kalerkantho


না.গঞ্জে ৭ খুন মামলায় হাইকোর্টে রায় আজ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৩ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



না.গঞ্জে ৭ খুন মামলায় হাইকোর্টে রায় আজ

নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত সাত খুনের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ডেথ রেফারেন্স এবং আসামিদের করা আপিলের রায় ঘোষণা করা হবে আজ রবিবার। বিচারপতি ভবানী প্রসাদ সিংহ ও বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করবেন।

হাইকোর্টে এ মামলায় গত ২২ মে শুনানি শুরু হয়ে শেষ হয় ২৬ জুলাই। ওই দিনই রায়ের তারিখ ধার্য করা হয়। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জাহিদ সারওয়ার কাজল ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল বশির আহমেদ। আসামিপক্ষে আইনজীবী ছিলেন অ্যাডভোকেট মনসুরুল হক চৌধুরী, এস এম শাহজাহান প্রমুখ।

শুনানিতে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, এ হত্যাকাণ্ড ক্ষমার অযোগ্য। লোমহর্ষক ঘটনার জন্য নিম্ন আদালতে আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এ সাজা বহাল থাকা উচিত। কারণ এ হত্যার সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্য জড়িত। এতে জনগণ বুঝবে আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।

যে বাহিনীর লোকই হোক না কেন আইনের চোখে সবাই সমান। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য এটি একটি বড় পদক্ষেপ।

আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান শুনানিতে বলেন, ১৩ দিন পুলিশ হেফাজতে রেখে আসামির (মেজর আরিফ) স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছে। এটা আইনানুগ হয়নি। এ ছাড়া স্বীকারোক্তির বক্তব্য অসংলগ্ন। এসব কারণে আসামিরা খালাস পেতে পারেন।

এ মামলায় গত ১৬ জানুয়ারি রায় দেন নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালত। রায়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন, র্যাবের সাবেক তিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। মোট ৩৫ জন আসামির মধ্যে বাকি ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন র্যাব-১১-এর তৎকালীন অধিনায়ক লে. কর্নেল (বরখাস্ত) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, কম্পানি কমান্ডার মেজর (বরখাস্ত) আরিফ হোসেন, লে. কমান্ডার (বরখাস্ত) মাসুদ রানা (এম এম রানা), র্যাব-১১-এর সাবেক সদস্য চাকরিচ্যুত হাবিলদার এমদাদুল হক, আরওজি আরিফ হোসেন, ল্যান্স নায়েক হীরা মিয়া ও বেলাল হোসেন, সিপাহি আবু তৈয়াব, কনস্টেবল মো. শিহাব উদ্দিন, এসআই পুর্নেন্দু বালা, সৈনিক আসাদুজ্জামান নুর, সৈনিক আ. আলীম, করপোরাল মোখলেছুর রহমান, সৈনিক মহিউদ্দিন মুন্সী, আল আমিন শরীফ, তাজুল ইসলাম, সার্জেন্ট এনামুল কবীর এবং নূর হোসেনের সহযোগী মর্তুজা জামান চার্চিল, আলী মোহাম্মদ, মিজানুর রহমান দিপু, রহম আলী, আবুল বাশার, সেলিম, সানাউল্লাহ সানা, শাহজাহান ও জামাল উদ্দিন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তারেক সাঈদ মোহাম্মদ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার জামাতা।

কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ৯ আসামি হলেন চাকরিচ্যুত করপোরাল রুহুল আমিন, এএসআই আবুল কালাম আজাদ, এএসআই বজলুর রহমান, হাবিলদার নাসির উদ্দিন, সৈনিক নুরুজ্জামান, কনস্টেবল বাবুল হাছান, কামাল হোসেন, মোখলেসুর রহমান ও হাবিবুর রহমান। সাবেক র্যাব সদস্য বজলুর রহমান ও নাসির উদ্দিনের সাত বছর করে এবং অন্যদের ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

গত ২২ জানুয়ারি নিম্ন আদালত থেকে ডেথ রেফারেন্স তথা মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য পূর্ণাঙ্গ রায়সহ যাবতীয় নথি পাঠানো হয় হাইকোর্টে। পরে কারাবন্দি আসামিরা পর্যায়ক্রমে আপিল করেন। এরপর প্রধান বিচারপতির নির্দেশে ছয় হাজার পৃষ্ঠার পেপারবুক তৈরি করা হয়। মামলাটি প্রথমে বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের হাইকোর্ট বেঞ্চে পাঠানো হলেও পরে গত ১৭ মে বিচারপতি ভবানী প্রসাদ সিংহের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে পাঠানো হয়।

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তখনকার কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তাঁর গাড়িচালক ও তিন সঙ্গী এবং নিরীহ আইনজীবী চন্দন সরকার ও তাঁর গাড়িচালককে দিনদুপুরে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেই রাতে শরীরে নেশাযুক্ত ইনজেকশন পুশ করে এবং শ্বাস রোধ করে হত্যা করা হয় তাঁদের। পরে লাশ গুম করার জন্য পেট কেটে ইটভর্তি দুটি বস্তা শরীরে বেঁধে মেঘনার মোহনায় শীতলক্ষ্যা নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। তিন দিন পর লাশ ভেসে উঠলে জানা যায়, সেগুলো অপহৃত সাতজনের লাশ। নিহত সাতজনের মধ্যে অন্যরা হলেন সিরাজুল ইসলাম লিটন, তাজুল ইসলাম, মনিরুজ্জামান স্বপন ও গাড়িচালক জাহাঙ্গীর এবং অ্যাডভোকেট চন্দন কুমার সরকার ও তাঁর গাড়িচালক ইব্রাহিম।

ওই ঘটনায় নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি এবং আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা মডেল থানায় আলাদা দুটি হত্যা মামলা করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ নূর হোসেন, তারেক সাঈদসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের ৮ এপ্রিল আলাদা চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দেয়। তবে দুই মামলার অভিযোগপত্রেই আসামি অভিন্ন। বিচারিক আদালতে ১০৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়। গত বছরের ৩০ নভেম্বর যুক্তিতর্ক শেষ হলে রায় ঘোষণার জন্য ১৬ জানুয়ারি দিন ধার্য করেন নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ।

সাত খুনের ঘটনায় ২০১৪ সালের ১৪ জুন রাতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কলকাতার দমদম বিমানবন্দরের অদূরে কৈখালি এলাকার একটি বাড়ি থেকে নূর হোসেন ও তাঁর দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে বাগুইআটি থানা পুলিশ। পরে ওই বছরের ১৮ আগস্ট নূর হোসেন, ওহাদুজ্জামান শামীম ও খান সুমনের বিরুদ্ধে ভারতে অনুপ্রবেশের অভিযোগে বারাসাত আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। ২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর দমদম কারাগার কর্তৃপক্ষ নূর হোসেনকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করে। ১৩ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ আদালতে উপস্থাপন করা হয় নূর হোসেনকে।


মন্তব্য