kalerkantho


হত্যার জন্যই নিয়ে যাওয়া হয় পুলিশ হেফাজত থেকে

আশরাফ-উল-আলম   

১৪ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



হত্যার জন্যই নিয়ে যাওয়া হয় পুলিশ হেফাজত থেকে

১৯৮১ সালের ২৯ মে চট্টগ্রাম গিয়েছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও সাবেক সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। রাতে তিনি চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অবস্থান করেন।

সেখানেই পরদিন ভোর ৪টার দিকে সেনাবাহিনীর কতিপয় সদস্যের হাতে তিনি নিহত হন। ওই সময় চট্টগ্রাম গ্যারিসনের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) এবং এরিয়া কমান্ডার ছিলেন মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুর, যাঁকে সে বছরের ১ জুন পুলিশ হেফাজত থেকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। মঞ্জুর হত্যা মামলার চার্জশিট, বিভিন্ন দলিল, আসামিদের জবানবন্দি ও আলামত পর্যালোচনা করে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. নূরুল আনোয়ার তাঁর সদ্য প্রকাশিত ‘মেজর জেনারেল মঞ্জুর হত্যাকাণ্ড—দুর্যোধনটি কে?’ বইয়ে এসব তথ্য জানিয়েছেন। বইয়ে মামলার বিবরণও রয়েছে। বইয়ের তথ্য অবলম্বনে কালের কণ্ঠ’র ধারাবাহিক প্রতিবেদনের প্রথম পর্ব প্রকাশিত হলো আজ।

বইটিতে বলা হয়েছে, সেনাবাহিনীর যেসব কর্মকর্তা জিয়া হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলেন তাঁরা ‘বিপ্লবী পরিষদ’ নামে ক্যান্টনমেন্ট ও চট্টগ্রাম সিভিল প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করেন। তাঁরা বিভিন্ন দাবিদাওয়া উত্থাপন করেন। একই সঙ্গে তৎকালীন সেনাপ্রধান ও মঞ্জুর হত্যা মামলার প্রধান আসামি এইচ এম এরশাদসহ কিছু সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করার ঘোষণা দেয় বিপ্লবী পরিষদ। এই পরিস্থিতিতে আবুল মঞ্জুর জিওসি হিসেবে তখনকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেন।

ঢাকায় সেনা সদরের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা করেন। কিন্তু ঢাকার সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হয়। সেনা সদর মঞ্জুরকে বিদ্রোহের ‘নায়ক’ বলে অভিহিত করে। তাঁর নামে প্রচারমাধ্যমে অপপ্রচার চালানো শুরু হয়। ওই সময় চট্টগ্রাম সেনানিবাসে বিমান আক্রমণের হুমকি দেওয়া হয় ঢাকা থেকে। এতে সাধারণ সেনা সদস্যরা চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট থেকে পালাতে শুরু করেন। বিভিন্ন স্তরের সেনা কর্মকর্তা ও সদস্যদের মধ্যে বিভ্রান্তি, দ্বিধা ও ভয় সৃষ্টি হয়। জেনারেল মঞ্জুর, তাঁর পরিবার, মঞ্জুরের ঘনিষ্ঠ লে. কর্নেল দেলোয়ারসহ তাঁর পরিবার, মেজর রেজাউল করিম রেজা ও কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা ১ জুন ভোর ৩টার দিকে ক্যান্টনমেন্ট ত্যাগ করে সীমান্তের উদ্দেশে রওনা দেন। যাত্রাপথে মানিকছড়ির কাছে সেনাবাহিনীর অন্য একটি দলের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। ওই সংঘর্ষে নিহত হন লে. কর্নেল মাহবুবুর রহমান ও লে. কর্নেল মতিউর রহমান। সংঘর্ষের একপর্যায়ে তাঁরা আত্মহত্যা করেন বলে জানা যায়। কয়েকজন আহত হন। আহতদের সঙ্গে নেওয়া অসুবিধাজনক মনে করে তাঁদের ফটিকছড়িতে রেখে মঞ্জুরের দল আবার সীমান্তের দিকে যেতে থাকে।

বইয়ে উল্লেখ আছে, কয়েকজন সেনা সদস্যের আহত হয়ে ফটিকছড়িতে পড়ে থাকা এবং মঞ্জুরের পালানোর খবর জানতে পারেন চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার। পুলিশের হাটহাজারী সার্কেল ইন্সপেক্টর (সিআই) এম জি কুদ্দুসকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। সঙ্গে সঙ্গে তিনি হাটহাজারী থানার ওসিসহ ফোর্স নিয়ে ফটিকছড়ির দিকে যান। অন্যদিকে এনএসআইয়ের সহকারী পরিচালক আবদুস সাত্তারও মঞ্জুরের পালানোর সংবাদ চট্টগ্রাম ইবিআরসির ব্রিগেডিয়ার আজিজুল ইসলামের কাছ থেকে যাচাই করে ফটিকছড়িতে যান। স্থানীয় জনসাধারণের সহাতায় পুলিশ জানতে পারে, মঞ্জুর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আছিয়া চা বাগানের একটি টিলার ওপর গনু মিয়ার বাড়িতে আছেন। ওই বাড়ি ঘেরাও করার পর মেজর জেনারেল মঞ্জুর পরিবারের সদস্য ও মেজর রেজাউল করিমকে নিয়ে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। ওই সময় তাঁদের কাছে থাকা অস্ত্রশস্ত্র পুলিশের কাছে জমা দেন তাঁরা। মঞ্জুরসহ সবাইকে তখন নিয়ে যাওয়া হয় হাটহাজারী থানায়।

