতে অন্য দেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতে না পারে সে জন্য সরকার বেশ কিছু পরিকল্পনা নেয়। সে অনুযায়ী বাংলাদেশে আটক উলফা নেতাদের ভারতীয় কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ইতিমধ্যে উলফাসহ ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী বিভিন্ন সংগঠনের বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে জব্দ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এতে সরকারের ওপর নাখোশ হয় উলফা।
মিয়ানমারের সন্ত্রাসী সংগঠন আরএসও এবং আরাকান আর্মির ঘাঁটি নির্মূলেও বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এতে এসব সংগঠন ব্যাপক ক্ষুব্ধ হয়। আর মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার ও রায় কার্যকর করায় পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই কর্তৃক পরিচালিত ইসলামী জঙ্গি সংগঠনগুলোও খেপে যায় সরকারের ওপর। এই সম্মিলিত ক্ষোভ থেকেই সরকার উত্খাত করতে জোট বেঁধেছে ওই ২৮টি সংগঠন।
ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে তারা বিশেষভাবে বেছে নিয়েছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলাকে। এই তিন জেলাকে গুরুত্ব দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে অর্থ, অস্ত্র, যোগাযোগ ও প্রশিক্ষণের বিশাল নেটওয়ার্ক। গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, সন্ত্রাসী-জঙ্গিদের এই জোট বাংলাদেশে সরকার উত্খাতের লক্ষ্যে ২০১৬ ও ২০১৭ সালে বড় ধরনের নাশকতার ছক নিয়ে এগোচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর ও বন্দরসংলগ্ন অন্তত আড়াই শ শিল্পকারখানা বিস্ফোরণের মাধ্যমে উড়িয়ে দেওয়া। এ জন্য ইতিমধ্যে পাকিস্তানের আএসআইয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা গোপনে বাংলাদেশ সফর করে গেছেন। কর্নেল পদমর্যাদার ওই কর্মকর্তার নাম গোলাম সামদানি ইবনে বিন ইয়ামিনি। সার্বিকভাবে নাশকতার অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব পড়েছে মাসুদউল্লাহ নামের এক বাংলাদেশির ওপর। তিনি এ জোটের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন।
জানা গেছে, নাশকতাকারীরা চট্টগ্রামের পতেঙ্গা এলাকার দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের তিন তেল কম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনায় একযোগে গ্যাস বোমা বিস্ফোরণ ঘটানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। তা করতে পারলে চট্টগ্রাম বন্দর ধ্বংস হওয়া ছাড়াও এ অঞ্চলের ছোট-বড় অন্তত আড়াই শ শিল্পপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে যাবে। এর মধ্যে রয়েছে কর্ণফুলী সার কারখানা (কাফকো), টিএসপি সার কারখানা, ডিএপি সার কারখানা এবং নৌবাহিনীর প্রশিক্ষণকেন্দ্র। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সরকারি বিভিন্ন কারখানা ও তেল শোধনাগারে জঙ্গি সংগঠনগুলোর সদস্যরা চাকরিও করছে।
কক্সবাজারে সরকারি দলে ভিড়ছে জঙ্গিরা : অনুসন্ধানে জানা গেছে, সীমান্তবর্তী এলাকা কক্সবাজারকে কেন্দ্র করে কার্যক্রম বিস্তৃত করছে আরএসও। এ কাজ করতে গিয়ে তারা সরকারি দলে ঠাঁই নিচ্ছে, কখনো সরকারি দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে অর্থের বিনিময়ে নিজেদের কবজায় রাখছে। আরএসওর সামরিক প্রধান মাস্টার আইয়ুব সম্প্রতি একাধিকবার কক্সবাজার ঘুরে গেছেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে গোপনে বৈঠকও করেছেন তিনি। বৈঠকে আইয়ুব ছাড়াও আরএসওর প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান মোহাম্মদ ইউনূচুর রহমান ও সংগঠনটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ইবরাহিমও ছিলেন। কক্সবাজারে পাঁচতারা মানের একটি হোটেলে বৈঠক করেন তাঁরা। