kalerkantho


বিশেষ নিবন্ধ

রোহিঙ্গাদের জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের দায় বাড়ল

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



রোহিঙ্গাদের জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের দায় বাড়ল

মোহাম্মদ জমির

বাংলাদেশ আশ্রয় দেওয়ার সক্ষমতার চেয়েও বেশি রোহিঙ্গাকে এরই মধ্যে আশ্রয় দিয়েছে। এ বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়গুলোকে এখন বুঝতে হবে।

প্রতিবেশী দেশসহ বিশ্বের অন্য দেশগুলোকে, বিশেষ করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য দেশগুলোর উচিত তাদের প্রভাবকে কাজে লাগানোর, যাতে করে মিয়ানমার তাদের বৈষম্যমূলক নীতি থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়। চলতি মাসেই শুরু হতে যাওয়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনকে এ ক্ষেত্রে তারা কাজে লাগাতে পারে। তারা কফি আনান কমিশনের প্রতিবেদন নির্দেশিত পথ ধরে সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে বের করা এবং এই সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পরে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যে মানবাধিকারের কথা বলে, এ নিয়ে তারা যে প্রত্যাশা করে, সেই দৃষ্টিকোণ থেকেও তাদের উদ্যোগ নেওয়ার এখন উপযুক্ত সময়। মিয়ানমারে সহিংসতার বৃত্তটি ক্রমেই বাড়ছে, এই ঊর্ধ্বগতি থামাতে এবং জাতিগত নির্মূল অভিযান থামাতে তাদের এই পদক্ষেপ প্রয়োজন।

গত ১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস যে মতামত প্রকাশ করেছেন তার নিগূঢ় অর্থ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বুঝতে হবে এবং সেই মতো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। গুতেরেস সাবধান করে দিয়ে বলেছেন, এরই মধ্যে মানবিক বিপর্যয় ঘটে গেছে এবং এরই মধ্যে ৪০০ লোকের মৃত্যু ঘটেছে বলে একটি পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে। নিহতদের অধিকাংশই রোহিঙ্গা মুসলিম বলে জানা গেছে। গুতেরেস রাখাইন প্রদেশে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযান পরিচালনাকালে ‘সংঘটিত বাড়াবাড়ি’র বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং এ ধরনের মানবিক বিপর্যয় ঘটানো থেকে বিরত থাকা বা এড়িয়ে চলার তাগিদ দিয়েছেন।

তুরস্ক ও ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রপতি, ইরান ও মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং মালদ্বীপ সরকার গুতেরেসের এই উদ্বেগকে সমর্থন করেছেন। এর পাশাপাশি ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিয়ানমার ও বাংলাদেশ পরিদর্শন করেছেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে চীন, রাশিয়া ও ভারত সামনে এগিয়ে আসেনি বরং এই ধরনের চলমান মানবিক সংকটকে ছোট করে দেখা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনে মিয়ানমারকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর কোনো কোনোটির ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযেজ্য।

নোবেল শান্তি পদকজয়ীদের মধ্যে ডেসমন্ড টুটু, মালালা ইউসুফজাই ও অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস রোহিঙ্গাদের সঙ্গে এ ধরনের মর্মান্তিক ও ঘৃণ্য আচরণ না করতে আহ্বান জানিয়েছেন অং সান সু চির কাছে; সু চি নিজেও একজন শান্তিতে নোবেল বিজয়ী।

সহিংসতার হাত থেকে বেঁচে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গারা যাতে ফিরতে না পারে সে জন্য সীমান্তে মিয়ানমার মাইন পুঁতে রাখায় পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়েছে। বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে সীমান্তের এত কাছে ভূমি মাইন পুঁতে রাখার আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানাতে পদক্ষেপ নিয়েছে।

নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডাব্লিউএফপি) মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে তাদের ত্রাণ তৎপরতা কার্যক্রম স্থগিত রাখায় সমীকরণটা আরো জটিল হয়েছে। এর ফলে রাখাইনের আড়াই লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষ এবং অন্যান্য বিপদগ্রস্ত সম্প্রদায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কারণ ২০১২ সাল থেকে রাখাইনেই শরণার্থীশিবিরে আশ্রয় নেওয়া প্রায় এক লাখ ২০ হাজার মানুষ (যাদের অধিকাংশই রোহিঙ্গা মুসলিম) ত্রাণ বা খাদ্য সাহায্যের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। ওই সময় জাতিগত দাঙ্গায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ হতাহত হয় এবং ওই সংকট আবারও বারুদের মতো জ্বলে উঠেছে দেশটিতে।

এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারও মিয়ানমারের সরকারকে বলেছে, তাদের গণহত্যা নীতি বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের মানবিক চাহিদা মেটানোর সক্ষমতা অর্জনে আন্তর্জাতিক ত্রাণ ও আর্থিক সহায়তার জন্যও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আঙুলের ছাপ প্রযুক্তির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নিবন্ধিত করার কাজ শুরু হয়েছে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর সময় এই পরিচয়পত্র কাজে লাগবে। এ ছাড়া আশ্রিত রোহিঙ্গাদের থাকার জন্য অস্থায়ীভাবে শিবির নির্মাণে দুই হাজার একর জমি বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। বাংলাদেশ তার সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছে এবং এই কাজে বাংলাদেশ গোটা বিশ্বকে পাশে চাইছে।

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও তথ্য কমিশেনর প্রধান তথ্য কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ও সুশাসন বিষয়ক বিশ্লেষক। অনুলিখন : শেখ শাফায়াত হোসেন।

 


মন্তব্য