kalerkantho


জালাল কাহিনিতে কিশোরগঞ্জে তোলপাড়

এক পরিবার দেশছাড়া বহু পরিবার সর্বস্বান্ত

শফিক আদনান, কিশোরগঞ্জ   

১৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



এক পরিবার দেশছাড়া বহু পরিবার সর্বস্বান্ত

৯ বছর নিখোঁজ ছিলেন জালাল। তাঁর ব্যাপারে সংবাদ সংগ্রহে গেলে তিনি দ্রুত বাড়ির ভেতর গিয়ে শয্যা নেন। পরিবারের দাবি, জালাল অনেকটাই অপ্রকৃতিস্থ। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘অপহরণ ও খুন’ হওয়ার ৯ বছর পর কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের উত্তর লাকুহাটি গ্রামের জালাল উদ্দিন (৪০) ফিরে এসেছেন। তাঁকে দেখতে তাঁর বাড়িতে রীতিমতো ভিড় করছে প্রতিবেশীরা। তিনি ৯ বছর ‘নিখোঁজ’ থাকার পর গত সোমবার ফিরে আসেন। এ ঘটনায় পাঁচজনকে আসামি করে ‘অপহরণ করে খুন ও লাশ গুমের’ মামলা করেছিলেন জালালের স্ত্রী ললিতা বেগম।

তবে ‘জালাল কাহিনির’ কোনো সদুত্তর দিতে পারছে না তাঁর পরিবারের লোকজন। পাওয়া যাচ্ছে এর পেছনে নানা ‘ষড়যন্ত্রের’ গন্ধ। রয়েছে আরো কয়েকজনের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার, এমনকি একজনের দেশান্তরি হওয়ার ঘটনাও।

গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে উত্তর লাকুহাটি গ্রামে জালাল উদ্দিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বেশ কয়েকজন প্রতিবেশী চেয়ারে বসে গল্পগুজব করছে। আর জালাল উদ্দিন পায়চারি করতে করতে মাঝেমধ্যে তাদের সঙ্গে কথা বলছেন। তখন তাঁকে বেশ স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল।

এত দিন কোথায় ছিলেন জিজ্ঞেস করলে জালাল উদ্দিন জানান, আসামিরা ঢাকার একটি বাসায় তাঁকে ৮৫ দিন আটকে রেখে ছেড়ে দিয়েছিল। ওই সময় তিনি পাগলের মতো হয়ে উঠেছিলেন। পরে আর কিছু মনে নেই তাঁর। বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি করে মানুষের কাছে চেয়ে-চিন্তে খেয়েছেন, থেকেছেন।

জালাল দাবি করেন, মাসখানেক আগে তিনি ধীরে ধীর কিছুটা স্মৃতি ফিরে পান। বাড়িঘর, স্ত্রী ও সন্তানদের কথা মনে পড়ে তাঁর। তখন তিনি মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুরে ছিলেন। একটা মোবাইল ফোন নম্বর তাঁর মনে ছিল, এটি তাঁর দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের ফোন নম্বর। সেই ফোনে তিনি তাঁর অবস্থানের খবর দেন। পরে তাঁর সেই আত্মীয় তাঁকে কিশোরগঞ্জে নিয়ে আসেন।

ওই আত্মীয় কে জানতে চাইলে মাথা চুলকে জালাল বলেন, ‘আমার মনে নেই।’ ফোন নম্বরটা জানতে চাইলে সেটাও ভুলে গেছেন বলে জানান তিনি।

এ সময় জালালের স্ত্রী ললিতার কাছে প্রশ্ন ছিল, আপনাকে কে জানিয়েছে, আপনার স্বামীকে পাওয়া গেছে। তিনিও সেই ব্যক্তির নাম ও ফোন নম্বর জানাতে পারেননি। তবে তিনি বলেন, অনেকেই তো ফোন দেয়; কিন্তু সেই নম্বরটা কার ছিল, তিনি বলতে পারেন না।

আপনার স্বামী বাড়িতে না গিয়ে সোজা আদালতে গেলেন কেন? আপনারাই বা কিশোরগঞ্জে এক হলেন কিভাবে? ললিতাকে এ প্রশ্ন করার সঙ্গে সঙ্গে জালাল ‘অসুস্থ’ হয়ে ঢলে পড়লেন। তখন তাঁকে ধরাধরি করে বসতঘরের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। পেছনে পেছনে এ প্রতিবেদকও ঘরে প্রবেশ করেন। তখন জালাল উদ্দিন রীতিমতো কাঁপছিলেন। তাঁকে কাঁথা-কম্বল দিয়ে জড়িয়ে দেন স্ত্রী। এ সময় জালাল উদ্দিনের মাথা কোলে নিয়ে মাথায় তেল দিতে থাকেন তাঁর স্ত্রী। আরো কয়েকটি প্রশ্ন করা হলেও জালাল উদ্দিন কোনো সাড়া দেননি।

জালাল নিখোঁজ হওয়ার পর যাঁদের নামে মামলা করা হয় তাঁদের একজন শঙ্কর সূত্রধরের দখল হয়ে যাওয়া বাড়ি।    ছবি : কালের কণ্ঠ

