kalerkantho


মামলাজট কমাতে সব রকম উদ্যোগ আছে

৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মামলাজট কমাতে সব রকম উদ্যোগ আছে

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। তিনি একজন প্রথিতযশা আইনজীবীও। পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি রয়েছে তাঁর। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় ছিলেন রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী। এ ছাড়া জাতীয় চার নেতা হত্যা মামলায় প্রধান আইজীবী, ২০০৭ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান আইনজীবী এবং পিলখানা হত্যা মামলাসহ অসংখ্য মামলায় অন্যতম আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর আইন ও বিচার বিভাগে দৃশ্যমান অগ্রগতি ঘটেছে। বিচার বিভাগের চলমান ইস্যুসহ নানা বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন আশরাফ-উল আলম রেজাউল করিমের সঙ্গে।

কালের কণ্ঠ : আদালতগুলোতে মামলাজট প্রকট। এটি কমাতে কী ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার?

আনিসুল হক : মামলাজট কিন্তু আমাদের দেশে যে রকম সমস্যা, সারাবিশ্বে একই সমস্যা। কিন্তু তাই বলে আমি বলছি না যে আমাদের দেশে এ সমস্যা নেই। মামলাজট নিরসনে আমরা অনেক অলটারনেটিভ (বিকল্প) চিন্তা করছি। তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি অলটারনেটিভ হচ্ছে—এক. অধস্তন আদালতে বিচারক নিয়োগ দেওয়া। আমরা বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করেছি। বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন বিচারক নিয়োগের কাজে নিয়োজিত। সেখানে বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। আমরা প্রয়োজন অনুযায়ী অবকাঠামো তৈরি করে দিয়েছি। দুই. আমরা চেষ্টা করছি অলটারনেটিভ ডিসপিউট রেজুলেশন (এডিআর বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি) বাস্তবায়নের। আমরা জনগণকে বোঝানোর চেষ্টা করছি যেন ছোটখাটো ব্যাপারে কোর্টে না গিয়ে বাইরে আপস-মীমাংসা করে ফেলে। সে জন্য জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থাকে শক্তিশালী করা হয়েছে। আরেকটি কথা যেটি না বললে অন্যায় হবে, সেটি হলো আমাদের অধস্তন আদালতের বিজ্ঞ বিচারকরা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করার ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে অত্যন্ত আন্তরিক। আমি নিজে জানি, তারা মামলার সংখ্যা কমিয়ে এনে সুপ্রিম কোর্টকে জানাচ্ছেন। সেখান থেকে পুরনো মামলা কমানোর খবর আমরা পাচ্ছি। এ ছাড়া মামলাজট নিরসনে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে বেশ কিছু মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে রাজন হত্যা মামলার বিচারের কথা বলতে পারি। দেখা যায়, দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তিতে বেশি বিলম্ব ঘটে। এ বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

কালের কণ্ঠ : ফৌজদারি মামলায় এডিআর প্রয়োগ করার বিষয়ে কী বলবেন?

আনিসুল হক : ফৌজদারি মামলায় এডিআর প্রয়োগ করা যায়। ফৌজদারি কার্যবিধিতেই বলা আছে কোন মামলাগুলো আপসযোগ্য ও কোনগুলো নয়। যে মামলাগুলো মীমাংসা করা যায় সেগুলো যদি আদালতে না গিয়ে উভয় পক্ষ মীমাংসা হয়ে যায় তাহলে আদালতের ওপর চাপ কমে যাবে।

কালের কণ্ঠ : বিচার বিভাগকে দুর্নীতিমুক্ত করার জন্য কী ধরনের উদ্যোগ নিচ্ছেন আপনারা?

আনিসুল হক : এ জন্য অনেক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথম উদ্যোগ হচ্ছে, যারা দুর্নীতি করে এবং হাতেনাতে তার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা। দুর্নীতি যাতে না হয়, সে জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অধস্তন আদালতের বিচারকদের বেতন দ্বিগুণ করেছেন। সে ক্ষেত্রে আমরা অনেক ম্যাকানিজম ব্যবহার করছি যাতে দুর্নীতি না হয়।

কালের কণ্ঠ : বিচার বিভাগের মানোন্নয়নে সরকার কী কী পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে?

