kalerkantho


আমার শার্ট ফ্লোরে পড়ে থাকে থাক, তোদের কী!

১৬ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



আমার শার্ট ফ্লোরে পড়ে থাকে থাক, তোদের কী!

মাইকেল ওলফের ‘ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি’ গ্রন্থ নিয়ে কেন তোলপাড়? পড়ুন বইটির বাছাই অংশ। ভাষান্তর : গাউস রহমান পিয়াস

 

‘তুমি কি জানো, তুমি কী করেছ?’ ‘তোমাকে এই ফরমান ফেরত নিতে হবে।’ ‘শুরু করতে না করতেই তুমি শেষ হয়ে গেলা!’ ‘হোয়াইট হাউসে কে ইমিগ্রেশনের বিষয়টি দেখে?’ ২০১৭ সালের ২৭ জানুয়ারি, শুক্রবার ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলো, কার্যকরও হয়ে গেল তৎক্ষণাৎ। এরপর এভাবেই আতঙ্ক ব্যক্ত হচ্ছিল খোদ ট্রাম্পের স্বজন ও বন্ধুমহল থেকে। কিন্তু হোয়াইট হাউসে একজনের খুশি খুশি ভাব। মুখ্য কৌশল প্রণেতা স্টিভ ব্যানন! ট্রাম্পের আমেরিকা ও উদারপন্থীদের আমেরিকা—এই দুই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্পষ্ট একটা রেখা টানার জন্য এর চেয়ে ভালো উপায় তাঁর হাতে ছিল না। তবে হোয়াইট হাউসের স্টাফরা ছেঁকে ধরেছিলেন ব্যাননকে, ‘করবে তো শুক্রবারে কেন করতে গেলে? তুমি জানো না, সপ্তাহের এই দিনে বিক্ষোভ হলে বেশি মানুষ যোগ দেবে? বিমানবন্দরে মানুষ ফেটে পড়বে?’ ব্যানন আমতা আমতা করে বলেছিলেন, ‘হুম, কারণটি হচ্ছে নচ্ছারগুলোকে বিমানবন্দরে টেনে আনা ও দাঙ্গা করতে দেওয়া।’ আসলে এ ছিল উদারপন্থীদের গুঁড়িয়ে দেওয়ার কৌশল : তাদের উত্তেজিত করো ও বাঁ দিকে ঠেলে দাও।

অভিবাসন ফরমান জারির পরের রবিবার। এমএসএনবিসির ‘মর্নিং জো’ অনুষ্ঠানের দুই উপস্থাপক জো স্কারবরগ ও মিকা ব্রজেজিনস্কি হোয়াইট হাউসে এসেছেন মধ্যাহ্নভোজের নিমন্ত্রণে। ৯ দিন হয়েছে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। ওভাল অফিস ঘুরিয়ে দেখাতে দেখাতে ট্রাম্প অতিথি দুজনকে প্রশ্ন করলেন, ‘আমার প্রথম সপ্তাহটি কেমন গেল বলে তোমরা মনে করছ?’ স্কারবরগ অবাকই হলেন ট্রাম্পের উজ্জ্বল মুখ দেখে, কারণ বাইরে গোটা দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে। তিনি সেদিকে না গিয়ে বললেন, ‘ইউএস স্টিলের সঙ্গে যা করলেন, ইউনিয়ন নেতাদের ওভাল অফিসে ডাকলেন, এটা আমার ভালো লেগেছে।’ ট্রাম্প আবারও প্রসঙ্গ একই দিকে ঠেলছেন দেখে স্কারবরগ অনুমান করলেন, ট্রাম্পের জন্য আসলে যে একটা বাজে সপ্তাহ গিয়েছে কথাটি কেউ তাঁকে বলেনি; ব্যাননরা তাঁর মাথায় মিথ্যার ফুলঝুরি ছড়াচ্ছে।

সেদিনই লাঞ্চে যোগ দিয়েছিলেন কন্যা ইভানকা ট্রাম্প ও জামাতা কুশনার। তখনো ট্রাম্প আত্মতুষ্টির সঙ্গে বলছিলেন যে সপ্তাহটি তাঁর দারুণ গিয়েছে। এবারও স্কারবরগ বললেন, স্টিল ইউনিয়নকে ট্রাম্প ভালোভাবে সামলেছেন। তখন কুশনার জানালেন, কৃতিত্বটি আসলে ব্যাননের, ‘দিস ওয়াজ দ্য ব্যানন ওয়ে।’ ‘ব্যানন’? জামাতার ওপর চড়াও হলেন ট্রাম্প। ‘আইডিয়াটি ব্যাননের ছিল না। আমার ছিল। ব্যানন ওয়ে না, বুঝলে? ট্রাম্প ওয়ে!’ কুশনার আর কথা বাড়ালেন না, ট্রাম্পও প্রসঙ্গ ঘোরালেন অতিথিদের দিকে, ‘তো তোমাদের কী খবর? বিয়েটা সেরে ফেলা উচিত না?’ নিজে অর্থডক্স ইহুদি হওয়ায় কুশনার বললেন, ‘আমিও কিন্তু তোমাদের বিয়ে পড়াতে পারি! কারণ আমি একজন ইন্টারনেট ইউনিটারিয়ান মন্ত্রী।’ ‘কী!’ খেপে উঠলেন প্রেসিডেন্ট। ‘তুমি কী বলছ? আমি যেখানে বিয়েটি পড়াতে পারি তারা কেন তোমাকে দিয়ে পড়াতে যাবে? যেখানে প্রেসিডেন্ট মার-এ-লাগো তে তাদের বিয়ে দেবেন, তারা যাবে তোমার কাছে?’

