kalerkantho


ভূত দেখলেন ট্রাম্প, কাঁদলেন মেলানিয়া

১৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ভূত দেখলেন ট্রাম্প, কাঁদলেন মেলানিয়া

মার্কিন সাংবাদিক মাইকেল ওলফের সদ্য প্রকাশিত ‘ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি : ইনসাইড দ্য ট্রাম্প হোয়াইট হাউস’ বইটি শুধু আমেরিকায়ই নয়, গোটা বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে। কী আছে বইটিতে? পড়ুন কালের কণ্ঠে ধারাবাহিকভাবে। আজ ছাপা হলো প্রথম অনুচ্ছেদের চুম্বক অংশ। ভাষান্তর : গাউস রহমান পিয়াস

 

রাজনীতিতে কাউকে না কাউকে হারতেই হবে, তবে প্রায় প্রত্যেক প্রার্থীই ভাবেন তিনি জিততেও পারেন। সম্ভবত আপনি জয় পাবেনও না যদি নিজের ওপর বিশ্বাস না রাখেন। কিন্তু ক্যাম্পেইনটি যদি হয় ট্রাম্পের? ট্রাম্পের প্রচারশিবিরের সবাই আগেই হেরে বসেছিলেন; এমনকি ট্রাম্প নিজেও। পরাজয় ছিল ট্রাম্পের কাঙ্ক্ষিত, জয় না। তাঁর স্বপ্ন ছিল, হেরে যাওয়ার পর বিশ্বের নাম্বার ওয়ান খ্যাতিমান মানুষটি হওয়া। ট্রাম্পের ক্যাম্পেইন ছিল মেল ব্রুকসের ‘দ্য প্রডিউসারস’ চলচ্চিত্রর মতো। প্রদর্শনীর শতভাগ শেয়ার প্রযোজক বিক্রি করে দিয়েছিলেন শো একেবারে চলবে না এবং তাই অডিটও হবে না, সেই আশায়। উল্টো প্রদর্শনীটি মারমার কাটকাট হয় এবং প্রযোজক ও তাঁর সহযোগী ধরা খান।

তিনি প্রেসিডেন্ট হওয়ার স্বপ্ন দেখেননি, এমনকি প্রচারণার শেষ প্রান্তে এসেও ট্রাম্প সংশয়ী ছিলেন। কিন্তু ই-মেইল কেলেঙ্কারির মতো কিছু ঘটনা হিলারিকে নিরঙ্কুশ বিজয় থেকে বঞ্চিত করে আর হারতে হারতে জিতে যান ট্রাম্প। তাহলে কেন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হলেন ট্রাম্প? দীর্ঘদিনের বন্ধু রজার আইলস ট্রাম্পকে বলতেন, ‘তুমি যদি টেলিভিশনে ক্যারিয়ারই চাও, আগে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হও।’ ট্রাম্প এই রজারকে নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগেও বলেছিলেন, এরই মধ্যে তিনি নিজেকে শক্তিশালী ব্র্যান্ড হিসেবে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছেন, তাঁর সামনে এখন অবারিত সম্ভাবনা। ঘনিষ্ঠজন স্যাম নানবার্গকে ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘আমি বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যক্তি হতে পারব।’ নানবার্গ এবার জানতে চান, ‘বাট ডু ইউ ওযান্ট টু বি প্রেসিডেন্ট? প্রেসিডেন্ট তো হতে চান? তাহলে কেন হতে চান?’ নানবার্গ কোনো উত্তর পাননি। আসলে কোনো উত্তর ছিলও না, কারণ ট্রাম্প তো জানেনই তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হচ্ছেন না। 

ট্রাম্প ভোটের মাত্র এক সপ্তাহ আগে রজারকে গল্পচ্ছলে বলেন, ‘যা পেয়ে গেছি তা আমার স্বপ্নেরও বেশি। আমি পরাজয় নিয়ে ভাবছিই না, কারণ এ আসলে হেরে যাওয়া নয়। আমরা পুরোপুরি জিতে গেছি।’ শুধু কি তাই! ট্রাম্প এরই মধ্যে লিখিত বক্তব্য তৈরি করছিলেন ভোটে হারের পর প্রকাশ্যে কী বলবেন, যদিও মুখে বলছিলেন, নির্বাচন ছিনতাই হয়ে গেছে। আগুন ও উন্মত্ততা সঙ্গে নিয়ে হারের জন্য মুখিয়ে ছিলেন ট্রাম্প এবং তাঁর ছোট্ট প্রচারশিবিরের প্রতিটি যোদ্ধা। তারা জয়ের জন্য প্রস্তুত ছিল না। ট্রাম্পের ধারণা ছিল যে জেতার যোগ্যতা কেবল হিলারির লোকজনের আছে। ট্রাম্প মাঝেমধ্যেই বলতেন, ‘দে হ্যাভ গট দ্য বেস্ট, উই হ্যাভ গট দ ওর্স্ট, সবচেয়ে ভালোটা ওরা পেয়েছে, আমাদের জুটেছে মন্দগুলো।’ ট্রাম্পের প্রচার পর্বে যে সময়টা আমি (লেখক মাইকেল ওলফ) সঙ্গে কাটিয়েছি প্রায়ই মনে হয়েছে এ কী কাণ্ড, তাঁর চারপাশের প্রতিটি মানুষই তো ইডিয়ট!

