পাঠ্য বইয়ে এসব কী

আজিজুল পারভেজ
আজিজুল পারভেজ
শেয়ার
পাঠ্য বইয়ে এসব কী

১ জানুয়ারি বিলি করা নতুন পাঠ্যপুস্তকে রয়ে গেছে যাচ্ছেতাই ভুল, অপ্রাসঙ্গিক নানা বিষয়, যা নিয়ে সামাজিক নেটওয়ার্ক এবং বিভিন্ন ফোরামে চলছে তুমুল বিতর্ক। শিক্ষাবিদদের অনেকের মতে,  আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমলের বিষয়বস্তু ফিরে আসাটা বিস্ময়কর। নিখাদ সাহিত্য ও ভাষা শিক্ষার বইয়ে অপ্রাসঙ্গিকভাবে তুলে আনা হয়েছে একেবারে ধর্মীয়  বিষয়। বাদ পড়েছে ‘হিন্দু’ ও ‘নাস্তিক’ লেখকদের লেখা।

নতুন শিক্ষানীতির আলোকে তৈরি কারিকুলামের ভিত্তিতে নতুন পাঠ্যপুস্তক প্রকাশের তিন বছরের মাথায় এবার আবার বড় ধরনের পরিবর্তন হলো। হেফাজতে ইসলামের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই পাঠ্যপুস্তকে এই পরিবর্তন এসেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জন, সংযোজন-বিয়োজনের নিয়ম হচ্ছে, বিদ্যালয় পর্যায়ে ট্রাই-আউটের মাধ্যমে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মতামত সংগ্রহ, তার ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে কর্মশালা এবং তার আলোকে এনসিসিসিতে (ন্যাশনাল কারিকুলাম কো-অর্ডিনেশন কমিটি) চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ। কিন্তু এবারের পাঠ্যপুস্তকের সংযোজন-বিয়োজনের বেশির ভাগ সিদ্ধান্ত হয়েছে এনসিসিসির সভায়।

এনসিসিসির প্রধান হচ্ছেন শিক্ষাসচিব। গত বছরের ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত এনসিসিসির সভায় সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা একটি তালিকা দিয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন না করে সে অনুসারে পাঠ্যপুস্তকে সংযোজন-বিয়োজন করে নেওয়ার কথা বলেন বলে জানা গেছে। তাঁর এই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতেই এবারের পরিবর্তন এসেছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব সোহরাব হোসাইন কালের কণ্ঠকে  বলেন, যথাযথ কমিটির মাধ্যমে প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই কমিটি যেটা ভালো মনে করেছে সেটাই করেছে।

জানা গেছে, দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তকের বাংলা বই থেকে ২০১২ সালে যে বিষয়গুলো বাদ পড়েছিল তার সবই আবার ফিরে এসেছে ২০১৭ সালের সংস্করণে। আবার ২০১২ সালের বইয়ে নতুন যে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল সেগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। এই পরিবর্তনের ফলে পাঠ্যপুস্তকে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে প্রণীত শিক্ষাক্রম আবার চালু হলো। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এসে ২০০৩ সালে পাঠ্যপুস্তকে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। প্রতিটি শ্রেণির বাংলা সাহিত্যের বইয়ে ধর্মীয় বিষয় ও ভাবধারা যুক্ত করা হয়।

২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে পাঠ্যপুস্তক সংস্কারের কাজ শুরু হয়। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণয়ন করে। এর আলোকে নতুন পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ করা হয় ২০১২ সালে, যা শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছায় ২০১৩ সালে। তখন বলা হয়েছিল, বাংলা বিষয়কে সাহিত্যসমৃদ্ধ এবং সর্বজনীন করার জন্য ধর্মীয় বিষয়গুলো সরিয়ে ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষাসহ অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বইয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

২০১৩ সালে গড়ে ওঠা সংগঠন হেফাজতে ইসলাম পাঠ্যপুস্তক সংস্কারের তীব্র বিরোধিতা করে। ওই বছরের শুরুতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়া ওঠা শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের সময়ে ইসলামী ছাত্রশিবির পরিচালিত ফেসবুক পেজ বাঁশের কেল্লায় পাঠ্যপুস্তকের বাংলা বই থেকে কী কী ইসলামী ভাবধারার লেখা বাদ পড়েছে এবং কোন কোন ‘হিন্দু লেখক’ ও ‘হিন্দুত্ববাদী’ লেখা যুক্ত হয়েছে সেই তালিকা প্রকাশ করা হয়। এর পর থেকে পাঠ্যপুস্তক সংশোধনের দাবিতে হেফাজতে ইসলামসহ কয়েকটি সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে।

