২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে পাঠ্যপুস্তক সংস্কারের কাজ শুরু হয়। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণয়ন করে। এর আলোকে নতুন পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ করা হয় ২০১২ সালে, যা শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছায় ২০১৩ সালে। তখন বলা হয়েছিল, বাংলা বিষয়কে সাহিত্যসমৃদ্ধ এবং সর্বজনীন করার জন্য ধর্মীয় বিষয়গুলো সরিয়ে ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষাসহ অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বইয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
২০১৩ সালে গড়ে ওঠা সংগঠন হেফাজতে ইসলাম পাঠ্যপুস্তক সংস্কারের তীব্র বিরোধিতা করে। ওই বছরের শুরুতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়া ওঠা শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের সময়ে ইসলামী ছাত্রশিবির পরিচালিত ফেসবুক পেজ বাঁশের কেল্লায় পাঠ্যপুস্তকের বাংলা বই থেকে কী কী ইসলামী ভাবধারার লেখা বাদ পড়েছে এবং কোন কোন ‘হিন্দু লেখক’ ও ‘হিন্দুত্ববাদী’ লেখা যুক্ত হয়েছে সেই তালিকা প্রকাশ করা হয়। এর পর থেকে পাঠ্যপুস্তক সংশোধনের দাবিতে হেফাজতে ইসলামসহ কয়েকটি সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে।
গত মে মাসে পাঠ্যপুস্তক সংশোধনের দাবিতে একটি সংগঠনের আন্দোলনের সময়ে এনসিটিবির বক্তব্য জানতে চাইলে সদস্য (প্রাথমিক শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুল মান্নান গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘পাঠ্যপুস্তকের বাংলা বইগুলো ধর্ম কিংবা সমাজ, বিজ্ঞান শেখানোর বই নয়, এগুলো ভাষা-সাহিত্য শেখানোর বই। ভাষা শিক্ষার জন্য যেসব লেখা থাকা দরকার, তাই দেওয়া হয়েছে। ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা হচ্ছে ধর্ম শিক্ষার বই, সেখানে ধর্ম শেখানোর জন্য যা দরকার তা আছে। বিজ্ঞানের বইয়ে কি ধর্মের বিষয় থাকবে? বিজ্ঞানের বইয়ে ধর্মীয় বিষয় নেই কেন এমন প্রশ্ন না উঠলে বাংলার ক্ষেত্রেও তা থাকা উচিত নয়। বইয়ের মধ্যে ভুল-ত্রুটি থাকতে পারে। তবে হলফ করে বলতে পারি, ইসলাম নয়, অন্য যেকোনো ধর্মকে বিন্দুমাত্র হেয় করা হয়েছে, এমন একটি শব্দও পাওয়া যাবে না পাঠ্য বইয়ে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের দুটি সংস্কৃতি। একটি ধর্মীয় সংস্কৃতি, আরেকটি জাতিগত। যখন জাতিগত সংস্কৃতির কথা উঠবে, তখন হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির কথা আসবে। তখন কোনটা হিন্দু, কোনটা মুসলমান, এটা দেখার বিষয় নয়। কোন কবিতার মধ্যে কোন মিথ আসছে, সেটাকে যারা বলেন হিন্দু মিথ তাঁরা ভুল করেন, আসলে এটা বাঙালি মিথ।’
গত বৃহস্পতিবার বইয়ের নতুন পরিবর্তন সম্পর্কে জানতে চাইলে এনসিটিবির সদস্য (প্রাথমিক শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুল মান্নান কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তিনি বলেন, এ দেশে ধর্মের রাজনীতির ব্যবহার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এখন চাইলেও অনেক কিছু করা সম্ভব নয়।
২০১৭ শিক্ষাবর্ষের প্রাথমিক স্তরের দ্বিতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকের ‘আমার বাংলা বই’য়ে পরিমার্জন করা হয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ে ‘সবাই মিলে করি কাজ’, তৃতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ে ‘খলিফা হযরত আবু বকর (রা.)’, চতুর্থ শ্রেণির বাংলা বইয়ে ‘খলিফা হযরত ওমর (রা.), পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ে ‘বিদায় হজ’ ও ‘শহিদ তিতুমীর’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া পঞ্চম শ্রেণির বাংলা বইয়ে কবি গোলাম মোস্তফা রচিত ‘প্রার্থনা’ কবিতার পরিবর্তে কবি কাদের নওয়াজ রচিত ‘শিক্ষাগুরুর মর্যাদা’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বাদ দেওয়া হয়েছে হুমায়ুন আজাদ রচিত ‘বই’ কবিতা।