kalerkantho


সাক্ষাৎকার

মানুষের শেষ আশ্রয় পুলিশ সেবার মান বাড়াতে হবে

সরোয়ার আলম   

১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মানুষের শেষ আশ্রয় পুলিশ সেবার মান বাড়াতে হবে

শহীদুল হক, আইজিপি

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক বলেছেন, সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল পুলিশ। তাদের জনগণের সঙ্গে মিশতে হবে, ভালো আচরণ করতে হবে। তাদের প্রত্যাশা অনুসারে সেবা দিতে হবে। থাকতে হবে জবাবদিহিরও আওতায়। ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর শহীদুল হক আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, অবসরে যাচ্ছেন আগামী ৩১ জানুয়ারি। কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এই গুরুদায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁর সাফল্য ও ব্যর্থতাসহ পুলিশি সেবা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন।

আইজিপি বলেন, ‘সময়ের সঙ্গে সেবার ধারণাও বদলেছে। পুলিশ সদর দপ্তরে কমপ্লেইন সেন্টার খোলা হয়েছে। আমরা ন্যাশনাল ইমার্জেন্সি সার্ভিস ৯৯৯ চালু করেছি। এখন এক নম্বরেই জনগণ সব ধরনের সেবা পাচ্ছে। এ ছাড়া অনলাইনে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স পাওয়া যাচ্ছে। আগে এসপি অফিস, থানায় ঘুরতে হতো।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা প্রবাসীদের জন্য কল্যাণ ডেস্ক, হেল্প ডেস্ক খুলেছি। বিদেশ থেকে ইন্টারনেট ও এসএমএসের মাধ্যমে সেবা দিচ্ছি।’

নিজেদের সক্ষমতা ও সীমাবদ্ধতা প্রসঙ্গে আইজিপি বলেন, পুলিশে জনবল ও ট্রান্সপোর্ট সুবিধা কম। তাই অনেক সময় ত্বরিত সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না। সীমাবদ্ধতার মধ্যেও থানা-পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘সেবা দিতে না পারলে সেবাপ্রার্থীকে বোঝাতে হবে; কিন্তু হয়রানি করা যাবে না। থানা-পুলিশকে সাধারণ মানুষ শেষ আশ্রয়স্থল মনে করে। তাই পুলিশকে তার দায়িত্ব পালন করে যেতে হবে। নিজেদের আচরণে পরিবর্তন আসা উচিত।’ সমাজের অনেক কিছু পুলিশকে প্রভাবিত করে জানিয়ে আইজিপি বলেন, একটি সমাজ ভালো হলে পুলিশও ভালো হবে। তিনি আশা ব্যক্ত করে বলেন, ‘এখন পুলিশে অনেক মেধাবী ও ভালো ভালো ছেলে আসছে। তাদের কমিটমেন্ট আছে। তারা ভবিষ্যতে পুলিশকে আরো বদলে দেবে। এরই মধ্যে কমিউনিটি পুলিশিং সেবা এমন ধারণার জন্ম দিয়েছে। তবে সমাজকেও ভালো হতে হবে। মানুষ যেন পুলিশকে সহযোগিতা করে।’

কিছু ঘটনা পুলিশের অর্জনকে অনেক সময় ম্লান করে দেয়—এ প্রসঙ্গে আইজিপি বলন, ‘পুলিশে আড়াই লাখ জনবল। ব্যক্তির দায় তো বাহিনী নেবে না। একজন সদস্য যদি অপরাধ করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় অ্যাকশন নেওয়া হয়। ফৌজদারি অপরাধ হলে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা তো ভালো দেখেই নিই। পরে কোনো কারণে কারো নৈতিকতার স্খলন হতে পারে। এ জন্য প্রশিক্ষণ ও মোটিভেশন ব্যবস্থা রয়েছে।’