গত মে মাসে পাঠ্যপুস্তক সংশোধনের দাবিতে একটি সংগঠনের আন্দোলনের সময়ে এনসিটিবির বক্তব্য জানতে চাইলে সদস্য (প্রাথমিক শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুল মান্নান গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘পাঠ্যপুস্তকের বাংলা বইগুলো ধর্ম কিংবা সমাজ, বিজ্ঞান শেখানোর বই নয়, এগুলো ভাষা-সাহিত্য শেখানোর বই। ভাষা শিক্ষার জন্য যেসব লেখা থাকা দরকার, তাই দেওয়া হয়েছে। ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা হচ্ছে ধর্ম শিক্ষার বই, সেখানে ধর্ম শেখানোর জন্য যা দরকার তা আছে। বিজ্ঞানের বইয়ে কি ধর্মের বিষয় থাকবে? বিজ্ঞানের বইয়ে ধর্মীয় বিষয় নেই কেন এমন প্রশ্ন না উঠলে বাংলার ক্ষেত্রেও তা থাকা উচিত নয়। বইয়ের মধ্যে ভুল-ত্রুটি থাকতে পারে। তবে হলফ করে বলতে পারি, ইসলাম নয়, অন্য যেকোনো ধর্মকে বিন্দুমাত্র হেয় করা হয়েছে, এমন একটি শব্দও পাওয়া যাবে না পাঠ্য বইয়ে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের দুটি সংস্কৃতি। একটি ধর্মীয় সংস্কৃতি, আরেকটি জাতিগত। যখন জাতিগত সংস্কৃতির কথা উঠবে, তখন হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির কথা আসবে। তখন কোনটা হিন্দু, কোনটা মুসলমান, এটা দেখার বিষয় নয়। কোন কবিতার মধ্যে কোন মিথ আসছে, সেটাকে যারা বলেন হিন্দু মিথ তাঁরা ভুল করেন, আসলে এটা বাঙালি মিথ।’

গত বৃহস্পতিবার বইয়ের নতুন পরিবর্তন সম্পর্কে জানতে চাইলে এনসিটিবির সদস্য (প্রাথমিক শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুল মান্নান কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তিনি বলেন, এ দেশে ধর্মের রাজনীতির ব্যবহার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এখন চাইলেও অনেক কিছু করা সম্ভব নয়।

২০১৭ শিক্ষাবর্ষের প্রাথমিক স্তরের দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকের ‘আমার বাংলা বই’য়ে পরিমার্জন করা হয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ে ‘সবাই মিলে করি কাজ’, তৃতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ে ‘খলিফা হযরত আবু বকর (রা.)’, চতুর্থ শ্রেণির বাংলা বইয়ে ‘খলিফা হযরত ওমর (রা.), পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ে ‘বিদায় হজ’ ও ‘শহিদ তিতুমীর’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ে কবি গোলাম মোস্তফা রচিত ‘প্রার্থনা’ কবিতার পরিবর্তে কবি কাদের নওয়াজ রচিত ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বাদ দেওয়া হয়েছে হুমায়ুন আজাদ রচিত ‘বই’ কবিতা।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুল মান্নান জানান, ‘সবাই মিলে করি কাজ’ [হজরত মুহাম্মদ (সা.) জীবনচরিত), ‘খলিফা হযরত আবু বকর (রা.)’, ‘খলিফা হযরত ওমর (রা.)’ শীর্ষক বিষয়গুলো বাংলা বইয়ে না থাকলেও ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বইয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। ‘বিদায় হজ’ ও ‘শহিদ তিতুমীর’ শীর্ষক নিবন্ধ দুটি বাংলা বই থেকে বাদ পড়লেও বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় বইয়ে ছিল। এগুলো পাঠ্যক্রম থেকে বাদ পড়েনি।

ষষ্ঠ শ্রেণির বাংলা পাঠ্যপুস্তক চারুপাঠ থেকে এস ওয়াজেদ আলীর ‘রাঁচি ভ্রমণ’ বাদ পড়েছে। যুক্ত হয়েছে সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘নীল নদ আর পিরামিডের দেশ’। সানাউল হকের কবিতা ‘সভা’ বাদ পড়েছে, যুক্ত হয়েছে জসীমউদ্দীনের ‘আসমানী’। আনন্দপাঠ থেকে বাদ পড়েছে সত্যেন সেনের গল্প ‘লাল গরুটা’, যুক্ত হয়েছে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র ‘সততার পুরস্কার’। এনসিসিসি সভার সিদ্ধান্তে  ভ্রমণ কাহিনী ও গল্পের পরিবর্তন হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে কবিতার পরিবর্তন হয়েছে ট্রাই-আউট রিপোর্ট ও বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে।

সপ্তম শ্রেণির বাংলা বই সপ্তবর্ণার গদ্যে হাবীবুল্লাহ বাহারের ‘মরু ভাস্কর’ যুক্ত হয়েছে এবং দ্রুতপঠন আনন্দপাঠ বই থেকে শরত্চন্দ্রের ‘লালু’ বাদ পড়েছে এনসিসিসি সভার সিদ্ধান্তে।

অষ্টম শ্রেণির বাংলা সাহিত্য কণিকা থেকে কাজী নজরুল ইসলামের একটি গদ্য বাদ নিয়ে নতুন একটি যুক্ত হয়েছে ট্রাই-আউট রিপোর্ট ও বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশে। ট্রাই-আউট রিপোর্টের ভিত্তিতে তিনটি পদ্য বাদ পড়েছে। তার জায়গায় একটি পদ্য যুক্ত করা হয়েছে বিশেষজ্ঞ কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে, কিন্তু দুটি পদ্য কায়কোবাদের ‘প্রার্থনা’ ও কালিদাশ রায়ের ‘বাবুরের মহত্ত্ব’ যুক্ত করা হয়েছে ২০১৬ সালের ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত এনসিসিসি সভার সিদ্ধান্তে। বাংলা দ্রুতপঠন আনন্দপাঠ থেকে উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর ‘রামায়ণ-কাহিনী’ (আদিকাণ্ড) বাদ পড়েছে।

