kalerkantho


চাল পেঁয়াজ সবজি পর্যাপ্ত তবু বাজারে আগুন

ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রীর হুঁশিয়ারি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



চাল পেঁয়াজ সবজি পর্যাপ্ত তবু বাজারে আগুন

ফাইল ছবি

পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার পরও বিক্রেতারা সবজির চড়া দাম হাঁকছে। অভিযোগ উঠেছে, আবহাওয়ার প্রতিকূল পরিবেশের কারণে যতটুকু দাম বৃদ্ধি পাওয়ার কথা, তার চেয়ে অনেক বেশি বাড়ানো হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারের দোকানগুলোতে থরে থরে সাজানো সবজি দেখলে কারোর মনে হবে না সবজির সংকট রয়েছে। তবে কুয়াশা কেটে গেলে দ্রুতই সবজির সরবরাহ স্বাভাবিক হবে এবং দাম অর্ধেকের বেশি কমে যাবে বলে ব্যবসায়ীরা আশ্বাস দিচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে খাদ্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করার অপচেষ্টা রোধসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সব জেলা প্রশাসককে নির্দেশনা দিয়েছে। গতকাল সোমবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে এ তথ্য জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) গতকাল দেখানো পরিসংখ্যান মতে, গত এক বছরের ব্যবধানে মোটা চালের দাম বেড়েছে ২৩.২৯ শতাংশ, মাঝারি চালের দাম বেড়েছে ২২.৩৫ শতাংশ এবং সরু চালের দাম বেড়েছে ২৬ শতাংশ। গতকাল দেখানো তথ্য মতে, এই তিন জাতের চালের দরই এক মাস ধরে একই স্থানে রয়েছে; অর্থাৎ দাম বৃদ্ধির পর আর কমেনি। মোটা চাল ৪৪ থেকে ৪৬ টাকা, মাঝারি ৪৮ থেকে ৫৬ টাকা এবং সাধারণ মানের সরু ৫৮ থেকে ৬২ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। টিসিবির তথ্য অনুসারে, ঠিক এক মাস আগেও ১৫ ডিসেম্বরও তিন ধরনের চালের এই দরই ছিল। কালের কণ্ঠ থেকে গতকাল বাজারে খোঁজ নিয়েও এই ধরনের দর দেখা যায়।

গতকাল সংসদ অধিবেশনে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য দিদারুল আলমের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসহ চালের বাজার স্বাভাবিক এবং ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ব্যবসায়ী নেতারাসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী ও সচিবের সভাপতিত্বে মন্ত্রণালয়ে মতবিনিময়সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি, দেশের চাহিদা নির্ণয়, স্থানীয় উৎপাদন, মজুদ পরিস্থিতি, আমদানির পরিমাণ ইত্যাদি ধারাবাহিকভাবে পর্যালোচনা করা হয়। এ ছাড়া সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মোছা. সেলিনা জাহান লিটার প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকারের পক্ষ থেকে পেঁয়াজের মূল্য স্থিতিশীলকরণের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মিয়ানমার ও তুরস্ক থেকে পেঁয়াজ আমদানির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। পেঁয়াজের বিপণনব্যবস্থায়ও সরকারের নজরদারি বাড়ানোসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

কুষ্টিয়ার মেহেরপুর থেকে প্রচুর পরিমাণ সবজি নিয়মিত ঢাকার বাজারে আসে। ওই অঞ্চলে প্রচুর বাঁধাকপির চাষ হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কালের কণ্ঠ’র মেহেরপুর প্রতিনিধি জানান, গতকাল মেহেরপুর বড়বাজারে (এই বাজার থেকেই ঢাকায় সবজি সরবরাহ করা হয়) প্রতি পিস বাঁধাকপি পাইকারি বিক্রি হয়েছে তিন-চার টাকায়। অথচ ঢাকার পাইকারি বাজারে একই বাঁধাকপি বিক্রি হয়েছে ১৫-২০ টাকায়। ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছতে এর দাম পৌঁছেছে ৩০-৩৫ টাকা।

