kalerkantho


ছাত্র প্রতিনিধি ছাড়াই ২৭ বছর

ঢাবি সিনেট পূর্ণাঙ্গ করতে ডাকসু নির্বাচনই চ্যালেঞ্জ

রফিকুল ইসলাম   

১২ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



ঢাবি সিনেট পূর্ণাঙ্গ করতে ডাকসু নির্বাচনই চ্যালেঞ্জ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণী সভা সিনেটে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতের প্রতিফলনে পাঁচজন নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধি রাখার বিধান রয়েছে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশে। তবে গত ২৭ বছর ছাত্র প্রতিনিধি ছাড়াই সিনেট সভা আয়োজনের মাধ্যমে নতুন উপাচার্য মনোনীত হয়েছেন।

সর্বশেষ গত ২৯ জুলাই সিনেটের মাত্র ৪৭ সদস্যের উপস্থিতিতে তিন সদস্যের উপাচার্য প্যানেল মনোনীত করা হয়। সিনেটের ওই সদস্যদের মধ্যে ছাত্র প্রতিনিধি ও রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধি ছিলেন না।

পরে এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে এই উপাচার্য প্যানেলকে অবৈধ ঘোষণা করে আগামী ছয় মাসের মধ্যে যথাযথভাবে সিনেট গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন উচ্চ আদালত।

আদালতের ওই নির্দেশের পর ছাত্র প্রতিনিধি পেতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। এবার তাহলে কি ডাকসু নির্বাচন না করে উপায় নেই?

প্রশাসনিক ভবন সূত্রে জানা গেছে, সিনেটে ১০৫ জন সদস্য থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে রয়েছেন ৫৫ সদস্য। উপাচার্য, দুই উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান ছাড়া বাকিরা হলেন সরকার মনোনীত পাঁচজন সরকারি কর্মকর্তা, আচার্য মনোনীত পাঁচজন শিক্ষাবিদ, স্পিকার মনোনীত পাঁচজন এবং ৩৫ জন শিক্ষক প্রতিনিধি। তবে গবেষণা সংস্থার পাঁচজন, একাডেমিক পরিষদ কর্তৃক অধিভুক্ত ও উপাদানকল্প কলেজগুলোর অধ্যক্ষ পাঁচজন ও শিক্ষক ১০ জন, রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধি ২৫ জন এবং ছাত্র প্রতিনিধি পাঁচজন—মোট ৫০টি সদস্য পদই এখন শূন্য।

সে ক্ষেত্রে আদালতের দেওয়া ছয় মাস সময়ের মধ্যে অন্য পদগুলো পূরণ সম্ভব হলেও ডাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে ছাত্র প্রতিনিধি নির্বাচনই হবে মূল চ্যালেঞ্জ।

ক্যাম্পাস সূত্রগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছে, ক্ষমতাসীন কিংবা বিরোধীদলীয় ছাত্রসংগঠন ডাকসু নির্বাচনে অংশগ্রহণের কথা বললেও কার্যত ফলপ্রসূ হবে না। ডাকসু নির্বাচনে অংশ নিতে হলে নিয়মিত ছাত্র হতেই হবে—এমন বাধ্যবাধকতায় শুরুতেই বাদ পড়বেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতারা।

আবার বিএনপির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের শীর্ষ নেতাদের বেশির ভাগের বয়স চল্লিশোর্ধ্ব; যাঁদের ছাত্রজীবন শেষ হয়েছে অনেক আগেই। তবে ছাত্রদল বলে আসছে, ক্যাম্পাসে স্থিতিশীল ও সহাবস্থান নিশ্চিত হলে ডাকসু নির্বাচনে তারা অংশ নেবে।

সক্রিয় বাম ছাত্র সংগঠনগুলো নিয়মতান্ত্রিক ও গঠনতন্ত্রের ধারায় পরিচালিত হলেও সদস্য ও কর্মী কম হওয়ায় নির্বাচন হওয়া না হওয়াতে তারা বড় কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না। তবে তারাও নির্বাচন হলে অংশ নেওয়ার কথা বলছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ-১৯৭৩-এ  বিশ্ববিদ্যালয়সংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্তে সবার মতের সম্মিলন রাখা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা, সংসদ সদস্য, শিক্ষাবিদ, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধি, শিক্ষক প্রতিনিধি ও ছাত্র প্রতিনিধির অংশগ্রহণের বিধান রাখা হয়। নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধি কিংবা কোনো ছাত্র প্রতিনিধি ছাড়াই ২৭ বছর সিনেট বসেছে। ছাত্র প্রতিনিধি পেতে ডাকসু নির্বাচনের বিষয়ে জোরালো কোনো উদ্যোগ এত দিন চোখে পড়েনি। দু-একবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিরোধী ছাত্র সংগঠনের বিরোধিতায় আর সামনে এগোয়নি।

