kalerkantho


প্রতিপক্ষ যতটা শ্রীলঙ্কা ততটাই হাতুরাসিংহে

মাসুদ পারভেজ   

১৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



প্রতিপক্ষ যতটা শ্রীলঙ্কা ততটাই হাতুরাসিংহে

ভুল বানান, ভুলতে চাওয়া স্মৃতির পিছুটান এবং খেলার ধরনের জিম্বাবুয়ে ব্র্যান্ড। ত্রিদেশীয় সিরিজে আজকের বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা লড়াইপূর্ব আলোচনার দখল নেওয়া বিষয়বস্তু এগুলোই।

বিশেষ করে এই ম্যাচের টিকিটে ‘বাংলাদেশ’ বানানটাই ভুল হওয়া নিয়ে পরশু রাত থেকে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে তোলপাড় উঠে যাওয়াটা অস্বাভাবিক ছিল না। যে ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে অবিক্রীত টিকিট প্রত্যাহার করে নিয়ে ভুল শোধরানোর আনুষ্ঠানিক ঘোষণাও গতকাল দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।

একই দিনে আরেকটি ঘোষণা দিলেন ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজাও। কিছুদিন আগেও যিনি ছিলেন ঘরের লোক, সেই চন্দিকা হাতুরাসিংহে এবার পরের ঘরের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা হয়ে আজ সেই বাংলাদেশেরই সামনে। তাঁকে ঘিরে গত কিছুদিনের জোর আলোচনা যতই থামাতে চায় বাংলাদেশ শিবির, ততই সেটি বেগবান হয়ে ফিরে আসে। ফিরে আসতে চাইল ম্যাচের আগের দিনও।

মাশরাফি তাই ভুলতে চাওয়া স্মৃতির পিছুটান একদম আলগা করে দিতে চাইলেন এই ভাষায়, ‘পেশাদার ক্রিকেটে সাবেক কোচের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। আমরা এই অধ্যায় অনেক আগেই পেছনে ফেলে এসেছি। তিনি যখন চলেই গেছেন, তাঁর পরিকল্পনাও আমরা পুরোটাই ভুলে গেছি। এখানে তাঁকে নিয়ে আর ভাবারই সুযোগ নেই।’ তবে নতুন দায়িত্বে হাতুরাসিংহের অভিষেক নিরানন্দ করে দিয়েছে যাঁরা, সেই জিম্বাবুয়ের খেলার ধরনও বাংলাদেশ অধিনায়কের মনে ঠাঁই করে নিয়েছে।

এমনভাবে যে মনে হলো একই ধরনের ক্রিকেট খেলেই আজ মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে হাতুরাসিংহেকে আরেকটি হারের স্বাদ দিতে চান, ‘জিম্বাবুয়ে কাল (বুধবার) যে ব্র্যান্ডটা খেলেছে, আমাদেরও ওভাবেই খেলতে হবে। এমন নয় যে জিম্বাবুয়ে ভালো না খেলে জিতেছে। ওরা যে ক্রিকেটটা খেলেছে, নির্দিষ্ট দিনে এমন ক্রিকেট না খেললে জেতা সম্ভব নয়। আমাদের সঙ্গে জিম্বাবুয়েও এমন খেলতে পারে। তাই আমাদের মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। আর জিম্বাবুয়ে যে ক্রিকেটটা খেলেছে, জিততে হলে আমাদেরও সেটিই খেলতে হবে।’

অবশ্য জিম্বাবুয়ের কাছে হেরে দেয়ালে পিঠ আরো ঠেকে যাওয়া শ্রীলঙ্কাও ঘুরে দাঁড়াতে আরো মরিয়া হয়ে থাকবে। বছরখানেক বেশ দুঃসময়ের মধ্য দিয়ে যাওয়া লঙ্কানদের পায়ের নিচে মাটি খুঁজে পাওয়ার আশার মধ্যমণিও যে সেই হাতুরাসিংহেই, দলের প্রতিনিধি হিসেবে সংবাদ সম্মেলনে এসে সে কথা বলে গেলেন থিলান সামারাবীরাও। চিনেছেন তো? হাতুরাসিংহের সময়ে ব্যাটিং উপদেষ্টা হিসেবে তিনিও বেশ কিছুদিন জাঁকিয়ে বসেছিলেন বাংলাদেশে। তাঁর কাছ থেকে ব্যাটসম্যানদের মোটেও উপকৃত না হওয়ার ক্রমাগত অভিযোগে গত চ্যাম্পিয়নস ট্রফির পর বিসিবি আর চুক্তি নবায়নই করেনি।

