kalerkantho


সিডরের ১০ বছর

৮০ শতাংশের আশ্রয় আজও অনিশ্চিত!

তৌফিক মারুফ   

১৫ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



৮০ শতাংশের আশ্রয় আজও অনিশ্চিত!

ফাইল ছবি

ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে দেশের উপকূলীয় এলাকার বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবন রক্ষায় অন্যতম প্রধান সহায় নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র। কিন্তু একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং ব্যাপক প্রাণহানির পরও বিষয়টি সেভাবে গুরুত্ব পায়নি কখনোই।

২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের ১২ জেলাকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে যায় সুপার সাইক্লোন সিডর। ওই দুর্যোগে সরকারি হিসাবেই প্রাণহানির সংখ্যা ছিল তিন হাজার ৪৪৭ জন। নিখোঁজ হয় ৭৮১ জন। সেই সময় উপকূলীয় জনপদে আশ্রয়কেন্দ্রের সংকট ও প্রয়োজনীয়তা আবারও প্রকটভাবে ধরা পড়ে।

সিডর দুর্যোগের পর নড়েচড়ে বসে সরকার। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গত এক দশকে প্রয়োজনের তুলনায় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের অগ্রগতি খুবই কম। গত ১০ বছরে সরকার উপকূলীয় অঞ্চলে মাত্র ১০০টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করতে পেরেছে। এর বাইরে সরকারি-বেসরকারি কয়েকটি সংস্থা কিছু আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। আর ১০ বছরের মাথায় এসে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে আরো ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের।

দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা বলেন, ঘূর্ণিঝড়ের আলামত বা পূর্বাভাস দেখে মানুষকে সতর্ক করে নিরাপদে আশ্রয় নিতে বলা হয়। এই কাজে গত এক দশকে বেশ অগ্রগতি হয়েছে। মানুষ অনেক সচেতন হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষ প্রাণ বাঁচাতে ঘরবাড়ি ছেড়ে কোথায় আশ্রয় নেবে তা এখনো নিশ্চিত করতে পারছে না সরকার। উপকূলের প্রায় দেড় কোটি মানুষ সব সময়ই ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকিতে থাকলেও এখন পর্যন্ত দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা চার হাজারেরও কম। সেখানে আশ্রয় নিতে পারে বড়জোর ৩০ লাখ, যা বিপদগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর ২০ শতাংশের মতো। বাকি ৮০ শতাংশের আশ্রয় এখনো অনিশ্চিত।

বিশেষজ্ঞরা জানান, গত ১২৫ বছরের হিসাবে বর্তমান বাংলাদেশ ভূখণ্ডের উপকূলীয় এলাকায় ৮০টির বেশি বড় ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে। এতে মারা গেছে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ। লাখ লাখ মানুষ হয়েছে ঘরহারা। আজও নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রের অভাবে মানুষ পূর্বাভাস পেয়ে কিংবা সতর্কতামূলক প্রচারণা শুনেও নিজ বাড়িঘর ছেড়ে যেতে চায় না। সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক ঝড়ের পূর্বাভাসের সময় দেখা গেছে, স্বেচ্ছাসেবকরা জোর করেও অনেককে আশ্রয়কেন্দ্রে নিতে পারছে না। এ ছাড়া পুরনো যে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো আছে এর বেশির ভাগের অবস্থাই ভালো নয়। রক্ষণাবেক্ষণ ঠিকমতো হয় না। যাতায়াতও নির্বিঘ্ন নয়।

সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রিয়াজ আহম্মেদ অবশ্য কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ সব এলাকাতেই আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। কেউ আশ্রয় পাবে না—এমন কোনো এলাকা নেই। তা ছাড়া উপকূলীয় অঞ্চলে যেকোনো সরকারি স্থাপনা নির্মাণের সময় প্রয়োজনে মানুষ যাতে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে সেই নির্দেশনা দেওয়া আছে। সেই হিসাবে সবার জন্যই আশ্রয়কেন্দ্র আছে। কোথাও কোথাও ঘরবাড়ি থেকে এসবের দূরত্ব একটু বেশি হতে পারে। ’

মহাপরিচালক আরো বলেন, ‘সব মিলিয়ে দেশে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে তিন হাজার ৮০০টি। এর মধ্যে ১০০টির কাজ গত বছর শেষ হয়েছে। আরো ২২০টির কাজ শুরু হয়েছে। ’ তাঁর মতে, দেশে মাত্র সাড়ে ছয় হাজার ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র হলেই আর সমস্যা থাকবে না।

উপকূলীয় অঞ্চলে বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের উপপরিচালক আবদুল মতিন সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নতুন যে ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে ৯৭টির টেন্ডার হয়েছে। আর এগুলোর সবই মূলত স্কুল-কলেজ কিংবা মাদরাসাভিত্তিক। তাদের জমিতেই করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে শর্ত দেওয়া আছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষই এগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করবে।

ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ কর্মসূচির পরিচালক (অপারেশন) নূর ইসলাম খান বলেন, ‘দেশে সাধারণত একেকটি বড় দুর্যোগের পরই বড় ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। যেমন গত শতাব্দীর ১৯৭০ ও ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড় এবং বর্তমান শতাব্দীর ২০০৭ সালে সিডর আঘাত হানার পর ব্যাপক উদ্যোগ শুরু হয়। তবে বাস্তবতা হলো, আজ পর্যন্ত পর্যাপ্ত ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ হয়নি। আবার পুরনো অনেক আশ্রয়কেন্দ্রই ব্যবহার উপযোগী অবস্থায় নেই। ’ এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের হিসাবে দেশের উপকূলীয় ৪২টি উপজেলায় প্রায় দেড় কোটি মানুষ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকির ভেতরে বসবাস করছে। ’

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, পুরনো আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর ধারণক্ষমতা কোনোটির ৪০০,  কোনোটির ৫০০ থেকে ৬০০। নতুনগুলোর ধারণক্ষমতা এক হাজার থেকে দেড় হাজার মানুষের। এর বাইরে গবাদি পশুর জন্য পুরনো মুজিব কিল্লা নামের টিলাগুলো সংস্কার করা হচ্ছে।

অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জানান, সিডরের পর পর সরকারের গৃহীত ইসিআরআরপির (ইমার্জেন্সি ২০০৭ সাইক্লোন রিকভারি অ্যান্ড রেস্টোরেশন প্রজেক্ট) আওতায় উপকূলীয় ও সিডর বিধ্বস্ত ১২ জেলায় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসের জন্য ১২টি অত্যাধুনিক উদ্ধারযান, ছয়টি ওয়াটার অ্যাম্বুল্যান্স, ১২টি পিকআপ ভ্যান, ১৬টি স্যাটেলাইট ফোনসহ নৌবাহিনী ও র‌্যাবের জন্য আলাদা চারটি সমুদ্রগামী উদ্ধারযান সরবরাহ করা হয়েছে।

তবে বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই সব উদ্ধার সরঞ্জামের বেশির ভাগই ব্যবহার উপযোগী নেই। বাকিগুলোও জোড়াতালি দিয়ে চালাতে হচ্ছে। জ্বালানি খরচ এবং জনবল সংকটও বড় সমস্যা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মহাপরিচালক রিয়াজ আহম্মেদ বলেন, ‘ব্যবহারের অনুপযোগী কথাটি ঠিক নয়। আর প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি ও জনবলের জন্য বাজেট নেই। তবে সম্প্রতি প্রকল্পটি রাজস্ব খাতভুক্ত করার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে আর সমস্যা থাকবে না।


মন্তব্য