kalerkantho


বন্ধুত্বের আসল রূপ প্রকাশ রোহিঙ্গায়!

বৈশ্বিক চাপ সৃষ্টির প্রচেষ্টাতেই ভরসা রাখছে ঢাকা

মেহেদী হাসান   

২১ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০



বন্ধুত্বের আসল রূপ প্রকাশ রোহিঙ্গায়!

ফাইল ছবি

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মাধ্যমে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টিকেই রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের অন্যতম টেকসই পথ হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ। কিন্তু সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে বন্ধু রাষ্ট্র ও কৌশলগত মিত্র হিসেবে পরিচিত দেশগুলোর প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে বেগ পেতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।

বিশেষ করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য চীন ও রাশিয়া দৃশ্যত এখনো মিয়ানমারের ওপর চাপ বাড়ানোর পক্ষে নয়। যদিও গত বছর অক্টোবর মাসে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিন পিংয়ের ঢাকা সফরে দুই দেশের সম্পর্ক ‘স্ট্র্যাটেজিক’ মাত্রায় উন্নীত হওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। আবার মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ‘স্ট্র্যাটেজিক’।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কূটনীতিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার বন্ধু রাষ্ট্রটি যে আজ মিয়ানমারেরও বন্ধু সে বিষয়টিও আমাদের চিন্তায় রাখতে হবে। আপনি আমার পক্ষে না বিপক্ষে এমন প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। ’

গত ১৩ অক্টোবর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আরিয়া ফর্মুলা বৈঠকে চীন, রাশিয়াসহ সবাই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের পক্ষে কথা বলেছে। আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাধ্য করার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ। চীন, রাশিয়াসহ সবাই চলমান সংকট নিয়ে উদ্বিগ্ন। সবাই এ সংকটের সমাধান চায়।

সবাই একমত যে মিয়ানমারে রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা বন্ধ, মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা এবং বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। কিন্তু এ জন্য নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব তোলা নিয়ে এখনো স্থায়ী সদস্যগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

কয়েক বছর আগেও চীনের আপত্তিতে নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা ইস্যুতে আলোচনা করা যেত না। তবে গত দেড় মাসে সবার সম্মতিতেই ওই ইস্যুতে উন্মুক্ত ও রুদ্ধদ্বার—উভয় ধরনের আলোচনা, বিবৃতি এসেছে। একেও অগ্রগতি বলে মনে করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। গত বুধবার তিনি সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশের ব্যাপক কূটনৈতিক উদ্যোগ ও জনসংযোগ কার্যক্রমের ফলেই আজ আন্তর্জাতিক মহলে রোহিঙ্গা ইস্যুটি এত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হচ্ছে। নিরাপত্তা পরিষদের আরিয়া ফর্মুলা বৈঠক আয়োজন ও সেখানে সব সদস্যের বক্তব্য থেকে এটি পরিষ্কার যে, রোহিঙ্গা সমাধানে আন্তর্জাতিক মহল গভীরভাবে নিয়োজিত আছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অনুধাবন করতে পারছে যে রোহিঙ্গা সমস্যার উৎস ও সমাধান—দুটোই মিয়ানমারে।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা প্রশ্ন থাকলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেছেন, নয়াদিল্লিও রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান চায়। ভারতের ওই অবস্থান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে তাদের বিবৃতিতে প্রতিফলিত হয়েছে।

গত এপ্রিলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ‘স্ট্র্যাটেজিক’ মাত্রাকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয় উভয় দেশ। তবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ ভারতের যে ধরনের ভূমিকা প্রত্যাশা করেছিল, বাস্তবে ততটা পাওয়া যায়নি বলেই সংশ্লিষ্টরা বলছেন। বাংলাদেশি এক কর্মকর্তাই বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরে কালের কণ্ঠকে বলেন, বাংলাদেশ যদি প্রত্যাশা করে ভারত মিয়ানমারকে পুরোপুরি ত্যাগ করে এ দেশের পক্ষ নেবে তাহলে হয়তো ভুল হবে। মিয়ানমারের সঙ্গেও ভারতের সীমান্ত ও সুসম্পর্ক আছে। বাংলাদেশ যেমন ভারতের প্রতিবেশী, তেমনি মিয়ানমারেরও। তা ছাড়া এত বড় সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক কাটছাঁট করেনি। দুই দেশের মন্ত্রীরা সফর বিনিময় করছেন।

ওই কর্মকর্তা রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার ও বর্তমানে দেশটির শীর্ষস্থানীয় নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (ওআরএফ) ডিস্টিঙ্গুইশড ফেলো পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর সাম্প্রতিক বক্তব্যের দিকেও ইঙ্গিত করেন।

পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী সম্প্রতি বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘রোহিঙ্গা তো আমাদের (ভারতের) সমস্যা নয়। এটা তো মিয়ানমার ও বাংলাদেশের। ’ বাংলাদেশকে চীনের সাহায্য নেওয়ার ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের একটা ধারণা যে আমরা মিয়ানমারকে চাপ দিয়ে সব সমস্যা সমাধান করে দেব। এটা তো হবে না। ’

পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী মনে করেন, মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা ভারতের উচিত হবে না। কারণ মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের একটি ‘নিজস্ব সম্পর্ক’ রয়েছে।

ভারত রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের সঙ্গে মধ্যস্থতা বা সাহায্য করতে পারে কি না, এমন প্রশ্নে পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর উত্তর—বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য ভারত ত্রাণ পাঠিয়েছে। আবার রাখাইন রাজ্য পুনর্গঠনেও ভারত সহায়তা দিতে চেয়েছে। এর বেশি ভারতের পক্ষে করা সম্ভব নয়।

বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন সরাসরি সমর্থন জানিয়েছে মিয়ানমারকে। অন্যদিকে চীন ও ভারত পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর কথায় চীনের প্রতি এক ধরনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে।

চীনকে বাংলাদেশের ‘বিশেষ বন্ধু’ হিসেবে উল্লেখ করে পিনাক রঞ্জন বলেছেন, ‘চীন এখন বাংলাদেশের বিশেষ বন্ধু হয়েছে। চীনকে জিজ্ঞেস করুক। ওরা কিছু করুক। যখন দরকার হয় তখন তো চীনের কাছে ছুটে যায় ওরা (বাংলাদেশ)। ... কিছু রোহিঙ্গা চীন নিয়ে নিক না। ’

পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর ওই বক্তব্যের বিষয়ে ভারতীয় কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না বললেও খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পিনাক ভুল কিছু বলেননি বলেই মত রয়েছে ভারতীয় মহলে। কৌশলগত বিভিন্ন ইস্যুতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কে ভারতীয় বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগ আছে। এমনকি রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের ভূমিকা নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন মহল যতটা সরব, চীন ও রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে ততটা আলোচনা না হওয়াকেও বিস্ময়কর মনে করছে তারা। তাদের মতে, ভারত অন্তত বিবৃতি দিয়ে রোহিঙ্গা পরিস্থিতিতে উদ্বেগ জানিয়েছে। ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ গত মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেছেন ও রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারকে অনুরোধ জানাবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। এগুলোর কোনোটিই চীন ও রাশিয়া করেনি।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো গত মাসে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মিয়ানমার সফরের পর থেকেই রোহিঙ্গা ইস্যুতে নয়াদিল্লির অবস্থানের নতুন করে ভারসাম্য সৃষ্টির বহিঃপ্রকাশ পর্যবেক্ষণ করছে। ছয় মাস আগে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন’ পাঠানোর প্রস্তাব থেকে ভারত নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিল। তবে গত মাসে ওই মিশনের মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব থেকে ভারত নিজেকে প্রত্যাহার করেনি। ১৯ সেপ্টেম্বর জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদে ভারত প্রথমবারের মতো বলেছে, রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারীদের ঢল নেমেছে।

‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের’ মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাবকে সমর্থন না করে চীন ওই উদ্যোগ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে বলেছিল, এটি মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে আলোচনা শুরু এবং রাখাইন পরিস্থিতির উন্নয়নে সহায়ক হবে না। অন্যদিকে চীনের পাশাপাশি আসিয়ান সদস্য ফিলিপাইন বলেছে, এমন কাজের জন্য ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের চেষ্টা চালানোর কথা বলা হচ্ছে, যার বেশির ভাগ কফি আনান কমিশন ইতিমধ্যে সম্পন্ন করেছে। ফিলিপাইন মনে করে, জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের রাখাইন রাজ্য পরিস্থিতির তদন্তের কোনো সুযোগ নেই। এখন শুধু আনান কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা বাকি আছে। তা করতে মিয়ানমার সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, রোহিঙ্গা সংকটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দুই ভাবে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে পারে। একটি রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা কার্যক্রম গ্রহণ এবং অন্যটি এ সংকটের স্থায়ী সমাধানে মিয়ানমারকে চাপ দেওয়া। বেশির ভাগ দেশের মধ্যেই মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের ব্যাপারেই বেশি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। অনেকের আবার রোহিঙ্গাদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বক্তব্য দেওয়ার পেছনে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থও আছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে এ যাবৎ যারা সরব ভূমিকা রেখেছে তাদের মধ্যে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, তুরস্ক অন্যতম। ইতিমধ্যে মিয়ানমারের ওপর কিছুটা হলেও চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এ চাপে কতটা ফল আসবে বা কত দিন বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দিয়ে মিয়ানমারের ওপর চাপ বজায় রাখতে পারবে তা নিয়েও নানা শঙ্কা আছে।

