kalerkantho


সিপিডির গবেষণা

ব্যাংক খাতের কেলেঙ্কারির বছর ছিল ২০১৭

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ব্যাংক খাতের কেলেঙ্কারির বছর ছিল ২০১৭

সদ্য বিদায় নেওয়া বছরটিকে ব্যাংকিং খাতের জন্য কেলেঙ্কারির বছর বলে আখ্যায়িত করেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, ব্যাংকের মালিকানায় এক ধরনের ‘ক্রনিজম’ (অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব) তৈরি হয়েছে। ৯৫ শতাংশ ব্যাংকার মনে করেন, দেশে নতুন ব্যাংকের প্রয়োজন নেই। এর পরও রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন নতুন ব্যাংকের অনুমোদন দিয়েছে সরকার। সিপিডি মনে করে, রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন করে অনুমোদন পাওয়া ব্যাংকগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। উল্টো আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। মালিকানার বদল হয়েছে বেশ কটি ব্যাংকে।

গতকাল শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশ অর্থনীতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম অন্তর্বর্তীকালীন পর্যালোচনা’ শিরোনামের সংবাদ সম্মেলনে এসব মন্তব্য করেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি অভিযোগ করেন, ‘ব্যক্তি খাতের ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পাচার হচ্ছে। সঞ্চিতির ঘাটতি বেড়েছে এবং ব্যাংকে অপরিশোধিত ঋণ বেড়েছে। একই সঙ্গে জনগণের করের টাকায় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাংকগুলোতে মূলধন ঘাটতি পূরণ করা হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০১৭—এই সময়ে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণে খরচ হয়েছে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা, যা মোট পদ্মা সেতুর ব্যয়ের অর্ধেক।’ এসব ক্ষেত্রে সরকার প্রতিষেধক ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো ব্যাংকিং আইন সংশোধন করে ব্যাংকের মধ্যে পরিবারতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে বলেও অভিযোগ করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান, খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমসহ অন্যরা। সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংকিং খাত, রোহিঙ্গা ইস্যু, বৈষম্য, বন্যা ব্যবস্থাপনায় করণীয়সহ বেশ কিছু বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছে সিপিডি। সংস্থাটি বলেছে, চলতি বছরের শেষের দিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে পারে। নির্বাচনী বছরে অর্থনীতি বাড়তি ঝুঁকিতে পড়ার শঙ্কা থাকে। নির্বাচনের বছর অর্থনীতির ব্যবস্থাপনায় রক্ষণশীল হওয়ার পরামর্শ দিয়ে ড. দেবপ্রিয় বলেন, ‘নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। এ সময় জনতুষ্টিমূলক সম্প্রসারণশীল নীতি গ্রহণে সরকার প্রলুব্ধ হতে পারে; অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য যা উচিত হবে না। আগামী কয়েক মাস সংরক্ষণমূলক নীতিতে থাকা সরকারের জন্য শ্রেয় হবে।’

বৈষম্য বাড়ছে : বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়লেও ধনী-গরিবের বৈষম্য কমেনি বলে মনে করে সিপিডি। সংস্থাটি বলেছে, গত এক দশকে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের বেশি অর্জিত হচ্ছে। গত দুই অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ ছাড়িয়েছে। কিন্তু সে আলোকে ধনী ও দরিদ্রের বৈষম্য কমেনি। বরং বেড়েছে। সংস্থাটি মনে করে, প্রবৃদ্ধির গুণগত মানের অভাবে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য বাড়ছে। তাদের হিসাবে, ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে মানুষের আয়ের বৈষম্য বেড়েছে। ২০১৬ সালে দেশের মানুষের মোট আয়ের শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশ এসেছে সবচেয়ে দরিদ্রদের ৫ শতাংশ থেকে, যা ২০১০ সালে ছিল শূন্য দশমিক ৭৪ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১৬ সালে মোট আয়ের সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশের অবদান ২৭.৮৯ শতাংশ, যা ২০১০ সালে ২৪.৬১ শতাংশ ছিল বলে সিপিডির হিসাবে উঠে এসেছে। অর্থাৎ ধনীরা ২০১০ সালে যে আয় করত, ২০১৬ সালে এসে তার চেয়ে বেশি আয় করেছে। অন্যদিকে আয় কমেছে গরিবদের। সিপিডির গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কাছে প্রবৃদ্ধির সুফল পৌঁছেনি। গরিবরা আরো গরিব হচ্ছে, ধনীরা আরো ধনী হচ্ছে।

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যে ব্যাংকে লুটপাট চলছে। ব্যাংকের অনিয়ম প্রতিরোধের উদ্যোগ নেই। পৃথিবীর অনেক দেশে আর্থিক খাতের সংকট থেকে বড় ধরনের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের আর্থিক সংকট সেই দিকে যাচ্ছে কি না তা দেখতে হবে।

