kalerkantho


এবি ব্যাংকে অস্থিরতা

নিজের অপকর্ম ঢাকতে চেয়ারম্যানকে অপসারণ করেন ফয়সল

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



নিজের অপকর্ম ঢাকতে চেয়ারম্যানকে অপসারণ করেন ফয়সল

দেশের প্রথম বেসরকারি ব্যাংক ‘এবি ব্যাংকের’ অস্থিরতায় ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা মোরশেদ খানের ছেলে ফয়সল মোরশেদ খানের বিরুদ্ধে। বিদেশে অর্থপাচার, বিএনপিকে অর্থ জোগান দেওয়া ও বঙ্গবন্ধুর খুনি ডালিমের মেয়ের কাছ থেকে অধিক মূল্যে জমি কেনার অপরাধ ঢাকতেই ব্যাংকটিতে অস্থিরতা সৃষ্টি এবং ব্যাংকটির চেয়ারম্যান এম ওয়াহিদুল হককে সম্প্রতি অপসারণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

নানা অভিযোগে গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ফয়সল বিদেশে পলাতক ছিলেন। ওই সময় ওয়াহিদুল হক মোরশেদ খানদের ডেউন্ডি ও নয়াপাড়ার চা-বাগানে কর্মরত ছিলেন। সেখান থেকে এনে তাঁকে এবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান করা হয়। ৩৫ বছরের বিশ্বস্ত ওয়াহিদুলকে এবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরও। গত ২১ ডিসেম্বর তাঁকে চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে।

মোরশেদ খানের ছেলের বিরুদ্ধে ব্যাংকটি ব্যবহার করে ভারত, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে অর্থপাচারের অভিযোগ রয়েছে। বিএনপিকে অর্থ জোগান দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগ ঢাকতেই দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ ওয়াহিদুলকে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।

এসব বিষয়ে কথা বলতে মোরশেদ খান বা তাঁর ছেলে ফয়সল মোরশেদ খানের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ফয়সল মোরশেদ খান বিভিন্ন সময় এবি ব্যাংক থেকে অফশোর ব্যাংকিংয়ের আওতায় প্রায় পাঁচ কোটি ৪০ লাখ ডলার বিদেশে পাচার করেছেন। তাঁর নির্দেশে নির্ধারিত প্রতিষ্ঠানকে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়েছে, যা মূলত বিদেশে পাচার হয়েছে। এর মধ্যে ইউরো কার নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে দেড় কোটি ডলার এবং এটিজেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে এক কোটি ডলার ঋণ দেওয়া হয়েছে। এ দুটি প্রতিষ্ঠানের দেওয়া ঠিকানার সঙ্গে মোরশেদ খানের সিঙ্গাপুরের ঠিকানার মিল রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এ ছাড়া রহিম আফরোজকে ৪০ থেকে ৫০ লাখ ডলার ঋণ দেওয়া হয়েছে, যা ভারতে চলে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া সিমেট সিটি নামের দুবাইয়ে একটি প্রতিষ্ঠানকে দুই কোটি ৯০ লাখ ডলার ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করে এবি ব্যাংক। পরে এটি নিয়ে সমালোচনা হলে দুই কোটি ডলার স্থানান্তর করা হয়। বাকি ৯০ লাখ ডলার পরিশোধ করা হয়নি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ওয়াহিদুল হকের বিরুদ্ধে দুবাইয়ে দুই কোটি ডলার পাচারের যে অভিযোগ উঠেছে, তা মূলত মোরশেদ খানের মেয়ের জামাতা সাইফুল হকের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আটলান্টিক এন্টারপ্রাইজের তদারকিতে সম্পন্ন হয়েছে। ২০১৩ সালে এবি ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রাঘাটতি হলে বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল সংগ্রহের জন্য সাইফুল হক এবি ব্যাংকের আবু হেনা মুস্তাফা কামালকে দুবাইয়ে খুররম আব্দুল্লাহর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে একটি বৈঠকের আয়োজন করেন। পরে ইসলামী শরিয়াভিত্তিক অর্থায়ন এবং ‘ওয়াকালা অ্যাগ্রিমেন্ট’-এর ভিত্তিতে বিস্তারিত আলোচনার পর একটি খসড়া প্রস্তাব প্রণয়ন করা হয়। এই অর্থ পাচার এবং দুবাইয়ে বিনিয়োগের সঙ্গেও মোরশেদ খানের পরিবার জড়িত বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, এবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে ওয়াহিদুল হক দায়িত্ব পালনকালে বিদেশে অর্থ পাচার করা হলেও সম্প্রতি অনিয়মতান্ত্রিক উপায়ে আরো অর্থ পাচারের জন্য তাঁকে নানাভাবে চাপ দিতে থাকেন ফয়সল মোরশেদ খান। ওয়াহিদুল হক তাতে অপারগতা প্রকাশ করে ফয়সল খানের অর্থপাচারের ক্ষেত্রে কিছুদিন ধরে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে আসছিলেন। সে জন্য ফয়সল চেয়ারম্যানের পদ থেকে ওয়াহিদুলকে অপসারণ করেন।

জানা গেছে, বিএনপি নেতা মোরশেদ খান ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে একটি কম্পানি গঠন করেছেন, যেখানে কুণ্ডু নামের একজন জাপানি নাগরিকও রয়েছেন। ওই কম্পানির নামে হংকংয়ের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এক কোটি ৬০ লাখ ডলার স্থানান্তর করা হয়। হংকং পুলিশ ওই অর্থ আটকে দেয়। পরে প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সহকারী ফেরদাউস খান ও অ্যাটর্নি জেনারেল হংকং গিয়ে মামলার আলামত সংগ্রহ করেন। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অজ্ঞাত কারণে ওই মামলা পরিচালনায় সময়ক্ষেপণ করে গোপনে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। পরে দুদকের আইনজীবী আপিল করলে হাইকোর্ট মোরশেদ খানের বিপক্ষে রায় দেন। এরপর মোরশেদ খান আপিল করেন, যা এখনো বিচারাধীন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনি মেজর ডালিমের মেয়ের কাছ থেকে বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে জমি কেনার অভিযোগ রয়েছে ফয়সলের বিরুদ্ধে। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার চলাকালে খুনিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে ডালিমের মেয়ে স্বস্তি হকের কাছ থেকে তড়িঘড়ি করে রাজধানীর ৭১৯ সাতমসজদি রোডের একটি বাড়ি বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে ট্রেনিং একাডেমির নামে কিনে নেয় এবি ব্যাংক। ওই অতিরিক্ত অর্থ মেয়ের মাধ্যমে খুনি ডালিমের কাছে পৌঁছানো হয় বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ওই জমি কেনার ক্ষেত্রে ফয়সল বিশেষ ভূমিকা পালন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া বিএনপিকে অর্থ জোগান দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে ব্যাংকটির বিরুদ্ধে। চট্টগ্রামের জাহাজ ব্যবসায়ী মাহিন লস্করের প্রতিষ্ঠান মাহিন এন্টারপ্রাইজকে প্রভাব খাটিয়ে এবি ব্যাংক থেকে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। এ ঋণের সিংহভাগই বিদেশে পাচার হয়েছে বলে জানা গেছে। এই মাহিন চট্টগ্রাম বিএনপির অর্থ জোগানদাতা হিসেবে পরিচিত। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় মাহিন এন্টারপ্রাইজ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ স্বল্প সময়ের মধ্যে উত্তোলন করা হয়েছিল, যা বিএনপির আন্দোলনের পেছনে ব্যয় করা হয়েছিল।


মন্তব্য