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি শফিউল্লাহ। বৈঠকের একাধিক ছবি কালের কণ্ঠের হাতে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, শফিউল্লাহর বাবা সালেহ আহমদ আরএসওর প্রতিষ্ঠাকালীন সহসভাপতি ছিলেন। শফিউল্লাহ ছাত্রজীবনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বর্তমানে বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা জঙ্গি সংগঠনের জন্য অবৈধভাবে পাঠানো হুন্ডির টাকা গ্রহণ ও তা বিতরণের মূল দায়িত্ব শফিউল্লাহর ওপর। পাঁচ বছর ধরে তাঁর বিরুদ্ধে শতাধিক গোয়েন্দা প্রতিবেদন দাখিল করা হলেও সরকারি দলের প্রভাবশালী এক নেতার কারণে দীর্ঘদিন সেসব প্রতিবেদন চাপা পড়ে ছিল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১০ সালে তত্কালীন বান্দরবান জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী মুজিবুর রহমানের (বর্তমানে বহিষ্কৃত) হাত ধরে শফিউল্লাহ আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ওই বছরই উপজেলা সম্মেলন কমিটির সদস্যসচিব হন। ২০১২ সালে শফিউল্লাহ উপজেলা কমিটির মানবসম্পদবিষয়ক সম্পাদক মনোনীত হন। একই বছর আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচন করে হেরে যান। ২০১৪ সালের ২৩ নভেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর একটি হোটেল থেকে শফিউল্লাহ ও এক পাকিস্তানি নাগরিকসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশ। ওই সময় পুলিশ দাবি করে, ওই পাঁচজন আরএসও নেতা।
সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থা নিশ্চিত করেছে, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান তোফাইল আহম্মদ (সম্প্রতি গ্রেপ্তার করা হয়েছে) ও শফিউল্লাহ বান্দরবানের সীমান্ত এলাকায় বিচ্ছিন্নতাবদী সংগঠনগুলোকে আর্থিক সহযোগিতা করে আসছেন। তাঁরা রোহিঙ্গা জঙ্গিদের মদদ দেন।
তবে এ ব্যাপারে শফিউল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা আমার বিরুদ্ধে যড়যন্ত্র। আমি কোনো আরএসওকর্মীকে সহায়তা দিই না। প্রতিপক্ষের লোকেরা এসব অপপ্রচার করে বেড়াচ্ছে।’
কক্সবাজার অঞ্চলের আরেক জঙ্গি নেতা আরএসওর সাবেক কমান্ডার হাফেজ সালাউল ইসলাম কক্সবাজার ও বান্দরবানে সরকারি জমি দখল করে একের পর এক মাদ্রাসা নির্মাণ করেছেন। এসব মাদ্রাসায় রোহিঙ্গা জঙ্গি এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন ইসলামী জঙ্গিবাদী সংগঠনের সদস্যদের জন্য প্রশিক্ষণ ক্যাম্প গড়ে তোলেন তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে থ্রি মার্ডারের একটি মামলাসহ কয়েকটি মামলায় পুলিশ অভিযোগপত্র দিয়েছে। অথচ তিনি প্রকাশ্যেই চলাফেরা করেন। অভিযোগ রয়েছে, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী একজন সংসদ সদস্য এবং বিএনপি ও ইসলামী ঐক্যজোট নেতারা পাশে থাকায় পুলিশ তাঁর কিছু করতে পারে না।
২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর সালাউলের উত্থান শুরু হয়। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, কক্সবাজারের লিংক রোডে দক্ষিণ মুহুরীপাড়ায় সরকারি বন বিভাগের সাত একর ও স্থানীয় মানুষের তিন একরসহ ১০ একর জায়গা দখল করে সেখানে ইমাম মুসলিম (রহ.) ইসলামিক সেন্টার গড়ে তুলেছেন তিনি। কার্যত এখান থেকেই আরএসওর সব কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ইমাম মুসলিম (রহ.) ইসলামিক সেন্টার নামের মাদ্রাসাটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট এ কে আহাম্মদ হোসেন। সালাউলের সঙ্গে তাঁর সখ্যের অনেক ছবি কালের কণ্ঠের কাছে আছে। সালাউলের আশ্রয়দাতা হিসেবে আহাম্মদ হোসেন ছাড়াও রয়েছেন জেলা শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক মো. জহিরুল্লাহ, ওলামা দলের জেলা সভাপতি মাওলানা আলী আহসান, জেলা ইসলামী ঐক্যজোট নেতা ও হেফাজতে ইসলাম নেতা মুফতি এনামুল হক, জেলা ইসলামী ঐক্যজোটের সভাপতি হাফেজ সালামত উল্লাহ ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মো. ইসমাইল। সালাউলের ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করছেন জেলা ছাত্রলীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম সাহেল। সালাউলের আরেক ঘনিষ্ঠ সহচর জেলা ইসলামী ঐক্যজোট ও হেফাজতে ইসলাম নেতা মুফতি এনামুল হক। ইমাম মুসলিম (রহ.) ইসলামিক সেন্টার ছাড়াও আরো ১২টি মাদ্রাসায় প্রতি মাসের খরচ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, হুন্ডির মাধ্যমে।
