kalerkantho


শীতে নিরাপদ থাকার বিশেষজ্ঞ পরামর্শ...

আতাউর রহমান কাবুল   

৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



শীতে নিরাপদ থাকার বিশেষজ্ঞ পরামর্শ...

হঠাৎ তীব্র শীতে সবাই জবুথবু। অবিশ্বাস্য এই পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত না হয়ে বরং বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, শীতে সর্দি-কাশি, আর্থ্রাইটিস বা বাতব্যথা, টনসিলাইটিস, অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্ট ও হার্টের সমস্যা হচ্ছে প্রচুর। সারা দেশে হাসপাতালগুলোতে ভিড় লেগেই আছে এসব রোগীর। বেশি সমস্যা হচ্ছে শিশু, বৃদ্ধ ও রোগীদের।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, এত বেশি  শীতে একটু বাড়তি সতর্কতা গ্রহণ করতে হবে। এই সময় সর্দি-কাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জা, সাইনাস, কান ও টনসিলের প্রদাহ বাড়ে। এ জন্য পরিবারের সবার উচিত কুসুম গরম পানি খাওয়া। গোসল ও অন্যান্য কাজে গরম পানির ব্যবহার বাড়তি সমস্যা তৈরি করে না বলেও জানান তিনি। ডা. আবদুল্লাহ বলেন, পরিবারের কেউ ঠাণ্ডাজ্বরে আক্রান্ত হলে অন্যদেরও সাবধান থাকতে হবে। বিশেষ করে কাশি-হাঁচির সময় রুমাল ব্যবহার করতে হবে। বাসায় সচরাচর হয় এমন কিছু রোগের ওষুধও রাখতে তিনি পরামর্শ দেন।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী বলেন, তীব্র শীতে বিশেষ করে ভোরের দিকে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ে। এ সময় স্কেমিয়ায় আক্রান্তদের অ্যানজাইনা বা বুকে ব্যথা বেড়ে যায়। যাদের উচ্চরক্তচাপ ও ডায়াবেটিস রয়েছে তাদের ঝুঁকি বেশি। রক্তনালি সংকুচিত হয়ে বা ব্লক হয়ে হার্ট ফেইলিউওরের হারও বেড়ে যায়। তবে কেউ যদি বুঝতে পারে, কারো হার্ট অ্যাটাক হতে যাচ্ছে, জিহ্বার নিচে নাইট্রেড গ্লিসারিন দ্রুত স্প্রে করা উচিত। অথবা অ্যাসপিরিন ৩০০ গ্রাম (ইকোস্প্রিন ৪টা ট্যাবলেট) চিবিয়ে খেয়ে দ্রুত হৃদরোগ সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে যাওয়া উচিত। তিনি বলেন, এই শীতে কুয়াশার মধ্যে নয়, বরং একটু রোদ উঠলেই বাইরে বের হয়ে হাঁটাহাঁটি বা ব্যায়াম করা উচিত। পাশাপাশি সালাদ জাতীয় খাবার, সিজনাল ফলমূল বেশি খাওয়া উচিত।

অ্যাজমা ও শ্বাসকষ্টে ভোগা রোগীদের খুব ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় বাইরে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেসপাইরেটরি মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এ কে এম মোশাররফ হোসেন। মোশাররফ হোসেন আরো বলেন, তীব্র শীতের একটি মারাত্মক সমস্যা হলো হাইপোথার্মিয়া অর্থাৎ শরীরের তাপমাত্রা অতিরিক্ত কমে যাওয়া, এতে রোগীর মৃত্যু ঘটতে পারে। এ জন্য যেকোনোভাবেই হোক সঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখতে হবে। এই পরিস্থিতিতে কেউ পড়লে রোগীকে দ্রুত গরম আবহাওয়ায় এনে গরম কাপড় পরিধান করিয়ে গরম পানি পান করাতে হবে। তিনি বলেন, ৪০ ঊর্ধ্ব ব্যক্তির  কোনো রোগ হোক বা না হোক তাদের ইনফ্লুয়েঞ্জার ভ্যাকসিন বা টিকা নেওয়া উচিত।

