kalerkantho


দাবির শেষ চাপ পেশাজীবীদের

তৌফিক মারুফ   

১৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



দাবির শেষ চাপ পেশাজীবীদের

ফাইল ছবি

জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বরাবরই সরকারের মেয়াদের শেষ বছরকে দাবি আদায়ের মোক্ষম সময় হিসেবে বেছে নেন পেশাজীবীরা। এবারও এর ব্যত্যয় ঘটছে না। রাজনৈতিক দাবিদাওয়ার নানামুখী কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের আন্দোলন। শুরু হয়ে গেছে একের পর এক আন্দোলন। এরই মধ্যে দেশব্যাপী সরকারি স্বাস্থ্য সহকারীরা পালন করেছেন কর্মবিরতি, নন-এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা টানা ১১ দিন ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান ও ছয় দিন আমরণ অনশন করেছে। এর আগের সপ্তাহে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মচারীরা ডাক দিয়েছিলেন ধর্মঘটের। শ্রমিক নিরাপত্তা ফোরামের ব্যানারে পাথর শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে সারা দেশে মানববন্ধন ও সমাবেশ হয়েছে। সব কর্মসূচিই সরকারের আশ্বাসের মুখে ‘স্থগিত’ করা হয়েছে।

এ ছাড়া আজ সোমবার ও আগামীকাল মঙ্গলবার সারা দেশের সব পৌরসভায় সেবা বন্ধ রাখা হবে বিভিন্ন দাবি পূরণের আন্দোলনের অংশ হিসেবে। আর ৯ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে ইবতেদায়ি মাদরাসার শিক্ষকদের আমরণ অনশন। বেসরকারি শিক্ষাকে জাতীয়করণের দাবিতে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিয়েছে বেসরকারি শিক্ষক সমিতি। গত ২৮ ডিসেম্বর ওই সমিতির নেতারা ঢাকায় বৈঠক করে কর্মসূচিও ঠিক করেছেন। আজ আবার আমরণ অনশন শুরু করছেন এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা। এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও যোগ্য গ্রেডেশন ও আপ্যায়ন ভাতা বৃদ্ধির পুরনো দাবি আবারও সামনে নিয়ে আসার প্রস্তুতি নিয়েছেন। জানা গেছে, বিদ্যুৎ শ্রমিক, ডাক বিভাগ, রাষ্ট্রায়ত্ত কলকারখানা, বিমান বাংলাদেশসহ আরো বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরাও ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি রেখেছেন যেকোনো সময় আন্দোলনে নামার। এ ছাড়া সরকারি কর্মকর্তাদের বড় আন্দোলনের তোড়জোড় শুরু হয়েছে এরই মধ্যে, যার অংশ হিসেবে বিসিএস ক্যাডারভুক্ত সব খাতের কর্মকর্তারা তাঁদের দাবিদাওয়া পূরণে সরব হওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন বলে জানা গেছে।

অবশ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, অনেক ক্ষেত্রে এসব আন্দোলনে কেবলই পেশাগত স্বার্থ থাকলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে আন্দোলনের নেপথ্যে নানা কৌশলগত রাজনৈতিক উসকানি থাকে; সরকারকে বেকাদায় ফেলাই এর মূল উদ্দেশ্য থাকে। তাই সরকারের অবস্থান থেকে যেমন বিভিন্ন পেশাজীবীদের ন্যায্য দাবিদাওয়া বিবেচনায় নেওয়া উচিত, একইভাবে আন্দোলন বিষয়ে আগাম সতর্কতা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।

বাংলাদেশ স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা শিক্ষক সমিতির সভাপতি কাজী রুহুল আমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, সারা দেশের পাঁচ হাজার ইবতেদায়ি মাদরাসার প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষক তাঁদের এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের দাবিতে প্রথমে ১১ দিন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে লাগাতার অবস্থান ধর্মঘট পালন করেছেন এবং ১২তম দিবস থেকে শুরু করেছেন আমরণ অনশন। তাঁদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা ঘরে ফিরে যাবেন না।

তবে এর চেয়েও বড় কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নেমেছেন দেশের বেসরকারি স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় সাত লাখ শিক্ষক-কর্মচারী। বেসরকারি শিক্ষাকে জাতীয়করণের দাবিতে আন্দোলনের অংশ হিসেবে ৯ জানুয়ারি সারা দেশের সব উপজেলা পর্যায়ে বিক্ষোভ ও স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। ১২ জানুয়ারি একই কর্মসূচি পালন করা হয়েছে জেলা পর্যায়ে, ২২ থেকে ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত বন্ধ রাখা হবে দেশের সব বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ২৮ জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ঘোষণা করা হবে পরবর্তী কর্মসূচি।

ওই আন্দোলন পরিচালনাকারী শিক্ষক-কর্মচারী সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক মো. আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত সরকার কী পদক্ষেপ নেয়, তা দেখব। ২ ফেব্রুয়ারি থেকে এসএসসি পরীক্ষা সামনে রেখে কর্মসূচির বিষয়টিও বিবেচনায় রাখব।’

