kalerkantho


মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করা হয়

আশরাফ-উল-আলম   

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করা হয়

জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার দুই দিনের মাথায় মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে পুলিশ হেফাজত থেকে সেনানিবাসে নিয়ে ‘ঠাণ্ডা মাথায়’ গুলি করে হত্যা করা হয়। অথচ তখন রাষ্ট্রযন্ত্রে প্রচার করা হয়, পুলিশ হেফাজত থেকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে নেওয়ার সময় উত্তেজিত সাধারণ সৈনিকরা মঞ্জুরকে বেদম মারধর করে।

আহত অবস্থায় সিএমএইচে ভর্তি করার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। সাবেক আইজিপি মো. নূরুল আনোয়ারের ‘মেজর জেনারেল মঞ্জুর হত্যাকাণ্ড —দুর্যোধনটি কে?’ শীর্ষক বইয়ে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

জিয়া ও মঞ্জুর হত্যাকাণ্ডের সময় চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন জিয়াউদ্দীন চৌধুরী। তাঁর লেখা ‘দি অ্যাসাসিনেশন অব জিয়াউর রহমান অ্যান্ড ইটস আফটারম্যাথ’ বইটি প্রকাশিত হয়েছে ২০০৯ সালে। ওই বইয়ে তিনি উল্লেখ করেন, জিয়া ও মঞ্জুর দুজনকেই হত্যা করা হয়েছিল। দুটি হত্যাকাণ্ডের পর এ নিয়ে সাংবাদিক লরেন্স লিফশুলজ ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউয়ে কয়েকটি ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। এসব লেখার উদ্ধৃতি ও মঞ্জুর হত্যা মামলার চার্জশিট নিয়ে নূরুল আনোয়ার সম্প্রতি ‘মেজর জেনারেল মঞ্জুর হত্যাকাণ্ড—দুর্যোধনটি কে?’ শীর্ষক বইটি লিখেছেন।

নূরুল আনোয়ারের বইয়ে মঞ্জুর হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন হুবহু তুলে ধরা হয়েছে। তাতে উল্লেখ আছে, মঞ্জুরকে চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ভেতরে ফায়ারিং স্কোয়াডের পাশে একটি পাহাড়ের পাদদেশে নিয়ে চায়নিজ রাইফেল মাথায় ঠেকিয়ে একটি গুলি করা হয়।

ওই গুলিতেই প্রাণ হারান মঞ্জুর।

বইয়ের তথ্য মতে, হাটহাজারী থানায় একটি লিখিত রসিদ দিয়ে মেজর জেনারেল মঞ্জুর, তাঁর স্ত্রী, চার ছেলেমেয়ে, লে. কর্নেল দেলোয়ারের স্ত্রী ও তিন মেয়ে, মেজর রেজাউল করিমকে রাত ৯টা ৩৫ মিনিটে বুঝে নেন ক্যাপ্টেন এমদাদ। এরপর মঞ্জুরকে পুলিশের গাড়ি থেকে চোখ-মুখ, হাত-পা বেঁধে সেনাবাহিনীর একটি জিপে তোলা হয়। পরিবারের লোকদের তোলা হয় আরেকটি জিপে। মেজর রেজাউল করিমকে হাত-পা, চোখ-মুখ বেঁধে আরেকটি জিপে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় ব্রিগেডিয়ার আজিজের অফিসে। কয়েকজন সেনা সদস্য জেনারেল মঞ্জুরকে সেনানিবাসের দিকে নিয়ে যান। সেনানিবাসের ২ নম্বর গেট পর্যন্ত পুলিশের গাড়ি ছিল। সেনানিবাসের ভেতরে পুলিশ প্রবেশ করেনি।