রোহিঙ্গা গণহত্যার পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন গত সোমবার লুক্সেমবার্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক থেকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যে প্রতীকী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে তাকে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির পথে প্রাথমিক অগ্রগতি হিসেবে দেখছে কূটনৈতিক সূত্রগুলো। তাদের মতে, ইইউ সুনির্দিষ্টভাবে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ জানানো স্থগিত ও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক পর্যালোচনা করার মধ্য দিয়ে সামরিক বাহিনীকে সতর্ক বার্তা দিতে চেয়েছে। রোহিঙ্গা গণহত্যা ও বাস্তুচ্যুতিতে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর ভূমিকার স্বীকৃতি মিলেছে এখানে। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদানসহ কফি আনান কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের প্রতি ইইউ সমর্থন ব্যক্ত করেছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, ভয়াবহ মানবিক সংকট বিবেচনায় নিয়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে হয়তো আরো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়াই ইইউয়ের কাছে প্রত্যাশিত ছিল। মিয়ানমারে ইইউয়ের বাণিজ্য মিশন স্থগিত করার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা গত সোমবার যে সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছেন তা প্রাথমিকভাবে ইতিবাচক অগ্রগতি।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো আরো জানায়, মিয়ানমারের জটিল রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে বেসামরিক সরকারেও সামরিক বাহিনীর বেশ জোরালো প্রভাব রয়েছে। তাই পরিস্থিতি উন্নতির জন্য চাপ দিতে গিয়ে বেসামরিক সরকারই যাতে অস্তিত্ব সংকটে না পড়ে সে দিকেও দৃষ্টি রাখতে হচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলোকে। তা ছাড়া মিয়ানমারের ওপর চীন, ভারত, রাশিয়ার প্রভাব এবং ভূরাজনৈতিক সমীকরণও পশ্চিমা দেশগুলোকে উভয় সংকটে ফেলেছে।

মিয়ানমারে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল (অব.) অনুপ কুমার চাকমা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর জ্যেষ্ঠ সামরিক জেনারেলদের ইউরোপে আমন্ত্রণ জানানো স্থগিত করার তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ওই দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, অর্থনীতিতে নেই। তবে ইইউ মিয়ানমারকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ এবং দ্রুত ও শান্তিপূর্ণভাবে এর সমাধান দেখার প্রত্যাশার ব্যাপারে বার্তা দিয়েছে। এটি আমাদের চলমান কূটনৈতিক তৎপরতার ইতিবাচক ফল। ’

অনুপ কুমার চাকমা বলেন, ‘আমরা যে ধরনের জোরালো ব্যবস্থা বা নিষেধাজ্ঞা চেয়েছিলাম সেগুলোর কথা ইউরোপীয় কাউন্সিলের বিবেচনা না করার প্রাথমিক কারণ হিসেবে আমার মনে হয়, মিয়ানমারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে কি হবে না তা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো এখন উভয় সংকটে পড়েছে। তারা বেশ ভালো করেই জানে যে মিয়ানমারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে তা কেবল ওই দেশটিতে চীনের দৃঢ় অবস্থান বাড়াবে। দেশটিতে এখন চীনের যে প্রভাব আছে তা আরো সম্প্রসারিত হবে। ’

বাংলাদেশে ইইউয়ের রাষ্ট্রদূত রেঞ্চে তেয়ারিংক রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীন, রাশিয়া ও ভারতের ভূমিকার গুরুত্বের কথা বলেছেন। ভারতের সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের প্রধান বিনোদ মিশ্র বলেন, ‘বড় উন্নয়ন সহযোগিতা ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের মাধ্যমে তিন দশকের বেশি সময়ের প্রভাব বজায় রাখতেই মিয়ানমারকে সমর্থন দিচ্ছে চীন। অন্যদিকে ভারত অভিন্ন বৌদ্ধ ঐতিহ্যের ভিত্তিতে সভ্যতার সংযোগ স্থাপন ও উন্নয়ন অর্থায়নের মাধ্যমে মিয়ানমারে সম্ভাবনা কাজে লাগাতে ও প্রভাব সৃষ্টি করতে মিয়ানমারকে সমর্থন করে। ’

বিশ্লেষকরা বলছেন, ১৯৮৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত মিয়ানমারে পশ্চিমা দেশগুলোর অবরোধ চীনের জন্য বড় সুযোগ সৃষ্টি করেছিল। মিয়ানমারের ওপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অতীতের মতো এবারও চীনসহ তার মিত্রদের দেশটিতে তাদের অবস্থান পাকাপোক্ত করার সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

