kalerkantho


মেয়ে ও জামাতার জারভানকা খেল

১৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মেয়ে ও জামাতার জারভানকা খেল

মাইকেল ওলফের ‘ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি’ গ্রন্থ নিয়ে কেন তোলপাড়? জানতে পড়ুন বাছাই অংশ। ভাষান্তর : গাউস রহমান পিয়াস

 

শুক্রবার সন্ধ্যায় সূর্য ডোবার আগে সাবাথ পালন করতেই হবে! যত গুরুত্বপূর্ণই হোক, এ সময় হোয়াইট হাউসে আর কিছু করবেন না কুশনার। অর্থডক্স ইহুদি হিসেবে বেড়ে ওঠা কুশনার শ্বশুরের হোয়াইট হাউসেও তাঁর মতো দুজন গোঁড়া পেয়ে গিয়েছিলেন : আভি বেরকোউইতজ ও জোশ রাফেল। মনেপ্রাণে ইহুদি যে জামাতা, তাঁকেই মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি স্থাপনের পক্ষে যোগ্য ব্যক্তি মনে করলেন ট্রাম্প। কুশনারও দায়িত্ব পেয়ে আমেরিকার ইহুদি সংস্থাগুলোর চেয়েও ইসরায়েলের বড় বান্ধব হয়ে উঠলেন। তবে ট্রাম্পের বাবা স্বভাবে নিষ্ঠুর শুধু নন, ছিলেন ইহুদিবিরোধিতায় স্পষ্টভাষী। নিউ ইয়র্কের আবাসন বিবাদে ইহুদি নন-ইহুদি ইস্যুটি বড় হয়ে উঠলে ট্রাম্প পরিবার ইহুদিবিরোধিতার পক্ষ নেয়। ওই সময় ট্রাম্পকেও প্রকাশ্যে মুখ খারাপ করতে শোনা যেত। বিল্ডিংয়ে নিজের নাম লিখে কুরুচিরও পরিচয় দেন ট্রাম্প। মজাটা হচ্ছে, এর পরও রিয়েল এস্টেট মার্কেটিং ও ডেভেলপার হিসেবে নাম কুড়াতে ট্রাম্পের অসুবিধা হয়নি। ইসরায়েলের দায়িত্ব জামাতাকে দেওয়া ট্রাম্পের জন্য ইহুদি ইস্যুতেও বড় পরীক্ষা ছিল। আশাবাদও কম ছিল না শ্বশুরের। ‘জারেদ নতুন হেনরি কিসিঞ্জার হতে যাচ্ছে’, জামাতার প্রশংসায় কয়েকবারই ট্রাম্প বলেছেন কথাটি।

জামাই জারেদ, মেয়ে ইভানকা। দুইয়ে মিলে ‘জারভানকা চক্র’ গড়ে উঠেছিল। যখন অন্দরমহলের প্রায় সবই ফাঁস হয়ে যাচ্ছে, জারভানকা অংশটির চক্ষুশূল হয়ে উঠলেন প্রধান কৌঁসুলি স্টিভ ব্যানন। জারেদ কুশনার ধরেই নিলেন, তাঁকে শেষ করার জন্য এমন কিছু নেই ব্যানন করতে পারেন না। এত দিন উদারপন্থী মিডিয়ার চোখ থেকে ব্যাননকে রক্ষা করেছেন কুশনার। এবার তিনি সিদ্ধান্তে এলেন, ব্যানন শুধু তার শত্রুই নন, ইহুদিবিরোধীও। ব্যাননও কম যান না। ইসরায়েল ইস্যুতে ব্যানন কাছে টানেন লাস ভেগাসের ধনকুবের শেলডন আডেলসনকে। কৌশলটি কাজে দিল। প্রেসিডেন্ট শ্বশুর জামাতাকে কয়েয়কবার স্মরণ করিয়ে দিলেন, ইসরায়েল  নিয়ে যাই করো, শেলডনের সঙ্গে কথা বলে নিয়ো। ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে এই জুডো খেলায় ট্রাম্প আর ব্যানন যখন একদিকে, কুশনার আঘাত হানলেন হোয়াইট হাউসে ‘গোল্ডম্যান জিউস’ বলে পরিচিত গ্যারি কহনকে প্রবেশ করিয়ে। কুশনার-কোহন জুুটি ও ব্যানন-প্রিবাস বিরোধ প্রসঙ্গে হেনরি কিসিঞ্জারের মন্তব্য ছিল, ইটজ আ ওয়ার বিটুইন দ্য জিউস অ্যান্ড দ্য নন-জিউস।

