kalerkantho


জাতিসংঘে ভাষণে শেখ হাসিনার ৫ দফা

রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান এখনই করুন

নিউ ইয়র্ক প্রতিনিধি   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান এখনই করুন

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বৃহস্পতিবার রাতে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি : পিআইডি

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ নিঃশর্তে বন্ধ করে মানবিক এই সংকটের স্থায়ী সমাধানে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, সহিংসতার মুখে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা যাতে নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারে, সে জন্য এখনই তার ব্যবস্থা করতে হবে।

জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিয়ে পুনর্বাসনের জন্য সুনির্দিষ্ট পাঁচটি প্রস্তাবও তুলে ধরেন তিনি। শেখ হাসিনা স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই। আমরা অর্থনৈতিক উন্নতি চাই, মানব ধ্বংস নয়, মানব কল্যাণ চাই। ’

স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় (বাংলাদেশ সময় শুক্রবার ভোর) জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষার পাশাপাশি সব ধরনের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে একাত্তরের ২৫ মার্চের গণহত্যার ভয়াবহতা তুলে ধরে এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সম্মিলিত পদক্ষেপ এবং ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর চালানো ওই গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রত্যাশা করেছেন তিনি।

বিশ্ব সংস্থার ১৯৩টি সদস্য দেশের প্রতিনিধিদের সামনে চতুর্দশবারের মতো বাংলায় দেওয়া ভাষণের শুরুতেই রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, “আমার হূদয় আজ দুঃখে ভারাক্রান্ত। কেননা আমার চোখে বারবার ভেসে উঠছে ক্ষুধার্ত, ভীত-সন্ত্রস্ত ও নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের মুখচ্ছবি। আমি মাত্র কয়েক দিন আগেই আমার দেশে আশ্রয় নেওয়া কয়েক লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে দেখা করে এসেছি, যারা ‘জাতিগত নিধনে’র শিকার হয়ে আজ নিজ দেশ থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত। অথচ তারা হাজার বছরেরও অধিক সময় যাবৎ মিয়ানমারে বসবাস করে আসছে।

নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এদের দুঃখ-দুর্দশা আমি গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আমার বাবা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করার পর আমি আমার ছোট বোনকে নিয়ে ছয় বছর উদ্বাস্তু জীবন কাটিয়েছি। ’

রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের বর্ণনা দিয়ে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান বলেন, ‘রাখাইন রাজ্যে চলমান নৃশংসতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ফলে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে অবস্থার ভয়াবহ অবনতি ঘটেছে। এই নৃশংসতার হাত থেকে বাঁচার জন্য প্রতিদিন হাজার হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত যাওয়া ঠেকানোর জন্য মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সীমানা বরাবর স্থলমাইন পুঁতে রাখছে। ’

মিয়ানমারে চলমান সহিংসতা বন্ধে এবং সেখানে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় উদ্যোগ গ্রহণ করায় নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য রাষ্ট্রগুলো ও জাতিসংঘের মহাসচিবকে ধন্যবাদ জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘আমরা এই মুহূর্তে নিজ ভূখণ্ড হতে জোরপূর্বক বিতাড়িত আট লাখেরও অধিক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় ও সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছি। ’ উদ্বেগময় পরিস্থিতির বর্ণনা করে তিনি বলেন, ‘এসব মানুষ যাতে নিরাপদে এবং মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারে, এখনই তার ব্যবস্থা করতে হবে। ’

রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দেওয়া প্রধানমন্ত্রী পাঁচটি প্রস্তাব হলো—১. অনতিবিলম্বে এবং চিরতরে মিয়ানমারে সহিংসতা ও ‘জাতিগত নিধন’ নিঃশর্তে বন্ধ করা; ২. অনতিবিলম্বে মিয়ানমারে জাতিসংঘের মহাসচিবের নিজস্ব একটি অনুসন্ধানী দল প্রেরণ করা; ৩. জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে সব সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান করা এবং এ লক্ষ্যে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সুরক্ষা বলয় ‘সেফ জোন’ গড়ে তোলা; ৪. রাখাইন রাজ্য থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত সব রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে তাদের নিজ ঘরবাড়িতে প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা; ৫. কফি আনান কমিশনের সুপারিশমালার নিঃশর্ত, পূর্ণ এবং দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার মধ্যে জাতিসংঘের অধিবেশনে আট লাখ অনুপ্রবেশকারীর আশ্রয়দাতা দেশ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা ছিলেন সবার মনোযোগের কেন্দ্রে। মিয়ানমারের নির্যাতিত এই মুসলিম জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য শেখ হাসিনার প্রশংসাও ঝরছে বিশ্বনেতাদের কণ্ঠে। সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার আগেই জাতিসংঘে বিভিন্ন বৈঠক ও সভায় রোহিঙ্গা প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।

