kalerkantho


পাথরে বিদ্ধ তীরটি টেনে তুললেন ট্রাম্প

১৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



পাথরে বিদ্ধ তীরটি টেনে তুললেন ট্রাম্প

মার্কিন সাংবাদিক মাইকেল ওলফের সদ্যঃপ্রকাশিত ‘ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি : ইনসাইড দ্য ট্রাম্প হোয়াইট হাউস’ বইটি শুধু আমেরিকাই নয়, গোটা বিশ্বকে নাড়া দিয়েছে। কী আছে বইটিতে? পড়ুন কালের কণ্ঠে ধারাবাহিকভাবে। আজ ছাপা হলো দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের বাছাই অংশ। ভাষান্তর : গাউস রহমান পিয়াস ১২ নভেম্বর ২০১৬। নির্বাচনের পর প্রথম শনিবার। ট্রাম্প টাওয়ারের ত্রিতল অ্যাপার্টমেন্টে ছোট একদল শুভাকাঙ্ক্ষীকে আপ্যায়ন করছেন ট্রাম্প। কিন্তু বারবার ঘড়ি দেখছিলেন ট্রাম্প, দৃশ্যটি তাঁর নিকটজনদের একদমই ভালো লাগছিল না, হাজার হোক ট্রাম্প এখন প্রেসিডেন্ট। যে মানুষটির দেরি দেখে ট্রাম্প এমন চঞ্চল, তিনি আর কেউ নন, মিডিয়া মোগল রুপার্ট মারডক; যাঁর কাছে ট্রাম্প নিছকই একজন বাচাল ও বোকা। আগের বছরও কন্যা ইভানকা ট্রাম্প যখন বললেন তাঁর বাবা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে যাচ্ছেন, তখন মারডক তাচ্ছিল্যভরে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেই ট্রাম্প এখন প্রেসিডেন্ট এবং মারডকও কথা দিয়েছেন তিনি সস্ত্রীক আসছেন। তবে আসতে তাঁর দেরি হচ্ছিল, অনেক দেরি।

এদিকে অতিথিরা উঠে যাওয়ার জন্য উসখুস করছে এবং ট্রাম্প তাদের আশ্বস্ত করছেন, তাঁর বিশেষ অতিথি এই এলেন বলে! এর পরও কয়েকজন অতিথি উঠে পড়লে ট্রাম্প আরেকটু বসার অনুরোধ করে বলেন, ‘ব্যক্তিটি যদি রুপার্ট হন আপনারা নিশ্চয়ই অপেক্ষা করতে রাজি হবেন।’ অস্থির ট্রাম্প আরো বলছিলেন, ‘রুপার্ট মহান ব্যক্তিদের একজন। ওয়ান অব দ্য গ্রেটস, লাস্ট অব দ্য গ্রেটস। তাঁকে দেখতে হলে খানিক ধৈর্ষ ধরতে হবে বৈকি!’

যুক্তরাষ্ট্রের একজন প্রেসিডেন্টের পক্ষে এমন আচরণ আদৌ মানানসই ছিল না। হতে পারে তখনো ট্রাম্প বুঝে উঠতে পারেননি—একজন প্রেসিডেন্ট এবং সমাজের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি এক জিনিস নন। অবশেষে তিনি এলেন। কিন্তু মারডককে দেখাচ্ছিল গম্ভীর, যেন নিজেকে আড়াল করারই চেষ্টা। আসলে তিনি ট্রাম্প সম্পর্কে নিজের এত দিনের দৃষ্টিটা বদলানোর চেষ্টা করছিলেন। কারণ লোকটি এক প্রজন্মেরও বেশি সময় ধরে ধনী ও প্রসিদ্ধ মানুষের আসরে ভাঁড় রাজকুমারের বেশি কিছু ছিলেন না।

ট্রাম্পকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছিল অনেক বিলিয়নেয়ার, মারডক একা নন। তবে কিছু মানুষ, যারা ট্রাম্পকে ভালো জানত, তাদের মধ্যে তাঁকে নিয়ে এক ধরনের বিভ্রম কাজ করত। ট্রাম্পের মধ্যে অন্য রকম কিছু তো আছেই। ‘হি ওয়াজ হোয়াট হি ওয়াজ’। তিনি অভিনব। চোখ তাঁর পিটপিট করে, আত্মায় পাপ। কিন্তু জাপানি জুডুর রিয়ালিটি শো সব বদলে দিয়েছে এবং এ ট্রাম্পই এখন প্রেসিডেন্ট। তাঁকে নিয়ে যে যা-ই বলুক, বাজিমাত করে গেছেন ট্রাম্প। পাথরে বিদ্ধ তীরটি টেনে তুলেছেন। এ কম কথা নয়। তাই বিলিয়নেয়ারদেরও এখন তাঁকে নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। ভাবতে হচ্ছে কাছের মানুষদেরও, যদি তাদের সামনে এখন পশ্চিমপাড়ার বড় পদের হাতছানি, ইতিহাস সৃষ্টিকারী চাকরির সুযোগ। কারণ ট্রাম্প অদ্ভুত, কঠিন, হাস্যকর শুধু নন, অদক্ষও। চলনে-বলনে এখনো প্রেসিডেন্ট ভাব আসেনি, এমনকি আত্মনিয়ন্ত্রণের সামান্য চেষ্টাটাও নেই। জিম মাতিস, রেক্স টিলারসন, জেব বুশের অনুসারীরা—সবারই চিন্তার বিন্দু একটা জায়গায় মিলে যাচ্ছিল; আর তা হচ্ছে ট্রাম্প যত অদ্ভুত বা বিমূর্ত হয়ে থাকুন, তিনি এখন রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। ট্রাম্প-বৃত্তের কেউ বলছিল, ‘আমরা পারব’, কেউ বা বলছিল ‘আমরা হয়তো পারব।’

