kalerkantho


দুর্গত রোহিঙ্গাদের হাতে অর্থ নেই দ্রব্যমূল্য লাগামহীন

আলুর কেজি ৪০, কাঁকরোল ৯০, পানির লিটার ৩৫ টাকা
বাঁশের দাম বেড়েছে তিন গুণ

নূপুর দেব, উখিয়া থেকে   

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



দুর্গত রোহিঙ্গাদের হাতে অর্থ নেই দ্রব্যমূল্য লাগামহীন

উখিয়ার কুতুপালং, বালুখালী, কোর্ট বাজার, স্টেশনসহ আশপাশের বিভিন্ন বাজারে বিভিন্ন আকৃতির বাঁশ, পলিথিন ত্রিপলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর দাম এখন আকাশচুম্বী। গত কোরবানির ঈদের এক সপ্তাহ আগে এসব বাজারে বড় আলু কেজিপ্রতি ১৮ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন তা বেড়ে ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

প্রতি কেজি ৪০ থেকে ৫০ টাকার কাঁকরোল এখন ৮০ থেকে ৯০ টাকা। অন্যান্য সবজির দামও অনেক বেশি। শুধু তাই নয়, হু হু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় তৈজসপত্র থেকে শুরু করে বিভিন্ন খাবার ও ফলমূলের দামও বেড়ে গেছে। বিভিন্ন ফার্মেসিতে ওষুধের দাম নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নেওয়া হচ্ছে।

মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন নামের এক রোহিঙ্গা যুবক মংডু থেকে পালিয়ে গত রবিবার বিকেলে তিন সন্তান, মা-বাবা ও স্ত্রীকে নিয়ে কুতুপালং এলাকায় আসেন। আসতে তাঁদের সাত দিন সময় লেগেছে। পানি ছাড়া আর কিছু খেতে না পারা এই পরিবারের সদস্যরা রবিবার রাতে একটি সংস্থার বিতরণ করা ত্রাণের দুটি প্যাকেটে চিঁড়া, মুড়ি ও গুড় পায়। এক ব্যক্তির কাছ থেকে ৫০ টাকা পেলে কুতুপালং বাজারে যান ত্রাণের পাওয়া খাবার খেতে পানি কিনতে। দোকানদার ৩৫ টাকায় এক লিটার পানি দেয় তাঁকে।

অথচ ওই পানির বাজারমূল্য ২০ টাকা। চড়া দামে কেনা পানিসহযোগে আট দিনের মাথায় রাতের খাবার খেয়েছে পরিবারের সাত সদস্য। তবে রাতে ছিল খোলা আকাশের নিচে।

জসিম জানান, পরের দিন সোমবার সকালে কক্সবাজার শহর থেকে মো. আমজাদ নামের এক স্বজন তাদের দেখতে আসেন। তিনিও রোহিঙ্গা। গত বছর পালিয়ে এসে কক্সবাজারে বসবাস করছেন। আমজাদের কাছ থেকে এক হাজার টাকা পাওয়া গেলে উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের বিপরীতে সড়কের পাশে বাঁশ কিনতে গিয়েছিলেন জসিম উদ্দিন। তখনই তাঁর সঙ্গে পরিচয় ও কথা হয় কালের কণ্ঠ প্রতিনিধির। তিনি বলেন, ‘কুতুপালং বাজারে ভাসমান বিক্রেতাদের কাছে লম্বা ১৮ ফুট, পাশে ৮ ফুট একটি প্লাস্টিক কিনতে গিয়েছিলাম। বিক্রেতা ৪০০ টাকা চেয়েছে। আবার এখানে বলেছে ৪৫০ টাকা। কী করব, বুঝতে পারছি না। ’

বাঁশ বিক্রেতা নুনু মিয়া পরিচয় দিয়ে বলেন, “উখিয়া মরিচ্যাবাজার (বাঁশ দোকান থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে) থেকে ১০০ বাঁশ কিনে জিপগাড়িতে করে আনতে আমার সাড়ে তিন হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এর মধ্যে পথে ‘পুলিশ ও বন বিভাগ’কে দিতে হয়েছে ৫০০ টাকা। খরচ বেশি লেগেছে তাই বেশি দামে বিক্রি না করলে পোষাবে না। ”

নুর মোহাম্মদ নামের এক রোহিঙ্গা বলেন, ‘ওদিকে (রাখাইন) তো সব হারিয়েছি। সাত দিন আগে আমরা (আটজন) এখানে আসি। দুই দিন আগে আমার স্ত্রীর (রশিদা বিবি) দুটি নাকফুল এখানে তিন হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করেছি। এর মধ্যে তিন হাজার টাকার বাঁশ কিনেছি। শুনেছি, এই বাঁশগুলো আগে এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকায় পাওয়া যেত। বাঁশ কিনতেই টাকা শেষ। এখনো প্লাস্টিক কিনতে পারিনি। সোমবার এক কেজি আলু কিনেছি ৪০ টাকা দিয়ে। আর এক কেজি সিদ্ধ চাউল কিনেছি ৪২ টাকায়। ১৩ হাতের একটি পাইয়া বাঁশের দাম আগে ছিল ৩০ টাকা এখন আমরা কিনেছি ৭০ টাকা করে। ’ এ সময় রোহিঙ্গা নুর হাবিব বলেন, ‘২৪ হাতের এই বাঁশটি কিনেছি ৫০০ টাকা দিয়ে। এই বাঁশ নাকি আগে বিক্রি হতো ২০০-২৫০ টাকায়। ’

তবে বাজারে দাম বাড়ার বিষয়টি অস্বীকার করে কুতুপালং বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ডা. আবদুল মজিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিটি জিনিসের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে আমি ও স্থানীয় ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার মো. বখতিয়ারের কারণে দাম বাড়াতে পারেনি। ’

সভাপতি যখন তাঁর দোকানে এ কথাগুলো বলছিলেন তখন তাঁর পাশে দাঁড়ানো স্থানীয় এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করে বলেন, ‘সভাপতি যেগুলো বলছে তা মিথ্যা, দাম বাড়ার কারণে শুধু রোহিঙ্গারা নয়, আমরা স্থানীয়রাও অনেক কষ্টে আছি। বিষয়গুলো দেখার মতো কেউ নেই। ’

স্থানীয়রা জানায়, বন্দুকের নল, বোমায় নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে প্রাণে বেঁচে থাকা লাখো রোহিঙ্গাকে মানবিক কারণে বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছে। সেই রোহিঙ্গাদের পুঁজি করে স্থানীয় সংঘবদ্ধ ও অসাধু ব্যবসায়ীরা প্রায় সব কিছুর দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।


মন্তব্য