মঞ্জুর হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বইয়ে বলা হয়, মঞ্জুর ও তাঁর সঙ্গীদের আটকের ঘটনা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জানান তৎকালীন আইজিপি। ওই ঘটনা তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদও জানতে পারেন। তিনি তত্ক্ষণাৎ মঞ্জুরকে পুলিশ হেফাজত থেকে সেনা হেফাজতে নেওয়ার জন্য ব্রিগেডিয়ার আজিজুল ইসলাম ও ব্রিগেডিয়ার আবদুল লতিফকে নির্দেশ দেন। অন্যদিকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারকে বোঝানো হয়, তাঁদের কোর্ট মার্শাল হবে। এরশাদ ব্রিগেডিয়ার আজিজ ও ব্রিগেডিয়ার লতিফকে টেলিফোনে বলেন, পুলিশ হেফাজত থেকে নেওয়ার পথেই মঞ্জুরকে হত্যা করতে হবে। এরশাদের নির্দেশে দুই ব্রিগেডিয়ার মিলে ক্যাপ্টেন এমদাদ হোসেনকে হাটহাজারী থানায় পাঠান মঞ্জুর ও সঙ্গীদের নেওয়ার জন্য। সে মোতাবেক এমদাদ সুবেদার মালেকসহ অন্য সেনা সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে কয়েকটি জিপে করে রাত ৯টায় (১ জুন) হাটহাজারী থানায় যান। পরে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যোগাযোগ করেন সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে। পুলিশ তখন জেনারেল মঞ্জুর, তাঁর স্ত্রী, দুই ছেলে, দুই মেয়ে, মেজর রেজাউল করিম রেজা, লে. কর্নেল দেলোয়ারের স্ত্রী ও তিন মেয়ে এবং তাদের মালপত্র সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেয়।

মঞ্জুর ও অন্যদের নিজ হেফাজতে নেন ক্যাপ্টেন এমদাদ। এ ক্ষেত্রে তিনি পুলিশকে একটি রসিদ দেন। বইয়ে সাবেক আইজিপি উল্লেখ করেন, ক্যাপ্টেন মো. এমদাদ হোসেন হাতে লিখে একটি রসিদ তৈরি করেন। ওই রসিদে লেখা হয়, ‘আমি মো. এমদাদ হোসেন (ক্যাপ্টেন) চিটাগাং ক্যান্টনমেন্ট, অদ্য ১-৬-৮১ ইং রাত ৯টা ৩৫ মিনিটের সময় হাটহাজারী থানা হইতে নিম্নলিখিত আর্মি অফিসার ও পরিবারবর্গকে বুঝিয়া লইলাম। আমি তাহাদিগকে চিটাগাং ক্যান্টে লইয়া যাইবো। ব্রিগেডিয়ার আজিজ (ইবিআরসি) ও ব্রিগেডিয়ার লতিফ (কমান্ডার ২০৩ ব্রিগেড)-এর আদেশ মোতাবেক লইয়া যাইতেছি। ১। মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুর, ২। মেজর রেজাউল করিম, ৩। মিমেস এম এ মঞ্জুর, ৪। মিসেস লে. কর্নেল দেলোয়ার হোসেন, ৫। জেনারেল সাহেবের দুই ছেলে ও দুই মেয়ে, ৬। লে. কর্নেল দেলোয়ারের তিন মেয়ে। ’ রসিদে আরো লেখা হয়, ‘উপরোক্ত ব্যক্তিদের নিজস্ব মালামাল তাহাদের নিজেদের সঙ্গেই আছে। উপরোক্ত ব্যক্তিদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী পুলিশের কাছে কোনো মালামাল রইল না। কেবলমাত্র একটা ৭.৬২ এসএমজি এবং একটি পিস্তল পুলিশের নিকট রইল। ’ এরপর ক্যাপ্টেন এমদাদ হোসেন জোরপূর্বক মঞ্জুরকে থানার পাশে থাকা পুলিশের ট্রাক থেকে নামিয়ে হাত, চোখ, মুখ বেঁধে সেনাবাহিনীর জিপে ওঠান। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় ক্যান্টনমেন্টে। অন্যদের আলাদা জিপে করে সেনানিবাসের দিকে নেওয়া হয়।


মন্তব্য