kalerkantho


না.গঞ্জে হকার উচ্ছেদকালে সংঘর্ষ

অস্ত্র দেখানোর আগে মারধর নিয়াজুলকে

♦ মেয়র আইভী মাইনর স্ট্রোক করেছেন
♦ অস্ত্রধারী শনাক্ত করে ব্যবস্থা : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি   

১৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



অস্ত্র দেখানোর আগে মারধর নিয়াজুলকে

গত মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জে হকার উচ্ছেদে যান সিটি মেয়র আইভী। তাঁর বাঁ পাশে বিএনপি নেতা কাউন্সিলর সুলতান এবং ডান পাশে মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক কাউন্সিলর খোরশেদ। ছবি : কালের কণ্ঠ

নারায়ণগঞ্জে হকার উচ্ছেদ নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনায় বহুল আলোচিত অস্ত্রধারী নিয়াজুল ইসলাম অস্ত্র উঁচিয়ে ধরার আগে প্রতিপক্ষের হাতে তিন দফা মারধরের শিকার হয়েছেন। এমন একটি ভিডিও গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বলা হচ্ছে, নিয়াজুলের বিরুদ্ধে পিস্তল নিয়ে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ স্রেফ মিথ্যাচার। আইভীকে নয়, বরং নিয়াজুল ইসলামকে হত্যার উদ্দেশ্যেই আইভী সমর্থকরা ওই দিন তাঁর ওপর হামলা চালিয়েছিল বলে দেখা যায় ওই ভিডিও চিত্রে। অনেকেই বলছে, ঘটনার শুরুর বিষয়টি ঊহ্য রেখে শুধু অস্ত্র প্রদর্শনের বিষয়টিই গণমাধ্যমে উঠে আসাটা দুখঃজনক।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গত মঙ্গলবার বিকেল ৪টা ৩৯ মিনিটে মেয়র আইভীর নেতৃত্বে লোকজন নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় বঙ্গবন্ধু সড়কের জীবনবীমা ভবনের মুক্তি জেনারেল হাসপাতালের সামনে এলে একজন হকারের সঙ্গে তাদের বাগিবতণ্ডা হয়। ওই হকারকে মারধর করা হলে পাশের মাসুদা প্লাজার নিচে থাকা নিয়াজুল ঘটনাস্থলে গিয়ে কাউকে মারধর না করার অনুরোধ করেন। তখন আইভীর বহরের সামনে থাকা লোকজন নিয়াজুলকে ধাক্কা দিতে থাকে এবং বাগিবতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে। পরে সেখানে জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও মেয়র আইভীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত আবু সুফিয়ান এসে নিয়াজুলকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন। কয়েক সেকেন্ড পরেই আইভীর ভগ্নিপতি ও জেলা যুবলীগের সভাপতি আব্দুল কাদিরও সেখানে এসে নিয়াজুলকে সরিয়ে দেন। কিন্তু তখন ওই বহরে থাকা বিএনপি-জামায়াতের অতি উৎসাহী লোকজন নিয়াজুলকে ধাক্কা দিতে দিতে সামনের দিকে ঠেলে নিতে থাকে। সায়াম প্লাজার সামনে আনার পর সেখানে ফুটপাতে পড়ে যান নিয়াজুল। তখন ৩০ থেকে ৪০ জন লোক নিয়াজুলকে বেধড়ক পেটাতে থাকে। একপর্যায়ে তিনি চাষাঢ়ার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে আবারও লোকজন গিয়ে নিয়াজুলকে দ্বিতীয় দফায় ফুটপাতে ফেলে মারধর করতে থাকে। ফুটপাত থেকে রাস্তায় পড়ে গেলে মারধরের মাত্রা আরো বেড়ে যায়। আশপাশের লোকজন নিয়াজুলকে উদ্ধার করলে তিনি দ্রুত চাষাঢ়ার দিকে যেতে থাকলে তৃতীয় দফায় পেছন থেকে তাঁকে লাথি মারতে দেখা যায় কয়েকজনকে। এ অবস্থায় পেছন থেকে লাঠিসোঁটা নিয়ে লোকজন এগিয়ে এলে নিয়াজুল কোমর থেকে পিস্তল বের করেন। তখন আবার চার-পাঁচজন যুবক গিয়ে মারধর করে নিয়াজুলের পিস্তল ছিনিয়ে নেয়। ভিডিও চিত্রেও এ রকমটা দেখা যায়।

কিন্তু গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুধু পিস্তল হাতে নিয়াজুলের ছবি ও ভিডিও প্রকাশিত হয়। নিয়াজুল একসময় এমপি শামীম ওসমানের কর্মী ছিলেন বলে বিষয়টি তাঁর ওপর বর্তানোর চেষ্টা করা হয়।

এদিকে মিডিয়ায় আবু সুফিয়ান, বিএনপি ক্যাডার সুমনের অস্ত্র প্রদর্শনের চিত্র উঠে আসায় বিপাকে পড়েছে আইভীপন্থীরা। বিশেষ করে বিএনপি-জামায়াতপন্থী কাউন্সিলরদের নিয়ে হকার উচ্ছেদে যাওয়া নিয়েও বিব্রত তারা। ওই দিনের ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, হকার উচ্ছেদে যাওয়ার সময় মেয়র আইভীর বাঁ দিকে রয়েছেন বহু মামলার আসামি বিএনপি নেতা, নারায়ণগঞ্জের কাউন্সিলর সুলতান এবং ডান দিকে নারায়ণগঞ্জ মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ।

নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘নিয়াজুল নামের যে ব্যক্তি অস্ত্র বের করেছিলেন তাঁর সম্পর্কেও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিক কিছু তথ্য পেয়েছি। তিনি একজন ব্যবসায়ী। তিনি কী কারণে সেখানে গিয়েছিলেন সে ব্যাপারেও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া গণমাধ্যমে যাদের আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের চিত্র বের হয়েছে, তাদের ব্যাপারেও খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।’

মেয়র আইভীর মাইনর স্ট্রোক : নারায়ণগঞ্জের সিটি মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী মাইনর স্ট্রোক করেছেন বলে সিটি স্ক্যান রিপোর্টে ধরা পড়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর ঢাকার ধানমণ্ডিতে ল্যাবএইড হাসপাতালে তাঁর মাথার সিটি স্ক্যান করা হয় বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের মিডিয়া বিভাগের প্রধান সাইফুল ইসলাম লেনিন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সিটি স্ক্যান রিপোর্টে আইভীর মাইনর হেমোরেজিক স্ট্রোক ধরা পড়েছে। তবে প্যারালিসিস বা অন্য কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায়নি।

আইভীর চিকিৎসায় নিয়োজিত পাঁচ সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ডের সদস্য এবং ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতালের সিসিইউ ইনচার্জ অধ্যাপক ডা. মাহবুবুর রহমান গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্ট্রোক হেমোরেজিক হলেও তা মাইনর (সামান্য)। যতটুকু হয়েছে তা কনজারভেটিভ। এর জন্য কোনো অপারেশনের প্রয়োজন নেই। আশা করি, প্রয়োজনীয় ওষুধেই কাজ হবে।’

অধ্যাপক ডা. মাহবুবুর রহমান জানান, আইভী স্বাভাবিক কথা বলতে পারছেন। আজ আবার সিটি স্ক্যান করে ফলোআপ করা হবে।

মেয়র আইভীর চিকিৎসায় বিশিষ্ট হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বরেণ চক্রবর্তীকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের ওই মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। অধ্যাপক ডা. বরেণ চক্রবর্তী জানিয়েছেন, ব্রেনের বা হার্টের রক্ত চলাচল ব্যাহত হওয়ার কারণে অথবা অন্য নানা কারণে যে কেউ আচমকা অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। মেয়র আইভীর ক্ষেত্রেও এমন কিছু ঘটেছে যাকে বলে ‘সিনকোপি’। তবে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় মেয়র সেলিনা হায়াত আইভির হৃদযন্ত্রে তেমন কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি।

সেলিনা হায়াত আইভী ল্যাবএইডের করোনারি কেয়ার ইউনিটের (সিসিইউ) ১৬ নম্বর বেডে ভর্তি আছেন।

হাসপাতালের মিডিয়া বিভাগের প্রধান সাইফুল ইসলাম লেনিন জানিয়েছেন, গতকাল বিকেলে নারায়ণগঞ্জ থেকে ল্যাবএইডে নিয়ে আসা হয় মেয়র আইভীকে।

এর আগে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) আসাদুজ্জামান জানান, মেয়র আইভীকে চার সদস্যের একটি মেডিক্যাল টিম চেক আপ করেছে। তাঁর ব্লাড প্রেসার লো হয়ে গেছে। এ ছাড়া তিনি হার্টের সমস্যায় ভুগছিলেন। চিকিৎসার পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে মেডিক্যাল চেক আপের জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়।

আইভীর ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) আবুল হোসেন বলেন, ‘মেয়র গতকাল নিজ কার্যালয়ে একটি জাতীয় দৈনিকের সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপ করছিলেন। এ সময় তিনি অসুস্থ বোধ করেন। বমি বমি ভাব হলে তিনি বাথরুমে গিয়ে বমি করেন। পরে বের হয়ে স্যালাইন খান। চিকিৎসকরা এ সময় তাঁর ব্লাড প্রেসার লো পাচ্ছিলেন। তাঁকে তাৎক্ষণিক স্যালাইন পুশ করার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে দ্রুত অ্যাম্বুল্যান্সে করে ঢাকায় নেওয়া হয়।

নারায়ণগঞ্জে যারা সন্ত্রাস করেছে তাদের গ্রেপ্তার করে বিচারের নির্দেশ আছে : ওবায়দুল কাদের

নিজস্ব প্রতিবেদক, কুমিল্লা জানান, সড়ক যোগাযোগ ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি বলেছেন, ‘নারায়ণগঞ্জে যারা সন্ত্রাস করেছে তাদের গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করার নির্দেশ আছে। বিষয়টি আমাদের প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তদারকি করছেন।’ মন্ত্রী গতকাল কুমিল্লা-নোয়াখালী সড়ক পরিদর্শনকালে এসব কথা বলেন।

নারায়ণগঞ্জে সংঘর্ষে অস্ত্রধারীদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, নারায়ণগঞ্জের ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ঘটনায় যা যা ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, তা করা হচ্ছে। ভিডিও ফুটেজ দেখে অস্ত্রধারীদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গতকাল দুপুরে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে (ডিএনসি) ‘কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র ৫০ শয্যা হতে ১০০ শয্যায় উন্নীতকরণ’ উদ্বোধন অনুষ্ঠান শেষে তিনি সাংবাদিকদের এ কথা বলেন।


মন্তব্য

mahfuz commented 5 days ago
vua