kalerkantho


ইজতেমায় যাবেন না মাওলানা সা’দ

নিজস্ব প্রতিবেদক ও টঙ্গী (গাজীপুর) প্রতিনিধি   

১২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ইজতেমায় যাবেন না মাওলানা সা’দ

তাবলিগ জামাতে উত্তেজনার পর কাকরাইল মসজিদকে ঘিরে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

ভারতের দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজের জিম্মাদার মাওলানা সা’দ কান্ধলভী বিশ্ব ইজতেমায় যোগ দিতে না পারলেও কাকরাইল মসজিদে বয়ান করতে পারবেন। আর সেই বয়ান শুনতে শুধু তাঁর অনুসারীরা অংশ নিতে পারবেন। এ ছাড়া মাওলানা সা’দ যখন খুশি তখন তাঁর নিজ দেশে ফিরে যেতে পারবেন। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অবশ্য একটি সূত্র জানায়, তিনি আজ শুক্রবার জুমার নামাজের পর দিল্লি ফিরে যাবেন।

মাওলানা সা’দের বিরুদ্ধে কোরআন-সুন্নাহর অপব্যাখ্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি ইজতেমায় যোগ দিতে আসায় দুই দিন ধরে বিবদমান দুই পক্ষের মধ্যে চরম টানাপড়েন চলছিল। এ অবস্থায় গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ওই দুই পক্ষকে নিয়ে বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান জানিয়েছেন, মাওলানা সা’দ ইজতেমায় যোগ দিচ্ছেন না। বৈঠকে তাবলিগ জামাতের মুরব্বিরা এ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

এর আগে হেফাজতে ইসলামের নেতারা হুমকি দেন, মাওলানা সা’দ ইজতেমায় যোগ দিলে দেশ অচল করে দেওয়া হবে। এ অবস্থার মধ্য দিয়েই আজ টঙ্গীতে ৫৩তম ইজতেমার প্রথম পর্ব শুরু হচ্ছে। চলমান সংকটের কারণে ইজতেমা এলাকায় নেওয়া হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা। এ ছাড়া মাওলানা সা’দ কাকরাইল মসজিদে থাকায় সেখানেও ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। বায়তুল মোকাররম মসজিদ এলাকায়ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে বায়তুল মোকাররম মসজিদ চত্বরে হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম সম্পাদক ফজলুল করিম কাশেমী সাংবাদিকদের বলেন, সূর্য (বৃহস্পতিবার) ডোবার আগে বিতর্কিত মাওলানা সা’দকে ফেরত পাঠাতে হবে। না হলে দেশ অচল করে দেওয়া হবে। তিনি আরো বলেন, “মাওলানা সা’দ নিজেকে দাওয়াতুল তাবলিগের স্বঘোষিত আমির হিসেবে দাবি করেন, যা পুরোপুরি অবৈধ। তিনি কোরআন-হাদিসের অপব্যাখ্যা দিয়েছেন। মাওলানা সা’দকে ফেরত পাঠালে দেশ শান্ত হবে, তাহলে গাড়ি-ঘোড়া চলবে, নয়তো সব বন্ধ হয়ে যাবে।”

এমন পরিস্থিতি শান্ত করতে উদ্যোগ নেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গতকাল বিকেলে উভয় পক্ষকে ডেকে পাঠানো হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, স্বরাষ্ট্রসচিব মোস্তাফা কামাল উদ্দীন, সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব ফরিদ উদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী, ধর্মসচিব আনিছুর রহমান, র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন, পুলিশের বিশেষ শাখার প্রধান জাবেদ পাটোয়ারী, ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া, কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাকের সিনিয়র সহসভাপতি আল্লামা আশরাফ আলী, গুলশান আজাদ মসজিদের খতিব মাওলানা মাহমুদুল হাসান, আওয়ামী লীগের ধর্মবিষয়ক সম্পাদক শেখ আবদুল্লাহ, বেফাকের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মাওলানা আবদুল কুদ্দুস, মুফতি মিযানুর রহমান সাঈদ, জামিয়া রাহমানিয়ার মুহতামিম মুফতি মাহফুজুল হক, লালবাগ মাদরাসার মুফতি ফয়জুল্লাহ, আফতাবনগর মাদরাসার মুহতামিম মুফতি মোহাম্মদ আলী, মাওলানা ওয়াসেক, মাসুম প্রমুখ।

তাঁদের মধ্যে মাওলানা ওয়াসেক ও মাসুম মাওলানা সা’দের ইজতেমায় যাওয়ার পক্ষে কথা বলেন। অন্যরা এর বিরোধিতা করেন। ওয়াসেক ও মাসুম চারজন বিদেশিকে সঙ্গে নিয়ে যান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে। কিন্তু তাঁদের বৈঠকে অংশগ্রহণ করতে না দিয়ে অন্য কক্ষে বসিয়ে রাখা হয়।

বৈঠকে থাকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, বৈঠকের শুরুতেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উপস্থিত সবার উদ্দেশে বলেন, সরকার তাবলিগের ওপর কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চায় না। তবে সমঝোতায় পৌঁছতে হবে।