সবজান্তা ভাব নেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্প হয়তো অন্য বিলিয়নেয়ারদের মতোই। তবে তাঁর ক্ষেত্রে একটি বড় তফাত হচ্ছে, সামাজিক সৌজন্যবোধের আনুষ্ঠানিক শিক্ষাটি তাঁর প্রায় নেওয়া হয়ে ওঠেনি। আনুষ্ঠানিকতা অনুকরণ করার চেষ্টাটা পর্যন্ত তিনি করতে পারেন না। তিনি সত্যিকার অর্থে কথাও বলতে জানেন না, বিশেষ করে যখন তথ্য জানানোর ক্ষেত্রে। তাঁকে কে কী বলল, তিনিই বা কী জবাব দিলেন এত সব ভাবার সময়ও তাঁর নেই। সৌজন্যতা দেখিয়ে কাউকে গ্রহণ করাও তাঁর ধাঁচে নেই। নিজে যখন কিছু চান, গভীর মনোযোগে প্রত্যাশা করেন, কিন্তু কেউ কিছু চাইলে বিরক্ত হয়ে ওঠেন, আগ্রহ পান না।

শ্বশুর ট্রাম্প ও জামাতা কুশনারের মধ্যে অনেক বিষয়ে মিল হয়তো আছে, তার মানে এই নয় তাঁরা সমতলে থেকে কাজ করবেন। ট্রাম্পকে বাগে রাখতে গিয়ে বেগই পাচ্ছিলেন কুশনার। কুশনার চাইছিলেন প্রেসিডেন্টের পেছনে থেকে তাঁর ভুলচুকগুলোকে যদি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। যখন ব্যানন হোয়াইট হাউসের প্রথম দস্তখতটি ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার ওপর দেওয়ার জন্য মরিয়া, কুশনার নিজের নেতৃত্বের পরীক্ষা দেন মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ইস্যুতে। সহায়তার আশায় কুশনার ৯৩ বছর বয়সী কিসিঞ্জারকেও ফোন দেন।

৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, শুক্রবার। জর্জটাউনের ফউর সিজনস হোটেলের সিঁড়িতে দেখা গেল ট্রাম্পকন্যা ইভানকা সিঁড়ি বেয়ে খাবার রুমের দিকে আসছেন ব্রেকফাস্টে। ইভানকা মোবাইল ফোনে উত্তেজিত গলায় কথা বলছিলেন, ‘সব তালগোল পাকিয়ে গেছে; আমি জানি না এর থেকে কিভাবে বের হওয়া সম্ভব...।’ সপ্তাহটি আসলেই খারাপ গিয়েছিল। আদালত ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে দিয়েছেন। তার চেয়েও বিব্রতকর ছিল দুটি ফোনকলের তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়া, একটি মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট, অন্যটি অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। এ ছাড়া আগের দিনই নরডস্ট্রম ঘোষণা দিয়েছে তারা ইভানকা ট্রাম্পের সঙ্গে পোশাকের চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।

প্রেসিডেন্সির শুরুর সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্পকে নিয়ে দুই ধরনের থিওরি গজাল। বন্ধুদের মনে হলো, ট্রাম্প প্রেসিডেন্টসুলভ আচরণ করছেন তো না-ই, সেই চেষ্টাও তাঁর নেই। ঘুম থেকে উঠেই টুইট করো! লিখিত ভাষণ পাশে রেখে বক্তৃতায় যাচ্ছেতাই বলো! আরেকটি তত্ত্ব শোনা গেল যে ট্রাম্প আসলে হোয়াইট হাউসে নিতান্তই অফ-কিলার! তল পাচ্ছেন না। ৭০ বছর বয়সী মানুষটির মাথায় হঠাৎ করেই চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে নিয়মের বোঝা। সুপরিসর ট্রাম্প টাওয়ার আর নিয়মের ঘেরাটোপের হোয়াইট হাউসের জীবন তো এক নয়! বন্ধুরা আরো অবাক হচ্ছিল, ‘হোটেলিয়ার ট্রাম্প’ কেন হোয়াইট হাউসে সংস্কার আনছেন না? এদিকে ট্রাম্পকে মনে হচ্ছিল, সার্বক্ষণিক নজরদারির চোখ তাঁকে ক্লান্ত করে দিচ্ছে।

