kalerkantho


মিয়ানমারের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক বাতিলের পথে ইইউ

নিরাপত্তা পরিষদে আনান কমিশনের বক্তব্য আজ

কূটনৈতিক প্রতিবেদক   

১৩ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



মিয়ানমারের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক বাতিলের পথে ইইউ

রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের সদস্যদের ওপর গণহত্যা চালানোর পরিপ্রেক্ষিতে মিয়ানমারের ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থগিত করতে যাচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। আগামী সোমবার ব্রাসেলসে ইইউর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

বৈঠকের প্রাক্কালে এ সংক্রান্ত একটি সমঝোতার কপি বার্তা সংস্থা এএফপি দেখেছে বলে দাবি করেছে। সমঝোতাপত্রটি এরই মধ্যে ব্রাসেলসে ইইউর সদস্য দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতরা অনুমোদন করেছেন। আগামী সোমবারের বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সই করার মধ্য দিয়ে ওই সমঝোতাটিই চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।

এএফপি জানায়, ইউরোপীয় ২৮টি দেশের জোট ইইউ ওই সমঝোতায় মিয়ানমারকে সতর্ক করে বলেছে, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে তারা ওই দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথাও বিবেচনা করবে। গত ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা ও উচ্ছেদ শুরু করার পর থেকে পাঁচ লাখ ৩৬ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এত বিপুলসংখ্যক মানুষের বাস্তুচ্যুতি ও দেশত্যাগকে ‘দেশ থেকে সংখ্যালঘুদের বহিষ্কারের উদ্দেশ্যপূর্ণ উদ্যোগের’ ইঙ্গিত হিসেবে সমঝোতায় উল্লেখ করা হয়েছে।

সমঝোতায় মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীগুলোকে অবিলম্বে হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে ইইউ বলেছে, নিরাপত্তা বাহিনীর মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগের পরিপ্রেক্ষিতে ইইউ এবং এর সদস্য রাষ্ট্রগুলো মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ও জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ স্থগিত করবে এবং সব ধরনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা পর্যালোচনা করবে।

কোনো দেশে ‘অভ্যন্তরীণ নিপীড়নের’ ক্ষেত্রে ইইউ অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে থাকে। সমঝোতায় বলা হয়েছে, সংকটের সমাধানের পথে অগ্রগতি না হলে ইইউ আরো বেশ কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বিবেচনা করতে পারে।

জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ গত মাসে মিয়ানমার বাহিনীর অভিযানকে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞের পাঠ্যপুস্তকের উদাহরণ’ হিসেবে অভিহিত করেছে। ইইউ সদস্য ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ গত মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বক্তৃতায় রোহিঙ্গা নিধন ও দমনকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে ইইউর বিদায়ী সদস্য যুক্তরাজ্য এরই মধ্যে এককভাবেই মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সব ধরনের সম্পৃক্ততা বন্ধ করে দিয়েছে। গত বুধবার লন্ডনে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের উভয় কক্ষেই মিয়ানমারের রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশের কক্সবাজারে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির পরিদর্শন করে যাওয়া ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্য উইল রোহিঙ্গা পরিস্থিতিকে মানবিক বিপর্যয় হিসেবে উল্লেখ করেন। কমন্সসভায় তিনি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মের কাছে জানতে চান, রোহিঙ্গারা যাতে নিজেদের দেশে ফিরে যেতে পারে সে জন্য নিপীড়ন বন্ধ করতে মিয়ানমার সরকারের ওপর কিভাবে চাপ প্রয়োগ করা যায়।

জবাবে বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে বলেন, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে যা হচ্ছে তা নিয়ে যুক্তরাজ্য অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। পাঁচ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা এরই মধ্যে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এটি একটি বড় মানবিক বিপর্যয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের যুক্তরাজ্য দ্বিপক্ষীয় অনুদান এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন ও ত্রাণ সংস্থাগুলোর মাধ্যমে সহায়তা দিচ্ছে। এ ছাড়া মিয়ানমারের রেডক্রসকেও যুক্তরাজ্য অর্থ দিয়েছে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে আমরা বিষয়টি তিনবার তুলেছি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। আর সেটি হলো বার্মা (মিয়ানমার) কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই সহিংসতা বন্ধ, শরণার্থীদের (রোহিঙ্গা) নিরাপদে ফিরে যাওয়ার সুযোগ এবং মানবিক সহায়তা দেওয়ার পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে। ’ তিনি বলেন, ‘বার্মার (মিয়ানমার) সঙ্গে আমাদের যে ধরনের ব্যবহারিক প্রতিরক্ষা সম্পৃক্ততা ছিল; উদ্বেগের কারণে আমরা সেগুলোর সব স্থগিত করেছি। ’

জাতিসংঘের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞাও যুক্তরাজ্যের বিবেচনায় : ব্রিটিশ লর্ডসভায়ও গত বুধবার রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশদ আলোচনা হয়। রোহিঙ্গাদের রক্ষায় ব্রিটিশ সরকার কী উদ্যোগ নিচ্ছে সে বিষয়ে প্রশ্ন ওঠে। জবাবে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী লর্ড আহমাদ বলেন, ‘রাখাইন রাজ্যের ঘটনাবলি নিয়ে আমরা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। ব্রিটিশ সরকার সহিংসতা বন্ধ, মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা এবং বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগে নেতৃত্ব দিয়েছে। ’ তিনি বলেন, আনান কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আসবে বলে যুক্তরাজ্য বিশ্বাস করে। ওই সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে মিয়ানমার সরকারকে সহায়তা করতে যুক্তরাজ্য তার সমমনাদের নিয়ে কাজ করছে।  

