kalerkantho


‘নারীরাজ্যের’ আট নক্ষত্র আরো উজ্জ্বল

শফিক আদনান, কিশোরগঞ্জ   

৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



‘নারীরাজ্যের’ আট নক্ষত্র আরো উজ্জ্বল

‘নারীরাজ্যের’ আট নক্ষত্র; তাঁদের একজন সুলতানা আক্তার (ডান থেকে দ্বিতীয়) সম্প্রতি বদলি হয়েছেন। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘নারীরাই ভালো। তাঁদের ঘুষ দিতে হয় না। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করেন। রাজনৈতিক এজেন্ডা যদি থাকেও প্রকটভাবে বোঝা যায় না। মমতা ও আন্তরিকতা নিয়ে সাধারণ মানুষের কথা শোনেন। ক্ষমতার জোর দেখান না।’ ভৈরব উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা বা ইউএনও দিলরুবা আহমেদ প্রসঙ্গে এমনই মূল্যায়ন কিশোরগঞ্জের কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. ফারুক মিয়ার। শুধু ভৈরব না! কিশোরগঞ্জ জেলাজুড়েই উপজেলা প্রশাসন নারীর ক্ষমতায়নের বড় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

১৩ উপজেলার আটটিতেই নারী নির্বাহী কর্মকর্তা। তাড়াইল উপজেলায় লুত্ফুন নাহার, পাকুন্দিয়ায় অন্নপূর্ণা দেবনাথ, কটিয়াদীতে ইসরাত জাহান কেয়া, মিঠামইনে তাসলিমা আহমেদ পলি, বাজিতপুরে সোহানা নাসরীন, কুলিয়ার চরে ঊর্মি বিনতে সালাম, ভৈরবে দিলরুবা আহমেদ, করিমগঞ্জে মাহমুদা (বিদায়ী) নারীরাজ্যে একেকজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। জনপ্রতিনিধি থেকে সাধারণ মানুষ, এমনকি খোদ জেলা প্রশাসক পর্যন্ত প্রশংসা করছেন তাঁদের। সবারই পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি। তাই পেয়েছেন গ্রহণযোগ্যতা, হয়ে উঠেছেন মানুষের ভরসার স্থল। এ পর্যন্ত কোনো ইউএনওর বিরুদ্ধে অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ শোনা যায়নি।

গত ৬ অক্টোবর ‘কিশোরগঞ্জ যেন নারীরাজ্য’ শিরোনামে কালের কণ্ঠে প্রতিবেদন ছাপা হওয়ার পর এরই মধ্যে একজন নারী ইউএনও বদলি হয়েছেন। তবে আরেকজন নারীই তাঁর জায়গায় এসেছেন, যা নারীর ক্ষমতায়নেই নতুন করে আলো ফেলে।

ভৈরবে দিলরুবা আহমেদের যোগদানের দুই বছর পূর্ণ হবে আগামী ২ মার্চ। বেশি সময় না হলেও তাঁর নামটি উপজেলায় শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। কালের কণ্ঠকে দিলরুবা আহমেদ বলেছেন, শুরু থেকেই কর্মসংস্থানকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করছেন তিনি। কারণ কাজ ছোট হোক, বড় হোক—না থাকলে মানুষ বিপথে যায়। এ কারণে পরীক্ষামূলকভাবে একটি ইউনিয়নকে দারিদ্র্যমুক্ত করার কর্মসূচি হাতে নিয়ে অনেক দূরই তিনি এগিয়েছেন।

তাড়াইলের ইউএনও সুলতানা আক্তার আড়াই বছর কাজ করে সপ্তাহখানেক আগে বদলি হলেন। তাঁর জায়গায় এসেছেন লুত্ফুন নাহার। তাঁর সম্পর্কে তাড়াইল-সাচাইল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. কামরুজ্জামান মহাজন বললেন, মাত্র কয়েক দিনেই তিনি তাড়াইলবাসীর মন জয় করে নিয়েছেন। কামরুজ্জামান বলেন, ‘এ পর্যন্ত তাড়াইলে চারজন নারী ইউএনও এসেছেন। সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া নারী প্রশাসকের সঙ্গে কাজ করে আমরা স্বস্তিতেই ছিলাম।’ লুত্ফুন নাহারও আশাবাদী, তিনি সবাইকে নিয়ে স্বচ্ছতার সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারবেন। ‘এরই মধ্যে সবার সহযোগিতা পাওয়া শুরু করেছি।’ বলছিলেন তিনি।

এক বছরও হয়নি পাকুন্দিয়ায় যোগ দিয়েছেন ইউএনও অন্নপূর্ণা দেবনাথ। কেউ কেউ তো তাঁকে দেবী দুর্গার সঙ্গে তুলনা করে। বলে, ইউএনওর ১০টি হাত! জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সরকার শামীম আহমেদ বলেন, ‘সবারই কমবেশি দোষত্রুটি থাকে। এমন শতভাগ সৎ কর্মকর্তা আমি আর দেখিনি। মাটির মানুষ।’ ‘আমার কার্যালয় সব সময় সবার জন্য খোলা’ মন্তব্য করে কালের কণ্ঠকে অন্নপূর্ণা দেবনাথ কিছু সমস্যার কথাও বলেন। ‘এখানে রাজনীতি নিয়ে মাঝেমধ্যে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সামলাতে অনেক সময় বেগ পেতে হয়। কিন্তু আমি বিবদমান পক্ষগুলোকে এসসঙ্গে করে কাজ করি। সবাই সহযোগিতাও করে।’ বাংলাদেশের নারীরা আরো অনেক দূর যাবে—এমন বিশ্বাস পোষণ করেন অন্নপূর্ণা।

