kalerkantho


খোঁজ মেলেনি এখনো

লোক আসবে, কম্পিউটার দিয়ে দাও—শেষ ফোনে নির্দেশ ছিল মারুফের

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



লোক আসবে, কম্পিউটার দিয়ে দাও—শেষ ফোনে নির্দেশ ছিল মারুফের

সোমবার সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিট, কূটনীতিক মারুফ জামানের বাসার ল্যান্ডফোন বেজে ওঠে। বাসায় তখন ছিলেন দুই গৃহকর্মী। তাঁদের একজন লাকি ছুটে গিয়ে ফোন ধরেন। অন্য প্রান্ত থেকে ‘হ্যালো হ্যালো’ বলতেই সংযোগ কেটে যায়। আবার ফোন আসে। ফের ফোন ধরে হ্যালো বলতেই অন্য প্রান্ত থেকে মারুফ জামানের কণ্ঠ শুনতে পান লাকি। ‘কিছুক্ষণের মধ্যে বাসায় কম্পিউটার নিতে লোক যাবে। উনাদের কম্পিউটার দিয়ে দাও’—এমন নির্দেশনার পরই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

রাত ৮টা ৫ মিনিটে তিনজন লোক আসে মারুফ জামানের বাসায়। তবে তারা শুধু কম্পিউটারের সিপিইউ নয়, ল্যাপটপ, বাসার ক্যামেরা ও একটি স্মার্টফোনও নিয়ে যায়। যাওয়ার আগে তারা মারুফ জামানের ঘরে তল্লাশিও চালায়।

এ ঘটনার কিছু সময় আগে ধানমণ্ডির ৯/এ সড়কের ওই বাসা থেকে বিমানবন্দরের উদ্দেশে বের হয়েছিলেন সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ। কম্পিউটার দেওয়ার নির্দেশনার পর থেকে তিনি নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁর গাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায় খিলক্ষেতের তিন শ ফুট রাস্তায়। এভাবে তিন ধরে নিখোঁজ থাকায় এ নিয়ে ক্রমেই রহস্য বাড়ছে। গত মঙ্গলবার মারুফের বাড়ি থেকে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ জব্দ করেছে ধানমণ্ডি থানা পুলিশ। গতকাল বুধবার থেকে তদন্তে নেমেছে গোয়েন্দা পুলিশও (ডিবি)।

সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ, পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবার রাতে মারুফের বাসায় সুঠাম দেহের তিন যুবক যায়। তাদের মাথায় ছিল মাংকি ক্যাপ। এ কারণে ফুটেজে তাদের চেহারা স্পষ্ট নয়। অল্প সময়ের মধ্যেই তারা কম্পিউটার ও ডিভাইসগুলো নিয়ে এবং তল্লাশি চালিয়ে বেরিয়ে যায়। তল্লাশির সময় তারা বাসার দুই গৃহকর্মীর মৌখিক বাধাকে পাত্তাই দেয়নি। গত সোমবার সন্ধ্যা থেকে বন্ধ থাকা মারুফের মোবাইল ফোনের শেষ অবস্থান দেখা গেছে দক্ষিণখান এলাকায়। এরপর তাঁকে আর শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। মারুফকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে বলে জানাচ্ছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।

গতকাল জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘এ ঘটনায় একটি জিডি হয়েছে। থানা পুলিশের পাশাপাশি ডিবিও কাজ শুরু করেছে। ’

গতকাল দুপুরে ধানমণ্ডির ৯/এ নম্বর সড়কে ৮৯ নম্বর বাড়ির সামনে গেলেও সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর বাড়ির ভেতরে ঢোকার অনুমতি মেলেনি। পরিবারের ঘনিষ্ঠ একজন কালের কণ্ঠকে জানান, পৈতৃক জমিতে করা ছয়তলা ভবনের তৃতীয় তলায় মারুফ জামান থাকেন। ওই বাড়ির চতুর্থ তলায় থাকেন তাঁর বড় বোন শাহরিনা কামাল, পঞ্চম তলায় থাকেন তাঁর ছোট ভাই রিফাত জামান। মারুফের স্ত্রী বেঁচে নেই। তাঁর দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে বেলজিয়ামে পিএইচডি করছেন। ছোট মেয়ে সামিহা জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিষয়ে স্নাতক করেছেন। তিনি এক সপ্তাহ আগে বড় বোনের কাছে বেড়াতে যান। সোমবার সন্ধ্যায় ফেরেন। তাঁকে বিমানবন্দর থেকে আনতে গিয়ে বেরিয়েই নিখোঁজ হন মারুফ জামান।