সূত্র জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ নির্বাচন কেবল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে জাতীয় রাজনীতি ও সরকারের ইচ্ছাও জড়িত। যে সরকার ক্ষমতায় আসে তারাই ছাত্ররাজনীতিতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সে কারণে ক্ষমতাসীনদের অনাগ্রহে উপাচার্যও নির্বাচনের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রগুলো বলছে, ছাত্র আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠার ভয়ে সরকার ও প্রশাসন ছাত্রসংসদ নির্বাচন দিতে অপারগতা প্রকাশ করছে। আবার ছাত্রসংসদ নির্বাচনে আরেকটি বড় বাধা নিয়মিত ছাত্র থাকার বাধ্যবাধকতা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্বে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা নিয়মিত শিক্ষার্থী। কিন্তু বর্তমান ছাত্রনেতাদের বড় অংশই নিয়মিত ছাত্র নন। নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম শেষে কেউ কেউ অন্য কোনো বিভাগে মাস্টার্স কিংবা এমফিলে ভর্তি হয়ে আছেন। কাজেই ছাত্রসংসদ নির্বাচন দিলে বর্তমান সময়ের নেতারা নেতৃত্বে আসতে পারবেন না। সেই দিক থেকে মুখে নির্বাচনের কথা বললেও বিরোধিতা করবে—এমন শঙ্কা প্রশাসনের।

বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশের ২০(১) ধারা অনুযায়ী, সিনেটের সদস্য হবেন ১০৫ জন। ২৫ সদস্যের উপস্থিতিতে কোরাম পূর্ণ হয়। সে ক্ষেত্রে অর্ধেক কিংবা একটু বেশি সদস্য হলেই সিনেট বসেছে। সর্বশেষ সিনেট সভা হলো গত ২৯ জুলাই।

এর আগে ২০১৩ সালের ২৪ আগস্ট অর্ধেক সদস্য নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট বসে। যদিও তার এক মাস পরেই রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সময় শিক্ষকরা সিনেটের নির্বাচন পেছানোর অনুরোধ করলেও শোনেননি তখনকার উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।

রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধিদের মেয়াদ তিন বছর। সে হিসাবে নির্বাচিত রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধিদের মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৬ সালে। তবে অনুকূল পরিস্থিতিতেও রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধি নির্বাচন না দিয়ে আবারও বিশেষ সিনেটে সভার মাধ্যমে উপাচার্য প্যানেল মনোনয়ন করায় ক্ষুব্ধ হন রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট প্রতিনিধিরা। পরে তাঁরা আদালতের দ্বারস্থ হন। প্রথম দফায় বিশেষ সভার ওপর স্থগিতাদেশ দিলেও পরে সভা করার অনুমতি পায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সভায় উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন করা হলেও সেখান থেকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ না দিয়ে প্যানেলের বাইরে থেকে উপাচার্য নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি ও আচার্য আবদুল হামিদ।

ডাকসুর উদ্যোগ নিলেও বাস্তবায়ন হয়নি : ১৯৯৪ সালে তৎকালীন উপাচার্য ড. এমাজউদ্দীন আহমদ ডাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করলে ছাত্রদল অংশ নেওয়ার সম্মতি দেয়। কিন্তু নির্বাচনের পরিবেশ নেই—ছাত্রলীগ এমন অভিযোগ করলে তা স্থগিত করা হয়।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে নতুন উপাচার্য এ কে আজাদ চৌধুরী অন্তত ছয়বার ডাকসু নির্বাচনের উদ্যোগ নেন। কিন্তু ছাত্রলীগ-ছাত্রদল দুই পক্ষই বিরোধী অবস্থান নেয়। পরে ২০০৫ সালে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। কিন্তু ছাত্রলীগ বিরোধিতা করে।

ডাকসু নিয়ে বর্তমান কর্তৃপক্ষ : উচ্চ আদালতের রায়ের পর পূর্ণাঙ্গ সিনেট গঠনে ডাকসু নির্বাচন প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রায় হাতে পাওয়ার পর আদালতের নির্দেশানুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনি কাঠামো অনুসরণ করে যা করার তা করব।’

যথাযথ সিনেট গঠনে পাঁচজন ডাকসু সদস্য রাখতে হবে; এই ছয় মাসে সেটা সম্ভাব—এ প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের সক্ষমতা ও আদালতের রায় অনুযায়ী সব কিছুই করা হবে।’

ছাত্রসংগঠনগুলো যা বলছে : ছাত্রলীগ সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা ছাত্রসংসদ চাই। নির্বাচন আয়োজন করলে ছাত্রলীগ প্রস্তুত। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যে সিদ্ধান্ত নেবে সেই সিদ্ধান্তেই নির্বাচনে যাবে ছাত্রলীগ।’

ছাত্রদল সভাপতি রাজীব আহসান সম্প্রতি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সব সময়ই ছাত্রসংসদ নির্বাচনের পক্ষে। তবে নির্বাচনের আগে ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক অধিকার ও সহাবস্থান দিতে হবে। নিয়মিত নির্বাচন না হওয়ায় ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির পথ বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে ছাত্র রাজনীতি ও ছাত্র নেতৃত্বের মান নিয়েও অনেক সময় প্রশ্ন উঠেছে।’ তবে নিয়মিত নির্বাচন হলে ছাত্র রাজনীতি ও নেতৃত্বের মান বহুগুণে বেড়ে যাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।


মন্তব্য