হলিহেডের ব্যারোনেস কিনক মিয়ানমারে রাখাইনদের হত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ, সীমান্তে স্থলমাইন মোতায়েনসহ পরিস্থিতি তুলে ধরে জানতে চান, ব্রিটিশ সরকার মিয়ানমার বাহিনীর গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রমাণগুলো আমলে নেবে কি না এবং মিয়ানমারের ওপর জাতিসংঘের মাধ্যমে অস্ত্র ও অন্যান্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের উদ্যোগ নেবে কি না।

জবাবে ব্রিটিশ প্রতিমন্ত্রী লর্ড আহমাদ বলেন, মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগের নেপথ্যে সামরিক বাহিনীর বর্বরতা ও নির্মমতাকে যুক্তরাজ্য আমলে নেয়। যুক্তরাজ্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে এ ইস্যুতে উন্মুক্ত আলোচনা আয়োজনে নেতৃত্ব দিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলবিষয়ক মন্ত্রী—উভয়ের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য অন্যদের সঙ্গে ব্যাপক যোগাযোগ রাখছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গেও যুক্তরাজ্য সরাসরি কথা বলছে। গত শুক্রবার তিনি নিজে লন্ডনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। ব্যারোনেস কিনক যেসব বিষয় তুলেছেন সেগুলোর সবই যুক্তরাজ্যের বিবেচনায় আছে।

লর্ড আহমাদ বলেন, ‘আমরা কোনো অবস্থায়ই বার্মার (মিয়ানমারের) সামরিক বাহিনীর কাছে কোনো অস্ত্র বিক্রি করব না। আমাদের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। রোহিঙ্গাদের প্রতি নিষ্ঠুর ও নির্মম আচরণের জন্য মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীই দায়ী। ’ তিনি বলেন, ‘আমরা মানবাধিকারের মতো বিষয়ে শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে মিয়ানমারকে কিছু সামরিক প্রশিক্ষণ দিতাম। সেগুলোও স্থগিত করা হয়েছে। ’

মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির নীরবতা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে লর্ড আহমাদ বলেন, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাতে সু চির নৈতিক সাহস কাজে লাগানোর সময় এসেছে।

নিরাপত্তা পরিষদকে আজ ব্রিফ করবে আনান কমিশন : রাখাইন পরিস্থিতি উন্নয়নে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে মিয়ানমার সরকার যে কমিশন গঠন করেছিল আজ শুক্রবার নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সেই কমিশনের বক্তব্য শুনবে নিরাপত্তা পরিষদ। কূটনীতিকদের বরাত দিয়ে চ্যানেল নিউজ এশিয়া অনলাইন এক প্রতিবেদনে বলেছে, আনান কমিশন গত আগস্ট মাসে যেসব সুপারিশ মিয়ানমার সরকারকে দিয়েছিল সেগুলোই বিশদ আকারে আজ নিরাপত্তা পরিষদকে অবহিত করবে। এ ছাড়া বর্তমান পরিস্থিতিতে ওই কমিশন মতামতও দিতে পারে।

এদিকে জাতিসংঘের রাজনীতিবিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তা জেফরি ফেল্টম্যান আজ চার দিনের মিয়ানমার সফর শুরু করছেন। জাতিসংঘের এক কর্মকর্তা বলেছেন, রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ে জেফরি ফেল্টম্যান মিয়ানমারে আলোচনা করবেন।

মালয়েশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী আসছেন পরশু : মালয়েশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী আহমেদ জাহিদ হামিদি সংক্ষিপ্ত সফরে আগামী পরশু রবিবার ঢাকায় আসছেন। কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করে পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখাই তাঁর এ সফরের লক্ষ্য। কক্সবাজার থেকে ফিরে ঢাকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে তাঁর বৈঠক করার কথা।

মিয়ানমারে শান্তির আহ্বান জানাবেন পোপ : ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের প্রধান ধর্মগুরু পোপ ফ্র্যান্সিস আগামী ২৭ থেকে ৩০ নভেম্বর মিয়ানমার সফরকালে শান্তির আহ্বান জানাবেন। তবে মিয়ানমারে অবস্থানকালে তিনি রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি তুলবেন কি না তা স্পষ্ট নয়।

মিয়ানমারের ক্যাথলিক বিশপদের সম্মেলনের মুখপাত্র ফাদার মারিয়ানো সোয়ে নেইং বলেছেন, পোপের বক্তব্য ঠিক কী হবে তা তাঁরা জানেন না। তবে তিনি মিয়ানমারের জন্য আসছেন এবং শান্তির কথা বলবেন। ফাদার মারিয়ানো আরো বলেন, পোপের মিয়ানমার সফরসূচিতে কোনো আন্তধর্মীয় বৈঠক নেই। তবে তিনি প্রধান বৌদ্ধ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করবেন। রাখাইন রাজ্যে যাওয়ার কোনো কর্মসূচি পোপের নেই।

 


মন্তব্য