কুলিয়ার চরের ইউএনও ড. ঊর্মি বিনতে সালামও নারীর ক্ষমতায়নকে এগিয়ে নিতে চান। ‘কোনো পুরস্কার বা স্বীকৃতির লোভে আমি কাজ করি না। আমার প্রধান লক্ষ হলো এখানকার নারী, বিশেষ করে যুব নারীদের আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তোলা। মানসম্পন্ন শিক্ষাটা নিশ্চিত করা। সেই লক্ষ্যে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৩০০ ছাত্রীকে বাইসাইকেল দেওয়া হয়েছে।’ কালের কণ্ঠকে বলেন ড. ঊর্মি। তিনি জানান, জনপ্রতিনিধি থেকে এলাকাবাসী সবাই তাঁকে সহযোগিতা করে।

হাওর অধ্যুষিত মিঠামইনের প্রথম নারী ইউএনও তাসলিমা আহমেদ পলি। এসেছেন দুই বছরেরও বেশি সময় হয়ে গেছে। পুরুষ কর্মকর্তরাই যেখানে দুর্গম এ এলাকায় থাকতে চান না, তিনি কোনো আক্ষেপ ছাড়াই সেবা দিয়ে চলেছেন। উপজেলার বৈরাটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাহাব উদ্দিন শাহাব বলেন, ‘পলি আমার দেখা সেরা ইউএনও। একজন নির্লোভ ও কাজপাগল মানুষ। আসলে বড় পদে নারীরা থাকলেই ভালো।’ পলি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চেষ্টা করছি, সহযোগিতাও পাচ্ছি।’ তিনি মনে করেন, সৎ চিন্তা থাকলে উদ্যোগগুলোও সফল হয়।

কটিয়াদীর ইউএনও হিসেবে চার মাস ধরে কর্মরত আছেন ইসরাত জাহান কেয়া। তিনি বলেন, ‘কেবল নারী হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে আমার লক্ষ্য সেবা দেওয়া। সবাই সহযোগিতাও করছে।’ তাঁর সম্পর্কে বনগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল হোসেন মিলনের মূল্যায়ণ হচ্ছে, ‘উনি কাজের লোক। চেয়ারম্যানদের যথেষ্ট মূল্যায়ন করেন। সমন্বয় ও পরামর্শ করে কাজ করতে পছন্দ করেন।’ 

সোহানা নাসরীন বাজিতপুরে এসেছেন চার মাসের মতো হয়েছে। ‘এলাকাবাসী খুশি থাকলে আমিও খুশি’—এ হচ্ছে তাঁর কাজের একটি কৌশল। তিনি বলেন, ‘খুব ব্যস্ত থাকতে হয়। পরিবারকে ওইভাবে দেখভাল করা যায় না। এতে আমার কোনো দুঃখ নেই। মানুষের জন্য কিছু করছি—এটাই আমার আত্মতৃপ্তি।’ বলিয়ার্দী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শফী উদ্দিন নতুন ইউএনও প্রসঙ্গে বললেন, ‘খুব ভালো, সৎ মানুষ, মিলেমিশে কাজ করছেন আমাদের সঙ্গে।’

করিমগঞ্জের ইউএনও মাহমুদা মাত্র ৯ মাসে তিনি উপজেলা প্রশাসনে স্বচ্ছতা আনতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর সততা ও নিষ্ঠা নিয়ে কারো কোনো অভিযোগ নেই। উপজেলার গুজাদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, খুব চমৎকার কর্মকর্তা মাহমুদা। তিনি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির স্বার্থে কাউকে কোনো ছাড় দিতেন না। এক বিন্দু দুর্নীতিকেও প্রশ্রয় দেননি তিনি। সম্প্রতি বদলির আদেশ পেয়েছেন মাহমুদা, তখন নতুন কেউ না আসায় এখানেই কর্মরত রয়েছেন। তাঁর আগেও ছিলেন একজন নারী ইউএনও—আসমা আরা বেগম।

জেলা প্রশাসক মো. আজিমুদ্দিন বিশ্বাস বলেন, জেলার ১৩ উপজেলার আট উপজেলায় নারী ইউএনওরা যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে কাজ করে যাচ্ছেন। সবাই ভালো করছেন। এখন পর্যন্ত কোথাও কোনো সমস্যা হয়নি।

ইউপি চেয়ারম্যান ফারুকের বিশ্বাস, প্রশাসনে বেশি করে নারীমুখ যোগ করার মাধ্যমেই বড় পরিবর্তন সম্ভব, ‘কিচ্ছু দরকার নেই। সারা দেশের সব কটি উপজেলায় ওনার মতো ইউএনও বসান, বদলে যাবে বাংলাদেশ। ওনার (দিলরুবা আহমেদ) সততা, কাজের প্রতি একনিষ্ঠতা, সবাইকে নিয়ে কাজ করার প্রবণতা—এটা শিক্ষণীয় ব্যাপার।’

 

 


মন্তব্য