kalerkantho


মনোহরদীতে ইয়াবা কারবারে জড়িয়ে পড়ছে পুলিশ

হায়দার আলী, ঢাকা ও মনিরুজ্জামান মনির, নরসিংদী   

৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মনোহরদীতে ইয়াবা কারবারে জড়িয়ে পড়ছে পুলিশ

ফাইল ছবি

‘পুলিশ মাদকের বিরুদ্ধে কী কইব? তারাই তো মাদক ব্যবসা করে। খোঁজ নিয়ে দেখেন, এলাকার মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এসআই কালাম ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত। শুকুন্দি ইউনিয়নে ইয়াবার ব্যবসা কম থাকলেও ব্রাহ্মণহাটা, গোতাসিয়া ও চালাকচরে মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে একত্রে মাদক ব্যবসা করছে সে। মনোহরদী থানার আরো কয়েকজন পুলিশ মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার না করে সাধারণ মানুষকে আটকের পর টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয়।’ গতকাল বৃহস্পতিবার ইয়াবা কারবারিদের সঙ্গে পুলিশের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে এভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন মনোহরদী উপজেলার শুকুন্দি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি সাদিকুর রহমান শামীম।

ক্ষুব্ধ কণ্ঠে শামীম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যে পুলিশ সর্বনাশা ইয়াবাসহ মাদক ব্যবসায়ীদের ধরবে, অভিযান চালাবে, তারা তা না করে উল্টো সাধারণ মানুষকে আটকের পর টাকা আদায় করছে। এসআই কালাম সম্প্রতি রায়পুরা থানায় বদলি হলেও প্রতি সপ্তায় মনোহরদী আসে। কেন আসে? একটু খোঁজ নিয়ে দেখেন সব জেনে যাবেন।’

একই ধরনের ক্ষোভ প্রকাশ করেন চন্দনবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ হিরণ। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের উপজেলার বড় সমস্যা ইয়াবা। শুধু উপজেলা সদরেই নয়, আমার ইউনিয়নের অলিগলি, পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে পড়েছে ইয়াবা। আগে বখাটেরা মাদকাসক্ত হলেও বর্তমানে স্কুল-কলেজের মেধাবী শিক্ষার্থীরাও ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশ যদি যথাযথ দায়িত্ব পালন করত, তাহলে এত ভয়াবহভাবে ইয়াবার বিস্তার ঘটত না।’

চন্দনবাড়ী ইউনিয়নের একজন সদস্য ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ইয়াবা বন্ধ হইব ক্যামনে? পুলিশই তো তাদের শেল্টার দেয়। থানার বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা সরাসরি ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।’

মনোহরদী বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী ক্ষোভ প্রকাশ করে কালের কণ্ঠকে জানান, যারা ইয়াবা ব্যবসা করছে তাদের না ধরে যারা ইয়াবায় আসক্ত তাদের ধরে টাকা আদায় করা হচ্ছে। অনেক সময় সাধারণ মানুষকে আটক করে পকেটে ইয়াবা দিয়ে টাকা আদায় করা হয়। ইয়াবা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকায় তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না। নরসিংদীর পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে তদন্ত করলে এর সত্যতা বেরিয়ে আসবে।

ইয়াবার বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মনোহরদী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুজতবা জুয়েল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হাত বাড়ালেই যেখানে-সেখানে পাওয়া যাচ্ছে মাদক। এই সহজলভ্যতার কারণে সাধারণ মানুষ থেকে শিক্ষার্থীরাও মাদকে জড়িয়ে পড়ছে।’

মনোহরদী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ রুহুল ছগীর বলেন, ‘বর্তমানে মাদক শুধু শহরে নয়, গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে। মাদকের এই করালগ্রাসের সর্বাধিক শিকার হচ্ছে টিনএজ শিক্ষার্থীরা। এ অবস্থায় শিক্ষকদের পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতন হওয়া জরুরি। বিষয়টিকে সামাজিক আন্দোলন হিসেবে নিতে হবে সবাইকে। না হয় এটি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়বে।’