ব্যানন দিনে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা, সপ্তাহে সাত দিন কাজ করছিলেন। ঘুম হারাম ছিল রাতেও! ফোন খোলা রেখে উদ্বেগে থাকতে হতো, কখন প্রেসিডেন্ট ডেকে বসেন। সবার চোখের সামনে ব্যাননের শরীর খারাপ হতে থাকল। চেহারায় ফোলা ভাব, দুই পাও ফুলে প্রায় ঢোল, চোখ নিষ্প্রভ! মনে হতো, একই জামা পরে ঘুমিয়েছেন! কাজে মনঃসংযোগও কমে এসেছিল। অথচ কুশনার প্রেসিডেন্ট শ্বশুরের কানও ভারী করছিলেন এই বলে, হোয়াইট হাউসের গুরুকর্মের ভার ৬৩ বছর বয়সী ব্যানন নিতে পারছেন না। জামাই কুশনার আরো ঘোষণা দিলেন, ‘রিসেট! টোটাল রিসেট!’

এক মাস গিয়ে প্রেসিডেন্সি দ্বিতীয় মাসে গড়িয়েছে, নড়েচড়ে বসল জারেদ-ইভানকা-গ্যারি-ডিনা চক্র। ২৮ ফেব্রুয়ারি কংগ্রেসের জয়েন্ট সেশনে প্রেসিডেন্ট যে ভাষণ দেবেন, অবশ্যই তাঁদের হাত দিয়ে যেতে হবে। মেয়ে ইভানকা বাবাকে জানিয়ে দিলেন, এবারের ভাষণে ‘ব্যানন’ নামটিও যেন না থাকে। এর আগে অভিষেক অনুষ্ঠানের ভাষণটি মূলত ব্যানন ও স্টিফেন মিলারের হাত দিয়ে গিয়েছিল। ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসের আরেকটি অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, ভাষণ লিখিয়ে দল না থাকা। ব্যানন শিক্ষিত, বলেন ভালো; কিন্তু লেখা বলতে যা বোঝায় কর্মটি তিনি কখনো করেন না। মিলারকে দিয়েও বুলেট পয়েন্ট বসানোর বেশি কিছু হয় না। শূন্য স্থানটিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন ইভানকা এবং দ্রুত জাভানকা শিবিরের লোকজনের সহায়তায় জয়েন্ট সেশনের একটা খসড়া দাঁড় করিয়ে ফেলেন।

২৮ ফেব্রুয়ারি কপি হাতে প্রেসিডেন্ট আচরণ করলেন যেমনটি জাভানকা চক্র আশা করেছিল। সেই রকম সাহসী ট্রাম্প, সেলসম্যান ট্রাম্প, বেপরোয়া ট্রাম্প, যুদ্ধজয়ী ট্রাম্প! ওই রাতে প্রেসিডেন্টকে সত্যিই প্রেসিডেন্ট দেখাল। এমনকি মিডিয়া একবারের জন্য হলেও ট্রাম্পের মধ্যে ভালো কিছু দেখল। এক দিনের জন্য হলেও গণমাধ্যমে এ ছিল অন্য রকম প্রেসিডেন্সি। কেউ কেউ তো এমনও বলল, ‘এত দিন ট্রাম্পকে আমরা ভুল বুঝিনি তো! পরের ঘণ্টাগুলো ট্রাম্পের জন্য ছিল হোয়াইট হাউসে তাঁর সেরা সময়। ট্রাম্প তাঁর প্রশংসা করে লেখা খবরগুলোয় চোখ বুলিয়ে টানা প্রায় দুই দিন কাটালেন। এই সফল ভাষণে আরো প্রমাণিত হলো, ইভানকা-কুশনার যে ঐকমত্যের কথা বলছেন তা যথার্থ। ইভানকার যে ধারণা তাঁর বাবা কেবলই ভালোবাসা পেতে চান, প্রমাণিত হলো এ সত্যটিও। আর বাতাসে ভাসছিল নতুন নীতিরও কথা : ‘রিচিং আউট’, বাইরেও নজর দাও! আর ব্যানন দেখলেন তাঁর আশঙ্কাই সত্যি : ট্রাম্প একটা মার্শম্যালো! চুইংগাম।