গতকাল দুপুরে ডিবি পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসি) ফজলুর রহমানকে বাসায় ঢুকে মারুফের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। পরে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা তথ্য সংগ্রহ করছি। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করছি। তবে পরিবার তাঁর নিখোঁজ হওয়ার মতো কোনো কারণ বলতে পারেনি। ’

মাথা ঢেকে আসে তিনজন : ধানমণ্ডি থানার ওসি আবদুল লতিফ বলেন, ‘সিসি ক্যামেরার জব্দ করা ফুটেজে দেখা গেছে, তিন যুবক মাংকি ক্যাপ পরে ওই বাসায় ঢুকে কিছু সময়ের মধ্যেই বেরিয়ে যায়। যুবকদের মুখ ঢাকা ছিল বলে তাদের এখনো শনাক্ত করা যায়নি। ’

গতকাল মারুফের স্বজনদের পক্ষ থেকে সরবরাহকৃত একটি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সোমবার সন্ধ্যায় ছোট মেয়ে সামিহা জামানকে বিমানবন্দর থেকে নিয়ে আসতে মারুফ জামান ধানমণ্ডির বাসা থেকে গাড়ি চালিয়ে বের হন। তার কিছুক্ষণ পর ৭টা ৪৫ মিনিট নাগাদ বাসার ল্যান্ডফোনে অজ্ঞাত নম্বর থেকে ফোন করে গৃহপরিচারিকাকে বলেন, তাঁর বাসায় কম্পিউটার নিতে কেউ একজন আসবেন। এর কিছুক্ষণ পর তিনজন সুঠামদেহী ভদ্রলোক বাসায় এসে তাঁর ল্যাপটপ, বাসার কম্পিউটারের সিপিইউ, ক্যামেরা, একটি স্মার্টফোন নিয়ে যায় ও তাঁর ঘরে তল্লাশি চালায়। সে সময় তাঁর ফোন বন্ধ থাকায় তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

পরিবারের ঘনিষ্ঠ সূত্রটি জানায়, বাসা থেকে বের হওয়ার কয়েক মিনিট পরই ফোন আসে। প্রথম ফোনটি হ্যালো বলতেই কেটে যায়। পরের ফোনে কথা হয়। তখন অন্যপ্রান্ত থেকে কথা বলেন মারুফ জামান। গৃহকর্মী লাকি তাঁর গলা চিনতে পারেন। মারুফ বলেন, ‘কিছুক্ষণের মধ্যে বাসায় কম্পিউটার নিতে লোক যাবে। উনাদের কম্পিউটার দিয়ে দাও। ’ তখন রাত ৭টা ৪৫ মিনিট। ৮টা ৫ মিনিটে তিনজন ঢোকে বাসায়। এরা কিছুক্ষণের মধ্যে তল্লাশি করে এবং ডিভাইসগুলো নিয়ে বের হয়ে যায়।

মারুফের বড় বোন শাহরিনা কামাল গৃহকর্মীর বরাত দিয়ে বলেন, সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে গাড়ি নিয়ে বেরোনোর ঘণ্টাখানেক পর মারুফ বাড়িতে ফোন করে গৃহকর্মীকে জানিয়েছিলেন, কয়েকজন লোক এলে তাদের কাছে যেন তাঁর ল্যাপটপটি দিয়ে দেওয়া হয়। তিনজন সুঠামদেহী লোক বাসায় আসে, যাদের দুজন ইয়াং। তারা একটি ল্যাপটপ, কম্পিউটারের সিপিইউ, ক্যামেরা ও একটি স্মার্টফোন নিয়ে চলে যায়। ’

শেষ অবস্থান দক্ষিণখান : শাহরিনা কামাল বলেন, ‘পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, দক্ষিণখানে মারুফ সর্বশেষ অবস্থান করছিল বলে তারা প্রযুক্তি ব্যবহার করে জানতে পেরেছে। এরপর আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। মোবাইল ফোনের কোনো সিগন্যাল মিলছে না। তাঁকে না পেয়ে আমরা উৎকণ্ঠার মধ্যে আছি। ’

তিনি  জানান, ২০১২ সালের এপ্রিলে তাঁদের মা মারা যান। এরপর ওই বছর ডিসেম্বরে মারুফ জামানের স্ত্রীর মৃত্যু হয়। পরের বছর তাঁদের বাবা মারা যান। এসব কারণে মারুফ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। স্ত্রীর মৃত্যু ও এক মেয়ে বিদেশে থাকার কারণে সামিহাকে নিয়ে থাকতেন মারুফ। মেয়ে বিদেশে যাওয়ায় বাসায় তিনি ছাড়া দুই গৃহকর্মীই থাকেন। বাবাকে না পেয়ে তাঁর ফোনও বন্ধ পাওয়ার পর চাচাকে ফোন করে বাড়ি ফিরেছিলেন সামিহা। পরদিনও বাবা ফিরে না আসায় থানায় জিডি করেন তিনি।