হতে পারে তিনি আধুনিক ইতিহাসের সব প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ, ভয়ংকর ও নীচ ছিলেন, ব্যক্তি ট্রাম্পের সঙ্গ স্বচ্ছন্দ বোধ করার মতো। তিনি বন্ধুবৎসল। ‘এ বিগ ওয়ার্ম হারটেড মাংকি’—তাঁকে নিয়ে দলের প্রধান কৌশলী স্টিভ ব্যাননের একটা মন্তব্য এমনই। ট্রাম্প চরিত্রের অন্য কিছু দিক আরো বেশি সমস্যাসংকুল ছিল। অবকাঠামো নির্মাণ বাদে আর কিছুই ভালো করে তিনি শেখেননি। মনে হবে মাত্র আধাঘণ্টা আগে শিখেছেন এবং শিক্ষাটি আধাখেচড়া। তাঁর ধনী বন্ধুদের জানাই ছিল ট্রাম্প ব্যালান্স শিট পর্যন্ত পড়তে জানেন না, এখন তাঁর ক্ষমতার কাছের মানুষও দেখছে প্রেসিডেন্ট সব কিছুতেই কাঁচা। তবে কিছু স্বভাবজাত ব্যাপারও তাঁর মধ্যে ছিল। তিনি অন্যকে বিশ্বাসী করে তুলতে পারেন। ব্রিটিশ সাংবাদিক, সাবেক সিএনএন উপস্থাপক পিয়ারস মরগান ট্রাম্পের একজন বিশ্বস্ত বন্ধুও। মরগান বলেন, ট্রাম্পের একটি বই পড়লেই তাঁর চরিত্র ভেতর থেকে জানা যাবে, ‘আর্ট অব দ্য ডিল’। সমস্যা হচ্ছে, লেখক হিসেবে নাম থাকলেও বইটি ট্রাম্প লেখেননি, সব এসেছে সহরচয়িতা টনি শোয়ারতজের কলম থেকে। টনি নিজেও বলেছেন, লেখা দূরের কথা, ট্রাম্প হয়তো পড়েনইনি বইটি। আসলেই তাই। ট্রাম্প কোনো লেখক নন, কেবলই চরিত্র : একটি প্রধান চরিত্র, একজন নায়ক। রেসলিংয়ের একনিষ্ঠ ভক্ত ট্রাম্প জীবন ধারণ করছেন রেসলার হালক হোগানের মতো। প্রেসিডেন্ট পদে জেতার পর ট্রাম্পের মধ্যে আরো একটি পরিবর্তন দেখছিল বন্ধুসহ নিকটজনরা। ট্রাম্প ‘আমি’ এড়িয়ে প্রায়ই থার্ড পারসনে কথা বলছিলেন! যেন প্রেসিডেন্ট হওয়ার ব্যাপারটি তখনো তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না বা মানতে চাইছিলেন না।

নিজের সম্পর্কে ট্রাম্পের কিছু ধারণা খুব সুস্পষ্ট। একবার নিজের বিমানে করে ফিরছেন, পাশে একজন বিলিয়নেয়ার—এক বিদেশি মডেলকে নিয়ে এসেছেন সঙ্গে করে। বন্ধুর ডেটিংয়ের দিন ট্রাম্পও উপস্থিত থাকবেন এই ভাবনা থেকে তিনি তাঁদের আটলান্টিক সিটিতে যাত্রাবিরতির প্রস্তাব দিলেন। প্রস্তাব দিলেন নিজের ক্যাসিনো ঘুরিয়ে দেখানোর। কিন্তু বন্ধুটি মডেলকে বললেন, শহরটিতে আদতে দেখার কিছু নেই, সাদা চামড়ার ‘ট্র্যাশ’ (জঞ্জাল) ছাড়া। ‘হোয়াইট ট্র্যাশ কী’ বিস্মিত হয়েছিলেন মডেলটি। ‘এই মানুষগুলো আমারই মতো, তফাত একটিই, তারা দরিদ্র’—উত্তর দিয়েছিলেন ট্রাম্প।