সাবেক আইজিপি নূরুল আনোয়ারের বই থেকে জানা যায়, সেনানিবাসে বসে ব্রিগেডিয়ার আজিজ ও ব্রিগেডিয়ার লতিফ (দুজনই মঞ্জুর হত্যা মামলার আসামি) যেসব নির্দেশনা দিয়েছিলেন তাই পালন করেছেন ক্যাপ্টেন এমদাদ ও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার যে বেতার বার্তা পাঠিয়েছিলেন তাতে লেখা ছিল, ‘আমি নিজে ও বিভাগীয় কমিশনারসহ স্থানীয় আর্মি হেড কোয়ার্টারের ব্রিগেডিয়ার আজিজ ও ব্রিগেডিয়ার লতিফ সাহেবের সঙ্গে এ ব্যাপারে পরামর্শ করিয়াছি এবং উভয় ব্রিগেডিয়ার সাহেবরা গ্রেপ্তারকৃত মে. জেনারেলকে নিয়া আসার জন্য ক্যাপ্টেন এমদাদকে পাঠাইয়াছেন বলিয়া জানাইয়াছেন। দুই. গ্রেপ্তারকৃত মেজর জেনারেলকে তাঁহার পরিবারসহ একটি লিখিত নিয়া এবং জিডি এন্ট্রি করিয়া ক্যাপ্টেন এমদাদের নিকট হস্তান্তর করিবেন। তিন. গ্রেপ্তারকৃত মেজর জেনারেলকে চোখ ও হাত বাঁধিয়া আর্মির সহিত পুলিশসহ কড়া প্রহরায় ক্যান্টনমেন্টের গেট পর্যন্ত পৌঁছাইয়া দিবেন। চার. গ্রেপ্তারকৃতদের পরিবারবর্গকে আলাদা গাড়ি করিয়া তাহার সঙ্গে পাঠাইয়া দিবেন। ইহা জরুরি। ’ দুই ব্রিগেডিয়ারের নির্দেশেই মঞ্জুর ও তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে যান ক্যাপ্টেন এমদাদ। মঞ্জুরকে বহনকারী জিপ নিয়ে ক্যাপ্টেন এমদাদ সেনানিবাসের ভেতরেই ঘুরতে থাকেন। সেনানিবাসের একটি জায়গায় লে. কর্নেল শামসুর রহমান শামস ও লে. কর্নেল মোস্তফা কামালউদ্দিনের দেখা পান ক্যাপ্টেন এমদাদ। এ সময় শামস বলেন, ‘কাজ সারতে দেরি কেন? তাড়াতাড়ি কাজ সারেন। ’ ক্যাপ্টেন এমদাদ তাড়াতাড়ি মঞ্জুরকে বহনকারী জিপ সেনানিবাসের মধ্যে ফায়ারিং রেঞ্জের দিকে নিয়ে যান। ফায়ারিং রেঞ্জের কাছাকাছি পাকা রাস্তায় গাড়ি রেখে তিনি মঞ্জুরকে গাড়ি থেকে নামান। তাঁকে প্রায় ৩০০ গজ দূরে একটি পাহাড়ের পাদদেশে নেওয়া হয়। ক্যাপ্টেন এমদাদ তাঁর সঙ্গে থাকা সৈনিকদের কাছে জানতে চান যে কে মঞ্জুরকে গুলি করতে রাজি আছেন। ওই সময় সুবেদার মালেক হাত উঁচু করে বলেন, ‘আমি রাজি। ’ ক্যাপ্টেন এমদাদের নির্দেশে সুবেদার মালেক চায়নিজ রাইফেল দিয়ে মঞ্জুরের মাথায় (কপালে ঠেকিয়ে) গুলি করেন। একটি গুলিতেই ঢলে পড়েন মঞ্জুর। লাশ রেখে এমদাদ ও তাঁর সঙ্গীরা জিপের কাছে ফিরে আসেন। সেখানে ছিলেন লে. কর্নেল শামস ও লে. কর্নেল কামাল। কাজ শেষ কি না জিজ্ঞেস করেন কামাল। জবাবে ক্যাপ্টেন এমদাদ বলেন, কাজ শেষ হয়েছে। ১৯৮১ সালের ১ জুন রাত সাড়ে ১১টার দিকে মঞ্জুরকে হত্যা করা হয়।

মঞ্জুর হত্যা মামলার চার্জশিটে উল্লেখ আছে, কাজ শেষ হওয়ার কথা দুই লে. কর্নেলকে জানানোর পর উপস্থিত সবাই মিলে আবার মঞ্জুরের লাশের কাছে যান। মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে কি না যাচাই করে তাঁরা ব্রিগেডিয়ার আজিজ ও ব্রিগেডিয়ার লতিফকে জানান। দুই ব্রিগেডিয়ার লাশ সিএমএইচে নেওয়ার নির্দেশ দেন। লাশ স্ট্রেচারে করে সিএমএইচে নেওয়া হয়। ব্রিগেডিয়ার আজিজ ও ব্রিগেডিয়ার লতিফের নির্দেশে এমদাদ, কামাল, শামস ও তাঁদের সঙ্গীরা আলামত গোপন করার জন্য মঞ্জুরের লাশ আত্মীয়স্বজনের কাছে ফেরত না দিয়ে দাফন করেন। একই সঙ্গে মঞ্জুরের মৃত্যু সম্পর্কে সত্য বিবৃতি না দিয়ে মিথ্যা ও বানোয়াট কাহিনী প্রচার করেন। তাতে বলা হয়, উচ্ছৃঙ্খল সৈনিকরা তাঁকে হত্যা করেছে।

নূরুল আনোয়ারের বইয়ে উল্লেখ আছে, হত্যার সাড়ে চার ঘণ্টা পর ২ জুন ভোর ৪টার দিকে মঞ্জুরের লাশ নেওয়া হয় সিএমএইচে। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ডা. লে. কর্নেল এ জেড এম তোফায়েল আহম্মদ (গ্রেডেড স্পেশালিস্ট, প্যাথলজি) ময়নাতদন্ত করেন। কিন্তু ওই ময়নাতদন্ত প্রকাশ করা হয়নি তখন। বিশেষ করে এইচ এম এরশাদ যত দিন ক্ষমতায় ছিলেন তত দিন মঞ্জুর হত্যাকাণ্ডের কোনো আলামতই প্রকাশ করা হয়নি। এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ১৯৯৫ সালে মঞ্জুরের বড় ভাই ব্যারিস্টার আবুল মনসুর ময়নাতদন্ত রিপোর্ট হাতে পেয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার তদন্ত করতে গিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা জানতে পারেন, তৎকালীন সেনাপ্রধানের নির্দেশে মঞ্জুরকে হত্যা করে বিভিন্ন আলামত গোপন করার চেষ্টা করা হয়। এ কারণে চার্জশিটে এইচ এম এরশাদকে প্রধান আসামি করা হয়। এ পর্যন্ত মঞ্জুর হত্যাকাণ্ড নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন লেখা থেকে জানা যায়, মঞ্জুর বেঁচে থাকলে তিনি অনেক কথাই প্রকাশ করতেন। অথবা তিনি বিচারের মুখোমুখি হলেও অনেক তথ্য ফাঁস করে দিতেন। তাই তাঁকে বিনা বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়।


মন্তব্য