kalerkantho


মেসি ম্যাজিকে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা

ক্রীড়া প্রতিবেদক   

১২ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



মেসি ম্যাজিকে বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা

জাদুকরী নৈপুণ্যে আর্জেন্টিনাকে সরাসরি বিশ্বকাপে পৌঁছে দিলেন লিওনেল মেসি। ছবি : এএফপি

ইতিহাস, ভূগোল, অঙ্ক, বিজ্ঞান—সব কিছু ভুলিয়ে দিয়ে ফুটবল জাদুকরের অবিশ্বাস্য ইন্দ্রজাল। এ যেন রবার্ট হুডিনির সেই বিখ্যাত জাদুর ফুটবল সংস্করণ।

হাতে হাতকড়া বেঁধে লোহার বাক্সে ভরে জাদুকরকে ফেলে দেওয়া হতো জল ভরা চৌবাচ্চায়। সেখান থেকেও কোনো এক অলৌকিক উপায়ে হাসতে হাসতে বের হয়ে আসতেন হুডিনি। কিটোর আতাহুয়ালপা অলিমিপক স্টেডিয়ামে ইকুয়েডরের বিপক্ষে নামার আগে লিওনেল মেসিকেও নিশ্চয়ই এভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছিল অনিশ্চয়তার শিকল, বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ে যাওয়ার শঙ্কার বেড়ি বেঁধে রেখেছিল পা। ১৬ বছর যে দেশের মাঠে জয় নেই, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার ফুট উঁচুতে যে মাঠে খেলতে নামলে কিছুদূর দৌড়ানোর পরই কাজ করতে অস্বীকৃতি জানায় ফুসফুস, সেখানেই যখন প্রতিপক্ষ ইকুয়েডর ম্যাচের প্রথম মিনিটেই গোল করে বসে, তখন জয়ের আশা রীতিমতো অসম্ভব মনে হয়। লৌকিক কোনো বিশ্বাস, যুক্তি তখন খাটে না। ভরসা করতে হয় অলৌকিকে। ইকুয়েডরের বিপক্ষে মেসি যেন সেই অলৌকিকের মানবমূর্তি। তাঁর জাদুকরী হ্যাটট্রিকেই তো ইকুয়েডরকে ৩-১ গোলে হারিয়ে সরাসরি বিশ্বকাপে পা রাখল আর্জেন্টিনা।

অনেক যদি, কিন্তুর হিসাব ছিল কিক-অফের আগে।

সেই জটিলতা ঘোচাতে আর্জেন্টিনার সামনে জয়ের চেয়ে সহজ কোনো রাস্তা ছিল না।

২০০১ সালের পর ইকুয়েডরকে তাদের মাঠে হারাতে না পারা, ৪৫৬ মিনিটের গোল খরা—সব কিছুর সঙ্গে যোগ হয়ে যায় ম্যাচের ৪০ সেকেন্ডেই ইকুয়েডরের ইবারার করা গোল। প্রথম মিনিটেই পিছিয়ে পড়া আকাশি নীলদের যে তখন ড্র করতেও একটা গোল চাই! এই খাদের কিনারা থেকেই আশ্চর্য পুনরুত্থান আর্জেন্টিনার। প্রথম মিনিটেই গোল করা রোমারিও ইবারা আরো একটা ভয়জাগানিয়া ক্রস করেছিলেন ওর্দোনেসের দিকে, আর্জেন্টিনার রক্ষণকেও দেখাচ্ছিল ছন্নছাড়া। কিন্তু ধূসর ক্যানভাসটা পলকেই রাঙিয়ে দিলেন মেসি! মাঝ মাঠের একটু সামনে থেকে নিজেই বল নিয়ে এগোলেন, আলতো করে পাস বাড়ালেন বক্সের ভেতর বাঁদিকে থাকা আনহেল দি মারিয়াকে। প্যারিস সেন্ত জার্মেইর এই উইঙ্গার মুহূর্তেই আবার বল আড়াআড়ি পাসে ঠেলে দেন মেসির পায়ে, ততক্ষণে ফুটবল জাদুকর চলে এসেছেন ডি বক্সের মাঝামাঝি। বুটের ডগার আলতো টোকায় বলটা জালে ঠেলে দেন মেসি, তাতেই নিশ্চুপ কিটোর ‘হলুদ’ সমুদ্র আর গ্যালারির একটা জায়গায় আকাশি নীলের ঢেউ! গোলের পর পোস্টের ভেতর থেকে মেসির বলটা কুড়িয়ে নিয়ে আসা থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, দিনটা জাদুকরেরই।