ট্রাম্প নিজেকে তুলে ধরেছিলেন বিলিয়নেয়ার হিসেবে, এ ক্ষেত্রে তিনি সম্পদ ১০ গুণ বাড়িয়ে বলেছিলেন। কিন্তু যেই প্রচারণায় অর্থব্যয়ের বিষয়টি এলো তিনি গাঁটের অর্থ দিতে রাজি হলেন না। তাঁর প্রধান কৌশল প্রণেতা স্টিভ ব্যানন সেপ্টেম্বরের প্রথম নির্বাচনী বিতর্কের পর কুশনারকে বলেছিলেন, ভোটের দিন পর্যন্ত আরো ৫০ মিলিয়ন ডলার দরকার পড়বে। কুশনারের জবাব ছিল, ‘অসম্ভব। তাঁকে যদি আমরা বিজয়ের নিশ্চয়তা দিতে না পারি এই অর্থ ট্রাম্প কিছুতেই দেবেন না।’ ‘তাহলে ২৫ মিলিয়ন দিক?’ এবারও কুশনারের উত্তর, ‘দেবেন, যদি আমরা বলতে পারি যে বিজয়ের সম্ভাবনা আছে।’ শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প ১০ মিলিয়ন ডলার দিয়েছিলেন, তাও ঋণ হিসেবে এই শর্ত বেঁধে দিয়ে যে চাঁদার তহবিলে অর্থ জমা পড়লে সেখান থেকে তিনি নিয়ে নেবেন।

আসলে ট্রাম্পের সত্যিকারের নির্বাচনী প্রচারণা ছিল না, কারণ সত্যিকারের কোনো সংগঠনই ছিল না, যেটুকু ছিল তাও ঠিকঠাক কাজ করছিল না। ‘ফল সিজন’-এ জয়লাভের যেটুকু সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল তা মিইয়ে গেল বিলি বুশের ক্যাসেটে। ভিডিওতে ট্রাম্পকে বলতে শোনা গেল, তিনি রগরগে ভাষায় নারীদের শ্লীলতাহানির পক্ষে বলছেন, জানাচ্ছেন তাঁর মতো ধনকুবের হলে নারীদেহ সুলভেই পাওয়া যায়।

এদিকে বিলি বুশ টেপ কলঙ্ক মেলানিয়া ট্রাম্পের জন্য ক্ষীণ আশা জাগাল, যাক, এবার আর তাঁর স্বামীর প্রেসিডেন্ট হওয়া হচ্ছে না। ট্রাম্পের এই বিয়ে তাঁর চারপাশের প্রায় সবার কাছে ছিল দুর্বোধ্য। ট্রাম্প-মেলানিয়া খুব কম সময়ই একসঙ্গে থাকতেন। এমনও হয়েছে, টানা অনেক দিন দুজনে কথা নেই, এমনকি যখন দুজন ট্রাম্প টাওয়ারে অবস্থান করছেন তখনো। প্রায়ই মেলানিয়া জানতেও পারতেন না ট্রাম্প কোথায় আছেন, বা মেলানিয়া জানার চেষ্টাও করতেন না। ট্রাম্প এক বাসস্থান থেকে আরেকটায় দৌড়াতেন, যেন তিনি এক ঘর থেকে আরেক ঘরে যাচ্ছেন। বাবা হিসেবে প্রথম চার সন্তান থেকে তিনি দূরে সরে গিয়েছিলেন, ট্রাম্প, মেলানিয়ার ঘরে আসা পঞ্চম সন্তান ব্যারনের সঙ্গে এই দূরত্বটা আরো দীর্ঘ। তৃতীয় বিয়ে প্রসঙ্গে ট্রাম্প বন্ধুদের বলতেন যে অবশেষে তিনি বিয়ে নামের সম্পর্কের শিল্পটার মর্মার্থ বুঝতে পেরেছেন : নিজে বাঁচো, অন্যকে বাঁচতে দাও, অর্থাত্ যে যার মতো বাঁচো, নিজের মতো সব করো।

কুখ্যাত এক বহুগামী ছিলেন ট্রাম্প এবং প্রচারণার সময় হয়ে ওঠেন সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত নারী নিপীড়ক। তার পরও বলা যাবে না, মেলানিয়ার সঙ্গে বিয়েটি কেবলই নামকাওয়াস্তে ছিল। মেলানিয়া সামনে না থাকলে প্রায়ই তাঁর কথা বলতেন ট্রাম্প। আবার সামনাসামনিও স্ত্রীর চোখের প্রশংসা করতেন ট্রাম্প, যা মেলানিয়াকে বিব্রতও করত। ট্র্রাম্প অন্যদের এও বলতেন, ‘এ আমার ট্রফি ওয়াইফ।’ কথাটি তিনি বলতেন সগর্বে এবং এতে ভণিতা ছিল না। নিজের জীবন স্ত্রীর সঙ্গে বেশি ভাগাভাগি না করলেও বিয়ের বিপদগুলো জানাতেন সদর্পে। এক ধনকুবেরের কথা নকল করে ট্রাম্প বলতেন, ‘আ হ্যাপি ওয়াইফ ইজ আ হ্যাপি লাইফ, সুখী স্ত্রীতেই জীবনের সব সুখ!’

