kalerkantho


হাবিবা সুখী, শুধতে চান সমাজের ঋণ

বিশ্বজিৎ পাল বাবু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া   

৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



হাবিবা সুখী, শুধতে চান সমাজের ঋণ

কিছু ভালো মানুষের ভালোবাসায় অসহায় জীবনে মিলেছে সহায়। নতুন জীবনের পথে চলেছেন হাবিবা। ছবি : কালের কণ্ঠ

একটি বিয়ে মানবিকতারও বড় উদাহরণ হতে পারে—প্রমাণ হাবিবা। আট বছর বয়সে মা-বাবাকে হারিয়ে পায়ের তলার মাটিও যখন থাকল না, তখন ঠাঁই হয়েছিল জেলার সরকারি অনাথ আশ্রমে। হাবিবার পায়ের তলার মাটি আরো একবার কেঁপে উঠল ১০ বছর পর, যখন তার বয়স ১৮ পূর্ণ হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি শিশু পরিবারের নীতিমালা অনুযায়ী হাবিবাকে  বাইরের পৃথিবীতেই জায়গা করে নিতে হবে। খবর পেয়ে হাবিবার মামা-মামি এসেছিলেন। কিন্তু হাবিবা শিশু পরিবারের উপতত্ত্বাবধায়ক রওশন আরার আঁচল ছাড়বেন না! খবর পেয়ে পাশে দাঁড়ালেন আইনমন্ত্রী, জেলা পুলিশ সুপার, স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ সমাজের অনেকে। পায়ের তলায় মাটিই শুধু না, নারীত্বের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা যে সংসার, তাও পেয়ে গেলেন হাবিবা। জমকালো আয়োজনে হাবিবার বিয়ে হলো। মন্ত্রী, এমপি থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বিয়েতে এসে হাবিবাকে শুভেচ্ছা জানান।

তার পর পেরিয়ে গেছে ছয় মাস। ‘কেমন আছেন?’ গত রবিবার বিকেল ৩টার দিকে কালের কণ্ঠ থেকে মোবাইল ফোনে এভাবেই জানতে চাওয়া হয় হাবিবার কুশল। ‘ভালো আছি’—জবাব দেন হাবিবা। সংসারজীবনে ইতিমধ্যেই জাঁকিয়ে বসেছেন হাবিবা, বললেন, ‘কখনোই কল্পনা করিনি আমার জীবন এভাবে পাল্টে যাবে। শ্বশুরসহ বাড়ির সবাইকে নিয়ে বেশ আনন্দে সময় কাটছে। আমার বিয়ের উদ্যোগ নেওয়া পুলিশ সুপারসহ অনেকের সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ হয়। তাঁরা আমার খোঁজখবর নেন। সবার দোয়ায় স্বামীর সংসারে আমি খুব ভালো আছি। আমার জন্য দোয়া করবেন।’ হাবিবা জানান তাঁর স্বপ্নেরও কথা। ‘আমার যদি সেই ধরনের ক্ষমতা হয় তাহলে একদিন আমার মতো কারো একজনের জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের আয়োজন করব।’ দুঃসময়ে সমাজ তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে, যেন তারই ঋণ শোধ করতে চাইছেন হাবিবা।  

সরকারি শিশু সদনের ‘অনাথ’ হাবিবা এখন জেলার কসবা উপজেলার খাড়েরা ইউনিয়নের সোনারগাঁও গ্রামের গৃহবধূ। স্বামী মো. জাকারিয়া। উদ্যোক্তাদের সহযোগিতায় হাবিবার স্বামী পুলিশে চাকরি পেয়েছেন। এখন কর্মরত কুমিল্লায়। কালের কণ্ঠ কথা বলে জাকারিয়ার সঙ্গেও। প্যারেডে অংশ নিতে তিনি এখন ঢাকায় রয়েছেন। জাকারিয়া বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমরা অনেক ভালো আছি। হাবিবার সঙ্গে বিয়ে না হলে হয়তো আমার বিয়ে এত জাঁকজমকপূর্ণ হতো না। এত এত মানুষের ভালোবাসা পেতাম না। সবাই এখনো আমার খোঁজ নেন। হাবিবা খুব ভালো মেয়ে। সব মিলিয়ে আমি দারুণ খুশি।’

