kalerkantho


যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাব

গত বছর সড়কে ৭ হাজার মৃত্যু

দুর্ঘটনা বেড়েছে ১৫.৫%, প্রাণহানি ২২.২%

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৪ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



গত বছর সড়কে ৭ হাজার মৃত্যু

বগুড়ার নন্দীগ্রামে গত ১০ জুলাই রাত ২টার দিকে নিজ ঘরে মা-বাবার সঙ্গে ঘুমাচ্ছিল তাঁদের একমাত্র মেয়ে রীতা খাতুন (১১)। হঠাৎ আমবোঝাই একটি ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাদের বেড়ার ঘরে ঢুকে চাপা দিলে রীতা স্বাভাবিক ঘুম থেকে চলে যায় চিরঘুমে।

১৮ নভেম্বর ঢাকা থেকে মাইক্রোবাসে সপরিবারে নিজ নির্বাচনী এলাকা গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ আর যাওয়া হয়নি সংসদ সদস্য গোলাম মোস্তফা আহম্মেদের। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের নাটিয়াপাড়ায় একটি বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসটির  মুখোমুখি সংঘর্ষে আহত হওয়ার পর হাসপাতালে মারা যান তিনি। গত ৬ ডিসেম্বর মাগুরার রাঘব দাইড় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী মিনু খাতুন পরীক্ষা শেষে রাস্তার ফুটপাত দিয়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছিল। চলন্ত ট্রাকের চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ যায় তার। এভাবেই ২০১৭ সালে সড়কে প্রাণ গেছে সাত হাজার ৩৯৭ জনের। আহত হয়েছে ১৬ হাজার ১৯৩ জন।  দুর্ঘটনা ঘটেছে চর হাজার ৯৭৯টি। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি গতকাল তাদের প্রতিবেদনে সড়কে দুর্ঘটনার এ পরিসংখ্যান দিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর এক হাজার ২৪৯টি বাস, এক হাজার ৬৩৫টি ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান, ২৭৬টি হিউম্যান হলার, ২৬২টি কার, জিপ, মাইক্রোবাস; এক হাজার ৭৪টি অটোরিকশা, এক হাজার ৪৭৫টি মোটরসাইকেল, ৩২২টি ব্যাটারিচালিত রিকশা, ৮২৪টি নছিমন-করিমন দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এসব দুর্ঘটনার ধরন সম্পর্কে বলা হয়েছে, ৪২.৫ শতাংশ পথচারীকে যন্ত্রযান চাপা দিয়েছে, ২৫.৭ শতাংশ ক্ষেত্রে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছে ১১.৯ শতাংশ খাদে পড়ে, ২.৮ শতাংশ ক্ষেত্রে চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। সংগঠনটির হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬ সালে চার হাজার ৩১২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ছয় হাজার ৫৫ জন নিহত এবং ১৫ হাজার ৯১৪ জন আহত হয়েছিল। ২০১৭ সালে চার হাজার ৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় সাত হাজার ৩৯৭ জন নিহত ও ১৬ হাজার ১৯৩ জন আহত হয়েছে। এতে দেখা গেছে, ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে দুর্ঘটনা বেড়েছে ১৫.৫ শতাংশ, নিহত বেড়েছে ২২.২ শতাংশ এবং আহত ১.৮ শতাংশ বেড়েছে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণ মতে, সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালনা, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, রাস্তাঘাটের নির্মাণ ত্রুটি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা এবং চালকের চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেড ফোন ব্যবহারের কারণে। মাদক সেবন করে যানবাহন চালানো, মহাসড়ক ও রেলক্রসিংয়ে ফিডার রোডে যানবাহনের উঠে পড়া ও  ফুটপাত না থাকা বা ফুটপাত বেদখলে থাকায় রাস্তায় পথচারীদের চলাচলের ফলে দুর্ঘটনায় এত প্রাণহানি ঘটেছে।

তবে সড়ক নিরাপত্তায় ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা, রোড শো, বিআরটিএর সড়ক নিরাপত্তা ইউনিট গঠন, ২২টি জাতীয় মহাসড়কে থ্রি হুইলার অটোরিকশা, নছিমন-করিমন উচ্ছেদ, বেশ কয়েকটি জাতীয় মহাসড়কে চার লেন চালু, সড়ক বিভাজক স্থাপন, আন্ডারপাস-ওভারপাস নির্মাণ, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান, চালক প্রশিক্ষণ, ফিটনেস পদ্ধতি ডিজিটাল করাসহ নানামুখী কার্যক্রমের কারণে সড়কে দুর্ঘটনা কমেছে যানবাহনের সংখ্যানুপাতে।

সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা নিয়ে মতভেদও আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও) বলেছে, বাংলাদেশে বছরে ২১ হাজার প্রাণহানি ঘটছে। আর বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী বছরে প্রাণহানি ঘটছে ১২ হাজার।

গতকাল শনিবার সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। দেশের জাতীয়, আঞ্চলিক ও অনলাইন সংবাদপত্রে প্রকাশিত সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদ বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন তৈরি করে সংগঠনটি। এতে দেখা গেছে, ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২ মাসে ছোট-বড় চার হাজার ৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। এতে মোট ২৩ হাজার ৫৯০ জন যাত্রী, চালক ও পরিবহন শ্রমিক হতাহত হয়। হাত, পা বা অন্য কোনো অঙ্গ হারিয়ে চিরতরে পঙ্গু হয়েছে এক হাজার ৭২২ জন।

২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে ৪৫০টি সড়ক দুর্ঘটনায় এক হাজার ১০৩ জন আহত এবং ৫২০ জন নিহত হয়। এ মাসে ১১০টি বাস, ১৮৩টি ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান, ১৫টি হিউম্যান হলার, ১৬টি কার ও মাইক্রোবাস, ৭৮টি অটোরিকশা, ১৩৫টি মোটরসাইকেল, ২০টি ব্যাটারিচালিত রিকশা, ৭৬টি নছিমন-করিমন সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে।  এসব দুর্ঘটনার ১৪৮টি মুখোমুখি সংঘর্ষ, ২৯টি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে, আটটি ঘটনায় ট্রেন-যানবাহন সংঘর্ষ হয়। চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে ১১ জন, গাড়িচাপায় ১৯৬ জন পথচারী নিহত হয়। ফেব্রুয়ারিতে ৪৬৬টি দুর্ঘটনায় এক হাজার ৬০৬ জন আহত এবং ৫৩৫ জন নিহত হয়। মার্চে ৪৭২ দুর্ঘটনায় এক হাজার ৪৮ জন আহত এবং ৫০৬ জন নিহত হয়। ৯৯টি বাস, ১৬৬টি ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান, ২৮টি হিউম্যান হলার, ৯১টি অটোরিকশা, ১৬টি কার ও মাইক্রোবাস, ১১৫টি মোটরসাইকেল, ২৩টি ব্যাটারিচালিত রিকশা, ৬৫টি নছিমন-করিমন দুর্ঘটনার পড়ে।

এপ্রিলে ৩৭৭টি দুর্ঘটনায় ৯১০ জন আহত এবং ৪১৮ জন নিহত হয়। মে মাসে ৪৩১টি দুর্ঘটনায় এক হাজার ৪৫ জন আহত এবং ৫৩৯ জন নিহত  হয়। জুনে ৪০২টি সড়ক দুর্ঘটনায় এক হাজার ৫৪ জন আহত এবং ৫০৩ জন নিহত হয়। জুন মাসে ৯৯টি বাস, ১৫৩টি ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান, ৩১টি হিউম্যান হলার, ১০১টি অটোরিকশা, ৩২টি কার ও মাইক্রোবাস, ১২২টি মোটরসাইকেল, ৩৫টি ব্যাটারিচালিত রিকশা, ৬৮টি নছিমন-করিমন দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। ১২৪টির ক্ষেত্রে সংঘর্ষ এবং ৬৪টি যান খাদে পড়ে। গাড়িচাপায় ১৫৮ জন পথচারী এ মাসে নিহত হয়। জুলাইয়ে ৩৮০টি সড়ক দুর্ঘটনায় এক হাজার ৪৩২ জন আহত এবং ৪২৫ জন নিহত হয়। আগস্টে ৩৪৪টি দুর্ঘটনায় ৩৯১ জন নিহত এবং ৬৯৮ আহত হয়। সেপ্টেম্বরে ৩৯৪টি দুর্ঘটনায় ৪৬৬ জন নিহত এবং এক হাজার ৩৭১ জন আহত হয়। অক্টোবরে ৪২৬টি দুর্ঘটনায় ৪৬৫ জন নিহত এবং ৭৮৬ জন আহত হয়। নভেম্বরে ৪০৭টি দুর্ঘটনায় ৪৩৭ জন নিহত এবং ৬৭০ আহত হয়। ডিসেম্বরে ৪৩০টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫০০ জন নিহত এবং এক হাজার ১৪৮ জন আহত হয়।



মন্তব্য