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবদুল মান্নান জানান, ‘সবাই মিলে করি কাজ’ [হজরত মুহাম্মদ (সা.) জীবনচরিত), ‘খলিফা হযরত আবু বকর (রা.)’, ‘খলিফা হযরত ওমর (রা.)’ শীর্ষক বিষয়গুলো বাংলা বইয়ে না থাকলেও ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বইয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। ‘বিদায় হজ’ ও ‘শহিদ তিতুমীর’ শীর্ষক নিবন্ধ দুটি বাংলা বই থেকে বাদ পড়লেও বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় বইয়ে ছিল। এগুলো পাঠ্যক্রম থেকে বাদ পড়েনি।
ষষ্ঠ শ্রেণির বাংলা পাঠ্যপুস্তক চারুপাঠ থেকে এস ওয়াজেদ আলীর ‘রাঁচি ভ্রমণ’ বাদ পড়েছে। যুক্ত হয়েছে সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘নীল নদ আর পিরামিডের দেশ’। সানাউল হকের কবিতা ‘সভা’ বাদ পড়েছে, যুক্ত হয়েছে জসীমউদ্দীনের ‘আসমানী’। আনন্দপাঠ থেকে বাদ পড়েছে সত্যেন সেনের গল্প ‘লাল গরুটা’, যুক্ত হয়েছে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র ‘সততার পুরস্কার’। এনসিসিসি সভার সিদ্ধান্তে ভ্রমণ কাহিনী ও গল্পের পরিবর্তন হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে কবিতার পরিবর্তন হয়েছে ট্রাই-আউট রিপোর্ট ও বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে।
সপ্তম শ্রেণির বাংলা বই সপ্তবর্ণার গদ্যে হাবীবুল্লাহ বাহারের ‘মরু ভাস্কর’ যুক্ত হয়েছে এবং দ্রুতপঠন আনন্দপাঠ বই থেকে শরত্চন্দ্রের ‘লালু’ বাদ পড়েছে এনসিসিসি সভার সিদ্ধান্তে।
অষ্টম শ্রেণির বাংলা সাহিত্য কণিকা থেকে কাজী নজরুল ইসলামের একটি গদ্য বাদ নিয়ে নতুন একটি যুক্ত হয়েছে ট্রাই-আউট রিপোর্ট ও বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশে। ট্রাই-আউট রিপোর্টের ভিত্তিতে তিনটি পদ্য বাদ পড়েছে। তার জায়গায় একটি পদ্য যুক্ত করা হয়েছে বিশেষজ্ঞ কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে, কিন্তু দুটি পদ্য কায়কোবাদের ‘প্রার্থনা’ ও কালিদাশ রায়ের ‘বাবুরের মহত্ত্ব’ যুক্ত করা হয়েছে ২০১৬ সালের ২০ আগস্ট অনুষ্ঠিত এনসিসিসি সভার সিদ্ধান্তে। বাংলা দ্রুতপঠন আনন্দপাঠ থেকে উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর ‘রামায়ণ-কাহিনী’ (আদিকাণ্ড) বাদ পড়েছে।
নবম শ্রেণির বাংলা বই মাধ্যমিক বাংলা সাহিত্য থেকে একটি গদ্য ও পাঁচটি কবিতা বাদ পড়েছে এবং পাঁচটি কবিতা যুক্ত হয়েছে এনসিসিসি সভার সিদ্ধান্তে। বাদ পড়া ভ্রমণ কাহিনীটি হচ্ছে সজীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পালামৌ’ এবং কবিতা হচ্ছে জ্ঞানদাসের ‘সুখের লাগিয়া’, ভারতচন্দ্রের ‘আমার সন্তান’, লালন শাহর ‘সময় গেলে সাধন হবে না’, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘স্বাধীনতা’ ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সাঁকোটা দুলছে’। যুক্ত হয়েছে শাহ মোহাম্মদ সগীরের ‘বন্দনা’, আলাওলের ‘হাম্দ’, আব্দুল হাকিমের ‘বঙ্গবাণী’, গোলাম মোস্তফার ‘জীবন বিনিময়’ ও কাজী নজরুল ইসলামের ‘উমর-ফারুক’।
নবম শ্রেণির বইয়ে মোতাহার হোসেন চৌধুরীর প্রবন্ধ ‘লাইব্রেরি’ ও সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘মে দিবসের কবিতা’ যুক্ত হয়েছে বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশে। এই দুটি লেখা আগে সপ্তম শ্রেণির বইয়ে ছিল। এ ছাড়া রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর ‘খতিয়ান’ কবিতার পরিবর্তে ‘মিছিল’ যুক্ত হয়েছে।