আনিসুল হক : বিচার বিভাগের মানোন্নয়নে সরকার আন্তরিক। এ জন্য নানা পদক্ষেপ হাতে নেওয়া হয়েছে। একটি সুদক্ষ বিচার বিভাগের জন্য প্রয়োজন সুদক্ষ মানবসম্পদ। এই মানবসম্পদের উন্নয়নের জন্য বিচারকদের স্থানীয় প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বিদেশি প্রশিক্ষণ নিতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সুষ্ঠুভাবে, দ্রুততা ও দক্ষতার সঙ্গে বিচারকাজ এবং বিচারব্যবস্থাপনা পরিচালনার লক্ষ্যে এরই মধ্যে অধস্তন আদালতের বিচারকদের বিদেশে প্রশিক্ষণসহ উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরকার ২০১৯ সালের মধ্যে ৫৪০ জন্য বিচারককে অস্ট্রেলিয়ায় ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈদেশিক প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষা প্রদানের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এই প্রকল্পের আওতায় এরই মধ্যে ৬৩ জন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে এসেছেন এবং ১৬০ জন প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের সরকারি আদেশ পেয়েছেন। দেশের অধস্তন আদালতের এক হাজার ৫০০ বিচারককে আদালত ব্যবস্থাপনা বিষয়ে দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য ভারত পাঠানোর ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় দুটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। পাঁচ বছর মেয়াদি এ সমঝোতা স্মারকের ফলে ভারতের ভুপালে অবস্থিত ন্যাশনাল জুডিশিয়াল একাডেমিতে আমাদের বিচারকদের প্রশিক্ষণ কাজ শুরু হয়ে গেছে। এরই মধ্যে ৭৬ জন বিজ্ঞ বিচারক প্রশিক্ষণ শেষ করে দেশে ফিরেছেন। জাইকার অর্থায়নে জাপানে বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং ১৫ জন বিচারক প্রশিক্ষণ শেষ করে দেশে ফিরেছেন। এ ছাড়া বিচারকদের নেদারল্যান্ডসে প্রশিক্ষণের জন্য নেদারল্যান্ডস সরকারের একটি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। 

আপনারা জানেন, ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর বিচার বিভাগ পৃথক্করণের যে আদেশ দেওয়া হয়েছিল তা বাস্তবায়নের জন্য তখন প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ছিল না। এই অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে আর্থিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসির স্থান সংকুলানের জন্য ২০০৯ সালে দেশের ৬৪টি জেলায় একটি করে সিজেএম আদালত ভবন নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এর প্রথম পর্যায়ে দুই হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪২টি জেলায় ১২তলা ভিতবিশিষ্ট সিজেএম আদালত ভবন নির্মাণ চলছে। এ প্রকল্প দ্রুততার সঙ্গে বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং এরই মধ্যে ২০ জেলায় নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। এগুলোতে  বিচারকাজ চলছে। ১০টি জেলায় নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে, যা মার্চ ২০১৮-এর মধ্যে চালু করা সম্ভব হবে। ১০ জেলায় নির্মাণকাজ মাঝামাঝি পর্যায়ে রয়েছে। ভূমিসংক্রান্ত জটিলতা ও মামলার কারণে দুটি জেলায় নির্মাণকাজ শুরু করতে বিলম্ব হচ্ছে। অবশিষ্ট ২২ জেলায় আদালত ভবন নির্মাণের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে এবং এতে ভবন নির্মাণের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে।

আমাদের বিচার বিভাগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত হচ্ছে জেলা ও দায়রা জজ আদালত। সেই বিবেচনায় ২০১৪ সালে ১৬২ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে ২৮টি জেলায় পূর্বের দোতলা জেলা জজ আদালত ভবনগুলো তিন-চারতলা পর্যন্ত ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এ প্রকল্পের  বাস্তবায়ন ৯৯ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। আমরা এখন অবশিষ্ট জেলাগুলোতে নতুন জেলা জজ আদালত ভবন নির্মাণ বা আগের ভবনগুলোর ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের লক্ষ্যে প্রকল্প গ্রহণ করছি। এ ছাড়া বিচারকার্য মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে ৯টি জেলায় ১৫টি চৌকি আদালত স্থাপন করা হয়েছে। জরাজীর্ণ চৌকি আদালতগুলোর অবকাঠামো নির্মাণ করার জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। জেলা পর্যায়ে বিচারকদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও হাতে নেওয়া হয়েছে। 

কালের কণ্ঠ : বিচারব্যবস্থা ডিজিটাইজড করার মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় ন্যায়বিচার পৌঁছানোর জন্য আরো কী ধরনের পদক্ষেপ রয়েছে সরকারের?

