kalerkantho


নতুন বছরে বাংলাদেশের নতুন চ্যালেঞ্জ

নোমান মোহাম্মদ   

১৫ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



নতুন বছরে বাংলাদেশের নতুন চ্যালেঞ্জ

দিনজুড়ে কুয়াশার অরণ্য। সন্ধ্যার পর বেজে ওঠে শিশিরের জলতরঙ্গ। কনকনে হাওয়ায় মেরুভল্লুকের কামড়। ক্রিকেট-আবহটা ইংল্যান্ড বা নিউজিল্যান্ডের হলে কথা ছিল না। যস্মিন দেশে যদাচার! কিন্তু এ যে ঢাকার শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের কালকের চিত্র! হলোই বা তা মাঘের প্রথম দিন, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় শীতের এমন তীব্রতা তো একরকম অচেনাই!

‘অচেনা’ সেই আবহে নতুন চ্যালেঞ্জে নামছে বাংলাদেশ। আজকের প্রতিপক্ষ কাগজ-কলমে জিম্বাবুয়ে।

বাস্তবের ক্যানভাসটা অবশ্য আরো বিস্তৃত। নতুন যুগে, নতুন সূচনার দায়বদ্ধতা যে মিশে তাতে! ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্টের তৃতীয় দল শ্রীলঙ্কা হওয়ার কারণে সেটি আরো বেশি।

দলটির কোচের নাম চন্দিকা হাতুরাসিংহে বলে! বাংলাদেশ ক্রিকেটের নতুন যুগের সবচেয়ে বড় নির্দেশক এই হাতুরাসিংহের অনুপস্থিতি। গেল দক্ষিণ আফ্রিকা সফরেও বাংলাদেশ জাতীয় দলের কোচ ছিলেন। এখন ভিন্ন ভূমিকায়। বাংলাদেশে এসেছেন শ্রীলঙ্কার কোচ হয়ে। কাল স্টেডিয়ামের ড্রেসিংরুমের ঠিক বাইরে হঠাৎ দেখা হাতরাসিংহে-মাশরাফি বিন মর্তুজার। হাত মেলানো, কোলাকুলি, হাসি বিনিময় সবই হলো। বাংলাদেশ অধিনায়ক ভেতরের আগুনটা দেখালেন না শুধু। সাড়ে তিন বছর একসঙ্গে কাজ করেছেন, হাজার হলেও ভদ্রতার একটা ব্যাপার তো রয়েছে!

তবে আজ থেকে মাঠের লড়াই শুরু হবে যখন, ওই আগুনটা দাবানলের মতো ছড়িয়ে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ সতীর্থদের নিশ্চয়ই দেবেন মাশরাফি। এই নতুন সূচনায় সাফল্যটা যে বড্ড প্রয়োজন! বাংলাদেশের সাফল্যে হাতুরাসিংহের সিংহভাগ অবদানের প্রচলিত প্রচারণা ভেঙেচুরে দেওয়ার জন্য। প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ে-শ্রীলঙ্কার বাইরে এই আরেক চ্যালেঞ্জও থাকবে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের সামনে।

মুখে অবশ্য ওসব কিছু বলেননি বাংলাদেশ অধিনায়ক। কাল টুর্নামেন্ট শুরুর আগের দিনের সংবাদ সম্মেলনে বরং পুরনো কোচকে কুর্নিশই জানান মাশরাফি, ‘বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে যারা আছি, সবাই অনেক বড় মানসিকতা নিয়ে ঘুরি। সবার পক্ষ থেকে আমি হাতুরাসিংহকে স্যালুট জানাই। তাঁর অধীনে খেলে ভালো ফল পেয়েছি; তাঁকে সেই কৃতিত্ব দিতে আমাদের বিন্দুমাত্র সংকোচ নেই। আবার এটিও তো ঠিক যে, মাঠের ২২ গজে গিয়ে ভালো জিনিসগুলোর প্রয়োগ আমরা খেলোয়াড়রাই করেছি।’ হাতুরাসিংহের মতো ত্রিদেশীয় সিরিজের আজকের প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ের কোচ হিথ স্ট্রিকও ছিলেন বাংলাদেশের কোচিং স্টাফে। এটিতে নিজেদের সীমাবদ্ধতা ভাবছে না বাংলাদেশ। বরং ওই দুই কোচের রণকৌশল সম্পর্কে ধারণা থাকায় নিজেরাও পিছিয়ে নেই বলে মাশরাফির দাবি, ‘আমাদের সম্পর্কে তাঁদের ধারণা থাকতে পারে। যদিও হিথ স্ট্রিক প্রায় দেড়-দুই বছর হলো বাংলাদেশ থেকে গিয়েছে। হাতুরাসিংহে কিছুদিন আগে গিয়েছে বলে ওর বিশ্লেষণ কাছাকাছি হতে পারে কিছুটা। তবে তাঁরা যে কেমন পরিকল্পনা করতে পারে, তা-ও আমাদেরও সবাই জানে। তা মাথায় রেখে আমরা পরিকল্পনা করব। সে পরিকল্পনার অন্তত ৭০-৮০ ভাগ মাঠে প্রয়োগ করতে পারলে আশা করি সমস্যা হবে না।’