পুলিশের সেবার মান বাড়ানোর নিজস্ব কর্মকৌশল প্রসঙ্গে শহীদুল হক বলেন, পুলিশ জবাবদিহির বাইরে থাকতে পারে না। তাকে আইনের কাছে জবাবদিহি করতে হয়, কর্তৃপক্ষের কাছে, আদালতের কাছে, মন্ত্রণালয়ের কাছে, জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। থানা-পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সেসব কমিউনিটি পুলিশিংয়ের ‘ওপেন ডে হাউস’ বৈঠকে সরাসরি উত্থাপিত হয়। এ ক্ষেত্রে অপরাধের শাস্তি পেতে হয়। দায়িত্ব অনুযায়ী সার্কেল এসপি, এসপি, ডিআইজি এবং পুলিশ সদর পর্যায়ক্রমে শাস্তি দিয়ে থাকে। জঙ্গিবাদ দমনে এরই মধ্যে পুলিশ সাফল্য দেখিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জঙ্গি দমনে অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটকে আরো শক্তিশালী করা হচ্ছে। জনবল নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এই ইউনিটের জন্য সাড়ে চার শ কোটি টাকার বাজেটও অনুমোদন পেয়েছে।’

মাদক নিয়ন্ত্রণে না আসা প্রসঙ্গে শহীদুল হক বলেন, পুলিশের অনেক সফলতা রয়েছে। তবে পুলিশের একার পক্ষে মাদক নির্মূল সম্ভব না। মাদক নির্মূলে আলাদা বিভাগ আছে। সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আইজিপি কমপ্লেইন সেলের কর্মপদ্ধতি প্রসঙ্গে শহীদুল হক বলেন, ‘সেলে আমাদের কর্মকর্তা রয়েছেন। প্রাপ্ত অভিযোগ তিনি ডিসিপ্লিন সেকশনের অতিরিক্ত ডিআইজিকে জানান। তাঁরা আমার কাছে নিয়ে আসেন। আমি সেসব অভিযোগ বুঝে গুরুত্ব অনুযায়ী তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করি। তদন্ত সাপেক্ষে তিন অথবা সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলি। ছোট-বড় মিলিয়ে প্রতিদিন শতাধিক অভিযোগ পাই।’

এক প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নিই ২০১৫ সালে। ২০১৪ থেকে প্রতিটি অপরাধ কমেছে। ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে অপরাধ হ্রাস পেয়েছে। ২০১৪ সালের সঙ্গে ২০১৫ সালের তুলনা করলে কিংবা আগের বছরের সঙ্গে পরবর্তী বছরের তুলনা করলে পুলিশের সফলতা বেশি। মাদকের ব্যাপারে প্রচুর মামলা হয়েছে। এটা পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে হয়েছে। কমিউনিটি পুলিশিং, পুলিশ মেমোরিয়াল ডেসহ বিভাগীয় ইতিবাচক উদ্যোগুলো প্রসঙ্গে শহীদুল হক  বলেন, ‘জনগণ কী ধরনের সেবা প্রত্যাশা করে সেটিও জানা দরকার। এ জন্য আমরা কমিউনিটি পুলিশিং করেছি। পুলিশ ও জনগণের মধ্যে যত সম্পর্ক বাড়বে তত ভীতি-জড়তা কমে যাবে। আর তখনই মানুষ তথ্য দেবে, পুলিশের কাজের অনুমোদন দেবে।’ আইজিপি জানান, পুলিশ সদস্যরা অনেক ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করেন। অনেক সময় আহত-নিহতও হন। তাঁদের ত্যাগ মূল্যায়ন করার লক্ষ্য থেকেই পুলিশ মেমোরিয়াল ডে পালন করা হয়। শহীদুল হক বলেন, ‘পুলিশই মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলে, অনেকে শহীদ হন। আমি যখন ডিএমপির কমিশনার ছিলাম তখনই বিষয়টি জনসমক্ষে নিয়ে আসি। তখন আমার লক্ষ্য ছিল পুলিশের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর থাকবে, পুলিশের অবদান, পুলিশের ইতিহাস, বঙ্গবন্ধুর অবদান—এগুলো থাকবে। জাদুঘর এরই মধ্যে হয়েছে।’


মন্তব্য