kalerkantho


নতুনের পদধ্বনি বড় দুই দলেই

লিমন বাসার, বগুড়া   

১২ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



নতুনের পদধ্বনি বড় দুই দলেই

সারিয়াকান্দি ও সোনাতলা উপজেলা নিয়ে গঠিত বগুড়া-১ আসনটি সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে সব দলের জন্যই চ্যালেঞ্জিং। এলাকাটি চলতি বছরও দুই দফা বন্যায় বিপর্যস্ত হয়েছে।

দুর্যোগকালীন এ পরিস্থিতিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়েই শুরু হয় এখানকার আগাম নির্বাচনী প্রচার। দুর্গত মানুষের সেবা করে তাদের সমর্থন আদায়ের জন্য ব্যাপক তৎপরতা দেখান আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা।

পরপর দুইবার আওয়ামী লীগের হাতে থাকা জাতীয় সংসদের ৩৬ নম্বর আসনটি আগামী নির্বাচনে দলটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর কারণ দলীয় কোন্দল। সে জন্য মনোনয়ন দৌড়ে বর্তমান সংসদ সদস্যের সঙ্গে দেখা যেতে পারে নতুন এক নেতাকে। অন্যদিকে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে আলোচনায় আছেন অন্তত সাতজন।

বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত এ জেলার সাতটি আসনের সবই নিজেদের কবজায় নেওয়া আওয়ামী লীগের লক্ষ্য। অন্যদিকে সব আসন পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ বিএনপির সামনে, কারণ দলটি এখন সংসদের বাইরে।

এরই মধ্যে ভোটারদের মুখে মুখে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম ও নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে।

সম্ভাব্য প্রার্থীদের কেউ কেউ এলাকায় পোস্টার, লিফলেট, ফেস্টুন ও ব্যানার টানিয়ে এলাকাবাসীর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন। আবার গণসংযোগ, সভা-সমাবেশ, মতবিনিময়ও করছেন।

বগুড়া-১ আসনে মোট ভোটার তিন লাখ আট হাজার ৯০২ জন। এর মধ্যে সারিয়াকান্দি উপজেলার ভোটার সংখ্যা এক লাখ ৬৭ হাজার ৭৮২ এবং সোনাতলা উপজেলার ভোটার সংখ্যা এক লাখ ৪১ হাজার ১২০।

২০০৮ সালে এই সংসদীয় আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) মনোনীত প্রার্থী শোকরানাকে প্রায় সাত হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে সংসদ সদস্য হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আব্দুল মান্নান। এর আগে ২০০১ সালে এখানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বিএনপি প্রার্থী কাজী রফিকুল ইসলাম। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করেন দলটির প্রার্থী ডা. হাবিবুর রহমান। কিন্তু নবম ও দশম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আব্দুল মান্নান জয়লাভ করায় এ নির্বাচনী এলাকার বর্তমান প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে।

আওয়ামী লীগ : আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে আবারও প্রার্থী হতে পারেন বর্তমান সংসদ সদস্য আব্দুল মান্নান। দলটির সাবেক এই সাংগঠনিক সম্পাদকের মনোনয়ন নিশ্চিত বলেই প্রচার চালাচ্ছে তাঁর অনুসারীরা। তবে দলে বিভক্তির কারণে আগামী নির্বাচনে নৌকার মাঝি হওয়ার আগ্রহ নিয়ে মাঠে আছেন তরুণ আরেক নেতা। তিনি সারিয়াকান্দি পৌরসভার মেয়র আলমগীর শাহী সুমন। তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক।

ছাত্ররাজনীতি থেকে উঠে আসা শাহী সুমন একসময় আব্দুল মান্নানের ব্যক্তিগত সহকারী (এপিএস) ছিলেন। মাঠপর্যায়ে তাঁর সমর্থকের সংখ্যাও বিশাল।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চ্যালেঞ্জিং এ আসনে এখন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ দলীয় কোন্দলে নানা ভাগে বিভক্ত। দলের তরুণ ও উদ্যমী নেতা পৌর মেয়র আলমগীর শাহী সুমনকে দলের উপজেলা সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি তাঁর ওপর হামলা-নির্যাতনের প্রভাব এখনো নেতাকর্মীদের মধ্যে স্পষ্ট। এ ছাড়া বর্তমান সংসদ সদস্য আব্দুল মান্নানের স্ত্রী সারিয়াকান্দি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাহাদারা মান্নান, তাঁর ভাই ও আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে সীমাহীন দুর্নীতি ও জুলুম-নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে।

বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা এসব অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেছেন, সারিয়াকান্দি ও সোনাতলার মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের ক্ষোভ ও অভিযোগ দলের হাইকমান্ডে জানানো হয়েছে। তারাই বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বর্তমান সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, তিনি উপজেলা কমিটিসহ বিভিন্ন পদে ও প্রতিষ্ঠানে একচেটিয়া তাঁর পরিবারের সদস্যদের স্থান করে দিয়েছেন। তাতে দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝে চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এবার প্রার্থী নির্বাচনে দলীয় নেতৃত্ব এসব ভুলে গেলে তার প্রভাব নির্বাচনে পড়তে পারে।

