kalerkantho


সা’দকে নিয়ে দ্বন্দ্বে উত্তপ্ত বিশ্ব ইজতেমা অঙ্গন

নিজস্ব প্রতিবেদক ও টঙ্গী (গাজীপুর) প্রতিনিধি   

১১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সা’দকে নিয়ে দ্বন্দ্বে উত্তপ্ত বিশ্ব ইজতেমা অঙ্গন

টঙ্গীর তুরাগ নদের তীরে ৫২ বছর ধরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে বিশ্ব ইজতেমা। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তসহ বিশ্বের বহু দেশের লাখো ধর্মপ্রাণ মানুষ প্রতিবছর ধর্মীয় এই সমাবেশে অংশগ্রহণ করে আসছে। পবিত্র হজের পর বিশ্ব ইজতেমা বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় সমাবেশ। এ নিয়ে ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে আলাদা অনুভূতি কাজ করে। তবে এ বছরই প্রথম বিশ্ব তাবলিগ মারকাজের প্রধান আমির মাওলানা সা’দ কান্ধলভীর বিশ্ব ইজতেমায় আগমন উপলক্ষে তাবলিগ জামাতের শীর্ষ পর্যায়ের মুরব্বিদের মধ্যে আগেকার বিরোধ চরম আকার ধারণ করেছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আগামীকাল শুক্রবার শুরু হচ্ছে ৫৩তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব।

এই বিরোধ-উত্তেজনার মধ্যে গতকাল বুধবার দুপুর ১টায় থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছেন মাওলানা সা’দ। তাঁর আগমনকে কেন্দ্র করে বিরোধী পক্ষ বিমানবন্দর সড়কে গতকাল দুপুর ১২টা থেকে বিক্ষোভ করতে থাকলে বিমানবন্দর এলাকাসহ বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বন্ধ হয়ে যায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যান চলাচল। এ নিয়ে ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষের মধ্যে দেখা দেয় হাজারো প্রশ্ন।

জানা গেছে, মাওলানা সা’দের বিরুদ্ধে ইসলাম ও শরিয়াবিরোধী বিতর্কিত বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন দারুল উলুম দেওবন্দের আলেমরা। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে একটি ফতোয়া জারি করে মাওলানা সা’দকে ওই বক্তব্য প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়। একপর্যায়ে মাওলানা সা’দ তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহারের কথা জানালেও এর প্রক্রিয়া নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেননি দেওবন্দের আলেমরা। বিশ্ব ইজতেমায় মাওলানা সা’দ যাতে অংশগ্রহণ করতে না পারেন, সে ব্যাপারে দেওবন্দের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের কওমি আলেমদের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মাওলানা সা’দকে ইজতেমায় আসতে না দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেন কওমি আলেমরা। এ নিয়ে তাবলিগের মধ্যেও বিভক্তি সৃষ্টি হয়।

এসব দ্বন্দ্বে রাজধানীর কাকরাইল মসজিদে কয়েক মাস আগে হাতাহাতি ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। এ ছাড়া মাওলানা সা’দকে বাংলাদেশে ইজতেমায় অংশগ্রহণের পক্ষে-বিপক্ষে মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইন্দোনেশিয়ার তাবলিগের একাধিক গ্রুপ বাংলাদেশকে চিঠি দিয়েছে। বিষয়টির সুরাহা করতে এরই মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।

সূত্র জানায়, গত ৬ জানুয়ারি রাজধানীর উত্তরায় মাওলানা সা’দকে কেন্দ্র করে চলমান সংকট নিরসনে একটি পরামর্শসভা অনুষ্ঠিত হয়। তাবলিগ জামাতকর্মীদের পাশাপাশি হেফাজতপন্থী কওমি আলেমরাও ওই সভায় অংশ নেন। সভায়  মাওলানা সা’দের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন এবং তাঁকে প্রতিহত করার ঘোষণা দেওয়া হয়।

পরের দিন ৭ জানুয়ারি যাত্রাবাড়ীতে কওমি ও তাবলিগসংশ্লিষ্টদের একটি বৈঠকে প্রস্তাব করা হয়, এবারের ইজতেমায় মাওলানা সা’দকে বাদ দিয়ে তাঁর প্রতিনিধি পাঠানো হোক। তবে মাওলানা সা’দের আসা না-আসা নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এদিকে গত ৭ জানুয়ারি বিশ্ব ইজতেমার সার্বিক ব্যবস্থা নিয়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের টঙ্গীর আঞ্চলিক কার্যালয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে তাবলিগ জামাতের অন্যতম শীর্ষ মুরব্বি ড. রফিকুল ইসলাম জানান, এবারের ইজতেমায় একটি পক্ষ মাওলানা সা’দের আগমন প্রতিহত করতে সচেষ্ট রয়েছে। এ কারণে ইজতেমা অনুষ্ঠানে যেন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে সে জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে বিশ্ব ইজতেমা সরিয়ে নিতে একটি মহল তৎপর রয়েছে। তাবলিগ জামাতের শীর্ষ মুরব্বিদের ইচ্ছা, এবারের ইজতেমা যেন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়। তা না হলে বিশ্ব ইজতেমা অন্য কোনো দেশে স্থানান্তর হতে পারে।

