kalerkantho


খালেদার বিরুদ্ধে আরো দুই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

একটি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা, অন্যটি মানহানির মামলা

আশরাফ-উল-আলম   

১৩ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



খালেদার বিরুদ্ধে আরো দুই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গতকাল বৃহস্পতিবার আরো দুই মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন ঢাকার দুটি আদালত। এর আগে নাশকতা, বাসে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা ও সহিংসতার একটি মামলায় গত ৯ অক্টোবর সোমবার কুমিল্লায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।

ফলে গত চার দিনে তাঁর বিরুদ্ধে তিনটি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলো।

গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের মানচিত্র ও জাতীয় পতাকাকে অপমান করার মামলায় খালেদার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এরপর সকাল সাড়ে ১১টার দিকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন বিশেষ জজ আদালত-৫-এর বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান। এ মামলার দুই আসামি কাজী সালিমুল হক কামাল ও শরফুদ্দিন আহমেদের জামিন বাতিল করে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়।

উভয় মামলায় দীর্ঘদিন হাজির না হওয়ায় সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পরোয়ানা জারির পর ওই মামলার বাদী এ বি সিদ্দিক কালের কণ্ঠকে জানান, খালেদা জিয়া সমন জারির পরও দীর্ঘদিন হাজির হননি। আর  জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসনের আইনজীবী জিয়াউদ্দিন জিয়া জানান, খালেদা জিয়ার পক্ষে সময়ের আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু আদালত তা নামঞ্জুর করে পরোয়ানা জারি করেছেন।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা : গতকাল জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থনের দিন ধার্য ছিল।

এই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয় গত বছর। খালেদা জিয়া একদিন আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য দেন। এরপর থেকে তিনি বারবার সময় নেন। গত ১৫ জুলাই থেকে খালেদা জিয়া এই মামলায় অনুপস্থিত। তিনি চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে থাকায় আদালতে হাজির হতে পারেননি বলে তাঁর আইনজীবীরা জানান।

গত ২০ জুলাই দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) বিশেষ পিপি মোশাররফ হোসেন কাজল এ মামলাসহ একই আদালতে বিচারাধীন জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায়ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করেন। জামিন বাতিলের আবেদনে ওই সময় বলা হয়, গুরুত্বপূর্ণ এই মামলার আসামি হয়েও তিনি (খালেদা জিয়া) বিদেশ গিয়েছেন আদালতের অনুমতি ছাড়া। আদালত তখন অবশ্য এই আবেদনের ওপর কোনো আদেশ দেননি।

গতকাল শুনানির সময় দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল আদালতকে বলেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। এখন এটির নিষ্পত্তি হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন অনুপস্থিত। তিনি বিচার বিলম্বিত করার জন্য কালক্ষেপণ করছেন। তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে মামলা এগিয়ে নেওয়া হোক। খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা সময়ের আবেদন করে বলেন, তিনি চিকিৎসার জন্য বিদেশে আছেন। তাঁকে সময় দেওয়া হোক। দেশে এসে সব সময়ই হাজির থাকবেন। আদালত সময়ের আবেদন নাকচ এবং আত্মপক্ষ সমর্থন পর্ব বাতিল করে যুক্তিতর্ক শুনানির দিন ধার্য করেন। ১৯ অক্টোবর এ শুনানি হবে। দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল বলেন, মামলার পরবর্তী শুনানির দিন খালেদা জিয়া হাজির না হলে মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন হবে এবং রায়ের দিন ধার্য হয়ে যাবে।