ললিতাকে প্রশ্ন করা হয়, জালালকে হাসপাতালে ভর্তি না করে বাড়িতে রেখেছেন কেন? উত্তরে তিনি বলেন, ‘গরিব মানুষ টাকা-পয়সা নেই। তবে পল্লী চিকিৎসককে খবর দেওয়া হয়েছে।’ এ সময় তিনি এমনভাবে তাঁর স্বামীর সেবা করছিলেন যে কিছুতেই জালাল উদ্দিনের মুখের ছবি তোলা যাচ্ছিল না। বরং ললিতা বারবার প্রশ্ন করছিলেন, ‘ছবি তুলে কী করবেন।’ তিনি দাবি করেন, মামলা চালিয়ে তিনি নিঃস্ব হয়ে গেছেন। এখন আসামিদের ভয়ে রয়েছেন, তারা যদি আবার তাঁর স্বামীর কোনো ক্ষতি করে।

জালালের এক প্রতিবেশী নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে জানান, তিনি নিশ্চিত জালালের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ ছিল। তিনি যোগাযোগ করেই বাড়ি ফিরেছেন।

একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, জালাল এলাকার একটি চক্রের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। কোনো কিছুর বিনিময় বা আশ্বাসে ওই চক্রের হয়ে কাজ করেছেন তিনি। ‘অপহরণ, খুন ও লাশ গুমের’ নাটক সাজিয়ে তৃতীয় একটি পক্ষ প্রতিপক্ষকে ফাঁসিয়ে ফায়দা লুটেছে।

আদালত সূত্রে জানা যায়, উত্তর লাকুহাটি গ্রামের মফিজ উদ্দিনের ছেলে মো. জালাল উদ্দিন ২০০৯ সালের ১০ জুলাই অপহরণের পর খুনসহ লাশ গুমের অভিযোগে তাঁর স্ত্রী ললিতা বেগম ২০১০ সালের ৩১ মার্চ হোসেনপুর থানায় পাঁচজনকে আসামি করে একটি মামলা করেন। আসামিরা হলেন পাশের গাঙ্গাটিয়া গ্রামের শঙ্কর সূত্রধর, মো. আসাদ মল্লিক, রুহুল আমিন ওরফে রঙ্গু, হিরা মিয়া ও আজহারুল ইসলাম।

জানা গেছে, আসামিদের মধ্যে মদন সূত্রধরের ছেলে শঙ্কর সূত্রধর এলাকায় ‘আদম ব্যবসা’ করতেন। তিনি অন্তত ২০ হাজার থেকে ২২ হাজার লোককে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন। তিনি মোটামুটি সুনামের সঙ্গেই বিদেশে লোক পাঠানোর ব্যবসাটি করতেন বলে এলাকার লোকজন জানিয়েছে। এলাকায় তাঁর বাড়িসহ অনেক সহায়-সম্পত্তি ছিল। স্থানীয় লোকজনের ধারণা, একটি চক্র তাঁর সহায়-সম্পত্তি দখল করে নেওয়ার জন্যই জালালকে দিয়ে এই নাটক সাজিয়েছে।

এলাকার লোকজন জানায়, ঘটনার প্রায় এক বছর পর মামলা করেন জালালের স্ত্রী। আর ঘটনার পরেই খুনের মামলার ভয়ে সহায়-সম্পত্তি ফেলে ভারতে চলে যান শঙ্কর সূত্রধর। এরপর তিনি আর দেশে ফেরেননি।

স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, দিদারুল আলম ফারুক নামের গাঙ্গাটিয়া এলাকার এক ব্যক্তির নেতৃত্বে একটি চক্র শঙ্কর সূত্রধরের বাড়ি ও জমিজমা দখল করে নিয়েছেন।

ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে সবিতা বর্মণ নামের এক নারী পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করছেন। তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, এটি ফারুকের বাড়ি। তিনি তাঁদের এখানে থাকতে দিয়েছেন। ভাড়া কত দেন জানতে চাইলে সবিতা বলেন, ভাড়া দিতে হয় না। কিছুদিনের মধ্যে তাঁরা এখান থেকে চলে যাবেন।

সেখানে ফারুকের চাচা সম্পর্কের এক ব্যক্তি জানান, এ বাড়ি শঙ্করের বাবার কাছ থেকে ফারুক কিনে রেখেছেন।

এ বিষয়ে ফারুকের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও এলাকায় তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর মোবাইল ফোন নম্বরটিও কেউ জোগাড় করে দিতে পারেনি।

মামলার আরেক আসামি আজহারুল ইসলাম গাঙ্গাটিয়া বাজারে ওষুধের ব্যবসা করেন। তিনি নিজে দোকানটি চালান। বাজারে তাঁর পাঁচটি দোকান ছিল। মামলায় পড়ে তিনি দুটি দোকান বেচে দিয়েছেন। তিনি অন্তত চারবার হাজত খেটেছেন। তা ছাড়া রিমান্ডে পুলিশের অকথ্য নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তাঁকে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। নির্যাতন থেকে বাঁচতে পুলিশকে বহু টাকা দিতে হয়েছে। তবে কত টাকা দিয়েছেন তিনি, তা বলতে রাজি হননি।