হোয়াইট হাউসে একান্ত বেডরুম ব্যবহার শুরু করেছিলেন ট্রাম্প, কেনেডির পর এই প্রথম কোনো প্রেসিডেন্ট দম্পতিকে দেখা গেল পৃথক কক্ষে ঘুমাতে (অবশ্য মেলানিয়া হোয়াইট হাউসে কম সময়ই অবস্থান করতেন)। প্রবেশের দিন কয়েকের মধ্যেই ট্রাম্প নতুন দুটি টেলিভিশন সেট আনার আদেশ দিলেন, আগের একটা যদিও ছিল। তিনি দরজায় তালার ব্যবস্থাও করে নিলেন, কারণ সিক্রেট সার্ভিসের লোকজন তাঁর ঘরেও দায়িত্ব পালনের ওপর চাপ দিচ্ছে। একদিন মেঝেতে প্রেসিডেন্টের শার্ট পড়ে ছিল। গৃহকর্মীদের ডেকে ট্রাম্পের সেকি শাসানি! ‘কেন আমার শার্ট ধরতে যাবে? আমার শার্ট যদি ফ্লোরে পড়ে থাকে তার অর্থ হচ্ছে আমি চাইছি এটা ওখানেই পড়া থাকুক।’ তারপর প্রেসিডেন্ট নতুন কিছু নিয়ম জারি করলেন : কেউ আমার কিছু ধরবে না, বিশেষ করে টুথব্রাশের কাছে হাত নেওয়ার স্পর্ধা যেন কেউ না দেখায় (বিষক্রিয়ার ভয় ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের; আর তিনি যে ম্যাকডোনাল্ডে আহার করেন তার কারণ হচ্ছে তাঁর আসার খবরটি রেস্টুরেন্টের কেউ জানে না এবং পাওয়া যায় নিরাপদে প্রস্তুতকৃত খাবার)। আরো ফরমান এলো : ‘নিয়ম করে বিছানার চাদর পাল্টানো চলবে না, আমি বললে তবেই বদলাবে; আর আমার বেডশিট আমিই তুলব।’ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় স্টিভ ব্যাননের সঙ্গে ডিনারে ট্রাম্প নেই? সম্ভবত প্রেসিডেন্ট তিন টিভি সেটে তিনটি চ্যানেল ছেড়ে দিয়ে চিজবার্গার চিবাচ্ছেন এবং একে-তাকে ফোন দিচ্ছেন। আসলে এই ফোনই ট্রাম্পের সত্যিকারের যোগাযোগমাধ্যম, বন্ধুদের ছোট্ট একটি তালিকা ধরে তিনি কথা বলেন এবং বেশি বলেন টম বারাকের সঙ্গে। প্রেসিডেন্টের মেজাজ বিকেলজুড়ে কতবার ওঠা-নামা করে তার চার্ট রাখেন এই টম; দুজনে কী কী নোট নিজেরা বিনিময় করেন, তা-ও।

৫ ফেব্রুয়ারি নিউ ইয়র্ক টাইমস হোয়াইট হাউসের অন্দরমহল নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন ছাপল। পত্রিকাটি বলে :  রাতের শেষ দিকটায় ট্রাম্প স্নানের পোশাক পরে ঘুরে বেড়ান। খবর দেখে প্রেসিডেন্ট অগ্নিশর্মা! ‘আমাকে দেখে কি সত্যিই মনে হয় আমি বাথরোব গাই বা এজাতীয় কিছু? সিরিয়াসলি, ক্যান ইউ সি মি ইন বাথরোব?’ এই প্রশ্নটি পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা হোয়াইট হাউসের অনেককেই শুনতে হয়েছে ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা দেওয়ার পর। সেই সঙ্গে এই প্রশ্নও ওঠে, ফাঁসটা করল কে! ফলোআপ স্টোরিতে নিউ ইয়র্ক টাইমসই জানিয়ে দিল, কাজটি ব্যাননের। নীরবতার কৃষ্ণগহ্বর বলে নিজের ভাবমূর্তি গড়েছেন যে মানুষ, রাতারাতি তিনি হয়ে গেলেন সবার ‘ডিপ থ্রট’, যার পেটে কথা থাকে না। ফাঁসে ট্রাম্প নিজেও কি কম যান? দিনের ব্যস্ততার ফাঁকে এবং রাতে বিছানায় যাওয়ার পর তিনি এমন অনেকের সঙ্গেও ফোনালাপ চালান, গোপনীয়তা রক্ষার দায় যাদের বোধ না করলেও চলে।

[চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ অনুচ্ছেদের অংশবিশেষের ভাষান্তর]


মন্তব্য