এ মামলায় অন্তর্বর্তীকালীন জামিনে থাকা দুই আসামি কাজী সালিমুল হক কামাল ওরফে ইকোনো কামাল ও শরফুদ্দিন আহমেদের জামিন স্থায়ী করার আবেদন আদালত নামঞ্জুর করে তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানও আসামি। তিনিও পলাতক। তাঁর বিরুদ্ধে আগে থেকেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রয়েছে। এ মামলার অন্য দুই আসামি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী, জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মোমিনুর রহমানও মামলার শুরু থেকে পলাতক। তাঁদের অনুপস্থিতিতেই বিচার চলছে।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার অভিযোগ থেকে জানা যায়, ট্রাস্টের দুই কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের দায়ে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় মামলা করে দুদক। ২০১০ সালের ৫ আগস্ট খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন দুদকের উপপরিচালক হারুন-আর-রশীদ। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ এ মামলায় অভিযোগ গঠন করা হয়।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা : একই আদালতে বিচারাধীন জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দুদকের সাক্ষী নুর আহমদের সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। গতকাল তাঁকে আসামিপক্ষের জেরার দিন ধার্য ছিল। কিন্তু আগের ধার্য তারিখে সাক্ষ্যগ্রহণ চলাকালে প্রবীণ আইনজীবী টি এম আকবর মারা যান। নতুন আইনজীবী নিয়োগ করার জন্য সময়ের আবেদন জানালে আদালত সাক্ষ্যগ্রহণ স্থগিত করে ১৯ অক্টোবর দিন ধার্য করে।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায়ও খালেদা জিয়া প্রধান আসামি। তাঁর সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীও (পলাতক) আসামি। হারিছের তখনকার সহকারী একান্ত সচিব ও বিআইডাব্লিউটিএর নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খানও এ মামলার আসামি।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, অবৈধভাবে তিন কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগে খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে ২০১০ সালের ৮ আগস্ট তেজগাঁও থানায় মামলা করে দুদক।

২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপপরিচালক হারুন-আর-রশীদ খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন। ২০১৪ সালের ১৯ মার্চ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।

মানহানি মামলায় পরোয়ানা : মুক্তিযুদ্ধকে কলঙ্কিত এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জাতীয় পতাকাকে অপমান করার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় বারবার সমন দেওয়ার পরও খালেদা জিয়া হাজির না হওয়ায় গতকাল তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। সকালেই মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. নুর নবীর আদালতে মামলাটি উপস্থাপন করা হলে বাদীর উপস্থিতিতে তিনি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন। একই সঙ্গে আগামী ১২ নভেম্বর পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়।

এর আগে গত ১৭ সেপ্টেম্বর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. নুর নবী আদেশে বলেছিলেন, ‘৫ অক্টোবর (গতকাল) আত্মসমর্পণ না করলে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হবে। ’ কিন্তু ৫ অক্টোবরও হাজির না হওয়ায় আদালত গতকাল দিন ধার্য করেন।

আদালত আদেশে বলেন, ‘বারবার সমন দেওয়া সত্ত্বেও আসামি হাজির হননি। শেষবারের মতো সময় দেওয়া হলেও তিনি আসেননি। এমনকি আদালতকে তাঁর পক্ষ থেকে কিছু জানানো হয়নি। এ কারণে আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হলো। ’

২০১৬ সালের ৩ নভেম্বর সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এ মামলাটি করেন জননেত্রী পরিষদের সভাপতি এ বি সিদ্দিকী। মামলায় জিয়াউর রহমানের মরণোত্তর বিচার দাবি করা হয়। মামলাটি গ্রহণ করে আদালত তেজগাঁও থানাকে ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্তে খালেদার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় বলে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন দেন তদন্ত কর্মকর্তা।

গত ২২ মার্চে এ মামলায় খালেদা জিয়াকে হাজির হতে সমন জারি করেন আদালত। এরপর কয়েকটি ধার্য তারিখ পেরিয়ে গেলেও তিনি হাজির হননি।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করেন। ১৯৮১ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এলে জিয়াউর রহমান তাঁকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেন। এ ছাড়া জিয়া ও খালেদা জিয়া দুজনই যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসন করেন। খালেদা জিয়া জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করে ক্ষমতায় এসে রাজাকারদের মন্ত্রিত্ব দেন। তাঁদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা উড়ানোর সুযোগ দিয়ে জাতীয় পতাকাকে অপমানিত করা হয়। সেই সঙ্গে দেশের স্বাধীনতাকে অপমান করা হয়।

 


মন্তব্য