এরপর বক্তব্য দেন মাওলানা মাহমুদুল হাসান। তিনি বলেন, ‘ওনাকে (সা’দ) ইজতেমায় যেতে দেওয়া ঠিক হবে না। আমাকে বলা হয়েছিল উনি আসবেন না। তখন আমি একটি পক্ষকে শান্ত করেছিলাম তিনি আসবেন না বলে। তিনি চলে আসায় ওই পক্ষ এখন আমাকে বলছে, আপনি আমাদেরকে দমিয়ে রাখলেন।’

শেখ আবদুল্লা বলেন, ‘দুই পক্ষকে ছাড় দিয়ে আমাদের একটি সমাধানে আসতে হবে। মাওলানা সা’দ একজন মেহমান। আমরা চাই তাঁর সম্মানজনক প্রস্থান।’

মাওলানা ওয়াসেক বলেন, ‘মাওলানা সা’দ ইজতেমায় বয়ান করে থাকেন। তাঁকে সেখানে যেতে না দেওয়াটা ঠিক হবে না। ইজতেমা নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্র হচ্ছে। উনি না গেলে ইজতেমা অন্য দেশে নিয়ে যাবে।’

এ সময় অন্যরা সমস্বরে বিরোধিতা করে বলেন, এ কারণে ইজতেমা অন্য দেশে নিয়ে যাবে—এ কথা ঠিক নয়।

বিশ্ব ইজতেমায় যোগ দিতে বুধবার দুপুরে মাওলানা সা’দ ঢাকায় আসেন। এরপর তাঁকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বায়তুল মোকাররম মসজিদে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন থেকে তিনি সেখানে অবস্থান করছেন। অন্যদিকে পল্টনে বায়তুল মোকাররম মসজিদে অবস্থান নেয় মাওলানা সা’দ বিরোধীরা।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এমন একটি ঘটনা ঘটবে আগে থেকেই আঁচ করা যাচ্ছিল। এ কারণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তাদের সঙ্গে কথাও বলা হয়। কোনো পক্ষই আপস না আসায় সেটি আগে নিরসন করা যায়নি। 

ব্যাপক নিরাপত্তা : মাওলানা সা’দের বিশ্ব ইজতেমায় অংশগ্রহণ ঠেকাতে গতকালও বিক্ষোভ করেছে তাঁর বিরোধীরা। গতকাল সকাল থেকে কাকরাইল মসজিদ ও বায়তুল মোকাররম চত্বরে মধুপুরের পীর আব্দুল হামিদের নেতৃত্বে চলেছে অবস্থান কর্মসূচি। পক্ষ-বিপক্ষ মুসল্লিদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে কাকরাইল জামে মসজিদ ঘিরে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়। 

ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের উপকমিশনার মারুফ হোসেন সরদার বলেন, পরিস্থিতি তাঁদের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। তবে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কাকরাইল মসজিদ ও তার আশপাশ এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

অন্যদিকে গতকাল সকালে ইজতেমা মাঠে নিরাপত্তা প্রস্তুতি দেখতে গিয়ে র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. আনোয়ার লতিফ খান সাংবাদিকদের জানান, বিশ্ব ইজতেমাকে ঘিরে যেন কোনো উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয় সেদিকে র‌্যাবসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক রয়েছে।

টঙ্গী পরিস্থিতি : মাওলানা সা’দ কান্ধলভীর আগমনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনা এখনো প্রশমিত হয়নি টঙ্গীতে। আবার মাওলানা সা’দ ইস্যুতে কথা বলতে তাবলিগের বেশির ভাগ মুরব্বি অপারগতা প্রকাশ করেন। কেউ কেউ তাঁদের মুঠোফোন বন্ধ করে রেখেছেন।

গতকাল বিশ্ব ইজতেমার সার্বিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ক জিম্মাদার প্রকৌশলী গিয়াস উদ্দিন বলেন, মাওলানা সা’দ বিশ্ব তাবলিগ মারকাজের এখনো আমির। তিনি বিশ্ব ইজতেমার নীতিনির্ধারণী শুরা সদস্যের মধ্যে সবচেয়ে জ্যেষ্ঠ ব্যক্তি। বিশ্ব ইজতেমায় যোগ দিতে তিনি বাংলাদেশে এসেছেন। তাবলিগ জামাতের মজলিশের শুরাই মুরব্বিদের সম্পর্কে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার রাখেন। বিশ্ব ইজতেমায় কে বয়ান করবেন, কে মোনাজাত পরিচালনা করবেন তা শুরা সদস্যের বাইরের কেউ বলে দিতে পারেন না।

বিমানবন্দরের সামনে বুধবারের বিক্ষোভ সমাবেশের প্রধান উদ্যোক্তা টঙ্গী গাজীপুর অঞ্চলের অর্ধশতাধিক কওমি মাদরাসায় ‘বড় হুজুর’ নামে পরিচিত গাজীপুর জেলা হেফাজতে ইসলামের সভাপতি মুফতি মাসুদউল করিম বলেন, মাওলানা সা’দ ইসলামের মূল আকিদা সম্পর্কে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের হক্কানি ওলামায়ে কেরাম তাঁর মতামতের সঙ্গে একমত পোষণ করেন না। আমরা বিশ্ব তাবলিগ মারকাজের মহান দায়িত্ব থেকে তাঁর অপসারণ দাবি করে আসছি।


মন্তব্য