kalerkantho


‘হকার মালেক ভাই’ স্বপ্ন দেখেন

শরীফুল আলম সুমন   

৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



‘হকার মালেক ভাই’ স্বপ্ন দেখেন

পথশিশুদের খাওয়াতে ভালোবাসেন আবদুল মালেক। তাঁকে এমন নানা সামাজিক কাজেই দেখা যায়। ছবি : কালের কণ্ঠ

দিনভর মুক্তভাবে ঘুরে বেড়ানো, কোনো রকমে ক্ষুধার জ্বালা মেটানোর পর রাতে খোলা আকাশের নিচেই ঘুমিয়ে পড়া আরো একটি অসহায় ভোর সামনে রেখে। রাজধানীর বিমানবন্দর রেলস্টেশন এলাকার এ পথশিশুরা এভাবেই বেড়ে উঠছে দেশের আরো লাখো ভাসমান শিশুর মতো। রেলওয়ের প্ল্যাটফর্মই তাদের ঠিকানা। সমাজের লাখ লাখ বিত্তবান মানুষ সামর্থ্য থাকার পরও যখন এই দুস্থ শিশুদের প্রতি অমানবিক অবস্থান নিয়ে আছে—অসামান্য এক উদ্যোগ নিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন একজন মানুষ। শিশুদের ভাষায় ‘হকার মালেক ভাই’। রাজধানীতে যারা লোকাল বাসে চলাচল করে, তাদের অনেকেই আবদুল মালেককে চেনে ‘হকার মালেক’ হিসেবে। বেশির ভাগ সময় মাথায় নীল রঙের হ্যাট আর গায়ে থাকে নীল জামা। ভাসমান জীবনে সপ্তাহের সাত দিনই সমান। তবে রাজধানীর অদূরে বিমানবন্দর রেলওয়ে এলাকার শিশুদের জন্য শুক্রবার হয়ে উঠেছে ভালোবাসার একটি দিন। অন্তত এই একটি দিন বাইরের একজন মানুষ তাদের কাছে আপন হয়ে ওঠেন। অন্তত এই দিন এক বেলা তাদের খাবারের জোগাড় নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় না, দরকার হয় না চেষ্টা-তদবিরের। পেটের জ্বালায় ছিঁচকে চুরির মতো অপরাধ করতে গিয়ে মার খেতে হয় না। কারণ এই দিন তাদের জন্য আছেন মালেক ভাই! ঝড়-বৃষ্টি-শীত যা-ই হোক, অসুখ-বিসুখ বা ব্যক্তিগত সমস্যা যা-ই থাক—মালেক ভাই খাবার নিয়ে আসবেনই। তাও আবার হোটেলের যেনতেন খাবার নয়, বাসায় রান্না করা গরম আহার!

এই অসামান্য মানবিক মালেক ভাইকে গত ১০ জুন কালের কণ্ঠ’র প্রথম পৃষ্ঠায় ‘পথশিশুদের মালেক ভাই’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। মালেক ভাই এই প্রতিবেদককে বলেছেন, তিনি এমনিতে মনের তাগিদেই শিশুদের জন্য কাজ করেন। তবে তাঁর এই কাজের কথা যে সবাই জানছে, এতে তাঁর উৎসাহ আরো বেড়েছে। ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝিতে এই প্রতিবেদন লেখার সময় আবদুল মালেক জানান, সর্বশেষ শুক্রবার গত ৮ ডিসেম্বর বিমানবন্দর রেলস্টেশনে খাইয়েছেন ১৫৭ জন পথশিশুকে, যাদের মধ্যে কমলাপুর ও টঙ্গী রেলস্টেশনের পথশিশুরাও ছিল।

ফেসবুক বন্ধুসহ বিভিন্ন ব্যক্তির সহায়তা নিয়ে মালেক ভাই শিশুদের জন্য কিছু করার চেষ্টা করছেন। পথশিশুদের জন্য আরো বড় পরিসরে কাজ করতে চান তিনি। এরই মধ্যে তিনিসহ কয়েক বন্ধু মিলে প্রতিষ্ঠা করেছেন বেসরকারি সংগঠন ‘পারি ফাউন্ডেশন’। এখন তাঁদের পরিকল্পনা হচ্ছে পথশিশুদের জন্য একটি আশ্রয়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা। এটি হয়ে গেলে শিশুরা মাথার ওপর নিজেদের একটি ছাদই শুধু পাবে না, পাবে কারিগরি শিক্ষার সুযোগও। এখান থেকে নিজেদের তৈরি করে তারা বৃহত্তর সমাজের অংশ হয়ে বাঁচবে মর্যাদার সঙ্গে।