নবম শ্রেণির বাংলা বই মাধ্যমিক বাংলা সাহিত্য থেকে একটি গদ্য ও পাঁচটি কবিতা বাদ পড়েছে এবং পাঁচটি কবিতা যুক্ত হয়েছে এনসিসিসি সভার সিদ্ধান্তে। বাদ পড়া ভ্রমণ কাহিনীটি হচ্ছে সজীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পালামৌ’ এবং কবিতা হচ্ছে জ্ঞানদাসের ‘সুখের লাগিয়া’, ভারতচন্দ্রের ‘আমার সন্তান’, লালন শাহর ‘সময় গেলে সাধন হবে না’, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘স্বাধীনতা’ ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সাঁকোটা দুলছে’। যুক্ত হয়েছে শাহ মোহাম্মদ সগীরের ‘বন্দনা’, আলাওলের ‘হাম্দ’, আব্দুল হাকিমের ‘বঙ্গবাণী’, গোলাম মোস্তফার ‘জীবন বিনিময়’ ও কাজী নজরুল ইসলামের ‘উমর-ফারুক’।

নবম শ্রেণির বইয়ে মোতাহার হোসেন চৌধুরীর প্রবন্ধ ‘লাইব্রেরি’ ও সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘মে দিবসের কবিতা’ যুক্ত হয়েছে বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশে। এই দুটি লেখা আগে সপ্তম শ্রেণির বইয়ে ছিল। এ ছাড়া রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর ‘খতিয়ান’ কবিতার পরিবর্তে ‘মিছিল’ যুক্ত হয়েছে।

গত বছরের ৮ এপ্রিল সন্ধ্যায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর কেন্দ্রীয় নেতাদের এক যৌথ বিবৃতি গণমাধ্যমে পাঠানো হয়। ওই বিবৃতিতে পাঠ্যপুস্তকের বাংলা বই থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে যে ১৭টি গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধের তালিকা প্রকাশ করা হয় তার সবই ২০১৭ সালের বইয়ে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। একইভাবে যে ১২টি গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ-নিবন্ধকে নাস্তিক্যবাদী ও হিন্দুত্ববাদী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয় তার সব কটিই বাদ দেওয়া হয়েছে।

পরিবর্তিত নতুন বই প্রায় চার কোটি ২৬ লাখ শিক্ষার্থীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে ১ জানুয়ারি।

পাঠ্যপুস্তকের বাংলা বই থেকে গণমানুষের বোধ-বিশ্বাস ও ধর্মীয় চেতনাবিরোধী বিতর্কিত গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ বাদ দিয়ে নতুন বছরের প্রথম দিনে সারা দেশের ছাত্রছাত্রীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম। গত রবিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও প্রতিবাদের পর শেষতক সরকারের নীতিনির্ধারকরা যে বিষয়টির গুরুত্ব ও নাজুকতা উপলব্ধি করতে পেরেছেন এ জন্য আমরা তাঁদের সাধুবাদ জানাই।’

এদিকে পাঠ্যপুস্তকের নতুন বইয়ের আরো কিছু বিষয় নিয়েও সমালোচনার ঝড় বইছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। প্রথম শ্রেণির বাংলা বইয়ে বর্ণ পরিচয়ে ‘ও’তে ‘ওড়না চাই’ বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। জেন্ডারের বিষয়টি এখানে লঙ্ঘিত হয়েছে। একজন ছাত্র কেন ওড়না চাইবে। তা ছাড়া, ওড়না কেন প্রয়োজন, একজন শিক্ষার্থী জানতে চাইলে শিক্ষক এর কী উত্তর দেবেন—ফেসবুকে একজন এ প্রশ্ন করেছে। বানান ভুল নিয়েও কথা উঠেছে। পঞ্চম শ্রেণির বইয়ে ‘ঘোষণা’ বানান ‘ঘোষনা’, ‘সমুদ্র’ বানান ‘সমুদ’ লেখা হয়েছে। তৃতীয় শ্রেণির হিন্দু ধর্ম শিক্ষা বইয়ের শেষ পৃষ্ঠায় ইংরেজি নীতিবাক্য লেখা হয়েছে ভুল বানানে। কাউকে কষ্ট দিও না-র ইংরেজি লেখা হয়েছে,  DO NOT HEART ANYBODY. প্রথম শ্রেণির বাংলা বইয়ে ছবি দিয়ে দেখানো হয়েছে ছাগল নাকি গাছে উঠে আম খায়। তৃতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ে কুসুমকুমারী দাশের ‘আদর্শ ছেলে’ কবিতায় ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে’ পঙিক্তর বদলে লেখা হয়েছে ‘আমাদের দেশে সেই ছেলে কবে হবে’। কবিতার চতুর্থ লাইনে ‘মানুষ হইতে হবে-এই তার পণ’-এর ‘হইতে’ শব্দটিকে পাল্টে লেখা হয়েছে ‘হতেই’। নবম লাইনে ‘সে ছেলে কে চায় বল কথায়-কথায়’-এর ‘চায়’ শব্দটির বদলে লেখা হয়েছে ‘চাই’। পঞ্চদশ লাইনে ‘মনে প্রাণে খাট সবে শক্তি কর দান’-এর ‘খাট’ এর বদলে লেখা হয়েছে ‘খাটো’। আর কবিতাটির একাদশ থেকে চতুর্দশ লাইনই উধাও। এসব ভুল বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা বলেন, ভুলের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে। কারো দায়িত্বে অবহেলা থাকলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অষ্টম শ্রেণির গল্পের বই আনন্দপাঠ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বইটিতে একটিও মৌলিক গল্প নেই। সাতটি গল্পের সব কটিই বিদেশি লেখকদের লেখার অনুবাদ। গল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে আরব্য উপন্যাস অবলম্বনে ‘কিশোর কাজী’, মার্ক টোয়েনের ‘রাজকুমার ও ভিখারির ছেলে’, ড্যানিয়েল ডিফোর ‘রবিনসন ক্রুশো’, ফরাসি ঔপন্যাসিক মহাকবি আবুল কাশেম ফেরদৌসীর ‘সোহরাব রোস্তম’, উইলিয়াম শেকসপিয়ারের ‘মার্চেন্ট অব ভেনিস’, ওয়াশিংটন আরবি রচিত গল্প অবলম্বনে ‘রিপভ্যান উইংকল’ ও লেভ তলস্তয়ের ‘সাড়ে তিন হাত জমি’।