নির্বাচনের ব্যাপারেও তিনি মেলানিয়ার সম্মতি নিয়েছিলেন (যেমন নিয়েছিলেন চারপাশের আর সব নারীর থেকেও)। তবে কন্যা ইভানকা প্রচার পর্ব থেকে নিজেকে সতর্কভাবেই দূরে রাখেন। সত্মায়ের প্রতি অপছন্দের বিষয়টি গোপন করেননি ইভানকা এবং বন্ধুদের বলতেন মজা করে, ‘জানিস, মেলানিয়া মনে করে যে বাবা জিততে যাচ্ছে।’

মেলানিয়া বিশেষত তাঁর ছোট ছেলেকে নিয়ে যে আশ্রিত জীবনে ছিলেন, তা অটুট রাখতে চাইছিলেন। স্বামীর প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনাটি তাই তাঁর জন্য ছিল ভয়ানক আশঙ্কার। ‘ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়তে যেয়ো না’, এই বলে একদিন তাঁকে অভয় দেওয়ার চেষ্টাও করেন ট্রাম্প। কিন্তু মেলানিয়ার ভয় উল্টো আরো বাড়ছিল। মাঝে ম্যানহাটানে গুজব ছড়াল, মেলানিয়ার মডেলিং ক্যারিয়ার শেষ! খুব কাছ থেকে তাঁর ওপর নজর রাখা হচ্ছে। অতীতে তাঁর ন্যুড ছবি ছাপা হয়েছিল মডেল হিসেবে, নিউ ইয়র্ক পোস্ট খবরটি দিল এবং সবাই ধরে নিল, ক্যামেরার পেছনের মানুষটি আর কেউ নন, ট্রাম্প! এরই মধ্যে সময় নির্বাচন মাসে গড়াল। ট্রাম্প স্ত্রীকে সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা দিলেন, এই নির্বাচনে জেতার কোনো উপায় নেই। ট্রাম্পের মতো অবিশ্বস্ত একজন স্বামীর কণ্ঠেও কথাটি অঙ্গীকারের মতো শুনিয়েছিল।

প্রেসিডেন্ট যাঁরা হন তাঁদের তলায় রাজনৈতিক সিঁড়ি থাকে, রাজনৈতিক বন্ধুবান্ধব থাকে, ছিল না শুধু ট্রাম্পের। রিয়েল এস্টেট বিজনেস থেকেও কেউ নির্বাচনে আসেননি তাঁর মতো। ট্রাম্প আয়কর রিটার্ন জানাননি, জানাবেনই বা কেন, তিনি তো জানেন যে জিততে যাচ্ছেন না। ট্রাম্প মনে করেছেন, এই হেরে যাওয়াটাই তাঁর জয়! ট্রাম্প বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত মানুষটি হবেন। মেয়ে ইভানকা ও মেয়ে-জামাই কুশনার ধনীর দুলাল-দুলালী পরিচিতি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক সেলিব্রিটি ও ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হয়ে উঠবেন। স্টিভ ব্যানন গণ্য হবেন টি পার্টি মুভমেন্টের মূল হোতা হিসেবে। মেলানিয়া ট্রাম্প ইচ্ছামতো স্থানে লাঞ্চ করতে যেতে পারবেন। আর এই সবই সবার অনায়াসে জয় হবে ৮ নভেম্বর, ২০১৬ পরাজয় নিশ্চিত হয়ে গেলে!

ওই রাতে ৮টার কিছু সময় পর যখন ট্রাম্পের দলের জয় প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেছে, তাঁর ছেলে ডন জুনিয়র এক বন্ধুকে জানালেন, ‘জানিস, বাবাকে এখন ভূতের মতো দেখাচ্ছে।’ যে মেলানিয়াকে ট্রাম্প সুনিশ্চিত হারের অঙ্গীকার করেছিলেন তাঁরও চোখে জল, তবে মেলানিয়ার এ কান্না আনন্দের ছিল না। স্টিভ ব্যানন হতাশার সঙ্গে দেখছিলেন, মাত্র এক ঘণ্টার কিছু বেশি সময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় ট্রাম্প কিভাবে প্রথমে অবিশ্বাসী ট্রাম্প এবং তারপর ভীতসন্ত্রস্ত ট্রাম্পে রূপান্তরিত হলেন। চূড়ান্ত রূপান্তর তখনো বাকি ছিল। আচমকা ট্রাম্প এমন এক ব্যক্তি হয়ে গেলেন যিনি বিশ্বাস করেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার যোগ্যতা তাঁর আগে থেকেই ছিল এবং দায়িত্বটি বহনের পুরো সক্ষমতাও তাঁর রয়েছে। [সংক্ষেপিত প্রথম অধ্যায় শেষ, পরের অধ্যায় আগামীকাল]

 


মন্তব্য