তাবলিগ জামাতের সার্বিক ব্যবস্থাপনাবিষয়ক জিম্মাদার প্রকৌশলী গিয়াস উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠান নিয়ে তাবলিগ জামাতের শীর্ষ মুরব্বিদের মধ্যে যে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে মাওলানা সা’দের আগমন, ইজতেমায় অবস্থান ও আখেরি মোনাজাত পরিচালনা নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। অধিকাংশ মুরব্বি চাচ্ছেন আগের মতোই মাওলানা সা’দ তাবলিগ মারকাজের আমির হিসেবে বিশ্ব ইজতেমা পরিচালনা করবেন। তবে একটি অংশ এতে বিরোধিতা করছে।

তাবলিগ জামাতের শীর্ষ মজলিশে শুরার প্রভাবশালী সদস্য ওয়াসিকুল ইসলাম বলেন, ‘মাওলানা সা’দের আগমনকে কেন্দ্র করে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তা বিশ্ব ইজতেমার বিরুদ্ধে একটি চক্রান্ত। আমরা এই চক্রান্তের অবসান ও সুষ্ঠু পরিবেশ প্রত্যাশা করি।’

সংকট নিরসন প্রসঙ্গে তাবলিগের শুরা সদস্য মাওলানা রবিউল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ পরিস্থিতিতে আমার পক্ষে কথা বলা মুশকিল। এ সংকট নিয়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে। প্রশাসনের কর্মকর্তারাও যুক্ত হয়েছেন। এখন দেখার বিষয়, সরকারের পক্ষ থেকে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।’

ইজতেমার প্রস্তুতির কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন, ইজতেমা ময়দানে মুরব্বিদের খেদমতের জিম্মাদার ডা. আসগার। তিনি বলেন, ‘আশা করি, কোনো সমস্যা হবে না। কারণ ইজতেমায় আগতরা কোনো দলের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়।’

মাওলানা সা’দকে নিয়ে সৃষ্ট জটিলতায় প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলতে রাজি না হলেও জানা গেছে, গতকাল বিমানবন্দরে যে বিক্ষোভ হয়েছে এর নেপথ্যে রয়েছেন মাওলানা জুবায়ের ও মাওলানা রবিউল হক। অন্যদিকে পক্ষে রয়েছেন মাওলানা ওয়াসিমুল ইসলাম।

ইজতেমার প্রস্তুতি সম্পন্ন 

এদিকে টঙ্গীর তুরাগ নদের তীরে আগামীকাল শুরু হতে যাওয়া ৫৩তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আজ বৃহস্পতিবার ফজরের নামাজের পর থেকে বিশ্ব ইজতেমার মূল কর্মসূচির প্রথম ধাপ ‘আমবয়ান’ শুরু হবে।

এবার প্রথম পর্বে ১৬ জেলার মুসল্লিরা অংশ নেবে। আগামী ১৯ জানুয়ারি একই স্থানে শুরু হবে বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব।

বিশ্ব ইজতেমার সার্বিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ক জিম্মাদার প্রকৌশলী গিয়াস উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে জানান, তুরাগ নদের তীরে তৈরি করা হয়েছে চটের বিশাল প্যান্ডেল। ময়দানের উত্তর-পশ্চিম দিকে তৈরি করা হয়েছে আন্তর্জাতিক নিবাস। এবারের ইজতেমায় গত বছরের চেয়ে মুসল্লির সংখ্যা আরো বেশি হবে বলে আশা করছেন আয়োজকরা। 

প্রথম পর্বে যেসব জেলার মুসল্লিরা অংশ নেবে—ঢাকা (১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭, ৮, ১৬, ১৮, ২০, ২১ নম্বর খেত্তা), পঞ্চগড় (৯ নম্বর খেত্তা), নীলফামারী (১০ নম্বর খেত্তা), শেরপুর (১১ নম্বর খেত্তা), নারায়ণগঞ্জ (১২, ১৯ নম্বর খেত্তা), গাইবান্ধা (১৩ নম্বর খেত্তা), নাটোর (১৪ নম্বর খেত্তা), মাদারীপুর (১৫ নম্বর খেত্তা), নড়াইল (১৭ নম্বর খেত্তা), লক্ষ্মীপুর (২২ নম্বর খেত্তা), ঝালকাঠি (২৪ নম্বর খেত্তা), ভোলা (২৫, ২৬ নম্বর খেত্তা), মাগুরা (২৭ নম্বর খেত্তা), পটুয়াখালী (২৮ নম্বর খেত্তা)।

গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল শেখ জানান, বিশ্ব ইজতেমার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রথম পর্বে পুলিশ র‌্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার ছয় হাজার সদস্য মোতায়েন থাকবে। বিশ্ব ইজতেমাস্থলসহ আশপাশে কড়া নজরদারি থাকবে। ১৫টি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ও ৪২টি সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে নিরাপত্তার বিষয়টি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ ছাড়া নৌ ও আকাশপথে টহল অব্যাহত থাকবে। ইজতেমা প্রাঙ্গণে প্রবেশের ১৭টি গেটে দেহ তল্লাশির ব্যবস্থা থাকবে।


মন্তব্য