আজহারুল বলেন, ‘আমি গোবিন্দপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী ছিলাম। একবার নির্বাচন করেছিও। এসবই আমার কাল হয়েছে।’ জালালের ঘটনা দিয়ে অনেকে অনেকভাবে তাদের আক্রোশ মিটিয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

ওই সব দুঃসহ দিনের কথা স্মরণ করে আজহারুল বলেন, ‘সমাজ, পরিবার ও সন্তানদের কাছে হেয় হয়েছি। মান-মর্যাদাও গেছে। আর্থিকভাবে একেবারে শেষ হয়ে গেছি। আমি এ ঘটনার নতুন করে তদন্তের দাবি জানাচ্ছি।’

ফিরে আসার সময় বেশ কয়েকজন এলাকাবাসীর সঙ্গে জালালের বিষয়ে কথা হয়। তাদের কেউ কেউ ঘটনাটিকে সন্দেহজনক, কেউ কেউ আবার সাজানো নাটক বলে মন্তব্য করেছে।

গত সোমবার ‘অপহরণ ও খুন’ হওয়ার ৯ বছর পর জালাল উদ্দিন কিশোরগঞ্জ দ্বিতীয় জেলা ও দায়রা জজ আদালতে হাজির হয়ে তাঁর আইনজীবীর মাধ্যমে বলেন, আসামিদের হাতে আটক থাকাবস্থায় নিয়মিত নেশাযুক্ত ওষুধ প্রয়োগের কারণে মানসিক ভারসাম্য ও স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। দীর্ঘদিন অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায় ঘুরে বেড়ানোর পর সম্প্রতি কিছুটা স্মৃতিশক্তি ফিরে পেয়ে তিনি বাড়িতে ফিরে এসেছেন। তাঁর আইনজীবী সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর এ কে এম আমিনুল হক চুন্নু জালাল উদ্দিনকে আদালতে উপস্থাপন করে তাঁর জবানবন্দি গ্রহণ করে নিজ জিম্মায় রাখা এবং মামলার সাক্ষী হিসেবে গণ্য করার জন্য বিচারকের কাছে আবেদন করেন। তবে আদালতের বিচারক মো. আব্দুর রহমান এ ব্যাপারে কোনো আদেশ দেননি।

অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের জন্য জালাল উদ্দিনকে আদালতের হেফাজতে নিয়ে জবানবন্দি গ্রহণের আবেদন জানালেও বিচারক তা আমলে নেননি।

এ ব্যাপারে মিজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা মিথ্যা ও সাজানো মামলা। শুধু আসামিদের হয়রানি করতেই মামলাটি করা হয়েছে।’

ওই মামলায় দীর্ঘ ৯ বছর ধরে পলাতক আছেন দুজন। বাকি আসামিরা পলাতক থাকার পর আদালতে আত্মসমর্পণ করে কিংবা পুলিশের হাতে আটক হয়ে হাজত খেটে জামিনে বেরিয়ে এসেছেন।

মামলার বিবরণে বাদী ললিতা বেগম আসামি শঙ্কর সূত্রধর ও আসাদ মল্লিককে আদম ব্যাপারী এবং বাকি তিনজনকে তাঁদের সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। চাকরিসহ সৌদি আরব পাঠানোর কথা বলে আসামিরা তাঁর স্বামীর কাছ থেকে দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা নিয়েছেন বলে মামলায় বলা হয়। কিন্তু নির্ধারিত তারিখে জালাল উদ্দিনকে বিদেশে না পাঠিয়ে বিভিন্ন টালবাহানায় তাঁকে ঘোরাতে থাকেন আসামিরা। একপর্যায়ে আসামিরা বিদেশে যাওয়ার কথা বলে তাঁর স্বামীকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার পর বহু চেষ্টা করেও আর কোনো খোঁজ পাননি।

প্রসঙ্গত, জালাল উদ্দিনের স্ত্রী ছাড়াও দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। তিনি ‘নিখোঁজ’ হওয়ার পর প্রথমে তাঁর মা ফিরোজা খাতুন এবং পরে বাবা মফিজ উদ্দিন মারা যান।

৯ বছর পর জালালের ফিরে আসা নিয়ে গতকাল কালের কণ্ঠে ‘অপহরণ ও খুন হওয়ার ৯ বছর পর আদালতে!’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়।

গতকাল বিকেলে দ্বিতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আব্দুর রহমান সার্বিক বিষয় বিবেচনায় জালাল উদ্দিনের জবানবন্দি নেওয়াসহ মামলাটি নিম্ন আদালতে পাঠানোর ব্যবস্থা নিতে মুখ্য বিচার বিভাগীয় হাকিমকে নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে হোসেনপুর থানার ওসিকে মামলাটি পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাইদুর রহমান গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।


মন্তব্য