মন্তব্য

সম্পর্কিত খবর

অন্য জীবন

কুকুরকে খাইয়ে সুধনের সুখ

পিন্টু রঞ্জন অর্ক
পিন্টু রঞ্জন অর্ক
শেয়ার
কুকুরকে খাইয়ে সুধনের সুখ
জগন্নাথ হলে এখন প্রায় ৬৫টি কুকুর-বিড়ালকে খাওয়ান সুধন। ছবি : লুৎফর রহমান

মাঠের এক কোণে বসে কাঁদছেন একজন। তাঁর চারপাশে ঘুরঘুর করছে বেশ কয়েকটি কুকুর। তিনি ওদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন আর বলছেন, ‘তোদের জন্য কিছু করতে পারছি না রে! আমারে মাফ কইরা দিস।’

কৌতূহলবশে জানতে চাইলাম, এই মাফ চাওয়ার কারণ কী? এবার কান্নার ঢল নামল তাঁর চোখে।

একটা কুকুরের দিকে আঙুল তুলে বললেন, ‘দেখেন না, খাবারের অভাবে বাবুটার হাড্ডি দেখা যাচ্ছে! আমার পরাণটা মানছে না। ওদের খাবারও দিতে পারছি না।’

খাবার দিতে সমস্যা কী, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হল কর্তৃপক্ষ নিষেধ করেছে। হলে নাকি কুকুর বেড়ে গেছে।

খাবার বন্ধ করে দিলে কুকুরগুলো অন্য কোথাও চলে যাবে। আমার তো হাত-পা বান্ধা!’

তিনি নিজেও না খাওয়া। জানালেন, কুকুরগুলো অভুক্ত থাকলে তাঁর মুখ দিয়ে কিছু নামে না।

এটা দিন দশেক আগের কথা।

গতকাল আবার তাঁর সঙ্গে দেখা। মুখে এবার আকর্ণ হাসি। সেই মাঠেই কুকুরদের খাওয়াচ্ছিলেন। বললেন, ‘ক্যাম্পাসে ছাত্রদের একটা সংগঠন (অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার টিম) আছে। তারা প্রভোস্ট স্যারের সঙ্গে কথা বলেছে।
এখন আর খাবার দিতে বাধা নাই!’

আলাভোলা এই মানুষটার নাম সুধন চন্দ্র বর্মণ। বয়স পঞ্চাশের ঘরে। পেশায় পরিচ্ছন্নতাকর্মী। স্বল্প আয় হলেও রোজগারের একটা ভাগ ব্যয় করেন কুকুর-বিড়ালের খাওয়ার জোগাড়ে। অথচ এগুলো তাঁর পোষাও নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে এভাবে প্রায় দুই দশক ধরে কুকুর-বিড়ালকে খাওয়াচ্ছেন সুধন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার টিমের সদস্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের ছাত্রী মিশকাত তানিশা বলেন, ‘সুধনদার সঙ্গে হল প্রশাসনের ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। আমরা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছি। ওদের খাওয়ানোর জন্য কিছু জায়গা ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। সেখানেই নিয়মিত খাবার দিচ্ছেন।’

 

টেনেটুনে দিন গুজরান

সুধনের জন্ম গাজীপুরের কাপাসিয়ায়। চার ভাই-বোনের সংসারে তাঁদের নুন আনতে পান্তা ফুরাত। তাই পড়াশোনায় বেশি এগোতে পারেননি। তেজগাঁওয়ে একটা অ্যালুমিনিয়াম কারখানায় অফিস সহকারী হিসেবে কাজ করতেন। একসময় মিরপুর চলে যান।