সুবাদে ভেঙে যাওয়া জুটি আবার জোড়া লেগেছে শ্রীলঙ্কার হয়ে। নিজের বিশ্বস্ত সহচরকে নিয়েই হাতুরাসিংহে এসেছেন বাংলাদেশে। যাঁর বিরুদ্ধেও ক্রিকেটারদের অভাব-অভিযোগ কম ছিল না। প্রচার আছে যে প্রশাসকদের সামনে ব্যর্থতার দায় খেলোয়াড়দের কাঁধে চাপিয়ে নিরাপদে থাকতে চাইতেন হাতুরাসিংহে। কালকের সংবাদ সম্মেলনে তাঁকে ঘিরে প্রশ্নের পর প্রশ্নে ব্যতিব্যস্ত মাশরাফিও একসময় পুরনো অভিমান চেপে রাখতে পারলেন না, ‘হাতুরাসিংহে যখন এখানে ছিলেন, তাঁর ওপরে এক রকমের চ্যালেঞ্জ ছিল। আমরা দক্ষিণ আফ্রিকায় বাজেভাবে হেরে আসার পর চ্যালেঞ্জটা আরো বেশি হতো। আরো উপভোগ্য হতো। তিনি থাকেননি, বেছে নিয়েছেন শ্রীলঙ্কাকে। এখন তাঁর আরেক রকম চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জ আমাদেরও। কারণ যখন তিনি ছিলেন, তখনো কথা তো সব আমরাই (খেলোয়াড়রা) শুনেছি। কাজেই চ্যালেঞ্জ সব সময় আমাদেরই নিতে হয়।’

সে জন্যই বিশ্বাস করা কঠিন যে হাতুরাসিংহে-সামারাবীরাকেও দেখিয়ে দেওয়ার চ্যালেঞ্জটি বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়রা নিচ্ছেন না। তা যতই মাশরাফি বলুন না কেন, ‘সত্যি কথা বললে এসব আমাদের ওপর প্রভাব ফেলে না। মনের কোণে এই চিন্তাই থাকে যে ম্যাচটি খেলতে হবে এবং জিততে হবে। এর বাইরে কোনো সুযোগই নেই অন্য কিছু চিন্তা করার। চিন্তা করলে শেষ পর্যন্ত চাপ আরো বাড়ে। আমার মনে হয় খেলার দিকেই সবার মনোযোগ থাকে।’ সেই মনোযোগ থেকে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে রণকৌশলে কিছু ভিন্নতা আনার চিন্তাও আছে। যেহেতু লঙ্কান দলের ব্যাটিং অর্ডারে বেশ কয়েকজন বাঁহাতি ব্যাটসম্যান, তাই একাদশেও পরিবর্তন আসার কথা আজ। বাঁহাতি স্পিনার সাঞ্জামুল ইসলামের জায়গায় ঢুকে পড়তে পারেন অফস্পিনার মেহেদী হাসান মিরাজ।

যাঁকেও খুব ভালো করেই চেনা হাতুরাসিংহের। যদিও সামারাবীরা বলে দিলেন যে এই ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের যুগে কোনো দলের শক্তি-দূর্বলতাই কারো অজানা নয়। সেই সঙ্গে এ কথাও জুড়ে দিলেন যে, ‘আমার মনে হয় না বাংলাদেশ হাতুরাসিংহের বিপক্ষে খেলছে।’

খেলছে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেই। তার আগে টিকিটের ভুল বানানের জন্য বিবৃতি দিয়ে দুঃখ প্রকাশ থাকল। মাশরাফিও জোর গলায় ভুলতে চাওয়া স্মৃতির পিছুটান উপেক্ষা করলেন। প্রকাশ্যে সুনাম করলেন জিম্বাবুয়ে ব্র্যান্ডেরও। যেটি প্রকাশ করলেন না, সেটি অবশ্যই মনের কোণে রেখে দেওয়া অন্য লড়াই। যে লড়াইটি বাংলাদেশ বনাম হাতুরাসিংহেরই!


মন্তব্য