শীত সহায়ক কিছু খাবারের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে ডায়েট প্লানেট অ্যান্ড নিউট্রিশন কনসালট্যান্সির পুষ্টিবিদ মাহবুবা চৌধুরী বলেন, শীতের উপযোগী কিছু মৌসুমি ফলমূল রয়েছে, যা বেশ পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত। তাই এই শীতে কমলা, স্ট্রবেরি, বেদানা, মধু, তুলসীপাতা, পালং ও সরিষার শাক, গাজর, ফুলকপি, বাঁধাকপি, রসুন, পিঁয়াজ, আদা, সবুজ শাকসবজি, গ্রিন টি বেশি করে খাওয়া উচিত।

চিকিৎসকরা বলছেন, তীব্র এই শীতে অনেক শিশু নিউমোনিয়া, ব্রংকিওলাইটিসসহ নানা রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এখনো পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর প্রধান কারণ নিউমোনিয়া। ঘিঞ্জি পরিবেশে বসবাসকারী, ইমিউন সিস্টেম দুর্বল শিশু, স্বল্প ওজন-অকালজাত (প্রি-ম্যাচিউর) নবজাতকরা এতে বেশি ভোগে। বারডেম জেনারেল হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, এই সময় শিশুদের শীত উপযোগী হালকা ও নরম কাপড় পরিধান করাতে হবে। সম্ভব হলে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ঘর থেকে বাইরে বের না করাই উত্তম। শরীরের তাপমাত্রা যেন খুব বেশি কমে না যায়—এ বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, অন্তত গরম কাপড় দিয়ে শিশুদের মাথার অংশটা ঢেকে রাখলে শরীরের সঠিক তাপমাত্রা বজায় থাকবে। তিনি বলেন, লম্বা সময় ধরে রুম হিটার ব্যবহারের কারণেও চামড়া শুকিয়ে যেতে পারে। এ জন্য ঘরের কোথাও আলাদা বালতি বা গামলায় কিছুটা পানি রেখে দিয়ে রুম হিটার ব্যবহার করলে শরীরের চামড়া শুকনা হওয়া রোধে সহায়তা করে।

অধ্যাপক ডা. আবিদ হোসেন মোল্লা আরো বলেন, শিশুদের অ্যাজমা প্রতিরোধে অবশ্যই বাইরের ধুলোবালি বা ফুলের রেণুর প্রভাবমুক্ত থাকাসহ মুখে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। অনেক শিশু বিশেষ করে মাদরাসাপড়ুয়া শিশুরা অনেকে একত্রে ঘুমায়; একে অন্যের কাপড়-চোপড় শেয়ার করে। এ থেকে খোশপাঁচড়া জাতীয় চর্মরোগ হতে পারে। এ কারণে পরবর্তী সময়ে প্রচুর শিশু কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়। তাই প্রত্যেকের উচিত আলাদা জামাকাপড় ব্যবহার করা।

আর্থ্রাইটিস বা বাতের সমস্যা শীতে বাড়ে বেশি। মূলত বয়স্কদেরই এ সমস্যা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রিউম্যাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মিনহাজ রহিম চৌধুরী বলেন, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বা এনকাইলোজিং স্পন্ডিওলাইটিস, স্পন্ডাইলো আর্থ্রাইটিস, রি-অ্যাকটিভ আর্থ্রাইটিস, সোরিয়াসিটিস, অস্টিও-আর্থ্রাইটিস রোগীদের শীতে চলাফেরা বা মুভমেন্ট কম হয় বলে ব্যথার প্রকোপ বেড়ে যায়। চলাফেরায় বরং ব্যথা কম হয়। তা ছাড়া তীব্র ঠাণ্ডায় বাতের কিছু রোগীর (রেনোড ফেনোমেনা) হাত-পা নীল হয়ে যেতে পারে। অনেকের গ্যাংগ্রিনও হয়। এ জন্য যথাসম্ভব গরম উত্তাপে থাকা, হালকা গরম ছেঁক দেওয়া, মোজা পরা, যতটুকু সম্ভব ঘরেই হালকা মুভমেন্ট করা ও চিকিৎসকদের নির্দেশনা মেনে চলা উচিত। তিনি বলেন, ‘এসব রোগীকে আমরা বারবার ঠাণ্ডা পানি ব্যবহার না করে প্রয়োজনে গরম পানি ব্যবহার বা তায়াম্মুম করে নামাজ পড়ার পরামর্শ দিয়ে থাকি।’


মন্তব্য