আনিসুল হক : বিচারব্যবস্থা ডিজিটাইজেশনের কাজ চলছে। এটি একটু সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। শিগগিরই বিচারপ্রার্থীরা এর ভালো ফল পাবে। 

কালের কণ্ঠ : সুুপ্রিম কোর্টে বিচারক সংখ্যা আগের তুলনায় কম। বিচারক নিয়োগের ব্যাপারে সরকারের চিন্তা কী?

আনিসুল হক : সুপ্রিম কোর্টে বিচারক সংকট রয়েছে, এটি বলা যাবে না। হাইকোর্ট ডিভিশনের ১০-১৫ জন বিচারক অবসরে যাওয়ায় বিচারক কমেছে। শিগগিরই বিচারক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

কালের কণ্ঠ : উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগের কোনো আইন বা নীতিমালা এখনো হয়নি।

আনিসুল হক : এ নিয়ে কাজ চলছে। আগামী বছর নাগাদ এসংক্রান্ত আইন করা হবে।

কালের কণ্ঠ : আপনি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার প্রধান আইনজীবী ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সবার শাস্তি নিশ্চিত করা যায়নি এখনো।

আনিসুল হক : বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত বিদেশে পালিয়ে থাকা দুই খুনিকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা অব্যাহত আছে। পলাতক দুই খুনির একজন নূর চৌধুরী কানাডায় পালিয়ে আছে। কিন্তু কানাডা আইনের মাধ্যমে তাদের দেশে মৃত্যুদণ্ড তুলে দিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে—এমন অপরাধী তাদের দেশে গেলে তাকে ফেরত পাঠায় না। আমরা এই আইনের প্যাঁচে পড়ে গেছি। তবে তাকে ফেরত আনার চেষ্টা অব্যাহত আছে। আরেক খুনি রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে আছে। আমরা যেভাবেই পারি বঙ্গবন্ধুর খুনিদের দেশে এনে সর্বোচ্চ আদালতের দেওয়া রায় কার্যকর করব ইনশাআল্লাহ।

কালের কণ্ঠ : একাত্তরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী চৌধুরী মঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানকে দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করার উদ্যোগ কেমন?

আনিসুল হক : পলাতক যুদ্ধাপরাধীদের দেশে ফেরাতে সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে সরকার। দুজন যুদ্ধাপরাধী যাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাজা দিয়েছে তারা যুক্তরাজ্যে আছে। এই দুজন যুদ্ধাপরাধীকে ফেরত আনার বিষয়ে যুক্তরাজ্যের সঙ্গে আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু হবে শিগগিরই। আমি আর বিশেষ কিছু বলব না, কারণ তারা ওখান থেকে গা ঢাকা দিক এটা আমরা নিশ্চয়ই চাইব না। আমরা যে লক্ষ্যে কাজ করছি সেটা যেন সফল হয়।

কালের কণ্ঠ : দণ্ডিত মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে একাত্তরের ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের দাবি রয়েছে। এ জন্য একটি আইন করার কথা আপনিও বলেছেন। কাজ কতদূর?

আনিসুল হক : যুদ্ধাপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার জন্য নতুন আইন করার কথা ভাবছে সরকার। এ নিয়ে কাজ বেশ এগিয়েছে। আমরা জনগণের সরকার। জনগণের কাছ থেকে যে দাবি উঠেছে তা বাস্তবায়ন করতে চায় সরকার। জনগণের মুখে হাসি ফোটাতেই এ সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার আসনে বসেছে। আমরা চাই খুব দ্রুততার সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের সম্পত্তির বিষয়ে আইনটি প্রণয়ন করতে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের মধ্যে একটি সুযোগ করা যেতে পারে বা নতুন আইন করা যেতে পারে। আইনগত দিক পর্যালোচনা করেই তা করা হবে।

কালের কণ্ঠ : একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দল হিসেবে জামায়াতের বিচার কতদূর?

আনিসুল হক : এ জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনটি সংশোধনের কাজ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। দ্রুতই একটি সুখবর দিতে পারব।

কালের কণ্ঠ : জঙ্গিরা জামিন পেয়ে যায়। তাদের জামিন ঠেকাতে সরকারের উদ্যোগ কেমন?