গত বছরের ৮ এপ্রিল সন্ধ্যায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ-এর কেন্দ্রীয় নেতাদের এক যৌথ বিবৃতি গণমাধ্যমে পাঠানো হয়। ওই বিবৃতিতে পাঠ্যপুস্তকের বাংলা বই থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে যে ১৭টি গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধের তালিকা প্রকাশ করা হয় তার সবই ২০১৭ সালের বইয়ে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। একইভাবে যে ১২টি গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ-নিবন্ধকে নাস্তিক্যবাদী ও হিন্দুত্ববাদী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয় তার সব কটিই বাদ দেওয়া হয়েছে।
পরিবর্তিত নতুন বই প্রায় চার কোটি ২৬ লাখ শিক্ষার্থীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে ১ জানুয়ারি।
পাঠ্যপুস্তকের বাংলা বই থেকে গণমানুষের বোধ-বিশ্বাস ও ধর্মীয় চেতনাবিরোধী বিতর্কিত গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ বাদ দিয়ে নতুন বছরের প্রথম দিনে সারা দেশের ছাত্রছাত্রীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম। গত রবিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও প্রতিবাদের পর শেষতক সরকারের নীতিনির্ধারকরা যে বিষয়টির গুরুত্ব ও নাজুকতা উপলব্ধি করতে পেরেছেন এ জন্য আমরা তাঁদের সাধুবাদ জানাই।’
এদিকে পাঠ্যপুস্তকের নতুন বইয়ের আরো কিছু বিষয় নিয়েও সমালোচনার ঝড় বইছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। প্রথম শ্রেণির বাংলা বইয়ে বর্ণ পরিচয়ে ‘ও’তে ‘ওড়না চাই’ বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। জেন্ডারের বিষয়টি এখানে লঙ্ঘিত হয়েছে। একজন ছাত্র কেন ওড়না চাইবে। তা ছাড়া, ওড়না কেন প্রয়োজন, একজন শিক্ষার্থী জানতে চাইলে শিক্ষক এর কী উত্তর দেবেন—ফেসবুকে একজন এ প্রশ্ন করেছে। বানান ভুল নিয়েও কথা উঠেছে। পঞ্চম শ্রেণির বইয়ে ‘ঘোষণা’ বানান ‘ঘোষনা’, ‘সমুদ্র’ বানান ‘সমুদ’ লেখা হয়েছে। তৃতীয় শ্রেণির হিন্দু ধর্ম শিক্ষা বইয়ের শেষ পৃষ্ঠায় ইংরেজি নীতিবাক্য লেখা হয়েছে ভুল বানানে। কাউকে কষ্ট দিও না-র ইংরেজি লেখা হয়েছে, DO NOT HEART ANYBODY. প্রথম শ্রেণির বাংলা বইয়ে ছবি দিয়ে দেখানো হয়েছে ছাগল নাকি গাছে উঠে আম খায়। তৃতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ে কুসুমকুমারী দাশের ‘আদর্শ ছেলে’ কবিতায় ‘আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে’ পঙিক্তর বদলে লেখা হয়েছে ‘আমাদের দেশে সেই ছেলে কবে হবে’। কবিতার চতুর্থ লাইনে ‘মানুষ হইতে হবে-এই তার পণ’-এর ‘হইতে’ শব্দটিকে পাল্টে লেখা হয়েছে ‘হতেই’। নবম লাইনে ‘সে ছেলে কে চায় বল কথায়-কথায়’-এর ‘চায়’ শব্দটির বদলে লেখা হয়েছে ‘চাই’। পঞ্চদশ লাইনে ‘মনে প্রাণে খাট সবে শক্তি কর দান’-এর ‘খাট’ এর বদলে লেখা হয়েছে ‘খাটো’। আর কবিতাটির একাদশ থেকে চতুর্দশ লাইনই উধাও। এসব ভুল বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা বলেন, ভুলের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে। কারো দায়িত্বে অবহেলা থাকলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অষ্টম শ্রেণির গল্পের বই আনন্দপাঠ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বইটিতে একটিও মৌলিক গল্প নেই। সাতটি গল্পের সব কটিই বিদেশি লেখকদের লেখার অনুবাদ। গল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে আরব্য উপন্যাস অবলম্বনে ‘কিশোর কাজী’, মার্ক টোয়েনের ‘রাজকুমার ও ভিখারির ছেলে’, ড্যানিয়েল ডিফোর ‘রবিনসন ক্রুশো’, ফরাসি ঔপন্যাসিক মহাকবি আবুল কাশেম ফেরদৌসীর ‘সোহরাব রোস্তম’, উইলিয়াম শেকসপিয়ারের ‘মার্চেন্ট অব ভেনিস’, ওয়াশিংটন আরবি রচিত গল্প অবলম্বনে ‘রিপভ্যান উইংকল’ ও লেভ তলস্তয়ের ‘সাড়ে তিন হাত জমি’।