গত মঙ্গলবার জাতিসংঘ সদর দপ্তরে ওআইসি কনট্যাক্ট গ্রুপের বৈঠকে তিনি রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে তাঁর প্রস্তাব তুলে ধরেন। তিনি জোরের সঙ্গে বলেন, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারকে ফেরত নিতেই হবে।

এই রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে মেনে নিতে মিয়ানমার সরকার রাজি না হলেও অনুপ্রবেশকারীদের যাচাই সাপেক্ষে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অং সান সু চি। আন্তর্জাতিক সমালোচনার প্রেক্ষাপটে এবার জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যাননি মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর সু চি।

গত ২৫ আগস্ট রাখাইনের ৩০টি পুলিশ পোস্ট ও একটি সেনা ক্যাম্পে হামলার পর সেখানে শুরু হয় সেনা অভিযান; এরপর বাংলাদেশ সীমান্তে নামে রোহিঙ্গাদের ঢল। জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা রোহিঙ্গাদের এই মানবিক সংকট নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে সমালোচনা করছে মিয়ানমার সরকারের।

১৯৭১ সালের পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার ঘটনা তুলে ধরে ২৫ মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালনে বাংলাদেশের পদক্ষেপ জাতিসংঘে জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের কোথাও যাতে কখনোই আর এ ধরনের জঘন্য অপরাধ সংঘটিত না হয়, সে জন্য আমি বিশ্ব সম্প্রদায়কে সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণের আহবান জানাচ্ছি। ’

সন্ত্রাসবাদ এবং সহিংস জঙ্গিবাদকে শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে নিজের বেশ কয়েকবার সন্ত্রাসী হামলার শিকার হওয়ার কথাও বলেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, “আমি সব ধরনের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন করছি। এ বিষয়ে আমাদের সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি মেনে চলে। ” তিনি আরো বলেন, ‘আমরা ধর্মের নামে যেকোনো সহিংস জঙ্গিবাদের নিন্দা জানাই। সহিংস জঙ্গিবাদ বিস্তার রোধে তৃণমূল পর্যায়ে আমরা পরিবার, নারী, যুবসমাজ, গণমাধ্যম এবং ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করেছি। ’

বৈশ্বিক সন্ত্রাস মোকাবেলায় তিনটি প্রস্তাবও তুলে ধরেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। এগুলো হলো ১. সন্ত্রাসীদের অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করতে হবে; ২. সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন বন্ধ করতে হবে ও ৩. শান্তিপূর্ণ উপায়ে আন্তর্জাতিক বিবাদ মীমাংসা করতে হবে।

মধ্যপ্রাচ্য শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করা এবং ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে সব ধরনের বৈষম্য এবং শত্রুতা নিরসনের জন্যও সব দেশের প্রতি আহ্বান জানান শেখ হাসিনা। ‘অব্যাহত শান্তি’র জন্য অর্থায়ন বিষয়ে জাতিসংঘের নতুন মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সাহসী এবং উদ্ভাবনমূলক প্রস্তাব প্রত্যাশা করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ‘জাতিসংঘ শান্তি বিনির্মাণ তহবিলে’ এক লাখ মার্কিন ডলার প্রতীকী অনুদান দেওয়ার ঘোষণাও দেন তিনি।

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের কার্যকারিতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা সমুন্নত রাখার ওপর জোর দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আরো নারী শান্তিরক্ষী মোতায়েনে বাংলাদেশ প্রস্তুত রয়েছে।

‘যৌন নিপীড়ন’ সংক্রান্ত সমস্যা মোকাবেলায় জাতিসংঘ মহাসচিবের ‘সার্কেল অব লিডারশিপ’-এর প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এ বিষয়ে গঠিত ‘ভিকটিম সাপোর্ট তহবিলে’ এক লাখ মার্কিন ডলার অনুদানের ঘোষণাও দেন শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অর্থপাচার, সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন এবং অন্যান্য আন্তঃরাষ্ট্রীয় সংঘবদ্ধ অপরাধের ক্ষেত্রে সাইবার জগৎ থেকে উদ্ভূত হুমকি মোকাবেলা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে আমি জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। ’

জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে প্যারিস চুক্তির বাস্তবায়নের প্রত্যাশা প্রকাশ করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কার্যকর পদক্ষেপ তুলে ধরতে গিয়ে বন্যা এবং অন্যান্য দুর্যোগ মোকাবেলায় সাফল্যের কথা বলেন তিনি। ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের শতভাগ মানুষকে নিরাপদ পানি সরবরাহের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা মনে করি শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের জন্য দারিদ্র্য, ক্ষুধা, নিরক্ষরতা এবং বেকারত্ব দূর করা অত্যন্ত জরুরি। ’

এসডিজি অর্জনে বাংলাদেশের অগ্রগতিসহ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে দেশের সাফল্যগাথাও বিশ্বসম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।

‘বাংলাদেশের মানুষের উদারতা ও মহানুভবতা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে’ এদিকে নিউ ইয়র্কে এক সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের মানুষের উদারতা ও মহানুভবতা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশনে অংশ নিয়ে আমি সাধারণ বিতর্ক পর্ব, ওআইসি কনট্যাক্ট গ্রুপের উচ্চপর্যায়ের সভাসহ সব দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে রোহিঙ্গা সমস্যা তুলে ধরেছি। নতুন করে চার লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ায় বিশ্বনেতারা আমাদের প্রশংসা করেছেন। স্থান ও সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের জনগণ এসব অসহায় ও নির্যাতিত রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছেন, তাদের খাদ্য ও অন্যান্য সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের মানুষের এই উদারতা ও মহানুভবতা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। ’

স্থানীয় সময় শুক্রবার সকাল ৯টার কিছুক্ষণ পর (বাংলাদেশ সময় শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা) নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদানসহ সফর নিয়ে ব্রিফ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ অধিবেশনে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের কাছে রোহিঙ্গা সমস্যা তুলে ধরা ও এর সমাধানে বিশ্ববাসীর সহযোগিতা নিশ্চিত করা ছিল আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ’

তিনি জানান, জাতিসংঘের ৭২তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্ক পর্বে অংশ নিয়ে রোহিঙ্গা সমস্যার কথা জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন। এই সংকটের স্থায়ী সমাধানে তিনি জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের সামনে যে প্রস্তাবগুলো তুলে ধরেছিলেন, সেই প্রস্তাবগুলোর কথাও বলেন সংবাদ সম্মেলনে।

তুরস্ক ও ইরানের রাষ্ট্রপতিসহ মুসলিম বিশ্বের বেশ কয়েকজন নেতা ওআইসি কনট্যাক্ট গ্রুপের সভায় বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এসব দেশ বাংলাদেশকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। সভায় আমি রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর চলমান নির্যাতন বন্ধে এবং মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে ওআইসির পক্ষ থেকে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানাই। এ সময় বিশ্বজুড়ে কেবল মুসলমানরাই কেন শরণার্থী হচ্ছে তার কারণ অনুসন্ধান করতেও আমি ওআইসি নেতাদের অনুরোধ জানাই। ওই সভায় রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে সব দেশের সম্মতিতে একটি ঘোষণাপত্র গৃহীত হয়। ’

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ও সেমিনারে অংশ নিয়েছেন বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের সভা, জাতিসংঘ মহাসচিবের আয়োজনে উচ্চপর্যায়ের সভা, আইএলও এবং ওইডিসির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের সভা, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের আয়োজনে উচ্চপর্যায়ের সভা, এসডিজি বিষয়ে দুটি উচ্চপর্যায়ের সভা ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সভায় অংশ নেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।  

তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে সাইডলাইনে আমি বেশ কিছু দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছি। জাতিসংঘের মহাসচিবের সঙ্গে বৃহস্পতিবার আমার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি এ সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য আমি মহাসচিবকে অনুরোধ জানিয়েছি। রোহিঙ্গা বিষয়ে তিনি যে উদ্যোগ নিয়েছেন, এ জন্য আমি তাঁকে ধন্যবাদ জানাই। মিয়ানমারে শিগগিরই ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন পাঠানোর অনুরোধ জানাই। এ ছাড়া ভুটানের প্রধানমন্ত্রী, নেদারল্যান্ডসের রানি, এস্তোনিয়া প্রেসিডেন্ট, কসোভোর প্রেসিডেন্ট, নেপালের প্রধানমন্ত্রী, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার মহাপরিচালক, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির নির্বাহী পরিচালক এবং আইবিএমের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আমার দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয়। ’

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘এবারের অধিবেশনে আমি রোহিঙ্গা সমস্যা আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি এ সমস্যা সমাধানে মুসলিম বিশ্বসহ সবার সহযোগিতা কামনা করি। সামগ্রিকভাবে এবারের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের অবদান ও ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল ও সুসংহত হয়েছে। ’


মন্তব্য