আনিসুল হক : এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে বেশি সজাগ থাকতে হবে। দেশ, জাতি ও দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কথা মনে রেখে জঙ্গিদের জামিন দেওয়ার বিষয়ে বিচারকদেরও কঠোর হতে হবে। বিচার বিভাগ স্বাধীন। এই স্বাধীনতার ওপর কোনো হস্তক্ষেপ না করে আমি শুধু বিচারকদের প্রতি অনুরোধ করব, দেশ ও জাতি আমাদের সকলের। আর দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার একটা বিরাট দায়িত্ব কিন্তু বিচার বিভাগেরও। সেদিকে লক্ষ্য রেখে বিচার বিভাগকে তার সুবিবেচনায় জঙ্গিদের জামিনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠিন হতে হবে।

কালের কণ্ঠ : দেশের রাজনীতিতে বিএনপির অবস্থান কেমন বলে আপনার মনে হয়।

আনিসুল হক : ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা এবং ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালিয়ে শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টার দুটি  ঘটনার একটিতে জিয়াউর রহমান নিজে এবং অন্যটিতে তাঁর পরিবার জড়িত। মামলার রায়েও আছে এবং শুনানির সময়ও এসেছে যে বঙ্গবন্ধু হত্যার সুবিধাভোগী জিয়াউর রহমান। নেপথ্যের ভূমিকার জন্য জিয়ার বিচার করা যায়নি একটি মাত্র কারণে। আর তা হলো আইন অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির বিচার করার সুযোগ নেই। ২১ আগস্টের হামলায়ও জিয়া পরিবার, জিয়াউর রহমানের বড় ছেলে তারেক রহমান জড়িত। ১৫ আগস্টের মতো ২১ আগস্টের মামলাও ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ইনডেমনেটি আইন বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারকাজ শুরু হয়েছে। এটি করতে ২১ বছর সময় লেগেছে। খন্দকার মোশতাক ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ বন্ধ করেছিলেন। পরে জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোতে পদায়ন করেন এবং ইনডেমনিটি অর্ডিনেন্সকে আইনে পরিণত করেন। জিয়া, এরশাদ ও খালেদা জিয়ার সরকার ওই খুনিদের বিচারের উদ্যোগ নেয়নি; বরং তাদের পদোন্নতি দিয়েছে। এরশাদ খুনি রশিদকে ফ্রিডম পার্টি করার সুযোগ দিয়েছেন। আর খালেদা জিয়া ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা বানান ওই খুনি রশিদকে।

কালের কণ্ঠ : তারেক রহমান অর্থপাচারের মামলায় নিম্ন আদালতে খালাস পেয়েছেন, সরকার হাইকোর্টে আপিল করার পর সাজা হলো। বিএনপি একটি কথা বলে যে সরকার প্রভাব বিস্তার করে হাইকোর্টকে এ রকম রায় দিতে বাধ্য করেছে।

আনিসুল হক : আমি এই মামলার প্রত্যক্ষদর্শী। আমি বলব উল্টোটা। তারেক রহমানের দুর্নীতি, মানি লন্ডারিংসহ সবকিছু প্রমাণ হওয়া সত্ত্বেও তারা মোতাহার হোসেনের মতো একজন জজকে কিনে নিয়ে তারেক রহমানকে খালাস করিয়েছিলেন। গিয়াস উদ্দিন আল মামুনকে সাজা দিয়েছেন। হাইকোর্ট বিভাগ সেই ভুল ঠিক করে দিয়েছেন। এটি হাইকোর্ট বিভাগের ক্ষমতার মধ্যে, এখানে কোনো অন্যায় হয়নি। যদি তাই হতো, যদি আমরা জোর করে সাজার ব্যবস্থা করতাম তাহলে নিম্ন আদালতকে দিয়েই করাতে পারতাম। তারেক রহমানকে কি আমরা দেশে আসতে মানা করেছি? তারেক রহমান এসে আপিল করলেন না কেন? আপিল বিভাগে আপিল করলে, তিনি নির্দোষ হলে তা প্রমাণ করতে পারতেন। একটি ফোরাম ছিল। সেই ফোরামে তো যাননি তারেক রহমান। তার মানে, তিনি দোষী এবং বিচারের মুখোমুখি হতে তাঁর সাহস নেই। একটি বিষয় খেয়াল করুন, বিচারিক আদালতের বিচারককে প্রভাবিত করে তারেক রহমান তখন নিজেকে খালাস করিয়েছিলেন এবং খালাস করানোর পরে সঙ্গে সঙ্গে কিন্তু সেই বিচারক বাংলাদেশ থেকে চলে যান।

কালের কণ্ঠ : আইনমন্ত্রী হিসেবে দেশের বর্তমান মানবাধিকার পরিস্থিতি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন।