জগন্নাথ হলে প্রথম আসেন ১৯৮৫ সালে। সেবার হলের টিভি রুমের ছাদ ধসে প্রাণ হারান অনেক শিক্ষার্থী। তখন ছাত্রসংসদের পিয়ন ছিলেন চিত্তরঞ্জন দেবনাথ। ১৯৮৯ সালের শেষের দিকে তাঁর মেয়ে মালতি রানীর সঙ্গে বিয়ে হয় সুধনের। এর পর আরো দুটি কারখানায় কাজ করে বছরখানেক পর আবার চলে আসেন জগন্নাথ হলে। তখন হলের প্রভোস্ট ছিলেন দুর্গাদাস ভট্টাচার্য। বদলি ডিউটির (কেউ ছুটিতে থাকলে তাঁর বদলি হিসেবে) জন্য সুধনকে নিয়োগ দেন তিনি। ২১ টাকা বেতন। সেই থেকে জগন্নাথ হলেই আছেন। এত দিন মাস্টার রোলে কাজ করেছেন। কিছু দিন আগে ‘সাময়িক কর্মচারী’ হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। এখন বেতন পান মোটে ১০ হাজার। এই টাকায় কোনোমতে টেনেটুনে চারজনের সংসার চালান।

 

৬৫ কুকুর-বিড়ালের জন্য খাবার

কাউকে কিছু খেতে দেখলে কুকুর গিয়ে কাছে দাঁড়ায়। সুধনের মনে এটা নাড়া দেয়—আহা, ওদেরও তো ক্ষুধা লাগে! সেই থেকে কুকুরকে খাওয়াতে উদ্বুদ্ধ হন। একই সঙ্গে বিড়ালকেও খাওয়াতে থাকেন।

জগন্নাথ হলে এখন ৫০টির মতো কুকুর ও ১৫টি বিড়াল আছে বলে জানালেন সুধন। হলের মাঠে, গ্যালারিতে, অক্টোবর ভবনের বারান্দায়, উত্তরবাড়িতে, সন্তোষ চন্দ্র ভট্টাচার্য ভবন, রবীন্দ্র ভবন, মেইন গেটে থাকে ওরা। একসঙ্গে অনেক খাবার জোগাড় করতে পারেন না তিনি। একসঙ্গে খাওয়াতে গেলে গোলমালও বাধে। তাই পালা করে সব কয়টিকে খাওয়ান।

মাছের কাঁটা, মাছের মাথা, মাংস, হাড্ডি, ভাত—কুকুর এগুলোই বেশি খায়। নিরামিষ মেস, সন্তোষ চন্দ্র ভট্টাচার্য ভবন ক্যাফেটেরিয়া, রবীন্দ্র ভবন ক্যাফেটেরিয়া থেকে এগুলো জোগাড় করেন সুধন। তবে ঈদের ছুটির কারণে এখন শুধু সন্তোষ চন্দ্র ভট্টাচার্য ভবন ক্যাফেটেরিয়া খোলা। তাই খাবার কম পড়ে যায়। ঘাটতি পোষাতে অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার টিমের সহায়তায় তিনি নিজে পাঁচ কেজি চাল আর দুই কেজি মুরগির মাংস (মূলত মাথা, গিলা, কলিজা) রান্না করছেন।

তবে কুকুর বিস্কুট বেশি পছন্দ করে—জানালেন সুধন। বিশেষ পছন্দ ড্রাই কেক। সুধন বলেন, ‘ড্রাই কেক ভালো খায় ওরা। বিশ্ববিদ্যালয়ে বেকারির লোক এলে তাদের কাছ থেকে নিই। যেদিন যেমন টাকা থাকে সেদিন তেমন কিনি। এক কেজি দিয়ে দুই দিনের মতো চালাই।’

হাতে টাকা না থাকলে বাকিতেও কেনেন সুধন। বললেন, ‘বেকারির লোকজন চেনা হইয়া গেছে। বাকিতে দেয়। আজকাই যেমন পুরো টাকা ছিল না। দুই শ টেকা কইরা কেজি। আইজ এক কেজি নিয়া ৫০ টাকা দিছি।’

 

ঘুরে ঘুরে খাবার জোগাড়

সাধারণত দিনে দুইবার খাবার দেন ওদের। সকালে বিস্কুট, দুপুরে ভাত, মাছের কাঁটা, মাংসের হাড্ডি এসব। হলের খাবার দেওয়া শুরু হয় দুপুর ১২টার দিকে। দেড়টার দিকে একটা বালতি নিয়ে সেখানে হাজির হন সুধন। বলেন, ‘দাদা, আমার একটু এঁটো আর কাঁটাকুটা লাগব।’

রবীন্দ্র ভবন ক্যাফেটেরিয়ার পরিচালক শংকর বিশ্বাস বলেন, ‘লোকটা বেশ সহজ-সরল। কুকুরগুলো যখন তাঁর পেছনে হাঁটে, দেখে বড় ভালো লাগে!’

সন্তোষ চন্দ্র ক্যাফেটেরিয়ার পরিচালক মনির বলেন, ‘ক্যান্টিন বয়দের বলে দিয়েছি, ওরা এখন উচ্ছিষ্ট এক জায়গায় রেখে দেয় সুধনদার জন্য।’

 

আনন্দের মাঝে বিড়ম্বনা

কুকুর-বিড়ালকে নিয়মিত খাওয়ানোয় সুধনকে অনেকে সাধুবাদ জানান।  কেউ কেউ সাধ্যমতো টাকাও দেন। কোনো কুকুর অসুস্থ হলে চিকিত্সায় অনেকে সহায়তা করেন।

তবে মাঝেমধ্যে এ জন্য ঝাড়িও খেতে হয়। বলে, ‘এই এক জিনিস নিয়া পইড়া আছ! খালি ঘ্যান ঘ্যান!’