ডিবি পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, তাঁর অবস্থান খিলক্ষেতের পরেও দেখা গেছে, দক্ষিণখান। ঘটনাটি আসলে রহস্যজনক। তিনি কোথায় গেছেন সেটি পরিবারের কেউই বলতে পারছে না। অপহরণ বলেও মনে হচ্ছে না। কারণ দুই দিন পরও কোনো মুক্তিপণ চাওয়া হয়নি। শত্রুতার তথ্যও মিলছে না। ’

মারুফের ভাই রিফাত জামান বলেন, ‘নিখোঁজ হওয়ার কোনো কিছুর সম্পর্ক খুঁজে পাচ্ছি না। রাজনৈতিক কোনো সংগঠনের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন না। বাসায়ই বেশি থাকতেন। ’ রিফাত জানান, মারুফ জামান ১৯৭৭ সালে সেনাবাহিনীতে সিগন্যাল কোরের ‘ষষ্ঠ শর্ট কোর্সে’ ক্যাপ্টেন হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। পরে শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি ওই চাকরি থেকে চলে আসেন। ১৯৮২ সালে আর্মি থেকেই ফরেন সার্ভিসে যোগ দেন মারুফ। প্রথম দিকে লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি ছিলেন। এরপর কাতার ও ভিয়েতনামের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। মারুফ জামান সর্বশেষ বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্ট্যাডিজে (বিআইএসএস) অতিরিক্ত মহাপরিচালক ছিলেন। এরপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে ২০১৩ সালে অবসর গ্রহণ করেন।

যেভাবে মিলে গাড়িটি : গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ৩০০ ফিট রাস্তায় টহল দিচ্ছিলেন খিলক্ষেত থানার এসআই এম এ জাহেদ। বিকেলে পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে একটি গাড়ির নম্বরসহ এক ব্যক্তি নিখোঁজ হওয়ার কথা শুনেছিলেন তিনি। তাই গাড়িটি দেখে তার কাছে গিয়ে আগে তিনি মালিকের খোঁজ করেন। কাউকে না পেয়ে থানায় ডিউটি অফিসারকে ফোন করে কন্ট্রোল রুমের মেসেজটি পুনরায় শোনেন এসআই। এর গাড়ির নম্বর মিলিয়ে দেখে নিশ্চিত হন এটাই সেই গাড়ি। এভাবেই উদ্ধার করা হয় মারুফ জামানের গাড়িটি। খিলক্ষেত থানার এসআই জাহেদ বলেন, ‘গাড়িটি অক্ষত অবস্থায় রাস্তার পাশে পার্কিং করা ছিল। কোনো দুর্ঘটনা বা অন্য কিছু হয়নি। লকড অবস্থায় ছিল। লোকজনের উপস্থিতিতে গাড়িটি খুলে ভেতরে শুধু গাড়ির কাগজপত্র পাওয়া গেছে। পরে সেসব জব্দ তালিকা করে খিলক্ষেত থানায় নেওয়া হয়েছে। ’

ধানমণ্ডি থানায় জিডির তদন্ত কর্মকর্তা এসআই তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা তাঁকে উদ্ধারের চেষ্টা করছি। তাঁর গাড়িটি ৩০০ ফিট এলাকায় পাওয়া গেছে। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে তাঁর সর্বশেষ লোকেশন উত্তরা ও দক্ষিণখান এলাকায় পাওয়া গেছে। ’

পুলিশের আরেক কর্মকর্তা জানান, অক্ষত অবস্থায় গাড়িটি পাওয়া গেছে মানে তিনি কোনো দুর্ঘটনায় পড়েননি। অথবা গাড়ি চোর বা ছিনতাই চক্রের হাতেও পড়েননি। তাহলে তারা গাড়িটি রাস্তার ধারে ফেলে রাখত না। এর নেপথ্যে অন্য কোনো কারণ রয়েছে।

নিখোঁজ ফারুক জামানের ছোট ভাই রিফাত জামান বলেন, ‘আমার ভাই নিজেই ড্রাইভ করে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। তিনি সুস্থই ছিলেন। আবার বাসায় ফোনও করেছেন। দুর্ঘটনায় পড়েছেন—এমন আশঙ্কা করেছিলাম প্রথমে। এখন তো অন্য কিছু মনে হচ্ছে। ’


মন্তব্য