kalerkantho


তদন্তে নেমে পথ খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশও

নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারে হতাশা

ওমর ফারুক   

৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



তদন্তে নেমে পথ খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশও

রাজধানীর ধানমণ্ডি এলাকা থেকে গত ২৭ আগস্ট নিখোঁজ হয়েছেন ইশরাক আহমেদ। কানাডার মন্ট্রিলের ম্যাগসাই বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী তিনি। তিন মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো কোনো সন্ধান মেলেনি তাঁর। ছেলের চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়েছেন মা নাসরিন আক্তার ও বাবা জামাল উদ্দীন। সন্তানকে ফিরে পেতে প্রায় দিনই পুলিশ ও র‌্যাবের কাছে যাচ্ছেন বাবা। কিন্তু কোনো খবর নেই।

ইশরাক নিখোঁজের পরদিন পরিবারের পক্ষ থেকে ধানমণ্ডি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। এ বিষয়ে খোঁজ নিতে যোগাযোগ করা হলে ধানমণ্ডি থানার ওসি আবদুল লতিফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা ঘটনাটি জানার পর তদন্তে নামি। দেখা গেছে, নিখোঁজ হওয়ার দিন সন্ধ্যায় একটি রেস্টুরেন্টে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে আড্ডা দেন ইশরাক। পরে তিনি এক বন্ধুকে এগিয়ে দিয়ে বাসার দিকে যান। ওই সময় থেকেই তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

ওসি বলেন, ‘নিখোঁজ রহস্য উদ্ঘাটনে ইশরাকের আত্মীয়স্বজন, পরিবারের লোকজন, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কথা বলেছে পুলিশ। আমরা তাঁকে খুঁজে পেতে চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। তাঁর পরিবারের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ আছে আমাদের। তারাও যদি কোনো তথ্য পায়, সেটি যেন আমাদের জানায় তা বলে রেখেছি। ’

সাংবাদিক উৎপল দাস, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোবাশ্বার হাসান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এম এম আমিনুর রহমান ও বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য সৈয়দ সাদাত আহমেদের ক্ষেত্রেও ঘটছে একই ঘটনা। নিখোঁজের পর আর কোনো সন্ধান মিলছে না তাঁদের।

প্রতিটি ঘটনাতেই পরিবারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট থানায় জিডি কিংবা মামলা করা হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ বলছে, নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারের চেষ্টা অব্যাহত আছে। তবে তদন্তে নেমে একটা পর্যায়ে আর এগোতে পারছে না তারা।

পুলিশের ‘এগোতে না পরার’ কথা শুনে হতাশা বাড়ছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোতে। তারা বলছে, কেউ যদি অপরাধীও হয়, তাহলে তাকে লিগ্যাল ফরমেটে নিয়ে গেলে অসুবিধা কি?

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে আটকের পর তাঁরা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে আদালতে সোপর্দ করেন। কিন্তু কেউ নিজে আত্মগোপনে চলে গেলে তাঁকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হয় পুলিশের জন্য।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, একটি থানা এলাকা থেকে সরকারের অন্য কোনো সংস্থা যদি কাউকে উঠিয়ে নেয়, সে ক্ষেত্রে বিষয়টি অনেক সময় থানাকে অবহিত করা হয় না। ফলে পরবর্তী সময়ে ভিকটিমের পরিবার এলে থানা পুলিশের জবাব দেওয়ার মতো কোনো তথ্য থাকে না। এ অবস্থায় মোবাইল ফোন ট্র্যাক করাই একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়ায়। উঠিয়ে নেওয়ার বিষয়টি যদি থানাকে অবহিত করা হয় তাহলে এ সমস্যা থেকে অনেকটা উত্তরণ ঘটানো সম্ভব।

আরেক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, কারো নিখোঁজের খবর পাওয়ার পর আমরা দুটি দিক চিন্তা করি। ওই ব্যক্তি নিজে নিখোঁজের নাটক করছে কি না বা কেউ তাকে অপহরণ করেছে কি না। গোয়েন্দা সংস্থা উঠিয়ে নিলে নিশ্চয়ই কোনো অপরাধের কারণেই নিয়ে যায়। সে পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ আমাদের নেই। প্রত্যেকের কাজের একটা সীমারেখা রয়েছে। ’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা যদি কাউকে কোনো অপরাধ সংশ্লিষ্টতার কারণে আটক করি সে ক্ষেত্রে স্থানীয় থানাকে আগে বা পরে অবহিত করি। আটকের পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আদালতে পাঠানো হয়। আবার এমন অনেকে আছেন, যাঁরা জানেন যে তিনি অপরাধ করছেন এবং গ্রেপ্তার হতে পারেন, সে ক্ষেত্রে তাঁরা মোবাইল ফোন বন্ধ করে দিয়ে নিজেই আত্মগোপনে চলে যান। এসব লোককে খুঁজে বের করা কঠিন। ’

এ বিষয়ে যোগাযোগ করলে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের প্রধান কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘র‌্যাব সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে আটক করার পর আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নিকটস্থ থানায় সোপর্দ করে। র‌্যাব আইনের বাইরে গিয়ে কিছু করে না। ’

যোগাযোগ করলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কেউ নিখোঁজ হলে তাকে উদ্ধারের দায়িত্ব পুলিশের। পুলিশ পারছে না এ কথা বলার সুযোগ নেই। তাদের উন্নত দেশের মতো প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। ’

নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান মিলছে না, তদন্তে নেমে পুলিশও একটা পর্যায়ের পর আর এগোতে পারছে না—এ বিষয়ে জানতে চইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পশ্চিমা দেশের সব প্রযুক্তি আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে রয়েছে। তারা খুঁজে পায় না এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। আমি বলব, তাদের ইচ্ছে ও উদ্যোগের ঘাটতি আছে। ’

জ্যোতির্ময় বড়ুয়া আরো বলেন, ‘আইনে কোথাও গুম বলে শব্দ নেই। আইনানুযায়ী পুলিশ বা কোনো গোয়েন্দা সংস্থা একজন নাগরিককে না জানিয়ে উঠিয়ে নিতে পারে না। এমনকি পুলিশ যে মাঝে মাঝেই কাউকে ডেকে নিয়ে যায় সেটিও আইন অনুযায়ী এখতিয়ার নেই। ’

সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী আরো বলেন, চলমান সমস্যা সমাধানের জন্য রাজনীতির পরিবর্তন দরকার। ব্রিটিশ আমলের আইনের পরিবর্তন দরকার। যাঁরা নিয়ে যাচ্ছেন তাঁরাই যদি খোঁজেন তাহলে কোনো দিনও পাওয়া যাবে না। ’

গত ২৬ আগস্ট রাজধানীর পল্টন থেকে নিখোঁজ হন কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এম এম আমিনুর রহমান। এরপর তাঁর ভাই মিজানুর রহমান পল্টন থানায় জিডি করেন। সেই জিডির পর পুলিশ তদন্তে নামে। কিন্তু দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও তাঁর সন্ধান মেলাতে পারেনি পুলিশ।

এ বিষয়ে পল্টন থানার ওসি মুহাম্মদ মাহমুদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বলার মতো কোনো অগ্রগতি নেই। আমরা তাঁকে খুঁজে পেতে তদন্ত অব্যাহত রেখেছি। ’

বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মহাসচিব এম এম আমিনুর রহমান নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে আমরা প্রতিবাদ সভা, মানববন্ধন করেই যাচ্ছি, করেই যাচ্ছি। কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। আমরা মনে করি, এটি একটি রাজনৈতিক অপহরণ। আমরা তাঁর সন্ধান চাই। ’

গত ১০ অক্টোবর রাজধানীর মতিঝিল এলাকা থেকে নিখোঁজ হন সাংবাদিক উৎপল দাস। তাঁকে খুঁজে পেতে উৎপলের বাবা চিত্তরঞ্জন দাস গত ২৩ অক্টোবর মতিঝিল থানায় জিডি করেন।

মতিঝিল থানার ওসি ওমর ফারুক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা তদন্তে নেমে প্রযুক্তির ব্যবহার করে জানতে পারি উৎপলের মোবাইল ফোনটি সর্বশেষ ধানমণ্ডি এলাকায় সচল ছিল। পরে বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আমরা আর এগোতে পারিনি। আমরা অন্যান্য সংস্থার সহযোগিতা নিচ্ছি। তাঁকে খুঁজে বের করার চেষ্টা অব্যাহত আছে। ’

উৎপলের বাবা চিত্তরঞ্জন দাস কালের কণ্ঠকে জানান, পুলিশ ও র‌্যাবের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন ছেলের সন্ধান পেতে। কিন্তু সবাই শুধু আশার বাণীই শোনাচ্ছেন, কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। উৎপলের কোনো খোঁজ পাচ্ছি না। র‌্যাব হেডকোয়ার্টারে গিয়ে ছেলেকে ফিরে পাওয়ার জন্য আবেদন জানিয়েছি। কিন্তু এখনো কোনো সুখবর পাইনি। ’

গত ৭ নভেম্বর মোবাশ্বার হাসান নিখোঁজের পর তাঁর বাবা খিলগাঁও থানায় জিডি করেন। মোবাশ্বারের নিখোঁজের ঘটনায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পুলিশ তদন্তে নামে। পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, তাঁরা প্রযুুক্তি ব্যবহার করে জানতে পেরেছেন, মোবাশ্বারে মোবাইল ফোনটি আগারগাঁও এলাকায় সর্বশেষ খোলা ছিল। এ কারণে ওই এলাকার রাস্তার পাশে থাকা ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায় তাঁর ছবি রয়েছে কি না সেটি পরীক্ষা করে দেখে পুলিশ। দুটো ক্যামেরায় তাঁর ঘোরাফেরার চিত্র ধরা পড়ে। কিন্তু ওই ক্যামেরার আওতার বাইরে চলে যাওয়ার পর তাঁর আর কোনো ছবি পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে পুলিশ নিশ্চিত হতে পারছে না তাঁকে কারা, কিভাবে নিয়ে গেছে। ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা থেকে ছবি সংগ্রহের পর তদন্তে আর এগোনো যায়নি।

খিলগাঁও থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোস্তাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত মোবাশ্বারের সন্ধান পাইনি। তবে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ’

গত ২২ আগস্ট বিমানবন্দর সড়ক থেকে অপহৃত হন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও এবিএন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সাদাত আহমেদ। তাঁর স্ত্রী ক্যান্টনমেন্ট থানায় অপহরণ মামলা করেন। গতকাল পর্যন্ত তাঁর সন্ধান মেলেনি।

ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি। তাঁর দুটো মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় খুব বেশি দূর এগোনো যায়নি। শুধু আমরা নয়, অন্য সংস্থাও তাঁকে উদ্ধারের চেষ্টা করছে। ’


মন্তব্য