মিনিটখানেক পর মেসির একটা শট বাঁচিয়ে দেন গোলরক্ষক, তবে পরেরটা বাঁচানোর সাধ্য ছিল না তাঁর। প্রতিপক্ষের গোলপোস্টের প্রায় ৩০ গজ দূরে, দি মারিয়ার পাসটা পড়েছিল প্রতিপক্ষের পায়েই। বিপক্ষের খেলোয়াড়ের পা থেকেই বল কেড়ে নেন মেসি। ট্রেডমার্ক স্টাইলে বল নিয়ে বক্সের ভেতর ঢুকে বাঁ পায়ের জোরালো শটে পাঠিয়ে দেন স্বপ্নের ঠিকানায়! শুরুতেই গোল হজম করা আর্জেন্টিনা তাতে ম্যাচের ২০ মিনিটের ভেতর ২-১ গোলে এগিয়ে। প্রথমার্ধ শেষ হয় ২-১ গোলে। দ্বিতীয়ার্ধে, ম্যাচের ৬৮ মিনিটে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ম্যাচে আর্জেন্টিনার ও নিজের তৃতীয় গোলটা করে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন মেসি। মাঝ মাঠের একটু সামনে বল মেসির পায়ে, শুরুটা ছিল হালকা চালেই। হঠাৎ বল পায়ে দ্রুত বক্সের দিকে ছুটলেন মেসি, একদম ইকুয়েডরের রক্ষণের বুক চিরে। খানিকটা বাঁয়ে সরে আলতো চিপে বল পাঠিয়ে দিলেন জালে। তাতেই নিশ্চিত হয় আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ যাত্রা আর স্বপ্ন ভাঙে ইকুয়েডরের।

আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপে খেলতে পারবে কি না, এ নিয়ে সংশয় ছিল খোদ আর্জেন্টাইনদেরই। কিন্তু সব অনিশ্চয়তা মুছে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে তৃতীয় হয়ে সরাসরিই বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে আর্জেন্টিনা।

ওদিকে কনফেডারেশনস কাপে রাশিয়া ঘুরে এলেও বিশ্বকাপ খেলতে সেখানে যাওয়া হচ্ছে না চিলির। কোপা আমেরিকার সবশেষ দুই আসরের চ্যাম্পিয়ন চিলিকে ৩-০ গোলে হারিয়েছে ব্রাজিল। সাও পাওলোতে প্রথম গোলটা পাউলিনিয়োর, এরপর জোড়া গোল গাব্রিয়েল হেসুসের। ব্রাজিলের কাছে হেরে গিয়ে চিলি আটকে গেছে ২৬ পয়েন্টেই। লুই সুয়ারেসের জোড়া গোলের সঙ্গে এদিনসন কাভানি ও মার্তিন সেসেরেসের লক্ষ্যভেদে বলিভিয়াকে ৪-২ গোলে হারিয়ে দক্ষিণ আমেরিকা বাছাই অঞ্চলে দ্বিতীয় উরুগুয়ে। নিজ মাঠে কলম্বিয়ার সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করেছে পেরু, ৫৪ মিনিটে হামেস রোদ্রিগেসের করা গোল ৭৪ মিনিটে শোধ করে দেন পাওলো গেরেরো। তাতে ২৭ পয়েন্ট নিয়ে লাতিন আমেরিকা থেকে সরাসরি বিশ্বকাপের টিকিট পাওয়া শেষ দল কলম্বিয়া। ২৬ পয়েন্ট নিয়ে গোল গড়ে চিলির চেয়ে এগিয়ে থেকে পঞ্চম হওয়া পেরু প্লে-অফ খেলবে ওশানিয়ার চ্যাম্পিয়ন নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে। ফিফা, স্কাইস্পোর্টস


মন্তব্য