এই রেলস্টেশন এলাকার শিশুদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মালেক ভাইকে তারা একনামে চেনে। মালেক ভাই হয়ে উঠেছেন এ অসহায় শিশুদের অভিভাবকও। ক্ষোভ, রাগ, দুঃখ, অভিমান, আবদার সবই চলে তাঁর সঙ্গে। মালেক ভাই তা পূরণে সাধ্যমতো চেষ্টাও করেন। কোনো শিশুর অসুখ হলো, মালেক ভাই পাশে দাঁড়াবেন ওষুধ-পথ্য নিয়ে, বাসা থেকে খোঁজ নেবেন। প্রতি শুক্রবার ব্যাগভর্তি খাবার নিয়ে নিজেই হাজির হন রেলস্টেশনে। তিনি যদি বিশেষ কোনো কারণে না থাকতে পারেন, তাহলেও বাসা থেকে খাবার রান্না করে নিয়ে যান তাঁর বন্ধুরা। অন্তত সপ্তাহে একবারের জন্য হলেও পথশিশুরা পেট ভরে খেতে পায়। আর প্রতিবার খাবার পরই মালেক ভাই জানতে চান পরের সপ্তাহে পথশিশুরা কী খাবে? তাদের ইচ্ছা অনুযায়ীই আসে পরের সপ্তাহের খাবার। এমনকি বেশি অসুস্থ শিশুদের নিয়ে যান তাঁর নিজের বাসায়। সুস্থ হয়ে উঠলে তার পরই তাকে ছাড়েন।

সপ্তাহে এক বেলার বেশি খাওয়ানোর সামর্থ্য নেই। এই ভাবনাটি মালেক ভাইকে পীড়া দেয়। তাই আট মাস আগে তিনি বিভিন্ন কমিউনিটি সেন্টারে যোগাযোগ করেন। ফেসবুকে অসংখ্যবার পোস্ট দেন। এতে তিনি ব্যাপক সাড়াও পেয়েছেন। এখন নিয়মিতই বিভিন্ন অনুষ্ঠানের বেঁচে যাওয়া খাবার তারা বিতরণ করছে পথশিশুদের মধ্যে।

আবদুল মালেক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রথম দিকে যখন কমিউনিটি সেন্টারগুলোতে যোগাযোগ করি তারা অনেকটা বিরক্ত হতো। তবে এখন অনেকেই এটা ভালোভাবে নিয়েছে। বেঁচে যাওয়া খাবার পথশিশুদের খাওয়াতে পেরে তারাও আনন্দিত। গত ২৮ নভেম্বর রাত পৌনে ১২টায় আমাদের কাছে একটি ফোন আসে। শাহীন কনভেনশন হলে ২৫০ জনের জন্য খাবার রয়েছে বলে জানানো হয়। সাড়ে ১২টার ভেতর আমরা কয়েকজন পৌঁছালাম। পোলাও, রোস্ট, সবজি, কাবাব ও জর্দা নিয়ে আমরা ৩২০টি প্যাকেট করলাম। রাত ৩টায় পৌঁছালাম বিমানবন্দর রেলস্টেশনে। অনেক দিন পর ভাসমান ৩২০ জন মানুষ তৃপ্তির সঙ্গে খেল সেই খাবার।’

রোহিঙ্গা শিশুদের জন্যও মন কাঁদে আবদুল মালেকের। তাই একটানা দুই মাস কাটিয়ে এসেছেন টেকনাফের কুতুপালংয়ে। বন্ধুদের সহায়তায় পারি ফাউন্ডেশনের রোহিঙ্গা তহবিলে জমা হয় প্রায় ২৩ লাখ টাকা। এই টাকা গিয়ে ব্যয় করে এসেছেন রোহিঙ্গা মা ও শিশুদের পুষ্টিকর খাবার, মেডিক্যাল ক্যাম্প স্থাপন, নলকূপ স্থাপন, টয়লেট নির্মাণসহ নানা কাজে। মালেক বলেন, ‘শিশু তো শিশুই। সে হোক বাংলাদেশের বা মিয়ানমারের। তবে এই সময়ে আমাদের নিয়মিত কার্যক্রম বন্ধ থাকেনি।’

পথশিশুদের স্বাবলম্বী করতেও আবদুল মালেক নিয়েছেন নানা উদ্যোগ। এখন পর্যন্ত ডজনখানেক পথশিশুকে স্বাবলম্বী করেছেন। তাঁর এ অভিযাত্রায় যোগ্য সঙ্গী হিসেবে পেয়েছেন আবু তালেব, ওয়াসিম, মুন, পারভেজ, সাজেদুর রহমান ও ডা. ফয়সালকে। যাঁরা সব কাজে থাকেন আবদুল মালেকের সঙ্গে। ইট-পাথরের এই শহরে নেই পাখপাখালির কূজন। শিশুরা যাতে পাখির ডাক শুনতে পারে সেই জন্য তিনি সম্প্রতি পাখির অভয়াশ্রম তৈরির কাজে হাত দিয়েছেন। আবদুল মালেক বলেন, ‘উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের লেকপাড়ের গাছগুলোতে দুই হাজার পাখির বাসা তৈরি করেছি। আমার ইচ্ছা আছে রাজধানীর সব গাছে পাখির বাসা তৈরি করা। যাতে রাজধানীর শিশুরা কিছুটা হলেও প্রকৃতির ছোঁয়া পায়।’

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে আবদুল মালেক বলেন, ‘আমি চাই এমন একদিন আসবে, যেদিন ব্যাগভর্তি খাবার নিয়ে বসে থাকব; কিন্তু একজন পথশিশুও আসবে না। আমাদের শেল্টার হোমের মাধ্যমে সব পথশিশুই হবে স্বাবলম্বী। তাদেরকে আর কেউ পথশিশু বলে ডাকবে না।’


মন্তব্য