তাঁর স্ত্রী মালতি রানী বললেন, ‘কুত্তা-বিলাইরে খাবার দেয় বইলা লোকটার চাকরি নিয়াও টানাটানি। মাইনষেও কথা শোনায়। কতবার যে মানা করেছি। কে শোনে কার  কথা!’

 

একটা আফসোস

এখন জগন্নাথ হলে জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা ভবনের পেছনে থাকেন সুধন। ব্যক্তিগত জীবনে দুই সন্তানের জনক। বড় ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন অ্যান্ড ফিল্ম স্টাডিজ বিভাগে অফিস সহকারী হিসেবে চাকরি পেয়েছেন।

ভোরের আলো ফোটার আগে ঘুম ভাঙে সুধনের। প্রথমে হলের পুকুরপারের লাইট নেভান। এর পর সন্তোষ চন্দ্র ভট্টাচার্য ভবনে এসে ফ্লোর ঝাড়ু দেন। এভাবে সারা দিন কাটে পরিচ্ছন্নতার বিভিন্ন কাজে।

জীবনের এই বেলায় এসে একটা আফসোস রয়ে গেছে তাঁর—চাকরিটা আজও স্থায়ী হয়নি! বললেন, ‘চাকরি আজ আছে কাল নাই অবস্থা। চাকরিটা স্থায়ী হলে শেষ বয়সে পেনশনসহ কিছু সুবিধা পেতাম!’

মন্তব্য
জামায়াত সেক্রেটারি পরওয়ার

ফ্যাসিবাদ পুনর্বাসনের প্রচেষ্টা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না

খুলনা অফিস
খুলনা অফিস
শেয়ার
ফ্যাসিবাদ পুনর্বাসনের প্রচেষ্টা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না
মিয়া গোলাম পরওয়ার

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, আওয়ামী লীগ চেতনার কথা বলে জাতিকে দুই ভাগে বিভক্ত করে জাতীয় ঐক্য ও উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে। সেই ফ্যাসিবাদকে নতুন এই বাংলাদেশে পুনর্বাসনের প্রচেষ্টা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।

গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার ধামালিয়া ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর ঈদ পুনর্মিলনীতে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় মিয়া গোলাম পরওয়ার এসব কথা বলেন।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, জুলাই বিপ্লবে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের পতনের ফলে দীর্ঘদিন পর দেশবাসী উন্মুক্তভাবে ঈদ উদযাপন করতে পেরেছে।

কোনো অপশক্তি যাতে এই আনন্দ ম্লান করতে না পারে সে জন্য সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।

মিয়া গোলাম পরওয়ার আরো বলেন, দুর্নীতি, সন্ত্রাস,  চুরি, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, সুদ, ঘুষ, ধর্ষণ, বৈষম্য ও শোষণমুক্ত দেশ গড়তে ইসলামী শাসন বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। এ দেশের মানুষ আর কোনো স্বৈরাচারকে ক্ষমতায় দেখতে চায় না। নতুন বাংলাদেশ গড়তে সৎ, যোগ্য, দেশপ্রেমিক লোক এখন সময়ের দাবি, যা সাপ্লাইয়ের কারখানা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

ইউনিয়ন আমির মোস্তাক আহমেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন খুলনা জেলা আমির মাওলানা এমরান হুসাইন, সেক্রেটারি মুন্সি মিজানুর রহমান, ডুমুরিয়া-ফুলতলা কল্যাণ পরিষদের সেক্রেটারি মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম আল ফয়সাল। আরো বক্তব্য দেন ডুমুরিয়া উপজেলা আমির মাওলানা মোক্তার হোসেন, উপজেলা হিন্দু বিভাগের সহসভাপতি ডা. হরিদাস মণ্ডল, উপজেলা ছাত্রশিবির সভাপতি মফিজুর রহমান প্রমুখ।

 

মন্তব্য
মির্জা আব্বাস

ইউনূসের সঙ্গে মোদির বৈঠক প্রয়োজন ছিল

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
শেয়ার
ইউনূসের সঙ্গে মোদির বৈঠক প্রয়োজন ছিল
মির্জা আব্বাস

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেছেন, থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাঙ্ককে বঙ্গোপসাগরীয় দেশগুলোর আঞ্চলিক সহযোগিতা জোটের (বিমসটেক) সম্মেলনের ফাঁকে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের প্রয়োজন ছিল। বৈঠকটি গুরুত্বপূর্ণ। গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজধানী ঢাকার শাহজাহানপুরে নিজ বাসভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মির্জা আব্বাস বলেন, এই বৈঠক (ইউনূস-মোদি) নিশ্চয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

এটার প্রয়োজন আছে এবং ছিল। এই বৈঠকের জন্য আমাদের সরকার স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে চেষ্টা করছিল। এই সময়ে একটা বৈঠক হওয়ার দরকার ছিল, তাঁরা তা করেছেন। তবে আমি জানি না বৈঠকের অভ্যন্তরে কী আলোচনা হয়েছে।

শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন এবং এই বিচার সময়ের দাবি, জনগণের দাবি, আমাদের দাবি। যদি শুধু শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে কথাবার্তা হয়ে থাকে, তাহলে আমি একটু যোগ করতে চাইব, উনার (শেখ হাসিনা) যেসব সাঙ্গোপাঙ্গ আছে সেখানে, যারা দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে, তাদেরও যেন সঙ্গে ফেরত পাঠানো হয়। ভারতের উচিত শেখ হাসিনাকে অবিলম্বে পাঠিয়ে দেওয়া, যাতে তাঁর বিচারটা হয়।

তিনি বলেন, বৈঠকে তিস্তা নিয়ে কথা হয়েছে।

তিস্তা বাঁধ নিয়ে কথা বলার প্রয়োজন নেই। তিস্তার পানি আমাদের দিতে হবে এবং তিস্তা বাঁধের প্রয়োজনীয় সংস্কার আমাদের করতে হবে। তিস্তা ও ফারাক্কার বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ কোনো ছাড় দেবে না। বাংলাদেশের মানুষ একটা শক্ত অবস্থানে আছে। ভারতের সঙ্গে যেসব অসম চুক্তি বিগত সরকারের আমলে হয়েছে, এখন সেসব চুক্তি বাতিল করা দরকার।
যেসব অসম চুক্তি কার্যকর হয়নি, সেগুলো বাতিল করতে হবে।

জাতীয় নির্বাচন নিয়ে মির্জা আব্বাস বলেন, নির্বাচন ও সংস্কার নিয়ে আমরা অনেক কথা বলেছি। এক গ্রুপ দেশে, আরেক গ্রুপ বিদেশে আছে; যারা নাকি নির্বাচন বাদ দিয়ে সংস্কারের কথা বলছে। আবার বলার চেষ্টা করছে, সংস্কারের কথা শুনলে নাকি বিএনপির মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। আমার এখানে তীব্র আপত্তি। বিএনপি কখনো সংস্কারের বিপক্ষে নয়, বরাবর সংস্কার ও নির্বাচনের পক্ষে। কিন্তু এমন সংস্কারের পক্ষে বিএনপি নয়, যেটি দেশের জনগণের স্বার্থের ও অধিকারের বাইরে চলে যাবে।

অনলাইনে কিছু কনটেন্ট ক্রিয়েটরের সমালোচনা করে মির্জা আব্বাস বলেন, গতকাল দেখলাম এক ভদ্রলোকদরবেশ সালমান এফ রহমানের টাকা খেয়ে মোটা হয়েছেন, স্বাস্থ্য ভালো করেছেন, চেহারা সুন্দর করেছেনতিনি লম্বা লম্বা কথা বলেন দেশের বাইরে থেকে। খুব দুর্ভাগ্যজনক, উনি গতকাল আমার সম্পর্কে খুব বাজে কথা বলেছেন। আমি প্রথমে বলেছি যে আমার বাগানে ক্ষুুদ্র ক্ষুদ্র শূকর পড়েছে। আমি শূকরের পর্যায়ে তাদের ধরে নেব। আরেকজন আছে ফ্রান্সে, আরেকজন কী যেন নাম, জারজ মিল্টন। সে আমাকে অশ্রাব্য ভাষায় বকা দিয়েছে, গালি দিয়েছে, আর তাকে সমর্থন করেছে পিনাকী। ওরা সবাই একই বংশের, একই গোত্রের সন্তান। কোনো ভদ্রলোক কোনো ভদ্রলোককে গালি দিতে পারে না। আমি ঢাকার মানুষ; আমার বাবা-মা ওদের মতো গালি দেওয়া শেখায়নি। ওরা আসলে মানুষ নয়, অন্য জাত। যারা দরবেশের টাকা খেয়ে শরীর-স্বাস্থ্য ভালো করে এ দেশের রাজনীতিবিদদের সম্পর্কে কুৎসা রটায়, গালিগালাজ করে, তা দেশের জনগণ মেনে নেবে? তিনি বলেন, তারা আমার সম্পর্কে, আমার দলের সেক্রেটারি জেনারেল মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং তাঁর পরিবার সম্পর্কে বাজে, খারাপ ভাষায় কথাবার্তা বলা শুরু করেছে। অপেক্ষা করুন, কদিন পর ওরা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সাহেবকেও ধরবে। ওরা চাচ্ছেটা কী? ওরা বিএনপি, আওয়ামী লীগ কিংবা অন্য কাউকে ভালোবাসে না। ওরা ভালোবাসে ভারতকে। ওরা এ দেশে যাতে ভারতের আধিপত্য বিস্তার হয় এবং ভারতের কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীকে বসাতে পারে, ওই সমস্ত লোকের জন্য ওরা কাজ করছে। এই গ্রুপটা, এই শূকরের গোষ্ঠী বাংলাদেশে কখনো কোনো সরকারকে স্থিতিশীল থাকতে দেবে না।

তিনি আরো বলেন, আমি আজকে হলপ করে বলছি, এই গোষ্ঠী দেশকে স্থিতিশীল থাকতে দেবে না। কখনো আমার বিরুদ্ধে, কখনো অমুকের বিরুদ্ধে লেগেই থাকবে। ওরা ইউটিউবের মধ্যে পয়সা কামাইতেছে এসব মিথ্যাচার, কুৎসা রটনা করে। ওরা যে ভাষায় কথা বলছে, আমি আর বললাম না। আমি বন্দে আলী মিয়ার কবিতাটাই বলতে চাই, কুকুরের কাজ কুকুর করেছে কামড় দিয়েছে পায়ে, তাই বলে কুকুরে কামড়ানো কি মানুষের শোভা পায়?’”

