kalerkantho


প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস

অনশন ভাঙলেন নন-এমপিও শিক্ষকরা

বিসিএস সমিতির কর্মসূচিও স্থগিত

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



অনশন ভাঙলেন নন-এমপিও শিক্ষকরা

নন-এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের ম্লান মুখ আর সজল চোখ মুহূর্তেই পাল্টে গেল। প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে দাবি পূরণের আশ্বাস পেয়ে তাঁদের চোখে-মুখে এখন আনন্দের ঝিলিক। ছবি : কালের কণ্ঠ

পাঁচ দিনের অবস্থান কর্মসূচি এবং ছয় দিনের আমরণ অনশনের পর শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশ্বাস পেলেন নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীরা। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে আশ্বাস পেয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে চালিয়ে আসা আমরণ অনশন গতকাল শুক্রবার প্রত্যাহার করেছেন তাঁরা।

প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব সাজ্জাদুল হাসান ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইন গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছে প্রধানমন্ত্রীর বার্তা পৌঁছান। এরপর অনশনরত শিক্ষকদের শরবত পান করিয়ে অনশন ভাঙান তাঁরা।

টানা ১১ দিন আন্দোলনের পর প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস পেয়ে নানাভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন শীতে কাবু হওয়া শিক্ষকরা; ভুলে গেছেন সব ক্লান্তি। কেউ কেউ ‘জয় বাংলা’ বলে আবার কেউ ‘মা জননী শেখ হাসিনা’ বলে স্লোগান দেন। অনেকে কেঁদেছেন আনন্দের কান্নাও।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইন জানান, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ নন-এমপিও শিক্ষকদের অনশনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন।

নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি অধ্যক্ষ গোলাম মাহামুদুন্নবী ডলার বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা আমাদের জানা নেই। আমরা এমনটাই চেয়েছিলাম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একান্ত সচিব এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আমাদেরকে প্রধানমন্ত্রীর বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী আমাদের দাবির বিষয়টি জেনেছেন এবং এমপিভুক্তির উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।’

সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ ড. বিনয় ভূষণ রায় বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসে আমরা অনশন প্রত্যাহার করলাম। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার প্রতি আমরা অশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করছি।’

এর আগে গত মঙ্গলবার অনশনরত শিক্ষকদের মধ্যে উপস্থিত হয়ে নীতিমালার ভিত্তিতে এমপিওভুক্তির আশ্বাস দেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। অর্থমন্ত্রীর বরাত দিয়ে সে সময় শিক্ষামন্ত্রী বলেছিলেন, ‘অর্থমন্ত্রী বিদেশ যাওয়ার আগে তাঁকে বলে গেছেন নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে, শেষ হলেই এমপিওভুক্তির উদোগ নেওয়া হবে। এটা আমাদের বিজয়।’ কিন্তু ওই সময় শিক্ষকরা মন্ত্রীর আশ্বাস নাকচ করে দেন। সংগঠনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনশন চালিয়ে যাওয়ারও ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।

অনশনরত শিক্ষকরা তখন বলেছিলেন, এমপিওভুক্তির জন্য প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে ঘোষণা শুনতে চান তাঁরা। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের আশ্বাসে তাঁরা ভরসা পাচ্ছেন না।

সংগঠনের সভাপতি বলেছিলেন, ২০১০ সাল থেকে তাঁরা নীতিমালার কথা শুনে আসছেন। মন্ত্রীর বিভ্রান্তিকর তথ্যে ও আশ্বাসে তাঁরা আর বিশ্বাস করেন না। তাই তাঁরা আমরণ অনশন কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন।

এমপিওভুক্তির দাবিতে গত ২৬ ডিসেম্বর থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীরা। টানা পাঁচ দিন অবস্থান কর্মসূচির পর গত রবিবার থেকে আমরণ অনশন কর্মসূচিতে যান তাঁরা। অনশনে শতাধিক শিক্ষক-কর্মচারী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে জানা গেছে। তাঁদের অনেকে এখনো হাসপাতালে ভর্তি আছেন। আবার কেউ কেউ প্রেস ক্লাবের সামনের ফুটপাতেই স্যালাইন লাগিয়ে অনশন চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে সরকার স্বীকৃত নন-এমপিও স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার সংখ্যা পাঁচ হাজার ২৪২টি। এতে ৮০ হাজারের মতো শিক্ষক-কর্মচারী চাকরি করছেন। কিন্তু তাঁরা সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। এমনও শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন যাঁরা ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে বিনা বেতনে চাকরি করছেন। কারণ ২০১০ সালের পর থেকে সরকার আর কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করেনি। 

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির দাবিতে এর আগে শিক্ষকদের জোরদার আন্দোলন শুরু হয় ২০১৩ সালে। ওই বছরের ১০ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচি পালনের সময় পুলিশ পিপার স্প্রে ব্যবহার করে তাঁদের সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। এরপর একই বছরের ১৫ জানুয়ারি ন্যাম ভবনের সামনে অনশন কর্মসূচি করতে গেলে মানিক মিয়া এভিনিউর পশ্চিম পাশে পুলিশ বাধা দেয়। এতেও জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ। এরপর শিক্ষকরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে গিয়ে অবস্থান করে। ওই সময় শিক্ষামন্ত্রীর আশ্বাসে তাঁরা ফিরে গিয়েছিলেন।

এরপর ২০১৫ সালের অক্টোবরে প্রথমে শহীদ মিনারে সমাবেশ এবং পরে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অনশন পালন করে ‘নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশন’। তখনো শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এমপিওভুক্তির আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। ২০১৬ সালেও একাধিকবার রাজপথে নামেন শিক্ষকরা। তাতেও কাজ না হওয়ায় ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আবারও অবস্থান নেন তাঁরা। তখনো শিক্ষামন্ত্রীর আশ্বাসে শিক্ষকরা ফিরে যান বিদ্যালয়ে। তবে এবার শিক্ষকরা আর শিক্ষামন্ত্রীর কাছে নয়, সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস চেয়েছিলেন। টানা ১১ দিন আন্দোলনের পর গতকাল প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস পেয়ে আশায় বুক বেঁধে বাড়ি ফিরে গেলেন শিক্ষকরা।

বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতিরও কর্মসূচি স্থগিত : আত্মীকরণের মাধ্যমে সরকারি হওয়া কলেজশিক্ষকদের নন-ক্যাডার রাখার দাবিতে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির পূর্বঘোষিত তিন দিনের কর্মবিরতির কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে। আজ শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত তাদের কর্মবিরতিতে যাওয়ার কথা ছিল।

গতকাল শুক্রবার সমিতির এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘জাতীয়করণের লক্ষ্যে ঘোষিত বেসরকারি কলেজশিক্ষকদের ক্যাডারবহির্ভূত রাখার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন করেছেন। এ বিষয়টি শিক্ষামন্ত্রীও আমাদের অবহিত করেছেন। এই পরিস্থিতিতে আমাদের কর্মসূচি পালন না করার জন্যও মন্ত্রণালয় থেকে অনুরোধ করা হয়েছে। আর সমিতিও জাতীয়কৃত শিক্ষকদের ক্যাডারবহির্ভূত রেখে বিধিমালা জারি করার জন্য কর্তৃপক্ষকে আরো কিছুটা সময় দিতে চায়। এ পরিপ্রেক্ষিতে ৬, ৭ ও ৮ জানুয়ারির কর্মবিরতির কর্মসূচি সাময়িক স্থগিত করা হলো।’


মন্তব্য