তিন-তিনটি টিভি আছে হোয়াইট হাউস বেডরুমে। নিজেই চ্যানেল ঘোরান ট্রাম্প। তবে পত্রিকায় কী পড়বেন সব ঠিক করে দেন হোপ হিকস। প্রচারের দিনগুলোতে অল্প বয়সী মেয়েটি ছিলেন ট্রাম্পের নিত্যসঙ্গী। স্বল্পবসনা, মিনিস্কার্ট পরা হোপ, ক্যাম্পেইন রিপোর্টারদের কাছেও অতিপরিচিত ছিলেন। তখন হোপ ট্রাম্পের মুখপাত্র, ট্রাম্পের মুখে প্রায়ই শোনা যেত, ‘হোপ কোথায়?’ হোয়াইট হাউসে হোপের চাকরির দায়িত্বের মধ্যে ছিল পত্রিকার কোন কোন খবরে ট্রাম্পকে চোখ বোলাতে হবে, কী কী আড়াল করতে হবে, তা বাছাই করে দেওয়া। কিন্তু ১ মার্চ ওয়াশিংটন পোস্ট, নিউ ইয়র্ক টাইমস ও নিউ ইয়র্কারে মুদ্রিত খারাপ খবরটি যে প্রেসিডেন্টের সামনে পেশ করতে হবে হোপ তা বুঝে উঠতে পারেননি। খবরে বলা হয়, ট্রাম্পের নিউ অ্যাটর্নি জেনারেল জেফ সেশনস রুশ রাষ্ট্রদূত সারগেই কিসলিয়াকের সঙ্গে দেখা করেছেন। তবে পরে এ খবর কানে যাওয়ার পর ট্রাম্প উল্টো প্রশ্ন করেছিলেন, রুশদের সঙ্গে যোগাযোগ করাটা কেন খারাপ হতে যাবে! পরে সেশনস বললেন, তিনি দেখা করেননি এবং ব্যাপারটাও আপাতত এখানে চুকে গেল। আর প্রেসিডেন্ট বললেন, ‘ফেক নিউজ।’

তবে কেলেঙ্কারি পিছু ছাড়ল না। নিউ ইয়র্কার তিন রিপোর্টারের সাড়ে ১৩ হাজার শব্দের একটি প্রতিবেদন ছাপে। খবরের বিষয় যদিও পুতিন-ট্রাম্প নিয়ে আতঙ্ক, তলার দিকে ছিল একটি স্পর্শকাতর তথ্য। তথ্যটি ছিল ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্ট জামাতা ট্রাম্প টাওয়ারে রুশ রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করেছেন, সঙ্গে ছিলেন মাইকেল ফ্লিন। তবে হোপের চোখ সে পর্যন্ত যায়নি এবং ব্যানন তা দেখতে পেয়ে দাগ দিয়ে প্রেসিডেন্টকে পড়তে দিলেন। আর যায় কোথায়! কুশনার ধরে নিলেন, ফাঁসের কর্মটি আর কারোর নয়, ব্যাননের।