 

মন্তব্য
ক্যাম্পের রোহিঙ্গাদের প্রশ্ন

আমাদের কোথায় নেবে আদিবাস তো আরাকান আর্মির দখলে

বিশেষ প্রতিনিধি, কক্সবাজার
বিশেষ প্রতিনিধি, কক্সবাজার
শেয়ার
আমাদের কোথায় নেবে আদিবাস তো আরাকান আর্মির দখলে

প্রত্যাবাসনে দীর্ঘদিন নীরব থাকা মায়ানমার এক লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে দেশে ফিরিয়ে নিতে সম্মতি জানানোর পরপরই ক্যাম্পগুলোতে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। কক্সবাজার ও ভাসানচরের ৩৪টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মায়ানমারের জান্তা সরকারের এমন ঘোষণাটিই এখন আলোচনার একমাত্র বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে মায়ানমারের আকস্মিক ঘোষণায় তারা (রোহিঙ্গারা) মোটেই বিচলিত নয়। কেননা বাংলাদেশের ক্যাম্পে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা মনে করছে, এই মুহূর্তে মায়ানমারের জান্তা সরকার যতই ঘোষণা দিক না কেন, তারা (জান্তা সরকার) কোনোভাবেই প্রত্যাবাসন করতে পারবে না।

কারণ, রোহিঙ্গাদের আবাসভূমি আরাকান (রাখাইন রাজ্য) এখন সরকারের হাতছাড়া।

গত বছরের ৮ ডিসেম্বর থেকে বাংলাদেশের ওপারের রাজ্য আরাকানের বেশির ভাগ এলাকা মায়ানমারের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির দখলে চলে গেছে। ক্যাম্পের রোহিঙ্গারা বলছে, ২০১৭ সালে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তি অনুযায়ী এত দীর্ঘ সময়েও তাদের (রোহিঙ্গা) দেশে ফিরিয়ে নেয়নি জান্তা সরকার। এত দিন পরে আকস্মিক ঘোষণা দিয়ে তারা বলছে, এক লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে সম্মত।

তা ছাড়া আরো ৭০ হাজার রোহিঙ্গাকেও ফিরিয়ে নিতে তালিকা যাচাইবাছাই করা হচ্ছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর চা দোকান থেকে শুরু করে তাদের ঘরে ঘরে এই মুহূর্তে আলাপ-আলোচনার বিষয়টিই এটি। ভাসানচর ক্যাম্পের রোহিঙ্গা শেড মাঝি গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় বিষয়টি নিয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশে ফিরে না যাওয়ার কোনো কারণই নেই। কিন্তু আমাদের কোথায় নেবে? আমাদের জন্মস্থান আরাকান তো এখন আরাকান আর্মির দখলে।

যেখানে জান্তা সরকারই আরাকান আর্মির কবল থেকে পালিয়ে গেছে, সেখানে আমাদের কিভাবে নেবে?

কুতুপালং ক্যাম্পের শেড মাঝি হামিদ হোসেন কালের কণ্ঠকে জানান, ২০১৭ সালে আমাদের বিতাড়িত করে জান্তা সরকার আবার বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে চুক্তি করেছিল আমাদের ফিরিয়ে নিতে। কিন্তু এত দিন সুযোগ থাকা সত্ত্বেও না নিয়ে এখন ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলে দেশবাসী ও বিশ্ববাসীর দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

কুতুপালং ক্যাম্পের অন্য রোহিঙ্গা নেতা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, মায়ানমার সরকার এখন সম্মত হলেই আমাদের প্রত্যাবাসন হবে না। এ ক্ষেত্রে এখন আরাকান আর্মির বিষয়টিও যোগ হয়েছে। এখন প্রত্যাবাসনে আরাকান আর্মির সঙ্গে মায়ানমার সরকারের বোঝাপড়া হতে হবে।

রোহিঙ্গা নেতা জাহাঙ্গীর বলেন, আরাকান হচ্ছে রোহিঙ্গাদের আদি এলাকা।  সেই আরাকানে তাদের ফিরিয়ে নিলে তারা এখনই চলে যাবে।

প্রসঙ্গত, ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা মায়ানমার থেকে বাংলাদেশের ক্যাম্পগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। এসব রোহিঙ্গার মধ্যে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার তালিকা মায়ানমারের কাছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেওয়া রয়েছে। এর আগে কয়েক দফায় রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের দিন ধার্য করা হলেও বাস্তবে প্রত্যাবাসন বারবার ভণ্ডুল হয়ে গেছে। সর্বশেষ গতকাল বিমসটেক সম্মেলন উপলক্ষে এক বৈঠকে মায়ানমারের পক্ষে এক লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে সম্মতির কথা জানিয়েছে।

 

 

 

মন্তব্য

সর্বশেষ সংবাদ