kalerkantho


জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব বিশ্বজুড়ে

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব বিশ্বজুড়ে

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্ব উষ্ণ হয়ে গ্যাস চেম্বারে পরিণত হচ্ছে—এমন আতঙ্ক নিয়ে দীর্ঘ সময় পার করেছি আমরা। এবার ঠিক উল্টোটা নিয়ে ভয় শুরু হয়েছে। জমে যাওয়া নায়াগ্রা জলপ্রপাত, যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চল আর ইউরোপজুড়ে তুষারপাত দেখার পর নতুন ভীতির জন্ম হচ্ছে, এই তীব্র শীতের কারণও কি জলবায়ুর পরিবর্তন? বিশেষজ্ঞদের এক বড় অংশের আশঙ্কা তেমনই।

যদিও এ দুটির মধ্যকার সম্পর্ক এখনো বিজ্ঞানের যুক্তি-প্রমাণে স্পষ্ট নয়।

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপজুড়ে যখন শীতে মানুষ জবুথবু হয়ে পড়েছে তখন অস্ট্রেলিয়ায় হাঁসফাঁসে গরমে মানুষের বাড়ি থেকে বের হওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। দেশটিতে গত ৮০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপে পুড়ছে মানুষ। একই সঙ্গে বিশ্বের দুই প্রান্তের আবহাওয়ায় এ চরম বৈপরীত্য বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে।

উষ্ণতা নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার বায়ুমণ্ডলে কার্বণের একটি স্তর তৈরি করেছে। এই স্তর ভেদ করে পৃথিবীর উত্তাপ বায়ুমণ্ডলের বাইরে যেতে পারছে না। ফলাফল পৃথিবীর তাপ বাড়ছে। মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে। সমুদ্রের স্তর বাড়ছে। বাড়ছে পানির উষ্ণতাও। বিশ্বের অনেকটা অংশ এই পানিতে ডুবে যাবে—এমন সতর্ক বাণী অহরহ উচ্চারণ করছেন বিজ্ঞানীরা। আরো বলা হচ্ছে, ২০১৭ সালজুড়ে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিধসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো যে মহাপ্রলয় দেখিয়ে গেল তার কারণও পৃথিবীর গরম হয়ে ওঠা।

এবার পুরনো এই ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের সঙ্গে নতুন যুক্ত হলো শীত প্রসঙ্গটি। এই প্রসঙ্গটি আলোচনায় এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোরের টুইটের সূত্র ধরে। কয়েক দিন আগে এক টুইটে যুক্তরাষ্ট্রের রেকর্ড গড়া শীতের জন্য তিনি দায়ী করেন জলবায়ু পরিবর্তনকে। তাঁর টুইটে একটি নিবন্ধের লিংক দেওয়া হয়। এই নিবন্ধে কী করে মানুষের কারণে সৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন হাড় কামড়ানো শীতের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে তার ব্যাখ্যা রয়েছে। নিবন্ধটি লেখেন পেন স্টেট ইউনিভার্সিটির বায়ুমণ্ডল বিজ্ঞানবিষয়ক অধ্যাপক ড. মাইকেল মান। তাঁর যুক্তি ছিল, ‘হেভি লেক ইফেক্ট’-এর কারণে এ বছর বেশি তুষারপাত হয়েছে, যা বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণেই ঘটে। উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে হ্রদগুলো গরম হয়ে ওঠে। এর পার্শ্ববর্তী এলাকাতেই পরবর্তী সময় ভারি তুষারপাত হয়। তিনি আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের একটা অংশের মধ্যে আর্কটিক ধাঁচের ঠাণ্ডা দেখা গেলেও দেশটির বাকি অংশ এবং বাকি বিশ্ব বেশ উষ্ণ। আবহাওয়াবিদ জো বাস্টারডি অবশ্য মানের সঙ্গে একমত নন। তাঁর অভিমত, মানের ব্যাখ্যায় বাস্তবতা ও যুক্তির চেয়ে বর্ণনা বেশি। বাস্টারডি চ্যালেঞ্জ করে বলেন, সাম্প্রতিক শীতলতার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের কোনো সম্পর্ক নেই। এ বছরের শীতের চেয়েও গত শতাব্দীর আশির দশকের শীত অনেক তীব্র ছিল। তবে জলবায়ু পরিবর্তন বা বৈশ্বিক উষ্ণতার সঙ্গে এর কোনো যোগ ছিল না।

এতটা নিশ্চিতভাবে অবশ্য বলতে রাজি না বহু বিশ্লেষকই। অনেকেই মনে করেন, চলমান শৈত্যপ্রবাহের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে। তবে সম্পর্কের যোগসূত্রগুলো কোথায় সে ব্যাপারে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছেন না তাঁরা। মেরু অঞ্চলগুলো আগের মতো শীতল নেই। অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় দ্রুত উষ্ণ হয়ে উঠছে। আর বিষয়টি ঘটছে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে। জার্মানির পটসড্যাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চের গবেষক মারলিন ক্রেটসচমের আর্কটিক প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলছিলেন, ‘অনেকেই দাবি করছেন, চলমান শৈত্যপ্রবাহে আর্কটিকের ভূমিকা রয়েছে। তবে এই ভূমিকা কী, কতখানি, কী করে পড়ছে—সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট মতামত, যুক্তি কারো কাছে নেই।’ আর্কটিকের শৈত্য উত্তর গোলার্ধে অবস্থান করছে—যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওসানিক অ্যান্ড অ্যাটমসফেয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের এমন একটি ছবি প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে ক্রেটসচমের বলেন, ‘পুরো বিষয়টিই অত্যন্ত জটিল।’

বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, শীতল আবহাওয়া এবং বৈশ্বিক উষ্ণতার মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে এখনো বহু বিতর্ক বাকি। যেমনটি বলছিলেন, আলাস্কায় অবস্থিত ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস ইন ফেয়ারব্যাংকের ক্লাইমেট সার্ভিস ম্যানেজার রিক থম্যান, ‘আমি মনে করি, ক্রমেই উষ্ণ হতে থাকা আর্কটিক নিম্ন অক্ষাংশের ওপর প্রভাব ফেলছে। তবে জলবায়ুর ক্ষেত্রে এর সংযোগ ঠিক কী ধরনের তা নিয়ে সক্রিয় গবেষণার প্রয়োজন।’ সূত্র : নিউ ইয়র্ক টাইমস, দ্য ব্লেজ, এনবিসি নিউজ, হেরাল্ড ডটকম নিউজিল্যান্ড, এএফপি।

 


মন্তব্য