ভয়েস অব আমেরিকার অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যেকোনো কঠোর পদক্ষেপে চীনের বিরোধিতার অন্যতম প্রধান কারণ সেখানে চীনের বিশাল স্বার্থ আছে। তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ কেবল শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগেই নয়, চীনের বাণিজ্যিক মহাপরিকল্পনা ‘এক বলয়, এক পথের’ গুরুত্বপূর্ণ অংশ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য।

বঙ্গোপসাগরে রাখাইন রাজ্যের তটরেখার প্রায় মাঝামাঝি স্থানে একটি গভীর সমুদ্রবন্দরের ৭০ শতাংশ স্বত্ব পেতে যাচ্ছে চীন। ওই বন্দর হবে চীনের ‘এক বলয়, এক পথের’ অন্যতম সংযোগস্থল। এ ছাড়া ওই রাজ্যে চীনের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্প পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা আছে। সেখানে চীনা কম্পানিগুলো কাজ করবে।

এসব প্রকল্প চীনের দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোকে ভারত মহাসাগর, আফ্রিকা, ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত সংযুক্ত করবে। রাখাইন রাজ্যে ওই গভীর সমুদ্রবন্দর থেকেই তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন শুরু। এটি মিয়ানমার হয়ে চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় ইউনান প্রদেশ পর্যন্ত গেছে।

সিঙ্গাপুরে এস রাজারত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের চীনবিষয়ক প্রোগ্রামের অ্যাসোসিয়েট ফেলো আইরিন চ্যান বলেন, চীনের পররাষ্ট্রনীতি অনেকটাই অভ্যন্তরীণ চাহিদার নিরিখে পরিচালিত হয়। রাখাইন রাজ্যে মানবিক ইস্যুর চেয়ে চীনের বিনিয়োগ সুরক্ষাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

গত মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং উই জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বলেছেন, তাঁর দেশ রাখাইন রাজ্যের সুরক্ষায় মিয়ানমারের প্রচেষ্টার গুরুত্ব বোঝে ও তা সমর্থন করে। তিনি বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান এবং বৈশ্বিক সম্প্রদায়ের ওপর গঠনমূলক ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

তবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে প্রস্তাব আনার প্রচেষ্টা চীন জাতিসংঘে আটকে দিলেও বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা পাঠিয়েছে। মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশ যে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে তা নিয়েও চীন উদ্বেগ জানিয়েছে।

জানা গেছে, ২০১২ সালের দিকে মিয়ানমারে বিদেশি বিনিয়োগের মধ্যে ৩৫ থেকে ৪০ ভাগই ছিল চীনের। যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ছিল মাত্র দশমিক পাঁচ সাত ভাগ। ইউরোপীয় দেশগুলোর বিনিয়োগ আরো কম।

আবার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উন্মুক্ত হওয়া মিয়ানমারে পশ্চিমা দেশগুলো ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সুবিধা কাজে লাগাতে চায় না তা নয়। বরং মানবাধিকার ইস্যুকে পুঁজি করে বিভিন্ন দেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করে তাদের সুবিধা নেওয়ার উদাহরণ আছে।

মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতাকারী দেশ চীন ও রাশিয়ার যুক্তি হলো—অতীতে আফগানিস্তান, ইরাকসহ বিভিন্ন দেশে এ ধরনের উদ্যোগ কোনো ইতিবাচক ফল আসেনি।

আবার মিয়ানমার যে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) হামলার পরিপ্রেক্ষিতে রাখাইনে অভিযান শুরু করেছে, সেই হামলার নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশসহ পুরো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। মিয়ানমারের অখণ্ডতা ক্ষুণ্ন হোক তা কেউ চায় না। গত বৃহস্পতিবার ঢাকায় বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশনের ডিফেন্স অ্যাটাশেদের উদ্দেশে সরকারের ব্রিফিংয়ে আরসা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। আরসা ও রোহিঙ্গাদের নিয়ে উগ্রবাদের ঝুঁকির বিষয়টিও সেখানে গুরুত্ব পেয়েছে।

বাংলাদেশ বিগত বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বারবার সতর্ক করে বলেছে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে ফিলিস্তিনের মতো আরেকটি সংকট সৃষ্টি হোক তারা তা চায় না। তবে বাস্তবতা হলো—ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বড় অংশই এখন বাংলাদেশে চলে এসেছে। এ সংখ্যা ইতিমধ্যে ১০ লাখ ছাড়িয়েছে। রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ এখনো থামছে না। সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়—উভয়েই স্বীকার করছে, খুব দ্রুত এ সংকটের অবসান হচ্ছে না।

 


মন্তব্য