পুলিশের সঙ্গে সখ্য ৩২ মাদক ব্যবসায়ীর : জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, মনোহরদীর প্রায় ২৫টি স্পটে নিয়মিত মাদক বেচাকেনা চলে। গত বছর নরসিংদী জেলায় মাদকবিরোধী ৪৯৬টি অভিযান চালানো হয়। অভিযানে মাদকসহ গ্রেপ্তার হয় দুই শতাধিক। এ ছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালতে মামলা হয়েছে ১৮৯টি। জেলায় মাদক ব্যবসায়ী কারা, জানতে চাইলে পুলিশ ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, মূল মাদক ব্যবসায়ী শতাধিক। আর খুচরা ব্যবসায়ীদের বেশির ভাগ নারী।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, মনোহরদী উপজেলার শহর-গ্রাম সর্বত্র মেলে ইয়াবা। এ ছাড়া ফেনসিডিল, গাঁজা, চোলাই মদও পাওয়া যায় সহজে। শহরের রেললাইন, নৌপথ ও সড়কপথে আখাউড়া, ভৈরব, কুমিল্লা, কটিয়াদী, কাপাসিয়া, টেকনাফসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মনোহরদীতে মাদক আসে। সরকারি দলের অনেক নেতাকর্মী, থানা পুলিশের কিছু সদস্য মাদক ব্যবসায় জড়িত বলে অভিযোগ উঠেছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ ও সাধারণ মানুষের তথ্য মতে, মনোহরদী উপজেলায় সর্বাধিক মাদক মেলে কামারআলগী, বাসুলিকান্দি, শেখেরবাজার, চর আহাম্মদপুর, চিকাদী, রায়েরপাড়া, হাতীরদিয়া বাজার, পূর্বচালাকচর, চালাকচর, চরমান্দালিয়া, চালাকচর বেপারিপাড়া, হেতেমদী, সৈয়দপুর, কালিয়াকুড়ি, রামপুর তাতারকান্দা, হাফিজপুর, চন্দনবাড়ী, হাফিজপুর মধ্যপাড়া, ব্রাহ্মণহাটা, পাঁচকান্দি, কাহেতেরগাঁও, হিতাশী ও কুড়িপাইকায়।

এর মধ্যে রয়েছেন একদুয়ারিয়া ইউনিয়নের কামারআলগী এলাকার আহসান উল্লাহ (৪২)। তাঁর বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মনোহরদী থানায় ছয়টি মামলা রয়েছে। বাসুলিকান্দি এলাকার নুরুল ইসলাম (৫৫)। তাঁর বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা রয়েছে পাঁচটি। শেখেরবাজার এলাকার বাচ্চু রবিদাস (৫০)। তাঁর বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা রয়েছে চারটি। চিকাদী এলাকার মাসুদ (৩০)। তাঁর বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা রয়েছে চারটি। হাতীরদিয়া বাজারের মহেশ বাসফোড় (৩৫)। তাঁর বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা রয়েছে পাঁচটি। চরমান্দালিয়ার লক্ষ্মীরানী রবিদাস (৩০)। তাঁর বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা রয়েছে তিনটি। এ ছাড়া চন্দনবাড়ী এলাকার গোলাম সাকলাইন স্বপন (৫০)। তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা না থাকলেও তিনি পুলিশের তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী।

অভিযোগ রয়েছে, মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সখ্য রয়েছে মনোহরদী থানার এসআই শাখাওয়াত হোসেন, এসআই শওকত হোসেন, এএসআই দুলাল, এসআই সাইদুর রহমানের। ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আটক না করে এসব পুলিশ কর্মকর্তা প্রতি সপ্তাহে মাসোয়ারা নিচ্ছেন।

মনোহরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগে মনে করতাম ইয়াবার বিস্তার শুধু শহরে। এখন দেখছি গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে। আইন-শৃঙ্খলা সভায় বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। এ থেকে উত্তরণে অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। আর ইয়াবা আসক্তদের গ্রেপ্তার না করে পুনর্বাসনকেন্দ্রে পাঠানো উচিত। সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।’

মনোহরদী থানায় সদ্য নিয়োগ পাওয়া ওসি ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি এই থানায় যোগ দিয়েই মাদক এবং জুয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছি। সব অপরাধের মূল হচ্ছে মাদক আর জুয়া। অভিযুক্ত পুলিশ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি এ থানায় নতুন এসেছি। খোঁজ নিয়ে দেখব কারা মাদকের সঙ্গে জড়িত। প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

মনোহরদী পৌরসভার মেয়র আমিনুর রশিদ সুজন বলেন, ‘এ উপজেলার প্রধান সমস্যা মাদক। এ সমস্যার সমাধান করা গেলে কিশোর অপরাধ, খুনসহ অনেক অপরাধ কমে যাবে। পৌর এলাকা মাদকমুক্ত রাখতে সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি। ’

নরসিংদী মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘এই জেলার যোগাযোগব্যবস্থা খুব ভালো। সেই কারণে সবখানে মাদক ছড়িয়ে পড়েছে। নিয়ন্ত্রণের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে। অভিযানের পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মাদকপ্রবণ এলাকায় সাধারণ মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে। মাদকবিরোধী তথ্যচিত্রও দেখানো হচ্ছে।’


মন্তব্য