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘সরকার অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০১৭ সাল শুরু করলেও শেষের দিকে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি। সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বেশ দুর্বল হয়ে গেছে। চাপের মুখে পড়েছে। এটা সামাল দিতে আমরা যে সংস্কারের কথা বলেছিলাম, তা সামনের দিকে এগোয়নি, বরং পেছনের দিকে গেছে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদাহরণ ব্যাংকিং খাত।’

ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমদানির আড়ালে দেশ থেকে অর্থপাচার হচ্ছে। বিশেষ করে পোশাকশিল্পের কাঁচামাল তুলা আমদানি ৭৫ শতাংশ বেড়েছে। উৎপাদনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর ৮০০ থেকে ৯০০ কোটি ডলার পাচার হচ্ছে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশই আমদানি-রপ্তানিতে মূল্য কারসাজির মাধ্যমে। বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) খতিয়ে দেখা উচিত। তিনি বলেন, নির্বাচনী বছরে অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। বর্তমান সমস্যা ও নির্বাচনের বাড়তি ঝুঁকি যোগ হলে অর্থনীতি বড় ধরনের চাপে পড়বে বলে অভিমত তাঁর।

সামগ্রিক এই পরিস্থিতির জন্য দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে দায়ী করেন দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বমূলক ভূমিকার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল। এ ঘাটতি তিন জায়গায়। সংস্কারের উদ্যমের অভাব, সমন্বয় করতে না পারা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায় দুর্বলতা। চলতি বছর সম্পর্কে তিনি বলেন, ২০১৮ সালের সব কর্মকাণ্ড নির্বাচনমুখী। চলতি বছরে এমন ম্যাজিক্যাল কিছু ঘটবে না, যাতে বড় ধরনের সংস্কার হবে। সংস্কার করার মতো রাজনৈতিক পুঁজিও নেই। গত বছরের আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার সঙ্গে চলতি বছরের নির্বাচনী বাড়তি ঝুঁকি যোগ হবে। এ জন্য রক্ষণশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা কার্যকর করতে হবে। ঋণ কমাতে হবে, টাকার মূল্যমান ঠিক রাখতে হবে, মূল্যস্ফীতি বিশেষ করে চালের দাম কমাতে হবে।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে পর্যবেক্ষণ : মিয়ানমার থেকে প্রাণভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নিয়ে আলাদা একটি গবেষণা করেছে সিপিডি। সংস্থাটি বলেছে, নতুন-পুরনো মিলে সাড়ে ১২ লাখ রোহিঙ্গার কারণে ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। সেটি হতে পারে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত। মিয়ানমার সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এখন থেকে প্রতিদিন যদি ৩০০ রোহিঙ্গাকে ফেরত নেয়, তাহলে সময় লাগবে সাত বছর। মূল্যস্ফীতি ও জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধি বাদ দিয়ে বিদ্যমান রোহিঙ্গাদের পেছনে ২০২৫ সাল পর্যন্ত খরচ করতে হবে ৪৪৩ কোটি ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৩৫ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধিকে বাদ দিয়ে মূল্যস্ফীতি যোগ করে প্রতিদিন যদি ৩০০ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে পাঠানো হয়, তাহলে সময় লাগবে আট বছর। অর্থাৎ ২০২৬ সাল নাগাদ রোহিঙ্গাদের পেছনে খরচ করতে হবে ৫৯০ কোটি ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৪৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা। জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধিকে বাদ দিয়ে মূল্যস্ফীতি যোগ করে প্রতিদিন যদি ২০০ রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানো হয়, তাহলে সময় লাগবে ১২ বছর। সে ক্ষেত্রে ২০৩০ সাল নাগাদ তাদের পেছনে খরচ হবে এক হাজার ৪৫ কোটি ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৮৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।

রোহিঙ্গাদের জন্য আগামী ছয় মাসে কত খরচ হতে পারে, তার একটি ধারণা দিয়েছে সিপিডি। তাতে বলা হয়েছে, এখন থেকে আগামী জুন পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের পেছনে খরচ হবে ৮৮ কোটি ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ সাত হাজার ৪০ কোটি টাকা। সিপিডি বলেছে, ২৫ আগস্টের পর থেকে এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প তৈরির কারণে ছয় হাজার একর বনের জমি উজাড় হয়েছে। সিপিডির হিসাবে এর আর্থিক মূল্য ৭৪১ কোটি টাকা।

চ্যালেঞ্জ : দেশের অর্থনীতিতে এই মুহূর্তে পাঁচটি চ্যালেঞ্জ দেখছে সিপিডি। সেগুলো হলো : প্রবৃদ্ধি হলেও সে হারে দারিদ্র্য কমছে না। রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা। আমদানি রাজস্বনির্ভরতা বেড়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি। ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। সব শেষ চ্যালেঞ্জ হিসেবে লেনদেনের ভারসাম্যে স্থিতিশীলতা রক্ষা করাকে দেখছে সিপিডি। এরই মধ্যে আমদানি ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়েছে। কিন্তু তার বিপরীতে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স আয় বাড়েনি।


মন্তব্য