টেকনাফে রহস্যঘেরা সোনার দোকান : কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় দীর্ঘদিন চারটি সোনার দোকান ছিল। কিন্তু গত তিন বছরের মধ্যে এ অঞ্চলে প্রায় ২০০ সোনার দোকান গড়ে উঠেছে। সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, উপজেলার কুমারপাড়া, শাহপরীর দ্বীপ রোড, শীলবুনিয়া, নাজিরপাড়া, নয়াপাড়াসহ পৌর এলাকায় এসব দোকান গড়ে উঠেছে। বেচাকেনা নেই, অথচ একেক দোকানে অন্তত ৯ জন কর্মচারী। স্থানীয় যুবক আহাদ সরকার জানান, কিছুদিন আগেও এসব দোকানে আরাকান আর্মির পোস্টার সাঁটানো থাকত। অধিকাংশ সোনার দোকানের মালিক মিয়ানমারের নাগরিক। স্থানীয় লোকজন জানিয়েছে, প্রতিদিনই রহস্যময় এসব দোকানের সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশ হয়ে পাচার হওয়া সোনা এসব দোকানের মাধ্যমে লেনদেন হয়।
২১টি একে-৪৭-এর খোঁজে গোয়েন্দারা : আরএসও সামরিক প্রধান মাস্টার আইয়ুব ২১টি একে-৪৭ রাইফেল বাংলাদেশে এনে তা কক্সবাজারে মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী কোথাও লুকিয়ে রেখেছিলেন বেশ কিছু বছর আগে। আরএসও ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে আসা একাধিক নেতা কালের কণ্ঠকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। স্থানীয় রোহিঙ্গা সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি মাস্টার আইয়ুব বাংলাদেশে এসেছেন। এসব অস্ত্র তিনি হিলফুল ফুজুলের জোটসঙ্গী কোনো বন্ধু সংগঠনের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন।
কেন্দ্র এখন চট্টগ্রামে : জেমএবি তাদের ঘাঁটি এলাকা হিসেবে বেছে নিয়েছে চট্টগ্রামকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়িয়ে বন্দরনগরীতে শক্তি সঞ্চয় করেছে তারা। সংগঠনের নেতাকর্মীরা নগরীতে বিভিন্ন পেশায় জড়িত। গত বছরের ৫ অক্টোবর কর্ণফুলী থানার খোয়াজনগর আজিমপাড়া লাল মিয়া কন্ট্রাক্টর সড়কের হাজি নূর আহমদ টাওয়ার এলাকা থেকে গ্রেনেড, বোমা, অস্ত্রসহ জেএমবির পাঁচ জঙ্গিকে আটক করা হয়। গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর রাতে পাহাড়তলী এলাকায় অভিযান চালিয়ে জেএমবির তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। ওই আস্তানা থেকে একটি এমকে-১১ রাইফেল, ১৯০ রাউন্ড গুলি, বিস্ফোরক জেল, ১০টি ডেটোনেটর, বোমা তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম পাওয়া যায়। খেলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে হিযবুত তাহ্রীর সারা দেশের মধ্যে এখন সবচেয়ে বেশি সক্রিয় রয়েছে চট্টগ্রামে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে হিযবুত তাহ্রীরের সক্রিয়তার খোঁজ পাওয়া গেছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই পাহাড়তলী। এ ছাড়া চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন সরকারি কলেজ ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আস্তানা গড়ে উঠছে এ সংগঠনের। গত বছরের ৯ আগস্ট হিযবুত তাহ্রীর চট্টগ্রামের কমান্ডার সোহান ইয়ারিসকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
অভিযোগ রয়েছে, পাহাড়তলীর হাফেজ এনায়েত উল্লাহর বাড়িতে হিলফুল ফুজুলের নেতারা বৈঠক করেন। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও মানবপাচার হয় এ বাড়ি থেকে।
২০১৩ সালে জামায়াতের ছাত্রসংগঠন শিবির থেকে বেরিয়ে শহীদ হামজা ব্রিগেড গঠনের পর এ পর্যন্ত বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে র্যাব এ সংগঠনের অর্ধশতাধিক ব্যক্তিকে আটক করে। এ সময় উদ্ধার করা হয় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও বিস্ফোরক দ্রব্য। বিভিন্ন সময় অভিযানে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র, গোলাবারুদ ছাড়াও আন্তর্জাতিক এক অস্ত্র বিক্রেতাকে আটক করা হয়। এ সংগঠনের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত অস্ত্রের মধ্যে একে-২২ রাইফেল, এলজি ও বিস্ফোরক জেল পাওয়া গেছে।