সমস্যা হয়েছে? বের হও, এ নীতি যেন ট্রাম্পের স্বভাবজাত। রুশ কেলেঙ্কারিতে অ্যাটর্নি জেনারেলের চাকরি যাওয়ার পর ট্রাম্প ভাবলেন, সেশনস থেকে মুক্তি পাওয়া গেছে! তাঁর আরো মনে হলো, ‘আড়ালে কী ঘটছে, রাশিয়া নিয়ে তথ্য কোত্থেকে আসছে সব আমি জানি!’ ট্রাম্প ওবামার লোকজনকে দায়ী করে ভাবলেন, এবার ছেড়ে দিলে সামনে অন্য কিছু নিয়ে হাজির হবে। অথচ সব ফাঁস করেই দিতে হবে! ৩ মার্চ। মার-এ-লাগো বেড়াতে গিয়েছেন ট্রাম্প। সন্ধ্যায় ফক্স চ্যানেলের এক খবরে শুনলেন প্রচারণার দিনগুলোতে ট্রাম্প টাওয়ারে আড়ি পাতা ছিল গোয়েন্দাদের। ৪ মার্চ ভোরে শুরু হলো ট্রাম্পের টুইট।

৪:৩৫ : “এ ভয়ংকর! সবেমাত্র জানা গেল, ওবামা ট্রাম্প টাওয়ারে আমার সব ‘ফোন রেকর্ড’ করেছে বিজয়ের ঠিক আগে। কিছুই পায়নি। বোগাস!” ৪:৪৯ : ‘একজন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের পক্ষে নির্বাচনের আগে এমন আড়ি পাতা কি বৈধ? একটি নয়া অপকর্ম!’ ৫:০২ : ‘পবিত্র নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রেসিডেন্ট ওবামা কিভাবে আমার ফোনে আড়ি পাততে পারলেন? এ হচ্ছে নিক্সন/ওয়াটারগেট (কেলেঙ্কারি)। একটা খারাপ (অসুস্থ) লোক!’

৬টা ৪০ মিনিটে প্রিবাসকে ফোন করে ঘুম ভাঙিয়ে ট্রাম্প বললেন, ‘ওদের হাতেনাতে ধরেছি!’ টিভির ‘বাইয়ার’ শোটি যাতে তখনই প্রিবাস প্লেব্যাক করতে পারেন, ট্রাম্প কথা লম্বা করলেন না। কিন্তু পরে সিএনএন জানায়, দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ট্রাম্পের অভিযোগ জায়গায় নাকচ করে দিয়েছেন। একজন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বললেন, ‘ননসেন্স।’

২৪ মার্চ, শুক্রবার রিপাবলিকান হেলথ কেয়ার বিল পেশের দিন। পলিটিকোর প্লেব্যাক পূর্বাভাস দিল বিল পাসের সম্ভাবনা ফিফটি-ফিফটি। ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেনসকে পাঠানো হলো মিডাওস ফ্রিডম ককাসকে হাত করে যদি কিছু করা যায়। সাড়ে ৩টায় স্পিকার পল রায়ান ফোন দিলেন ট্রাম্পকে, জানালেন এখনো ১৫ থেকে ২০টি ভোট কম আছে। এদিকে ব্যানন মরিয়া, বিলটিকে দ্রুত ভোট পর্যন্ত গড়াতেই হবে। বিল পাস না হওয়া মানেই রিপাবলিকান নেতৃত্বের পরাজয়। ‘ওরা ডুবুক’, ভাবছিলেন ব্যানন। কিন্তু ট্রাম্প বিলটি আটকে দিলেন। এদিকে রায়ান ফাঁস করে দিলেন, ভোট বাতিল তিনি করেছেন প্রেসিডেন্টের আদেশে। উইকএন্ডে এসে ব্যানন তালিকা ধরে এক দল রিপোর্টারকে বললেন, অবশ্য প্রকাশ না করার শর্তে, রায়ান আর বেশি দিন থাকছেন না।

বিলটি আটকে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন ডেপুটি চিফ অব স্টাফ ক্যাটি ওয়ালশও। কুশনারকে ডেকে বলেই ফেললেন, তিনি চলে যেতে যান। কুশনার দেখলেন এই সুযোগ! ট্রাম্প জামাতা ঢোল পিটিয়ে বললেন, সব ফাঁস ওয়ালশের কাজ, সে আর থাকছে না! নতুন প্রশাসনের দশম সপ্তাহে ট্রাম্পের হোয়াইট হাউস দ্বিতীয়বারের মতো বড় পদের একজনকে হারাল। [১০, ১১ ও ১২ অনুচ্ছেদের বাছাই অংশ ধরে ভাষান্তর]


মন্তব্য