সাধারণ ভোটারদের মতে, সংসদ সদস্য মান্নান ভালো হলেও তাঁর স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের অপকর্মের ব্যাপারে নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেও তাঁর কাছে কোনো প্রতিকার পায়নি। এ কারণে এবার তারা নতুনের পক্ষে। এলাকার উন্নয়নের পক্ষে।

এবারই প্রথম মনোনয়ন দৌড়ে বর্তমান সংসদ সদস্য ছাড়াও প্রতিপক্ষ হিসেবে মাঠে নেমেছেন আলমগীর শাহী সুমন। দলীয় মনোনয়ন পেলে নৌকার বিশাল জয় আওয়ামী লীগের ঘরে উঠবে বলে মনে করেন তিনি। সুমন বলেন, বিভক্ত আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করছেন তিনি। এটা হাইকমান্ড জানে।

পৌর মেয়র আলমগীর শাহী সুমন অভিযোগ করে বলেন, ‘এমপির আত্মীয়-স্বজনের সন্ত্রাসী ও স্বজনপ্রীতি এবং লুটপাটের কারণে দলের অস্তিত্ব এখন বিলীন হওয়ার পথে। ’

সুমন মনে করেন, তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হলে মাঠের নেতাকর্মীসহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা খুশি হবেন। কারণ তাঁরা এখন ‘পারিবারিক শোষণ’ থেকে মুক্তি পেতে চান। তিনি আশা করছেন, দলের হাইকমান্ড তাঁকেই মনোনয়ন দেবে। কারণ মেয়র হিসেবে বর্তমানে তিনি জনসেবা করছেন। আগামী দিনে আরো বড় পরিসরে জনগণের সেবা করতে চান বলেই মনোনয়ন চাইছেন।

অন্যদিকে সংসদ সদস্য আব্দুল মান্নান বলেন, তাঁর নির্বাচনী এলাকা  সোনাতলা-সারিয়াকান্দি এখন বাংলাদেশের মধ্যে উন্নয়নের রোল মডেল। আওয়ামী লীগ সরকারের দুই  মেয়াদের শাসন আমলে যে উন্নয়ন হয়েছে তা চোখে পড়ার মতো। এর আগে এলাকার মানুষ এত উন্নয়ন দেখেনি। তিনি জানান, এলাকায় প্রায় আট বছরে এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নদীভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়া চলতি বছরের মধ্যে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া, এলাকার রাস্তাঘাট কার্পেটিং করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ ও উন্নয়ন করা হচ্ছে।

বিএনপি : বগুড়া-১ আসনে আবারও কর্তৃত্ব ফিরে পেতে আগামী নির্বাচন ঘিরে তৎপর হয়ে উঠেছেন বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী একাধিক নেতা। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন জেলা ঢাকাস্থ বগুড়া জেলা জাতীয়তাবাদী ফোরামের সভাপতি ও জিয়া শিশু-কিশোর কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোশারফ  হোসেন চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য কাজী রফিকুল ইসলাম, মো. শোকরানা, এ কে এম আহসানুল তৈয়ব জাকির। সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় আরো যাঁদের নাম শোনা যাচ্ছে তাঁরা হলেন সারিয়াকান্দি উপজেলা চেয়ারম্যান মাসুদুর রহমান হিরু মণ্ডল, মহিদুল ইসলাম রিপন, লুত্ফুল বারী মুকুল।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপির সম্ভাব্য কোনো প্রার্থীকে এলাকায় সভা-সমাবেশ, এমনকি মতবিনিময় সভা পর্যন্ত করতে দেখা যায়নি। সাংগঠনিকভাবে ভেঙে পড়া দলকে নতুনভাবে চাঙ্গা করাসহ মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন মোশারফ হোসেন চৌধুরী। বগুড়া জেলা বিএনপির শিশুবিষয়ক সম্পাদক মোশারফ হোসেন এলাকায় বন্যাকবলিত মানুষের মাঝে একাধিকবার ত্রাণ বিতরণ করে  ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন মামলা-হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মীদের আর্থিক সহযোগিতা এবং তাদের মামলা  দেখাশোনা করছেন। এলাকায় বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড করেও সহযোগিতা করছেন।

বিএনপির এই নেতা বলেন, মনোনয়ন  পেলে এলাকার উন্নয়নে কাজ করবেন এবং বেকার সমস্যা দূর করার চেষ্টা করবেন।

সাধারণ ভোটারদের মতে, ভোটে জিতে সবাই নিজ এলাকার কথা ভুলে যায়। এমনটি না করলে মোশারফ ভালো করবেন।

বিএনপির একাধিক নেতার ভাষ্য মতে, জামায়াত ও বিএনপি জোটগতভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে এবং সুষ্ঠু নির্বাচন হলে কোনো প্রতিবন্ধকতাই বিএনপির বিজয় ঠেকাতে পারবে না।

জাতীয় পার্টি : আগামী সংসদ নির্বাচনে এ আসনটি দখল করতে চায় সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি। দলটির তেমন সক্রিয় অবস্থান না থাকলেও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মোকছেদুল আলম মাস্টার এলাকায় অবস্থান তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বিভিন্ন স্থানে লাঙ্গল প্রতীকে ভোট চেয়ে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। দলের কেন্দ্রীয় কমিটির আরেক সদস্য জি এম বাবু মণ্ডলও দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী।


মন্তব্য