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সিবিএর সাধারণ সম্পাদক ও জাতীয় শ্রমিক লীগের অর্থ সম্পাদক সুলতান মাহমুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে সাত দফা দাবি জানিয়ে আসছি। এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে ৮-৯ বার বৈঠক হয়েছে, সমঝোতাও হয়েছে। কিন্তু ওই দাবি বাস্তবায়নের কোনো লক্ষণ নেই। সর্বশেষ গত ২৮ তারিখ আমরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছি। তিনিও আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন। তাই আমরা ধর্মঘটের ডাক দিয়েও স্থগিত করেছি। এর পরও যদি দ্রুত সময়ের মধ্যে আমাদের দাবিগুলো বাস্তবায়িত না হয়, তবে আমরা আবারও পথে নামতে বাধ্য হব।’ তিনি বলেন, ‘পানি আইন ২০১৩ সংশোধন, আউটসোর্সিং বন্ধ, বিএনপি-জামায়াত জোটের সময় চাকরিচ্যুত ২১২ জনের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়া, গাড়িচালকদের ওভারটাইমসহ সব দাবিই আমাদের ন্যায্য দাবি।’

এদিকে বাংলাদেশ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রায় আট হাজার ওয়ার্ক-চার্জড কর্মচারীকে নিয়মিতকরণের দাবিতে কয়েক দিন আগেই ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান ধর্মঘট পালিত হয়। ওই আন্দোলনকারীরা আবারও মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া ‘রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা ও পেনশনসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার’ দাবিতে গত মাসের শেষ সপ্তাহে ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশ করেন বাংলাদেশ পৌরসভা সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের আওতাধীন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও কাউন্সিলররা।

বাংলাদেশ পৌরসভা সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আব্দুল আলিম মোল্লা জানান, ১৫ ও ১৬ জানুয়ারি সব সেবা বন্ধ এবং ২৯ জানুয়ারি প্রতি জেলায় ডিসি (জেলা প্রশাসক) কার্যালয়ের সামনে কাফনের কাপড় পরে অনশন পালন করা হবে। এর পরও দাবি পূরণ না হলে আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সব সেবা বন্ধ করে শহীদ মিনারের সামনে আমরণ অনশন করা হবে।

ওদিকে পাঁচ দফা দাবি আদায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে মাঠে রয়েছে বাংলাদেশ বেকার অ্যান্ড প্রাইভেট সার্ভিসেস মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট অ্যাসোসিয়েশন। এর সভাপতি শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ডিপ্লোমা মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড গঠন, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের আওতায় মেডিক্যাল শিক্ষা বন্ধ, চার বছর মেয়াদি মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট কোর্স চালু, স্থগিত করা নিয়োগপ্রক্রিয়া চালু, রাষ্ট্রীয় চিকিৎসা শিক্ষা অনুষদ এবং ফার্মেসি কাউন্সিলের সনদধারীদের প্রাইভেট মেডিক্যালে নিয়োগ বাধ্যতামূলক করাসহ পাঁচ দফা দাবি নিয়ে আমরা আন্দোলন করছি। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবেই। শিগগিরই নতুন কর্মসূচি দেওয়ার চিন্তাভাবনা চলছে।’

এদিকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানায়, বিদায়ী বছর বা নির্বাচনের বছরে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের দপ্তরে পেশাগত আন্দোলনের বিষয়টি মাথায় রেখে সরকার এরই মধ্যে প্রায় আট লাখ কর্মচারীর পদোন্নতির পরিকল্পনা করেছে। সে অনুসারে কাজও শুরু হয়ে গেছে; যদিও সমস্যাটি কেবল বর্তমান সরকারের আমলেই নয়, দীর্ঘকাল ধরেই বিরাজ করছে। এর মধ্যে সচিবালয়, হাইকোর্ট, সংসদ, নির্বাচন কমিশন, পিএসসি ও মন্ত্রণালয়ের সংযুক্ত বিভাগগুলোতে ১১ থেকে ১৬ গ্রেডভুক্তদের দশম গ্রেডে পদোন্নতি দেওয়া হয়। তবে এর বাইরে রয়ে গেছেন বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়, জেলা প্রশাসন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়সহ বিভিন্ন অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, করপোরেশন, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রায় আট লাখ কর্মচারী, যাঁদের অনেকেই চাকরিতে যোগদান করে একই গ্রেড থেকে অবসরে যান।

কেবল নিচের পদের কর্মচারীরাই নয়, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও আটঘাট বাঁধছেন দাবিদাওয়া পূরণে সোচ্চার হওয়ার জন্য। বিসিএস সমন্বয় কমিটির মহাসচিব ও প্রকৃচি-বিসিএস সমন্বয় স্টিয়ারিং কমিটির সভাপতি মো. ফিরোজ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের কাছে সরকারের মেয়াদের শেষ বছর কিংবা নির্বাচনের বছর বিবেচ্য নয়, আমরা আমাদের ন্যায্য দাবি পূরণে সব সময়ই সরব থাকি। এরই ধারাবাহিকতায় শিগগিরই সব খাতের ক্যাডারভুক্ত সংগঠনের সভাপতি ও সম্পাদকদের সমন্বয়ে ঢাকার অফিসার্স ক্লাবে একটি বৈঠকের পরিকল্পনা রয়েছে। কারণ অনেক পদেই দীর্ঘদিনেও কোনো পদোন্নতি হচ্ছে না। এক ধরনের বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন তাঁরা। এটি চলতে পারে না।’

ওই পেশাজীবী নেতা বলেন, ‘আমাদের আন্দোলনকে যে যেভাবেই দেখুক না কেন, আমরা শুধু আমাদের পেশাগত মর্যাদা ও ন্যায্যতার স্বার্থেই কাজ করছি। এর বাইরে আমাদের আর কোনো উদ্দেশ্য নেই।’


মন্তব্য