কুয়াশায় যাতায়াতে বিঘ্ন ঘটায় ট্রাকে পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত সময় লাগছে বলে অজুহাত দিচ্ছে ব্যবসায়ীরা। মেহেরপুর থেকে পাঁচ টনের যেসব ট্রাক ১৪-১৫ হাজার টাকায় ঢাকা যেত সেগুলোর ভাড়া চার-পাঁচ হাজার টাকা বেড়েছে। এই অঞ্চলের ট্রাকচালক আবুল খায়ের কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কুয়াশায় ট্রাক নিয়ে ঢাকা পৌঁছতে দ্বিগুণ সময় লাগছে। এখন ভাড়া বেড়েছে। আমরা ১৮-২০ হাজার টাকা ভাড়া নিচ্ছি প্রতি ট্রিপে।’ ট্রাকে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় প্রতি পিস বাঁধাকপিতে এক টাকাও বৃদ্ধি পাওয়ার কথা নয়। কিন্তু এই অজুহাতেই তিন-চার টাকার বাঁধাকপি ঢাকায় পাইকারি বিক্রি হচ্ছে ১৫-২০ টাকা করে, যা সপ্তাহখানেক আগেও বিক্রি হয়েছে সাত-আট টাকায়।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান মনে করেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে নজরদারি জরুরি। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আবহাওয়ার কারণে কিছুটা সমস্যা তৈরি হয়েছে, এটা সত্য। তবে সমস্যাকে পুঁজি করে ব্যবসায়ীদের অতি মুনাফার প্রবণতাও রয়েছে। ব্যবসায়ীদের এই প্রবণতা বন্ধ করতে মনিটরিংয়ের কোনো বিকল্প নেই।’ এ নিয়ে প্রশাসনিক উদ্যোগ থাকার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে গতকাল চট্টগ্রামের বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে আমদানি করা ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে কেজি ৫৫ থেকে ৫৬ টাকায়। গত সপ্তাহে দর ছিল ৫৮ থেকে ৬০ টাকা। এ ছাড়া মিসর থেকে আসা পেঁয়াজ ৫৫ টাকায় এবং চীন থেকে আসা পেঁয়াজ ৩০-৩২ টাকায় বিক্রি হয়েছে। খাতুনগঞ্জ কাঁচা পণ্য আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইদ্রিস বলেন, ‘ভারতে দাম না কমায় পেঁয়াজের বাজার সহনীয় হয়নি এখনো। তবে চট্টগ্রামের বাজারে এক আমদানিকারক চীন থেকে তিন কনটেইনারে ৮৪ টন পেঁয়াজ আনেন, সেগুলো দাম কম থাকায় দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়।’

বরাবরই দেখা যায়, অজুহাত পেলেই হলো, ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দর বাড়িয়ে দিচ্ছে। গতকাল সবজি বাজার ঘুরে সরবরাহ দেখে ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, পরিবহনে ব্যয় বৃদ্ধি কম হওয়ার পরও সবজির দাম অনেক বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে কুয়াশা কেটে গেলে দ্রুতই সবজির সরবরাহ স্বাভাবিক হবে এবং দামও অর্ধেকের বেশি কমে যাবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন কামাল হোসেনসহ বিভিন্ন আড়তদার।

কারওয়ান বাজারের গাউছিয়া সবজিভাণ্ডারের মালিক কামাল হোসেন গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তিন-চার দিন ধরে বাজার একটু চড়া। কারণ ঢাকায় ট্রাক ঢুকছে কম। ভাড়াও কিছু বেড়েছে। কুয়াশার কারণে এ সমস্যা তৈরি হয়েছে।’ সমস্যার কারণে যতটুকু দাম বৃদ্ধির কথা এর চেয়েও বেশি নেওয়া হচ্ছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চাহিদার চেয়ে সরবরাহ অনেক কম। আমি যেখানে প্রতিদিন ৫০-৬০ কার্টন লাউ আনতাম, সেখানে এখন পাচ্ছি মাত্র ছয় থেকে ১০ কার্টন। কম পণ্যে খরচও বেশি পড়ছে। তাই দাম বাড়ছে। অতিরিক্ত দাম নিচ্ছি না।’