আনিসুল হক : দেশে মানবাধিকার সুরক্ষা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে বেশ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সরকার দেশের সব নাগরিকের মানবাধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাই জনগণের মানবাধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে আমাদের মানবাধিকার পরিস্থিতির ক্রমান্বয়ে উন্নতি ঘটছে। সংবিধান অনুযায়ী দেশের সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী হলেও দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী আর্থিক অসচ্ছলতা ও অন্যান্য কারণে এই অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। গরিব-অসচ্ছলদের এই অধিকার প্রতিষ্ঠায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার আইনগত সহায়তা প্রদান আইন প্রণয়ন করেছে। সেই আইনের অধীন জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা গঠন করা হয়েছে। প্রতিটি জেলায় তার কার্যালয় রয়েছে। এই সংস্থা বিনা খরচে দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের আইনি সহায়তা প্রদান করে তাদের আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকার প্রতিষ্ঠা করছে। বর্তমান সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে আমাদের মানবাধিকার পরিস্থিতির ক্রমান্বয়ে উন্নতি ঘটছে। এ ক্ষেত্রে বিচার বিভাগেরও অবদান রয়েছে। মানবাধিকার সুরক্ষায় সরকার কিছু সমস্যা মোকাবেলা করলেও সবার সহযোগিতায় তা অতিক্রম করে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া হবে। দেশের কোথাও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেলে সরকার তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। কারণ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা। বর্তমান সরকার সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ করতে বদ্ধপরিকর। যেখানে এর ব্যত্যয় ঘটবে, সেখানেই সরকার শক্ত হাতে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

কালের কণ্ঠ : আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলো নিবন্ধন অধিদপ্তর। এটির কতটুকু উন্নয়ন হয়েছে?

আনিসুল হক : প্রতিষ্ঠানটি রেজিস্ট্রেশন খাত থেকে প্রতিবছর প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে থাকে। অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটির পেছনে বছরে ব্যয় হয় মাত্র ২০০ কোটি টাকা। এটা বাদ দিলে বছরে ১০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দিচ্ছে তারা। অথচ এই প্রতিষ্ঠান অবহেলিত ছিল। বর্তমান সরকারের আমলে এর উন্নয়নে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানটি কিন্তু আগে পরিদপ্তর ছিল। তা আমরা অধিদপ্তরে উন্নীত করেছি। সাব-রেজিস্ট্রারদের জন্য আগে কখনো প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল না। বর্তমান সরকারের আমলে তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাদের বিচার প্রশাসন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষণ প্রদানের পাশাপাশি বাংলাদেশ লোক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া বিশ্বের উন্নত দেশের রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থাসংক্রান্ত অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য তাদের পর্যায়ক্রমে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে।

কালের কণ্ঠ : বর্তমানে দেশের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো রোহিঙ্গা সমস্যা। এ নিয়ে কী বলতে চান।

আনিসুল হক : মিয়ানমারকে অবশ্যই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে হবে। এ ছাড়া মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরাতে সংশ্লিষ্ট দেশের ওপর চাপ অব্যাহত রাখুন। সরকার মানবাধিকারের কথা চিন্তা করে মিয়ানমার থেকে নির্যাতনের মুখে আগত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে। এটা সাময়িক সমাধান। তাদের অবশ্যই নিজ দেশে ফিরে যেতে হবে। যে প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে আশা করি তাতে সফলতা আসবে।

কালের কণ্ঠ : আপনার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে একটি প্রশ্ন। আইন পেশা ছেড়ে রাজনীতিতে, একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পালন করছেন। কেমন লাগছে?

আনিসুল হক : আমার রক্তে রাজনীতি রয়েছে। আমার বাবা রাজনীতি করতেন। তিনি পার্লামেন্ট মেম্বার ছিলেন। সে ক্ষেত্রে রাজনীতিটা আমার পারিবারিক সূত্রেই। আমি মনে করেছি একটি সময়, দেশকে কিছু দেওয়ার। সেই ইচ্ছাটা কমবেশি পূরণ হয়েছে। সে জন্য আমি রাজনীতিতে যোগ দিয়ে কসবা-আখাউড়া থেকে এমপি হয়েছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছেন। দায়িত্ব পাওয়ার পর আমার মনে হয়েছে, আমার দায়িত্ব আরো বেড়ে গেছে। দেশকে আরো কিছু দিতে হবে। আমি সেই চেষ্টাই করে যাচ্ছি।

কালের কণ্ঠ : আপনাকে ধন্যবাদ।

আনিসুল হক : আপনাদেরও ধন্যবাদ।


মন্তব্য