হাবিবার বিয়ের উদ্যোগ নিয়ে প্রথম এগিয়ে এসেছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান। গত বছরের ১৪ জুলাই হওয়া এ বিয়েতে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী, জেলা প্রশাসক রেজওয়ানুর রহমান, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল-মামুন সরকারসহ আরো অনেকে সার্বিক সহযোগিতা করেন। অতিথি আপ্যায়নসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় করেন পুলিশ সুপার। বিয়ের আগের দিন আয়োজন করা হয় গায়ে হলুদের। ১৫ জুলাই হাবিবার বিয়ে নিয়ে ‘এই হাবিবা সেই হাবিবা’ ও এর আগে ৯ জুলাই ‘হাবিবার জন্য ভালোবাসা’ শিরোনামে দৈনিক কালের কণ্ঠে সংবাদ প্রকাশিত হয়। পুলিশ সুপারের এ উদ্যোগ সর্বত্র প্রশংসা পায়।

সরকারি শিশু পরিবারের তত্ত্বাবধায়ক রওশন আরা কালের কণ্ঠকে বলেন, সবার সার্বিক সহযোগিতায় এ ধরনের একটি বিয়ের আয়োজন সম্পন্ন করা গেছে। হাবিবা ও তাঁর স্বামীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হয়। তাঁরা খুব ভালো আছে। মাঝে মাঝে আমার এখানে বেড়াতেও আসে। সমাজসেবা অধিদপ্তর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সহকারী পরিচালক মো. মোস্তফা মাহমুদ সারোয়ার বলেন, ‘হাবিবার বিয়ে মানবিকতার একটি উদাহরণ হয়ে আছে। হাবিবা ও জাকারিয়ার সংসারজীবন বেশ ভালো কাটছে। নিয়মিতই তাঁদের খোঁজ রাখা হয়। আমরা সবাই মিলে হাবিবার শ্বশুরবাড়িতে যাব বলে চিন্তা করে রেখেছি।’

জানা যায়, ভালো ছেলের সন্ধান পেলে পাত্রকে চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য পুলিশ সুপারকে অনুরোধ করেছিলেন রওশন আরা। একপর্যায়ে পাত্রের খোঁজ পাওয়া যায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার সোনারগাঁর মো. জাকারিয়া আলম। হাবিবার মামা-মামির সঙ্গে কথা বলে তাঁর সঙ্গে হাবিবার বিয়ের বিষয়টি পাকা করা হয়। পরে পুলিশ সুপারেরই সহযোগিতায় জাকারিয়া আলমকে পুলিশের কনস্টেবল পদে চাকরি দেওয়া হয়। হাবিবার বিয়েতে কোনো ধরনের ঘাটতি রাখেননি পুলিশ সুপার। বিয়েতে রীতিমতো কার্ড ছেপে অতিথিদের দাওয়াত করা হয়। বাবাহীন হাবিবার বিয়েতে ‘উকিল বাবা’ হন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল-মামুন সরকার।

বিয়েতে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক এমপির পক্ষ থেকে দেওয়া হয় এক সেট গয়না, র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী এমপি নবদম্পতির থাকার জন্য হাবিবার শ্বশুরবাড়ি কসবায় নির্মাণ করে দেন বসতঘর, জেলা প্রশাসক রেজওয়ানুর রহমান দেন সোনার চেইন, বরের বিয়ের শেরওয়ানি, পাগড়ি, নাগরা ও রঙিন টেলিভিশন, পুলিশ সুপারের সহধর্মিণী ফারহানা রহমান দেন বিয়ের শাড়ি ও গয়না, জেলা সমাজসেবার পক্ষ থেকে দেওয়া হয় স্টিলের আলমারি। অতিথি আপ্যায়ন, বরের গাড়ি থেকে যাবতীয় খরচ বহন করেন পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান পিপিএম (বার)। যে পরিবারে হাবিবার কেটেছে শৈশবের দশটি বছর, সেই সরকারি শিশু পরিবারের উপতত্ত্বাবধায়ক রওশন আরা সেলাই মেশিন দিতে চেয়েছিলেন। হাবিবা এখনো আনেননি, প্রয়োজন পড়ছে না বলে। ‘আমার আর্থিক সচ্ছলতার জন্য একটি সেলাই মেশিন দেওয়া হবে বলা হয়েছিল। কিন্তু আপাতত সেটি আমার প্রয়োজন পড়ছে না বলে আনা হয়নি।’ কালের কণ্ঠকে বলেন হাবিবা।

হাবিবার বিয়েকে সমাজের জন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান পিপিএম। তিনি বলেছেন, ‘হাবিবার মতো অন্য কেউ যদি এমন সমস্যায় পড়ে আমরা তার পাশেও দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।’

 


মন্তব্য