হাতুরাসিংহে নেই, তাঁর জায়গায় এসেছেন খালেদ মাহমুদ। জাতীয় দলের কোচের পদবি তাঁর নয়, পোশাকি পরিচয় ‘টেকনিক্যাল ডিরেক্টর’। সঙ্গে আরেক কোচিং স্টাফের সবাই তো রয়েছেনই। তাঁদের জন্য নিজেদের সর্বস্ব ঢেলে দেওয়ার জন্য প্রস্তুতির ঘোষণা বাংলাদেশ অধিনায়কের, ‘আমাদের কোচিং স্টাফে রিচার্ড হ্যালসাল, সুজন ভাইরা (খালেদ মাহমুদ) রয়েছেন। তাঁদের শতভাগ ব্যাকআপ দেওয়ার চেষ্টা করব। উনারাও আমাদের ব্যাকআপ করছেন।’

আজ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হচ্ছে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সেই নতুন অধ্যায়। আগের দিনই সংবাদ সম্মেলন করায় কাল আর আনুষ্ঠানিক কথাবার্তা বলেননি। তবে কুয়াশা ছাওয়া দুপুরে অনুশীলনের জন্য ঠিক চলে আসেন স্টেডিয়ামে। ত্রিদেশীয় এই টুর্নামেন্টে বড় ভূমিকা রাখতে পারে আবহাওয়া। শীতের তীব্রতা বাড়ছে যেভাবে! সন্ধ্যায় শিশিরের কথা মাথায় রেখে ম্যাচ শুরুর সময়ও এগিয়ে আনা হয়েছে দুপুর ১২টায়। আবহাওয়ার এই চ্যালেঞ্জের কথা মাথায় রেখেও প্রয়োগক্ষমতার ওপর জোর দেন মাশরাফি, ‘আন্তর্জাতিক ম্যাচের সময় এসব বিষয় সামনে আসে। তবে টুর্নামেন্টের শুরুতে এসব নিয়ে না ভেবে মাঠে কিভাবে নিজেদের সামর্থ্যের প্রয়োগ করতে পারি, তা নিয়ে ভাবতে হবে। অবশ্যই একটু বেশি কুয়াশা থাকছে। তাতে ক্যাচিংয়ে কিছু সমস্যা হতে পারে। আর ফ্লাডলাইটেও অনুশীলন করেছি। আশা করছি, সবারই তাতে কিছুটা ধারণা হয়েছে। এখন বাকিটা নির্ভর করবে মাঠে কিভাবে প্রয়োগ করতে পারি।’

ওখানে আরো এক চ্যালেঞ্জ অবশ্য আছে বাংলাদেশের। এমনিতে আবহাওয়ার অদ্ভুতুড়ে আচরণে অচেনা আবহ, নিজ দেশে ওয়ানডে খেলাটাও তো ভুলে যাওয়ার দশা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সর্বশেষ খেলে ২০১৬-র অক্টোবরে। ১৫ মাস পর বাংলাদেশে আবার ওয়ানডে খেলতে নামছে মাশরাফির দল। সেখানে টস জিতলে কোন সিদ্ধান্তটি ভালো হবে, তা নিয়ে দ্বিধা আছে বাংলাদেশ ক্যাম্পে। তবে উইকেট ভালো হবে বলে আশাবাদী মাশরাফি। আর ত্রিদেশীয় টুর্নামেন্টে শিরোপা জয়ের কথা সমস্বরে শুনিয়ে গেছেন অধিনায়ক মাশরাফি ও টেকনিক্যাল ডিরেক্টর মাহমুদ।

শেষ পর্যন্ত ওই মোক্ষে পৌঁছতে পারলে যুগসূচনার চ্যালেঞ্জে জিতবে বাংলাদেশ। কুয়াশার অরণ্য কিংবা শিশিরের জলতরঙ্গের শব্দও তখন মনে হবে কী মধুর!


মন্তব্য