বন্ধুরা আরো দেখলেন ট্রাম্পের মধ্যে একটি জিনিস নেই—দ্বিধা। তিনি ছিলেন বিদ্রোহী, একজন শান্তিভঙ্গকারী, শুধু আইনের বাইরেই থাকেন না, কানুনেরও নিন্দা করেন। সমর্থনযোগ্য হলে পরের মতে সায় দেওয়া বা নিজেকে সম্মানিত বোধ করা—এসবের ধারেকাছেও নেই। একটা লাইসেন্স হলেই হলো, যা ভাঙিয়ে জয়, জয়, এবং কেবল জয় নিশ্চিত করা যায়। ট্রাম্পের একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু, যিনি বিল ক্লিনটনেরও ভালো বন্ধু ছিলেন, দুজনের তুলনা করে বলেন, নারী লোলুপতা, এমনকি নারী নির্যাতনের বিচারে দুজন যেন মাসতুতো ভাই! পার্থক্য এক জায়গায়—ক্লিনটনের মর্যাদাবোধ ছিল, ট্রাম্পের ছিল না। ট্রাম্প একটি কথা বলতেও পছন্দ করতেন—যেসব ঘটনা তাঁর জীবনকে উপভোগ্য করেছে, তার একটি হচ্ছে বন্ধুর স্ত্রীকে নিজ শয্যায় নেওয়া। প্রথমে বন্ধুর স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে তিনি বলতেন, ‘তোমার তো আরো বেশি কিছু প্রাপ্য। নিজেকে কেন ঠকাচ্ছ?’। পরে বন্ধুটিকেও ডেকে একই কৌশলে হতাশ করে প্রস্তাব দিতেন, ‘আজই লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে আসছে...। চাও তো ওপরের তলায় কক্ষ আছে, অপেক্ষা করো। নিয়ে আসছি।’ বন্ধুটির স্ত্রীকে দুর্বল করতে এই আলাপচারিতাটি ফোনে শোনানো হতো।

ট্রাম্পকে যারা জানত, তাদের অনেকের কাছে আরো একটি উদ্বেগ বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল। রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্বটি পালনের জন্য যেসব উপলব্ধিগুণ থাকা প্রয়োজন বলে স্নায়ুবিশেষজ্ঞরা মত দেন, সেগুলো ট্রাম্পের ছিল না। পরিকল্পনা প্রণয়ন, ব্যবস্থাপনা, মনোযোগ দান, বিষয় থেকে বিষয়ে আলোকপাত করা—এ দক্ষতাগুলোর অভাব ছিল ট্রাম্পের। দুটি বিন্দুকে জোড়া লাগানো, কার্য ও কারণের সম্পর্ক অনুধাবনের শক্তিও অনুপস্থিত ছিল ট্রাম্পের মধ্যে। এই না থাকার যথার্থ উদাহরণ তাঁর রাশিয়া কেলেঙ্কারি। ভোট কারচুপির ষড়যন্ত্র তিনি নাও যদি করে থাকেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও তাঁর লোকজনের সমীহ লাভের চেষ্টার ভয়ের কারণ তো ছিলই।

যদিও ক্যাম্পেইনকালে প্রযুক্তি খাতকে তুলাধোনা করেছেন ১৪ ডিসেম্বর সিলিকন ভ্যালির উচ্চপর্যায়ের এক প্রতিনিধিদলকে ট্রাম্প টাওয়ারে গ্রহণ করলেন ট্রাম্প। ওই দিনই বিকেলে ট্রাম্প ফোন করলেন রুপার্ট মারডককে—মারডক জানাতে চাইলেন কমন হল সব কিছু। ‘ওহ গ্রেট, জাস্ট গ্রেট’। রিয়েলি রিয়েলি গুড। এই মানুষগুলো আমার সাহায্যের দরজায় পড়বে। ওবামা তাদের প্রতি সদয় ছিলেন না, বিধি-নিষেধের পাহাড় তুলেছিলেন। তাদের সহায়তা করার সুযোগটি এখন আমার সামনে’—বললেন ট্রাম্প। জবাবে রুপার্ট মারডক বলেন, ‘ডোনাল্ড, আট বছর এই লোকগুলো ওবামাকে তাদের পকেটে পুরে রেখেছিল। আদতে প্রশাসন ওরাই চালিয়েছিল। তোমার সহায়তা তাদের লাগবে না।’ সঙ্গে তিনি যোগ করলেন, ‘এইচ-ওয়ানবি ভিসার কথা জানো তো। তাদের এই ভিসাটি দরকার।’ মারডকের পরামর্শটি ছিল এইচ-ওয়ানবি ভিসা ইস্যুতে উদারনীতি নিলে ট্রাম্প তাঁর অভিবাসন প্রতিশ্রুতি নিয়ে সামনে ফাঁপরে পড়বেন। তবে ট্রাম্পকে দেখাল নিরুদ্বিগ্ন এবং তিনি মারডককে বললেন, ‘আমি আমার মতো বিষয়টি সামলাব।’ ফোনের লাইন কেটে দেওয়ার আগে মারডকের শেষ কথাটি ছিল, হোয়াট এ ফা...ইডিয়ট’—কী গণ্ডমূর্খ একটা।’



মন্তব্য