kalerkantho


হিসাব-নিকাশের বছর অন্যান্য দলের জন্যও

এনাম আবেদীন   

১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



হিসাব-নিকাশের বছর অন্যান্য দলের জন্যও

নতুন বছরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশের বড় দুটি দলের মধ্যে সংঘাতের শঙ্কা জনমনে থাকলেও অন্যান্য দল রাজনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। বিশেষ করে আগামী নির্বাচনপূর্ব রাজনীতি তথা নির্বাচন থেকে লাভের ফসল কিভাবে ঘরে তোলা যায় সে হিসাব কষতে শুরু করেছে সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি, বিএনপির প্রধান মিত্র দল জামায়াত, সম্প্রতি গড়ে ওঠা যুক্তফ্রন্ট এবং উদারপন্থী ও বাম ধারার দলগুলো।

জাতীয় পার্টি (জাপা) গত নির্বাচনে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত নানা প্রক্রিয়া ও অবস্থার মধ্য দিয়ে দলটির ৩৪ জন প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। বিএনপির নির্বাচন বর্জনের মুখে দলটি সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এ বছর বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে জাপার অবস্থান হবে এক রকম, আর অংশ না নিলে হবে আরেক রকম।

নির্ভরযোগ্য বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও ভেতরে ভেতরে জাপার অনেক নেতার সঙ্গে আবার বিএনপিরও যোগাযোগ রয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিকভাবে প্রভাবশালী বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে বৃহৎস প্রতিবেশী ভারত কোন দিকে অবস্থান নেয় তা দেখেও জাপা তার অবস্থান ঠিক করবে। দলটির নেতাদের মতে, রাজনীতিতে যাতে জাপা টিকে থাকে এবং দলের নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয় তেমন অবস্থানই শেষ পর্যন্ত নেওয়ার পক্ষে জাপা। অর্থাৎস শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দলটি কোনো ঝুঁকি না নিয়ে টিকে থাকার পক্ষে। ফলে আওয়ামী লীগ বা বিএনপির, নাকি তৃতীয় কোনো ধারার সঙ্গে দলটি যুক্ত হবে তা এ বছরই স্পষ্ট হবে বলে মনে করেন জাপার শীর্ষস্থানীয় নেতারা। 

এ বিষয়ে জাপার কো-চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের কালের কণ্ঠকে বলেন, সুযোগ পেলে জাপা রাজনীতির শূন্যস্থান পূরণ করবে। তিনি বলেন, জাপা দেখবে তার রাজনীতির লাভ কোন জায়গায় থাকলে। আন্দোলন করে বা নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি তার শক্তি ক্ষয় করে ফেললে জাতীয় পার্টি নতুন শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার চেষ্টা করবে। আবার নির্বাচনের আগে জনগণের অবস্থানের বিরুদ্ধেও জাপা যাবে না।

এক প্রশ্নের জবাবে জি এম কাদের বলেন, ‘দেশের অন্যান্য দলও লাভ-ক্ষতির হিসাব কষেই রাজনৈতিক অবস্থান নেবে বলে মনে হয়। বিএনপির সঙ্গে যার সুবিধা ও হিসাব মিলবে সে বিএনপির সঙ্গে এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে যার হবে সে ওই দলের সঙ্গে জোট করবে।’ তবে রক্ষণশীল দলগুলো বিএনপির সঙ্গে এবং উদারপন্থী দলগুলো আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের গুরুত্বপূর্ণ শরিক দল জামায়াত কোন দিকে যাবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিএনপির সঙ্গে ২০ দলীয় জোটে জামায়াত এখনো থাকলেও নির্বাচনের আগে কী হবে, তা নিয়ে বিএনপির অনেকের মধ্যেই সংশয় আছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতের প্রথম সারির নেতাদের ফাঁসি কার্যকর হলেও বিএনপি কোনো অবস্থান না নেওয়ায় জামায়াতের একটি অংশের ক্ষোভ রয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি মনে করে, এই দলটির সঙ্গে জোট করার কারণে তাদের ‘জঙ্গি ও স্বাধীনতাবিরোধী’ তকমা দেওয়ার সুযোগ সরকার পেয়েছে। এ ছাড়া উদারপন্থী দলগুলোর সঙ্গে জোট গড়ার ক্ষেত্রেও জামায়াত বড় বাধা। এই পরিস্থিতিতে জোটে ‘জামায়াত থাকলেও ভালো না থাকলেও ভালো’—এমন মনোভাব এখন বিএনপির অনেক নেতাই পোষণ করেন। দুই দলের মধ্যে সৃষ্ট এই টানাপড়েন নির্বাচনপূর্ব রাজনীতিতে কোন দিকে গড়ায় তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে অনেকেই।