বগুড়ার মহাস্থানগড়ের পাঁচলাই গ্রামের এক কৃষক কালের কণ্ঠকে জানান, ৮০ শতক জমিতে ৩৫ হাজার টাকা খরচ করে মুলার চাষ করেছিলেন, যেখানে প্রায় এক লাখ টাকার মুলা উৎপাদিত হয়েছে। ৪০ হাজার টাকার মুলা বিক্রিও করেছেন। এখন ক্ষেতে অনেক মুলা থাকলেও প্রচণ্ড ঠাণ্ডার কারণে শ্রমিকের অভাবে তিনি তুলতে পারছেন না।

ঢাকার সবজির একটি বড় অংশ আসে বগুড়ার মহাস্থানগড়ের পাইকারি বাজার থেকে। আবহাওয়ার কারণে সপ্তাহখানেক ধরে ওখানে সরবরাহ কম। বাজারের এক বিক্রেতা আব্দুল মজিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মূলত ক্ষেত থেকে কৃষক সবজি তুলতে পারছে না বলে সরবরাহ কমেছে। তাই দাম বেড়েছে। আবার যেটুকু বাজারে আসছে সেটুকুও পরিবহন সমস্যায় সময়মতো ঢাকায় পাঠানো যাচ্ছে না।’

গতকাল রাজধানীর ফার্মগেট, শুক্রাবাদ, মোহাম্মদপুর, তালতলা, কারওয়ান বাজার, সেগুনবাগিচাসহ কয়েকটি খুচরা ও পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সব ধরনের শীতের সবজির দাম তিন-চার দিনের ব্যবধানে বেড়ে গেছে। খুচরা বাজারগুলো ঘুরে দেখা গেছে, গত শনিবার যে ফুলকপি বিক্রি হয়েছে ৩০ টাকায়, সেটি গতকাল বিক্রি হয় ৪০-৪৫ টাকায়। প্রতি কেজি টমেটো বিক্রি হচ্ছে ৬০-৬৫ টাকায়, প্রতি কেজি আলু ৩০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৭০-৭৫ টাকা, ২৫-৩৫ টাকায় নেমে আসা শিম প্রতি কেজি ৫৫-৬৫ টাকায়, ৪০ টাকার কচুর লতি ৫০-৫৫ টাকায়, ৩০-৩৫ টাকার বেগুন ৫৫-৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

একইভাবে মেহেরপুরের ২৫ টাকা কেজির শিম ঢাকায় খুচরা বিক্রি হচ্ছে ৬০-৬৫ টাকায়, যা কয়েক দিন আগেও খুচরা বাজারে ছিল ৩০-৩৫ টাকা। এখন ঢাকার আড়তেই শিম বিক্রি হচ্ছে ২৮-৪০ টাকায়।

যেসব লাউ দিন কয়েক আগেই ঢাকার খুচরা বাজারে বিক্রি হয়েছে ৫০-৬০ টাকায়, সেগুলো চলতি সপ্তাহে বিক্রি হচ্ছে ৮০-১০০ টাকায়। রাজধানীর কলাবাগানের খুচরা বিক্রেতা মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমাদের কেনা দামই দ্বিগুণ হয়েছে। কারণ লাউ পাওয়া যাচ্ছে না। ঢাকায় কম আসছে বলে শুনেছি।’

খুচরা বিক্রেতারা জানান, পাইকারি বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ার কারণেই খুচরায় দাম বেড়েছে। আবহাওয়া ঠিক হলে বাজারও স্বাভাবিক আচরণ করবে। শীতের শুরুতেই না কমলেও ধীরে ধীরে দাম কমে একটি সহনীয় মাত্রায় এসেছিল।

এদিকে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে গতকাল মিয়ানমারের আদা কেজিপ্রতি ৩৫, চীনের আদা ৬০ ও থাইল্যান্ডের আদা ৪০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। রসুন বিক্রি হয়েছে কেজি ৬৫ টাকায়। সব পণ্যের দাম গত সপ্তাহের মতোই ছিল।


মন্তব্য