জঙ্গিবাদীদের সহায়তা, পাহাড় কাটা ও রোহিঙ্গাদের দিয়ে পাহাড় দখলের অভিযোগ রয়েছে হাটহাজারী সদর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আলী আজমের বিরুদ্ধে। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় পাহাড় কাটা মামলায় জেলও খেটেছেন তিনি। ছোট ভাই আফছারকে দিয়ে পাহাড় কেটে আফছার ফার্ম নামে একটি মুরগির খামার করেছেন। এখানে কম টাকায় রোহিঙ্গারা কাজ করে। এখানকার সন্দ্বীপপাড়া, আদর্শগ্রাম ও গুচ্ছগ্রামে সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গা থাকে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে গত বৃহস্পতিবার আলী আজম মোবাইল ফোনে বলেন, ‘এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি বাধ্য না। আপনার সঙ্গে এ বিষয়ে আমি কোনো কথা বলব না।’ ফোন করে বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চাওয়ায় তিনি থানায় জিডি করারও হুমকি দেন।
চট্টগ্রাম অঞ্চলে ইসলামী জঙ্গিগোষ্ঠীর সক্রিয়তার ব্যাপারে জানতে চাইলে গত শুক্রবার র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এরা চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করে থাকে বলে আমাদের কাছে তথ্য আছে। তবে আমাদের অভিযানে তাদের বড় বড় নেতা ও অস্ত্র ধরা পড়ায় তারা অনেকটাই কোণঠাসা। জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে।’
সম্পর্কিত খবর

ড. ইউনূসের মন্তব্যে জয়শঙ্করের দাবি
বঙ্গোপসাগরে রয়েছে ভারতের দীর্ঘতম উপকূলরেখা
কালের কণ্ঠ ডেস্ক

চীন সফরে গিয়ে ভারতের সেভেন সিস্টার্স নিয়ে করা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারপ্রধান ইউনূসের মন্তব্যের পাল্টা জবাব দিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলটি বিমসটেকের জন্য একটি সংযোগ কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে; যেখানে সড়ক, রেলপথ, জলপথ, গ্রিড এবং পাইপলাইনের অসংখ্য নেটওয়ার্ক রয়েছে।’
বিমসটেক ঘিরে জয়শঙ্করের সেই বার্তাকে ভারত-বাংলাদেশ কূটনীতিতে বেশ তাৎপর্যবাহী বলে মনে করছে ভারতের গণমাধ্যমগুলো।
এখন ব্যাঙ্ককে চলছে বিমসটেকের শীর্ষ সম্মেলন।
কিছুটা পরে হলেও জয়শঙ্কর বলেন, ‘বঙ্গোপসাগরে আমাদের দীর্ঘতম উপকূলরেখা রয়েছে, প্রায় ছয় হাজার ৫০০ কিলোমিটার। ভারত শুধু পাঁচটি বিমসটেক সদস্যের সঙ্গেই সীমান্ত ভাগ করে না, তাদের বেশির ভাগকেই সংযুক্ত করে। বরং ভারতীয় উপমহাদেশ এবং আসিয়ানের মধ্যে সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশও প্রদান করে।

টিউলিপের আইনজীবীরা দুর্নীতিসংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রস্তুত
কালের কণ্ঠ ডেস্ক

সাবেক ব্রিটিশ মন্ত্রী টিউলিপ সিদ্দিকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে যেকোনো আনুষ্ঠানিক প্রশ্নের উত্তর দিতে তাঁর আইনজীবীরা প্রস্তুত। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে টিউলিপ নিজে এ কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমার বিরুদ্ধে কয়েক মাস ধরেই একাধিক অভিযোগ আনা হচ্ছে। কিন্তু অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করা হয়নি।
গত জানুয়ারিতে টিউলিপের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে একাধিক দুর্নীতিতে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগ আনা হয়। এরপর তদন্তের স্বার্থে অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন তিনি। মন্ত্রিত্ব ছাড়ার পর জনসমক্ষে এটি ছিল তাঁর প্রথম বক্তব্য।
স্কাই নিউজকে গত মাসে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বরাবর একটি চিঠি লিখেছিলেন টিউলিপের আইনজীবীরা। সাবেক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোকে মিথ্যা ও বিরক্তিকর বলে উল্লেখ করেন তাঁরা।
কয়েক সপ্তাহ আগে লেখা ওই চিঠিতে আরো বলা হয়, টিউলিপের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগসংক্রান্ত সব জিজ্ঞাসা যেন ২৫ মার্চের মধ্যে প্রেরণ করা হয়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে সাবেক মন্ত্রী লিখেছেন, সময়সীমা অতিক্রম হয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। স্কাই নিউজ বাংলাদেশ সরকারের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সূত্র : স্কাই নিউজ

চিফ প্রসিকিউটর
জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার বানচালে অর্থ বিনিয়োগের প্রমাণ মিলেছে
নিজস্ব প্রতিবেদক

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডের বিচার বানচাল করতে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এতে পতিত সরকারের লোকজন মোটা অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করছে। যার সুনির্দিষ্ট তথ্য পেয়েছে প্রসিকিউশন। এসব ঘটনায় জড়িতদের চিহ্নিত করা হয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, ‘বিচার বানচাল করতে মোটা অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগের তথ্য আমরা পেয়েছি। জড়িতদের অনেককে শনাক্ত করা হয়েছে। এখনই বিস্তারিত প্রকাশ করছি না।

মুরগির দাম কিছুটা কম টমেটো ও পেঁপে বাড়তি
নিজস্ব প্রতিবেদক

ঈদের ছুটি এখনো চলছে। আপনজনদের সঙ্গে ঈদ উদযাপনে ঢাকার বাইরে যাওয়া মানুষের ফেরার স্রোত এখনো শুরু হয়নি। এ জন্য রাজধানীর বাজারগুলোতে ক্রেতা-বিক্রেতাদের চিরচেনা সেই হাঁকডাক নেই। এমন পরিস্থিতিতে মুরগির দাম কিছুটা কমেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর রামপুরা, বাড্ডা ও জোয়ারসাহারা বাজার ঘুরে এবং বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ঈদের চতুর্থ দিন পরও রাজধানীর বাজারগুলোতে ক্রেতার তেমন আনাগোনা নেই।
বিক্রেতারা বলছেন, রাজধানীর বাজারগুলোতে চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে মুরগি ও কিছু সবজির দাম কমেছে। আবার সরবরাহ সংকটের কারণে কিছু সবজির দাম বেড়েছে।
বাজারে সব মুদি ও সবজির দোকান এখনো খোলেনি।
রাজধানীর বাজারগুলোতে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ২১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা ঈদের বাজারে ২২০ থেকে ২৩০ টাকায় উঠেছিল। সোনালি মুরগি মানভেদে বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৩০ টাকা কেজি, যা ঈদের আগে ৩১০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। গরু ও খাসির মাংস আগের সেই চড়া দামেই বিক্রি হচ্ছে।
জোয়ারসাহারা বাজারের মুরগি বিক্রেতা মো. হেলাল উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাজারে ক্রেতা কম থাকায় মুরগির চাহিদা কমে গেছে। তাই দামও কিছুটা কমেছে। চাহিদা কম থাকায় অনেক মুরগির দোকান এখনো খোলেনি।’
সবজির বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সরবরাহ সংকটে টমেটো ও পেঁপের দাম কেজিতে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তবে চাহিদা কম থাকায় বেশ কিছু সবজির দাম কমেছে। ঈদের আগে বাজারে প্রতি কেজি ঢেঁড়স ১০০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। এখন তা ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজি। পটোল প্রতি কেজি ছিল ১০০ টাকা। এখন বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকায়। করলা প্রতি কেজি ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যদিও ঈদের কয়েক দিন আগে বিক্রি হয় ১০০ থেকে ১২০ টাকায়। বেগুন প্রতি কেজি মানভেদে ৬০ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা রমজান মাসে ছিল ৮০ থেকে ১২০ টাকা। দেশি শসা প্রতি কেজি ৬০ টাকা, ঈদের আগে ছিল ৮০ থেকে ১০০ টাকা।
টমেটোর দাম কেজিতে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পেঁপে প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লম্বা লাউ আগের চড়া দামেই বিক্রি হচ্ছে। প্রতি পিস ৭০ থেকে ৮০ টাকা। আলু প্রতি কেজি ২৫ থেকে ৩০ টাকা।
বাড্ডার সবজি বিক্রেতা মো. সুমন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন চাহিদা কম থাকার কারণে কিছু সবজির দাম আগের তুলনায় কমেছে। আবার আগামী সপ্তাহ থেকে সবজির চাহিদা বেড়ে গেলে দামও বেড়ে যাবে। কারণ এখন সবজির সরবরাহ তুলনামূলক কম। ঈদের আগে ঢেঁড়স, পটোল ও করলা প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১২০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছিল। সেগুলোর দাম এখন ৮০ টাকার মধ্যে নেমে এসেছে। তবে মৌসুম শেষ হওয়ার কারণে টমেটোর দাম কেজিতে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। সরবরাহ কম থাকায় পেঁপের দামও বাড়তি।’