নির্বাচন সামনে রেখে গত ৪ ডিসেম্বর ‘যুক্তফ্রন্ট’ নাম দিয়ে জোট গঠন করেছে চারটি দল—বিকল্পধারা, জেএসডি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ও নাগরিক ঐক্য। জানা যায়, এই দলগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগপন্থী দলও রয়েছে বিএনপিপন্থীও রয়েছে। বিএনপি অবশ্য গত দুই বছর চেষ্টা করেও এই চারটি দলকে তার নেতৃত্বাধীন জোটে ভেড়াতে পারেনি। একইভাবে বিএনপির পথ অনুসরণ করে এই চারটি দল সর্বশেষ ৫ জানুয়ারির নির্বাচনও বর্জন করেছে; কিন্তু সামনের নির্বাচন তারা বর্জন করবে কি না সেটি এখনো স্পষ্ট নয়। নির্বাচন সামনে রেখেই দলগুলো তৎপর হলেও ‘নিরপেক্ষ নির্বাচন’ অনুষ্ঠানের দাবিতেও সোচ্চার রয়েছে; কিন্তু বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে বিএনপি ওই নির্বাচন বর্জন করতে পারে—এমন আলোচনা থাকায় এই চারটি দলের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ আটকে আছে, যা নির্বাচনপূর্ব সময়ে স্পষ্ট হবে।

বিকল্পধারার সভাপতি অধ্যাপক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী মনে করেন, নির্বাচনপূর্ব ২০১৮ সাল এ দেশের ভবিষ্যৎস রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, এ বছরই দেশের রাজনীতির গতিপথ তথা নির্বাচনপূর্ব রাজনীতির মেরুকরণ স্পষ্ট হবে। তবে যুক্তফ্রন্ট কোন দিকে থাকবে তা সময় বলে দেবে।

এক প্রশ্নের জবাবে সাবেক এই রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘প্রথমত নিরপেক্ষ নির্বাচন কতটা নিশ্চিত হয় সেটি আমরা দেখব। জনমত কী বলে সেটাও বিবেচনায় নেওয়া হবে এবং তৃতীয়ত দেশ যাতে আবারও কোনো দুর্নীতিবাজদের কবলে না পড়ে সেদিকেও খেয়াল রাখা হবে।’ সিপিবি, বাসদসহ বামপন্থী বেশির ভাগ দল গত নির্বাচনে অংশ না নিলেও আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পক্ষপাতী। যদিও এই দলগুলো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে এখনো সোচ্চার; কিন্তু তারা মনে করে, ওই দাবি আদায় করার মতো শক্তি বিএনপির নেই। তাই বিএনপিও নির্বাচনে যাবে বলে দলগুলোর নেতারা ধরে নিয়েছেন।

সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য হায়দার আকবর খান রনো কালের কণ্ঠকে বলেন, নতুন বছরের রাজনীতি ও নির্বাচনে চূড়ান্তভাবে কী ঘটবে তা বলার সময় এখনো আসেনি। তবে সিপিবির নির্বাচনে যাওয়ার ইচ্ছা আছে। তিনি বলেন, ‘বিএনপিও নির্বাচনে যাবে বলে মনে হয়।’

রাজনীতিতে নতুন বছরের প্রত্যাশা সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রবীণ এই বামপন্থী নেতা বলেন, ‘আমাদের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষা হলো নতুন বছরে গণতন্ত্র ফিরে আসুক এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান হোক; কিন্তু এই ইচ্ছা পূরণ হওয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।’


মন্তব্য